আধুনিক লেখকদের মধ্যে নারায়ণ সান্যাল এক গোষ্ঠীর পাঠকের কাছে বিপুল ভাবে জনপ্রিয়। জনপ্রিয়তার কারণ তাঁর অনবদ্য লেখার টান, বিষয়ের বৈচিত্র্য এবং সময়বিশেষে নিখুঁতভাবে পাঠকের আবেগকে ছুঁতে পারার ক্ষমতা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি পাঠকেরা প্রথম নারায়ণ সান্যালের ভক্ত হয়ে পড়েন "বিশ্বাসঘাতক" বা "প্রবঞ্চক" পড়ে। আমারও নারায়ণ সান্যালের লেখার সাথে প্রথম পরিচয় এই দুটি বইয়ের মধ্যে দিয়েই। ভাল লেগেছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু সত্যিকারের ভক্ত হয়ে পড়ি যে দুটি বই পড়ে সেগুলো হল "হে হংসবলাকা" আর "অন্তর্লীনা"। এই অন্তর্লীনার কথাই বলতে বসেছি আজ। এত পুরনো বই নিয়ে রিভিউ লেখার রেওয়াজ হয়তো বিশেষ নেই, তবু বইটি বহুল পঠিত নয়, তাই মনে হল লেখা যেতেই পারে। কোনওভাবেই অন্তর্লীনা নারায়ণ সান্যালের শ্রেষ্ঠ রচনা নয়, সত্যি কথা বলতে খুব আহামরি কিছুও নয়। তবু কেন এই বইটাকে নিয়ে পড়লাম? তার প্রধান কারণ হিসেবে বলতে পারি বইটি তাঁর অন্যান্য বেশিরভাগ গ্রন্থের থেকে স্বতন্ত্র। কিভাবে? সে কথায় পরে আসছি… এটার কথা লেখার আরেকটা কারণ এই যে এটা ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব কাছের একটা বই। কলেজে থাকতে প্রথম পড়েছিলাম যখন, তখন কিছু কিছু জায়গায় যেন নিজের সাথে মেলাতে পেরেছিলাম গল্পের নায়ক কৃশানুকে। তারপর থেকে বহুবার পড়েছি বইটা। যাই হোক, এই নিয়ে বেশি বলার থেকে নৈর্ব্যক্তিক আলোচনা করাই শ্রেয় (সব লেখার মধ্যেই নিজেকে জড়িয়ে ফেলা আমার একটা বদ অভ্যেস, এটা অনেকেই ইতিমধ্যে বুঝে গেছেন আশা করি)। গল্পের নায়ক কৃশানু মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। বুদ্ধিদীপ্ত, কিন্তু সাধারণের দৃষ্টিতে স্মার্ট নয়, কারণ সে লাজুক, ইন্ট্রোভার্ট, নিজের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে ভালবাসে। এছাড়া তার মধ্যে আছে এক শিল্পীমন, সে সাহিত্যের ছাত্র, ছবিও আঁকে। অথচ তার স্কেচবুকে নেই কোনও নারীর ছবি। তার বয়সী এক যুবক শিল্পীর কাছে একটু অস্বাভাবিক ঘটনা, সন্দেহ নেই। শুধু স্কেচবুক বলে তো নয়, সে ট্রামে উঠে চেষ্টা করে লেডিজ সীট থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকতে, তার সহপাঠী মেয়েদের মুখের দিকে সে কখনও তাকায়না পর্যন্ত। এ হেন নারীভীতির কারণ কি শুধুই লজ্জা? ধীরে ধীরে পাঠকরা জানতে পারেন যে কেবল লাজুক স্বভাবের জন্য নয়, এই আচরণের পিছনে আছে তার এক অদ্ভুত মানসিক সমস্যা। সেই সমস্যা সম্পর্কে সে যথেষ্টই সচেতন, কেবল জানে না কিভাবে বেরিয়ে আসবে সেই সমস্যা থেকে, কিভাবে স্বাভাবিক আর পাঁচটা ছেলের মত হতে পারবে। এ হেন কৃশানুর জীবনে হঠাৎই একসাথে তিনজন নারীর আবির্ভাব হয়। টিউশন পড়ানোর সূত্র ধরে ইভা, আইভি এবং হঠাৎ নতুন পরিচিত স্বাহা মিত্রের সংস্পর্শে এসে তার চরিত্রের নতুন নতুন দিক বিকশিত হতে থাকে। একই সঙ্গে সে যুঝতে থাকে তার নিজের সঙ্গে, নিজের মানসিক সমস্যার সঙ্গে। এইসবের টানাপোড়েনে প্রেম ভালবাসা আবেগের জগতে ঘুরপাক খেতে থাকে কৃশানু, কিন্তু বুঝতে পারেনা নিয়তি তাকে নিয়ে যাবে কোনদিকে। শেষপর্যন্ত কি হয়, কৃশানু তার সমস্যার সমাধান করতে পারে কিনা, সেসব জানতে গেলে পড়তে হবে মূল উপন্যাসটি।

কৃশানুকে ঘিরে তিনজন নারীর এই আবর্তনকে তাঁর কলমের জাদুতে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। কৃশানুর জীবনের প্রথম প্রেম সার্থক হোক না হোক, রোম্যান্টিক উপন্যাস হিসেবে অন্তর্লীনার সার্থকতা নিয়ে সন্দেহ নেই। অন্তর্লীনা শুধু রোম্যান্টিক উপন্যাস নয়, মনন-আশ্রয়ী উপন্যাসও বটে। নায়ক কৃশানুর মনের ভিতর যে আনন্দ, দুঃখ, সংশয় ভিড় করে আসে তার বর্ণনা দেওয়ার ব্যাপারে লেখকের মুন্সিয়ানা লক্ষণীয়। এই ধরনের মানসিক সমস্যা নিয়ে লেখা উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি নেই। সেদিক থেকেও এই বইটি স্বতন্ত্র। একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল বইটি ১৯৬০ এর দশকে লেখা। এখনকার লেখকেরা যতটা সহজে যৌন সমস্যার বর্ণনা দিতে পারেন সে সময় সেটা অসম্ভব না হলেও অনেক লেখকই সেটা এড়িয়ে যেতেন সমাজের একদল পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারানোর ভয়ে। অন্তর্লীনায় কিন্তু লেখক রাখঢাক করেননি, যৌন বিবরণ সরাসরি না এলেও এ গল্পের মূল ভিত্তি ওই যৌন সমস্যা।

স্বতন্ত্রতার আরেকটি দিক হল এর মৌলিকতা। নারায়ণ সান্যালের সমালোচকরা অনেকেই বলেন তাঁর বেশিরভাগ উৎকৃষ্ট লেখাই বিদেশী কোনও লেখার ছায়া অবলম্বনে। কথাটা নেহাৎ মিথ্যে নয়। যদিও অন্য লেখার অবলম্বনে লেখা বেশকিছু উপন্যাস বাঙ্গালী পাঠকের কাছে এমন কিছু বিষয়কে নিয়ে এসেছে যা অন্যথায় হয়তো বেশিরভাগ বাঙ্গালী পাঠকই জানতেও পারতেন না, এবং এই ধরনের লেখায় বাংলা সাহিত্যে নারায়ণ সান্যাল পথিকৃৎ তাও সত্যি, তবু কথাসাহিত্যের জগতে মৌলিক লেখার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আর নারায়ণ সান্যালের মৌলিক কথাসাহিত্যের মধ্যে অন্তর্লীনা অন্যতম শ্রেষ্ঠদের দলেই থাকবে। নারায়ণ সান্যালের ভক্ত হওয়ার দরুণ তাঁর বহু বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে চরিত্র সৃষ্টিতে তাঁর প্রতিভা থাকলেও একটা সীমাবদ্ধতাও আছে। বিভিন্ন উপন্যাসে দেখি উপন্যাসের নায়ক যেন একটা বাঁধা ছকে কথা বলে, বাঁধা ছকে ভাবনাচিন্তা করে। অনেকটা যেন নারায়ণ সান্যালের নিজের মতই। উপন্যাসের নায়কের মধ্যে থেকে নিজেকে পুরোপুরি পৃথক করে নেওয়া, তার জীবনদর্শনের মধ্যে নিজের জীবনদর্শনকে ঢুকতে না দেওয়া বড় সহজ কাজ নয়। রবীন্দ্রনাথ অবধি এ দোষে দুষ্ট। কিছু ক্ষেত্রে গল্পের প্রোটাগনিস্ট লেখকের জীবনদর্শনের বাহক হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু গল্প বলার সময় সবক্ষেত্রেই এরকমটা হলে মুশকিল। নারায়ণ সান্যালের অনেক উপন্যাসেই এই দোষ এসে বিঘ্ন ঘটিয়েছে সার্থক চরিত্র-সৃজনে। এদিক থেকেও অন্তর্লীনা স্বতন্ত্র। এর চরিত্রগুলো একঘেয়ে নয়, তাদের নিজস্ব সত্তা আছে, এবং তারা টিপিকাল নারায়ণ সান্যালোচিত নায়ক-নায়িকা নয়। কিছু চরিত্র বেশ অদ্ভুত… সমালোচকরা বলবেন অ্যাবসার্ড…অবাস্তব… আমার মতে মানবচরিত্র বড় জটিল বস্তু, কোন চরিত্রকেই অবাস্তব বলার আগে আমি দুবার ভাবব, কারণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি এমন বহু মানুষ আমাদের চারপাশে আছেন যাদের চরিত্র এতই অদ্ভুত, এতই জটিল, এতই দুর্বোধ্য, যে তাঁদের কথা কোনও উপন্যাসে লিখতে গেলে আমি দ্বিধা করব… “বড্ড অবাস্তব শোনাচ্ছে না তো?” …এই ভেবে।

সবশেষে গল্পের পরিণতি প্রসঙ্গে বলি সারা উপন্যাসের তুলনায় শেষটা একটু যেন তাড়াহুড়ো করে করা, একটু বেশি মেলোড্রামাটিক। তাজের স্বপ্ন, মনামী এই উপন্যাস গুলোতেও দেখেছি উপন্যাসের পরিণতির দিক থেকে কিছুটা অপূর্ণতা রয়ে যেতে। হয়তো এটাকে লেখকের একটা দুর্বলতা বলা যেতে পারে। তবু একটা কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না, যতই মেলোড্রামাটিক হোক, যতই আবেগের বাড়াবাড়ি থাক, উপন্যাসটা পড়তে শুরু করলে ছাড়তে ইচ্ছে করবে না, এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেলতে চাইবেন। লেখকের অদ্ভুত সাবলীল লেখনীর গুণে তৃপ্তিটা পাবেন পুরোমাত্রায়ই।  

(সরাসরি গল্পের বর্ণনায় না ঢুকে আজ অনেকটা জেনারাল ভাবে "নারায়ণ সান্যালের অন্তর্লীনা" কে দেখতে চেষ্টা করলাম। বড্ড বেশি গম্ভীর আর বোরিং লাগলে জানাবেন। ভবিষ্যতে অন্যভাবে লেখার চেষ্টা করব।)

অন্তর্লীনা : একটি রোম্যান্টিক উপন্যাস ও নারায়ণ সান্যাল
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments