তোর না লেখা চিঠি

আসেনি, আসেনা, আসবেনা

জানি, তবু আমি বসে থাকি…

 

অপেক্ষা করি। অন্ধকারে। নিকষ কালো অন্ধকার। রোজ রাত্রে ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিয়েও জেগে থাকি অনেকক্ষণ। ঘরের কোণে জমতে থাকে হুইস্কির খালি বোতল। বাপের পয়সায় কেনা… চাইতে সঙ্কোচ হয়না। অনেক পয়সা আমার বাপের। খরচ করে উঠতে পারেনা একা। একা একা ওই বিশাল বাড়িটায় থাকে কি করে কে জানে? কদিন আগেই ঘুরে এলাম চন্দননগরে মায়ের বাড়িটা থেকে। অদ্ভুত একটা মিক্সড ফীলিং হল, জানিস? স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার মত ছোট্ট ঘুপচি দুটো ঘর। সেখানে থাকে মা। নিজেদের এত বড় বাড়িটা থাকতেও ওখানে থাকতে হয়… ভেবে খারাপ লাগছিল। তারপর দেখলাম ওইটুকুনির মধ্যেও কি সুন্দর গুছিয়ে নিয়েছে। চিরকালের অভ্যেস মত নানারকম টুকটাক জিনিস দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে ঘরটাকে। ওইটুকুর মধ্যেও ছোট্টখাট্টো গোছানো একটা সংসার।

 

মায়ের সাথে খুব গল্প করে এলাম। তবে আজকাল আর গল্প করতেও তেমন ভাল লাগেনা। একা থাকতেই ইচ্ছে করে। সকালে উঠে স্নান করে একটু পড়াশুনা। তারপর দুপুরে খেয়ে এসে বসি কোনো একটা গল্পের বই নিয়ে। ফাঁকে ফাঁকে তাকিয়ে দেখি বারান্দার দরজার ওপর গ্রিলের ছায়ার একবার স্পষ্ট আবার ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাবার খেলা… রোদের তেজ বাড়া কমার সাথে সাথে। সেই সঙ্গে আমার বারান্দায় মেলা গামছাটার অসংখ্য ফুটো ফাটার মধ্যে দিয়ে পাশের বাড়ির সেক্সি কাকিমাকে ঝাড়ি মারা…

 

একটু বেলা পড়লে পড়ন্ত রোদটা এসে পড়ে আমার আলমারির ওপর সাঁটানো সেই ছবিটার ওপর। কোন ছবি সে তুই জানিস। সেই সোনালী রোদের ছোঁয়ায় তোর ছবিটাকে মনে হয় রক্তমাংসের প্রাণবন্ত মানুষ!

 

তারপর রোদটা পুরো পড়লে বেরোব একটু হাঁটতে। পুকুরধারে ঘুরব। একবার উঁকি মেরে আসব সেই স্কুলটায়, আর ডি-মাইনর গানটা মনে পড়বে। ওই রাস্তাটার ধারে অনেক ছাতিম গাছ আছে। সন্ধ্যাবেলা ছাতিমফুলের গন্ধে প্রায় নেশা ধরে যায়। অদ্ভুত একটা গন্ধ। মিষ্টি, অথচ একটু ঝাঁঝালো। তুই নিশ্চয়ই চিনিস না। কলকাতার লোকজন এসব ব্যাপারে অশিক্ষিতই হয়ে থাকে।

 

নেশা ধরানো বুনো গন্ধ

 

সন্ধ্যাবেলা হোস্টেল ক্যাম্পাসে ফিরে এসে দেখতে পাওয়া যায় একটা অসাধারণ লাইভ শো। টীচার্স কোয়ার্টারের পাশটায় জোনাকিগুলো সে সময় দল বেঁধে নিজেদের নাচ দেখাতে থাকে। অন্ধকারের মধ্যে কয়েক হাজার আলোকবিন্দু জ্বলছে আর নিভছে। আর সেই সঙ্গে ঝিঁঝি পোকার প্রবল চীৎকার স্নায়ুতন্ত্রকে কেমন অবশ করে ফেলে। মিনিট পনেরো দাঁড়িয়ে দেখি এই নাচ গান, মশার কামড় খেতে খেতেই। তারপর ফিরে আসি। বেশ উপভোগ করি এই সন্ধ্যার অন্ধকারটা। তুই বুঝবি না। বা হয়তো বুঝবি। কিন্তু কিছু কিছু অনুভূতি একা থাকলেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুভব করা যায়…

 

 

*******************************

 

মৃত্যুদূত

 

রাত বাড়লে অন্ধকারটা আর অত সুমিষ্ট লাগেনা। অবসাদ ঘিরে ধরে ধীরে ধীরে। অবসাদ? ভুল বললাম। একটা অদ্ভুত ভয় চেপে বসে আমার ওপর। মনে হয় বিকেল বেলা আকাশে উড়তে দেখেছিলাম যে শকুন তিনটেকে, অথবা নন্টুদের বাড়ির জানলার বসে থাকতে দেখেছিলাম যে কালো বেড়ালটাকে, ওরা বোধহয় মৃত্যুদূত। অলসভাবে প্রহর গুনছে আমার মৃত্যুর। জানে যে বেশি দেরি নেই আর সেই কাঙ্ক্ষিত সময় আসতে। আমার জীবনটাকে কে যেন ফাস্ট ফরওয়ার্ড করে দিয়েছে হঠাৎ… খুব দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছি আমি। আর বুঝি সময় বেশি নেই। ভাবতেই শিউরে উঠি। মৃত্যুকে খুব ভয় পাই আমি। খুব।

 

অলস প্রতীক্ষা

 

রাতের গভীর নিঃশব্দ অন্ধকারটা আরো জাপ্টে ধরে। এই সমস্ত উদ্ভট চিন্তার বাঁধনে বেঁধে ফেলে। মনে পড়ে এরকমই এক অন্ধকার রাতে তোর পাশে শুয়ে শুনিয়েছিলাম ছোটবেলার প্রিয় সেই কবিতাটা?
 


রাত হয়ে আসে, শুই বিছানায়,

     মুখ ঢাকি দুই হাতে-

চোখ বুজে ভাবি- এমন আঁধার,

কালি দিয়ে ঢালা নদীর দু ধার

তারি মাঝখানে কোথায় কে জানে

নৌকা চলেছে রাতে।

আকাশের তারা মিটি-মিটি করে,

শিয়াল ডাকিছে প্রহরে প্রহরে,

তরীখানি বুঝি ঘর খুঁজি খুঁজি

      তীরে তীরে ফিরে ভাসি।

ঘুম লয়ে সাথে চড়েছে তাহাতে

      ঘুমপাড়ানিয়া মাসি।

 

*****************************

 

কালবৈশাখীর মেঘ

 

সব অন্ধকার এরকম ভয় পাইয়ে দেয় না। কখনও সে নিয়ে আসে শান্তিও। উগ্র রোদ ঝলসানো দুপুরে যখন হঠাৎ ঘনিয়ে ওঠে কালবৈশাখীর মেঘ, মনটা নেচে ওঠে একটা অদ্ভুত আনন্দে। মনে হয় সমস্ত পাপ ধুয়ে যাবে প্রলয়ে, তারপর নেমে আসবে শান্তির বারি। কালবৈশাখীতে বেরিয়ে ঝড়ে পড়া আম কুড়োনোর দিন এখন গেছে- এ ধারণা ঠিক নয়। আজকালকার বড়লোকের বাচ্চাদের হয়তো সে অভিজ্ঞতা বিশেষ নেই, কিন্তু পাশের বস্তির ছেলেমেয়েগুলোকে দেখি হরদম ঘুরঘুর করে বসাক-বাড়ির বিশাল আমগাছটার আশেপাশে। তারপর বৃষ্টি নামলে রাস্তার জমা নোংরা জলে ছপাত ছপাত ছপাত। একটা ফুটবল সাথে নিয়ে নেমে পড়ার জন্য পা নিশপিশ করতে থাকে।

 

সেদিন পুকুরধারে ঘুরতে ঘুরতে এমনই আকাশ কালো করে এল। একটা ব্যাং অনেকক্ষণ কোথায় লুকিয়ে বসে কটর কটর করছিল। এবার ওপাশ থেকে আরেকজন ওকে সাড়া দিল। জলপোকাদের আঁকিবুঁকির ফাঁক থেকে তিড়িং করে ঘাই মেরে উঠল একটা ছোট মাছ। পশ্চিম দিক থেকে একটা মৃদু হাওয়া ধেয়ে এল… আরও জোরালো ঝড়ের প্রিল্যুড। উপর দিকে চাইতেই কপালে এসে পড়ল ছোট্ট একটা জলবিন্দু, আর পুকুরের দিকে চাইতেই দেখি পথের পাঁচালীর সেই সীন…

 

সুয্যিমামা ঘাপটি মেরেছেন

 

সুয্যিমামা ততক্ষণে ঘাপটি মেরেছেন কালো মেঘের লেপের তলায়। আজকের মত বোধহয় ঘুমের দেশে গেছেন তিনি। চারিদিক বেশ আঁধার করে এসেছে। সবমিলে মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে গেল। একটু আগে বাবার কথা ভেবে যেমন ঘৃণায় বিষিয়ে উঠেছিল মনটা, সে ভাবটা কেটে গেল অনেকটাই। তাকিয়ে দেখলুম অনেক দূর থেকে মাঠের ওপর দিয়ে ধেয়ে আসছে ঝমঝমে বৃষ্টি। সেই সঙ্গে এসে পড়ল ঝোড়ো হাওয়া। পাশের গাছে সরু ডালটায় বসে দোল খাচ্ছে দোয়েল পাখিটা… কি অদ্ভুত সুন্দর এই অন্ধকার! শান্তি… একটা সজীব শান্তি ঘিরে ধরল আমায়। মনে মনে বললাম “পরাণ আমার জাগল বুঝি মরণ অন্তরালে… ওরে আয়… আয়রে আমার শুকনো পাতার ডালে…”

 

ওরে ঝড় নেমে আয়

 

 

****************************

 

 

কিছু কিছু অন্ধকার বড় একলা হয়। সে অন্ধকারে তুই নেই। নেই তোর বিষণ্ণ হাসি, আছে কেবল একঘেয়ে ঝিঁঝির ডাক, পুকুরপাড়, একটুকরো নিশ্ছিদ্র শান্ত অন্ধকার।

সে অন্ধকার গভীর নয়, তার ব্যপ্তিও নয় বিশাল, তবু সে ইন্দ্রিয়গুলোকে গ্রাস করে, একটা নেশায় আচ্ছন্ন করে দেয় মনকে। ঘুম না আসা মধ্যরাত্রের ঘড়ির কাঁটার শব্দের মত সে প্রতি মুহূর্তে বলে “তুমি একা!”

 

মনে পড়ে দিল্লির সেই দিনগুলো। সন্ধ্যা হতেই চারিদিক নিশ্চুপ… ভেসে আসছে শুধু সেই ছেলেটার সঙ্গে তোর সঙ্গমের আওয়াজ। তোর শীৎকার আর রাতজাগা পাখির ডাক মিলেমিশে একাকার। আর আমি বসে আছি বালির স্তূপের ওপর। কানাভাঙা মোবাইলে মৃদুস্বরে বাজছে

 

মেলা ভাঙল দুনিয়ার

খেলা সাঙ্গ যে এবার

মাঝি মাঝি ও মাঝি… পরানপিঞ্জরে

শুনেছি ছুটির ডাক, নাও ভাসারে…

 

আজও গানটা শুনতে গেলেই ঝাপসা হয়ে আসে আলো, ভরদুপুরেও অন্ধকার দেখি চোখে।

 

নষ্ট জনম কষ্ট জীবন শুধু আছে পড়ে… মাঝি রে…

 

সিঁড়ির কোণে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে যেদিন তোকে প্রথম চুমু খেয়েছিলাম সেদিনটার কথা মুছে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেই সিঁড়িরই নীচে একলা দাঁড়িয়ে দূরে তোর মিলিয়ে আসা দেহাবয়ব… শেষবারের মত।

তৃষ্ণার্ত বালিশ কোলে টেনে নেয় আমায়।

 

হ্যালুসিনেট করি… দেখি বেডরুমটা হয়ে গেছে  ফুলের বাগান, তার মধ্যে দাঁড়িয়ে তুই… বুকদুটোর আকৃতি হার্ট শেপের… ছুঁয়ে দেখি সে বুক… হাতে ছ্যাঁকা খেয়েও সরিয়ে নিই না, যতক্ষণ না ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে আসে তোর শরীরটা।

 

দেহটা এলিয়ে দিই কাউচের ওপর। দেওয়াল বেয়ে সারি বেঁধে চলা পিঁপড়ের দল আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলে “ঘুমিয়ে পড়ো… ঘুম সবকিছুর ওষুধ…” বলে চলে যায়। কুটুরে প্যাঁচা গাছের ডাল থেকে হুত্থুম থুম করে শুভরাত্রি বলে যায়।

 

টেবিলে সোনালি তরলের পাঁচ নম্বর পেগটার আশে পাশে সুড়সুড় করে ঘোরে আরশোলার বাচ্চাটা। টেবল ল্যাম্পের টিমটিমে আলোটা আরো টিমটিমে হয়ে আসে। নিশুতি রাত জানলা দিয়ে চুপি চুপি ঢুকে এসে উপহার দেয় একটুকরো জমাট বাঁধা অন্ধকার…

 

সেই উপহার বুকে জড়িয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে আওড়াই

 

একটু আমার হাত ধরে নে তোর সঙ্গেই হাঁটি

জিয়ন হয়ে আবার আমায় ছুঁইয়ে দিবি কাঠি?

 

 

*************************

 

 

মাঝরাতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। বুঝতে পারলাম লোডশেডিং এর গরমেই ঘুম ভেঙ্গে গেছে। বারবার চেষ্টা করেও ঘুম আনতে পারলাম না কিছুতেই। দরদর করে ঘাম হচ্ছে। সেই সঙ্গে অন্ধকারের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা। নিজের নিঃশ্বাসকে মনে হচ্ছে শোঁ শোঁ করে ঝড়ের শব্দ। একটা টিকটিকির টিক টিক শব্দে চমকে উঠলাম! কোথায় আছি আমি? নরকে? হঠাৎ মনে পড়ল তোর কথা ভাবতে ভাবতে কিরকম ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মনে পড়তেই আবার অবসাদ ঘিরে ধরল। হাত পা গুলো এলিয়ে দিলাম আবার…

 

সব শেষ হয়ে গেছে। একটা ভয়ঙ্কর একাকিত্বে ভরা অন্ধকার ছাড়া নিজের বলতে আর কিছুই নেই আমার। হঠাৎ…

ও কিসের শব্দ? দূর থেকে ভেসে আসছে একটা আওয়াজ। ধীরে ধীরে সেটা স্পষ্টতর হতে লাগল। তারপর চমকে উঠে উপলব্ধি করলাম এ আমার বাবার গলার স্বর! গমগমে সে গলায় কোত্থেকে যেন ভেসে আসছে আবৃত্তি…

 

বলেছিলে দেবেই দেবে!

যেমন করেই পারো তুমি আলোর পাখি এনে দেবে…

তবে কেন ধুলোর মধ্যে শুয়ে আছ?

আবার তুমি উঠে দাঁড়াও!

তবে কেন আকন্দ ফুল মুখে তোমার?

আবার দীর্ঘ বাহু বাড়াও আলোর দিকে।

আজ না হোক তো কাল, না হোক তো পরশু

তুমি পাখিটাকে ধরে আনবে কথা ছিল…

এই কি তোমার কথা রাখা?

উঠে দাঁড়াও!

রাখো তোমার প্রতিশ্রুতি!

 

 

 

উঠে বসি আমি। ড্রয়ার হাতড়ে খুঁজে বার করি দেশলাই এর বাক্সটা। টেবিলের উপর মোমবাতি জ্বেলে তোকে চিঠিটা লিখতে শুরু করি। দীর্ঘ চিঠি। অন্ধকারের চিঠি…

 

ফুটে উঠবে আলোর পাখি…

 

 

*** এই লেখায় ব্যবহৃত কবিতা/গানগুলি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবেই মিসকোট করা হয়েছে।

**** সমস্ত ছবি আমার ক্যানন পাওয়ারশট এস থ্রি আই এস ক্যামেরায় তোলা।

 

 

অন্ধকারের চিঠি
  • 3.50 / 5 5
4 votes, 3.50 avg. rating (72% score)

Comments

comments