প্রথম যেদিন হাতে পেলাম, পেলাম কেন, পাওয়ার আগে থেকেই উত্তেজনা। এখনকার মত এত সহজলভ্য ছিল না জিনিসটা। তখন সেকেন্ডহ্যান্ডের যা দাম ছিল আজকের দিনে তার চেয়ে অনেক কম দামে ঢের ভাল সেট ফার্স্টহ্যান্ডই পাওয়া যায়। কে যে বলে সেকালে সবকিছু ভাল ছিল!! যাই হোক, জিনিসটা যখন আসব আসব, হাতের কাছে কিছু না পেয়ে টিভির রিমোট নিয়েই শুরু করে দিলাম অনুশীলন। কি ভাবে মোবাইল ফোন ধরতে হয়। মনে আছে আজ থেকে ঠিক এক যুগ আগে যে দাম দিয়ে যে জিনিস কিনেছিলাম পায়ে ধরে সাধাসাধি করলেও আজ সে জিনিস বিনামূল্যে কেউ নেবে না। তবু হাজার হোক, প্রথম মোবাইল ফোন বলে কথা। একটা প্রেম জেগেই আছে। কি সুন্দর!! প্রেমিকা ফোন করলে সবুজ আলো জ্বলে ওঠে, বস ফোন করলে লাল। আহা, হাতে যেন স্বর্গ পেলাম। খালি একটাই দুঃখ ছিল, অবিশ্যি তাকে বেশিদিন বয়ে বেড়াতে হয়নি, আমাকে যদি কারও ফোন করার দরকার হয়ে পড়ত তাহলে আমাকেও গাঁটের কড়ি গুনতে হত।

একদম শুরু থেকেই আমি যে জিনিসটির প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়ে পড়লাম সেটি হল রিংটোন। সেই সময়েই আমার এক সঙ্গীতপ্রেমী সহকর্মী একটা চমৎকার রিংটোন বানিয়ে দিয়েছিলেন। সেটাই বেজে উঠত। ধীরে ধীরে আমিও মানুষ হয়ে উঠলাম। জানতে পারলাম জিপিআরএস বলে একটা জিনিস এসেছে তাতে পয়সা খরচ করলে মনের মত রিংটোন পাওয়া যায়। ফলে প্রথম ফোন বদলে আরও একটু দামি একটি নতুন হাতে এল। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে খোঁজখবর নিতে থাকলাম কি ধরনের রিংটোন আমার জন্মসময়, নামের সাথে ঠিকঠাক খাপ খায়। যত না খরচ হয় ফোন করতে তার চেয়ে বেশি খরচ হয় ওই রিংটোন কিনতে। নিজে ‘পড়োশন’ –এর ভোলার মত সঙ্গীত বিশারদ হলে কি হবে, সকালে আমার মোবাইলে ভৈরবী রাগিনীতে আলাপ, সন্ধ্যেবেলা ইমন আধারিত দ্রুত তরানা বেশ জাঁকিয়ে বেজে উঠত। বেশ একটা কেউকেটা মনে হত নিজেকে। জ্ঞানচক্ষু কার আর কবে একেবারে খুলেছে। আমারও আস্তে আস্তেই খুলেছে। বুঝতে শিখলাম মোবাইল ফোনের দাম ক্রমাগত কমছে। দামটা সহ্য হতেই পুরনো ফোন অসহ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু রিংটোনের প্রতি ভালবাসাটা থেকেই যায়। ইন্টারনেট থেকে বিনাপয়সার সফটওয়্যার নামিয়ে নিয়ে আমি নিজেই হয়ে উঠলাম এক রিংটোনেশ্বর। সিডি থেকে হোক, নেট থেকে ঝেড়ে হোক, পছন্দসই সুর পেলেই তাকে কাটাছেঁড়া করে আমি রিংটোন বানিয়ে ফেলি। কি ঘ্যাম সেসব ব্যাপার। এই মনে হচ্ছে গান শুরু হল হল, কিন্তু না হল না। আবার শুরু থেকে শুরু প্রিল্যুড। এই করতে করতে আমারই তৈরি করা রজ্জু বাগে পেয়ে একদিন আমাকে সর্প ভাবিয়ে ছাড়ল। কি করে? বলব তো। সেই জন্যেই তো এত ভনিতা।

তো আমি করি কি অফিস থেকে বেরিয়ে সেই যে কানে ইয়ারপ্লাগ গুঁজি, খুলি একেবারে বাড়ির কলিং বেল টিপে। সেদিন কি হয়েছে, কেন কে জানে, আমার মোবাইলের ব্যাটারিটির শরীর সারাদিনের ধকল নিতে পারেনি। দিনের শেষে যখন গা এলিয়ে দিয়েছে তখন আমি ট্রেন থেকে নেমে তাকে রেহাই দিলাম আমাকে গান শোনানোর হাত থেকে। কানে গোঁজা ইয়ারপ্লাগটাকে আর খুললাম না। রেলওয়ে স্টেশন থেকে আমার বাড়ি বেশ খানিকটা দূর। তবু ভাবলাম ঠিক আছে এইটুকু রাস্তা না হয় অসুরে গান করতে করতেই চলে যাই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পথ কমছে, সেই সাথে গুনগুনিয়ে চলছে আমার সঙ্গীত চর্চা। রাস্তার যে জায়গাটায় দু’পাশে অতিকায় গাছপালা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, জনমনিষ্যির দেখা মাত্র নেই, রাত প্রায় এগারটা, দূষণ কমানোর জন্যই হোক বা দুর্মূল্য বিদ্যুৎ বাঁচানোর তাগিদেই হোক, ল্যাম্পপোস্টের সোডিয়াম ভেপারগুলি ঘুমিয়ে পড়েছে, নিজেকেই ঠিকমত দেখতে পাচ্ছি না, হঠাৎ আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এল শীতল এক স্রোত। দাঁড়িয়ে পড়তে হল। গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠল, শেষ ডিসেম্বরের ঠাণ্ডাতেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। 

কানের একেবারে ভেতরে, মস্তিষ্কের কাছাকাছি অঞ্চলে কিঞ্চিত বিকৃত কন্ঠে অথচ সমবেত স্বরে এবং স্পষ্ট সুরে ডলবি ডিজিটালে শুনতে পেলাম ‘হাঁউ মাউ খাঁউ, মানুষের গন্ধ পাঁউ’।

 

 

 

 

 

আমারই সৃষ্ট রিংটোন লালকমল নীলকমলের ইন্ট্রো।

অকারণে অকালে মোর পড়ল যখন ডাক
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments