থ্রি ইডিয়টস মুভিটিতে আমির খান, ডিরেক্টর অথবা স্ক্রিপ্ট রাইটারের দৌলতে, খুব সহজেই চতুরের স্ক্রিপ্টে বিভিন্ন জায়গায় ‘চমৎকারের’ বদলে ‘বলাৎকার’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করে। মুখ্য অতিথি সহ পুরো কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সামনে সেই স্ক্রিপ্ট পাঠ করার সময় চতুরের শব্দ্যজ্ঞতার দরুন বারংবার সেই শব্দ উচ্চারিত হলেও সে থেমে থাকেনা। তার বিদঘুটে শব্দপ্রয়োগের ঠেলায় সবাই হাসিতে কুটিপাটি দেখে সে আরো উৎসাহ নিয়ে আবারো সেই শব্দের পুনরুচ্চারণ করতে থাকে। অত বড় জমায়েতে সবাই অনাবিল আনন্দ পেয়ে হাসিতে লুটিয়ে পড়ল অথচ কেউ কিন্ত হাত তুলে, চোয়াল শক্ত করে কিংবা ভ্রূ কুঁচকে ওই শব্দটি ব্যবহারের প্রতিবাদ করলো না। প্রতিবাদ হলে হয়তো চতুর থেমে যেত,হাসির রোলও বন্ধ হতো ও একাধিকবার ‘বলাৎকার’ উচ্চারণের তালে তালে হাহা করে গড়াগড়ি খাওয়া আপামর জনগণ বুঝতেন যে ওই শুড়শুড়ি প্রদত্ত শব্দটির সাথে জড়িত ক্রিয়াটি ততটা আনন্দদায়ক নয়। শুড়শুড়ি যদিও আমাদের মজ্জায় প্রাচীন সময় হতেই বহাল তবিয়তে বিরাজমান এবং তার সাক্ষ পৃথিবীর বিভিন্ন পুরাণ ও ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এ দেশে ইন্দ্র থেকে গ্রিক মুলুকের জিউস নিজের সময়ের এক একজন দিকপাল বলাৎকারি পুরুষ ছিলেন। এ ব্যাপারে পূর্বোক্ত দুই দেবরাজের মধ্যে একটা জিনিস খুব মিলের আর সেটা হলো এরা দুজনেই তামাম রাজকার্য ছেড়ে নানা পশুর রূপ ধরে বনেবাদাড়ে একলা সুন্দরী রমণী খুঁজে বেড়াতেন। মানে একটা ব্যাপার আমার খুব খটকা লাগে যে ব্রহ্মান্ডের সব থেকে শক্তিমান পুরুষ তো চাইলেই যার তার সাথে সহবাস করতে পারতেন তবে এই ছোঁকছোঁকানি কেন? আরেকটু ভালো করে তলিয়ে গিয়ে জানতে পারলাম যে আসলে সহজে সহবাস হয়ে গেলে তার মধ্যে কোনো নিষিদ্ধ অপকর্মের স্বাদগন্ধ থাকেনা । মানে স্রেফ লিগালিটি মেনে কপিবুক ফর্মে কাজকর্ম করাটা তাদের কাছে নেহাৎই নুন ছাড়া হবিষ্যির মতো। তার ওপর আবার জোর না খাটালে আর ক্ষমতার ব্যবহার করা হলো কই, সম্রাট আর সারমেয়র যৌনাচরণ তো এক হতে পারেনা? তা সারমেয় ও সম্রাটদের মধ্যেও এ ব্যাপারে কিঞ্চিৎ মিল আছে, এই দুই সম্প্রদায়েরই অজাচার নিয়ে সেরকম বাধা নিষেধ নেই। জিউস নাকি তার বোন হেরাকে এতটাই ভালোবাসত যে তার প্রণয় নিবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে সে নিজের তৈরী ঝড়ের রাতে মুমূর্ষু পাখির রূপে হেরার বক্ষে আশ্রয় নেয় ও মুহূর্তের মধ্যে নিজের আসল রূপ ধরে তার ভগিনীর শয্যা কলুষিত করে। সামাজিক লজ্জা এড়াতে হেরা শেষমেশ তার দাদাকে বিয়ে করতে বাধ্য হন।

আমরা জিউসের সন্তান, দেবেন্দ্রের মানসপুত্র তাই আমাদের মধ্যে একটু আধটু ঐশ্বরিক চরিত্র অবশিষ্ঠ থাকবে এতে আর আশ্চর্যের কি আছে ‼ তা এই চরিত্রের দোহাই দিয়ে নারীর প্রতি অমর্য্যাদা নিয়ে নানা ধর্মে নিন্দা ও তার স্বাস্তি-বিধান লেখা আছে। সকল দেশের সাবেকি আইনেও পরিষ্কার করে লেখা আছে যে কি ঘটলে তা ধর্ষণ ও সেই অপকম্মের সাজা কতদূর অব্দি যেতে পারে। ধর্ম ও আইন দিয়ে দুনিয়া চলেনা। সেটা চলে তার সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সমীকরণের রসায়ন মেনে। আর আমাদের সেই বহুরাসায়নিক মানসিকতা প্রতিফলিত হয় আমাদের ভাষায় ও ব্যবহারে। যেমন এই কূকর্মটিকে বলা হয় ‘সতীত্ব নষ্ট করা’ কিংবা ইংরেজি তে ‘লুসিং চেষ্টিটি’। মানে খানিকটা দুধ ফ্রিজের বাইরে রাখা ছিলো বলে ছানা কেটে গেছে ‼ অতয়েব দুধ কে সম্মান করো, তাকে শুদ্ধ পবিত্র ইত্যাদি বলো কিন্তু কেটে গেলে তার দায় দুধের মানের কিংবা সেটা কোথায় রাখা ছিল সেই স্থানের। এক কথায় নারী কে সম্পত্তি হিসেবে দেখো ও তা আগলে না রাখলে তার নষ্ট হয়ে যাওয়া তো স্বাভাবিক ব্যাপারই। কিংবা হিন্দি/উর্দুতে ‘ইজ্জাত লুটনা’ – সোনাদানার মতো লুটে তো গেলো কিন্ত তা ফেরত কি করে হবে সেটা কারো জানা নেই। আমাদের বাংলার নেতা কাম নায়ক দেব অধিকারী কিংবা বলিউডের সালমান খান-ও তাই প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে গেলে কিংবা বিপাকে পড়লে খুব সহজে ছোট্ট করে বলে ‘আই ওয়াস ফিলিং এস রেপ্ড ‼’ যখন কোনো শব্দের তাৎপর্য এতো লঘু হয়ে যায় তখন তার সাথে জড়িত ক্ৰিয়া আর গম্ভীর থাকে কি করে ? পাশ্চাত্যে অবশ্য অনেকেই রেপকে একটা ‘স্টেট্ অফ মাইন্ড’ বলে মনে করে। মানে এই মুহূর্তে যেটা এক উপভোগ্য অভিজ্ঞতা পরের মুহূর্তে সেটা হয়তো দমবন্ধ করার সমান কিংবা উল্টোটাও হতে পারে ‼ ওখানকার টিনএজারদের প্রায়শই কাউন্সেলিং করানো হয় যে কিভাবে তারা এই দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে তফাৎ করবে। ওখানে যারা রেপ ভিক্টিম তাদের অনেকেই পরবর্তীকালে জানিয়েছেন যে তারা মানতে চাননা যে তারা আদৌ রেপ্ড হয়েছেন। তাদের বক্তব্য একটা মানসিক ভারসাম্যহীন নাগরিক তার নিজের দেহের ক্ষুদ্র এক অঙ্গ জোর জবরদস্তি করে অন্যের দেহে ঢোকালে পরেই সেটাকে রেপ হিসেবে গণ্য করা উচিৎ না বা সেই মহিলাকেও দুম করে ভিক্টিম বলা যায়না। অনেকেই দাবি করেছে যে তারা ঘটনাটি এনজয় না করলেও মোটেও ট্রমা বোধ করেননি বা শারীরিক ভাবেও সেরকম কোনো কষ্ট পাননি। এক কথায় ঘটনাটা ঘটার পর তাদের মন বা শরীর কোনোটারই সেরকম ভাবে কিছু বিগড়ায়নি – গায়ের ওপর দিয়ে সাময়িক ভাবে এক অশান্ত ঢেউ চলে যাওয়ার মতন। অনেকেই আবার তাদের রেপিস্টদের খুঁজে বার করেছে, সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখেছে ও তাদের কাছ থেকে জানতেও চেয়েছে যে ঘটনাটা ঘটার পরে ঠিক কিরকম উপলব্ধি হয়েছিল তাদের – আনন্দ, অনুশোচনা, শান্তি , ঠিক কি? প্রথম বিশ্বের ব্যাপার আলাদা হলেও, এই ‘কিছুই এলো গেলো না’ ধরণের অনুভূতি কিন্ত আমাদের দেশের অনেক বিবাহিত নারীরও নিজপুরুষের সাথে হয়ে থাকে, সেটা কি তাহলে রেপ? কিংবা রাস্তা-ঘাটে-কর্মস্থলে, না ছুঁয়ে দিয়েও, অনেকে মনে মনে প্রবেশ করে যায় শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে, সেটা কি?

যাক বিতর্ক বাড়িয়ে লাভ নেই কেননা সবই তো মোটামুটি ব্যাদে বলা আছে, আর বাকিটা আছে বাইবেল ও হাদিসে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নির্ভয়ার ধর্ষণকারীদের ‘সজা-এ-মউতের’ টাটকা গরম খবর। ২০১২এর ১৬ই ডিসেম্বর রাতের ঘটনাটি আমাদের সকলের জানা। খবর কাগজ খুললেই এরকম ঘটনা প্রায়শই দেখা যায় যেখানে বস্তিবাসী থেকে বিদেশিনী অনেকেই তার শিকার। তবে এই ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনার সাথে এই ধরণের হিংস্রতার নিদর্শন হালের ইতিহাসে সত্যি বিরলতম। সেই রাতে একাধিক পুরুষ যার মধ্যে একজন নাবালক তারা শুধুমাত্র কোনো অবলা নারীর নিছক ‘সতীত্ব নষ্ট’ করেননি। তাদের হাতে সেই মহিলার দাঁতের দাগ, শরীরে নখের আঁচড় ও তার শরীরে ঢোকানো লোহার রডের থেকে তৈরী হওয়া অন্ত্রপিন্ড একটা অন্য মাত্রার যুদ্ধের কথা বলে। আমার দেখা সবথেকে ভয়াবহ অত্যাচারের দৃশ্য হলো কর্পোরেশনের কর্মীদের নানা রকম লোহার ফাঁস ও কলকব্জা নিয়ে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে রাস্তার কুকুরের মতো এক অসহায় অথচ ক্ষিপ্র প্রাণীকে টেনে হিচড়ে চিপে মেরে ফেলা। নির্ভয়া নিশ্চই চলন্ত বাসে একটা রাস্তার কুকুরের চেয়ে বেশি ক্ষিপ্র ছিলোনা – তবুও তার দাঁত নখ চলেছিল ওই অসহায় কুকুরটার মতোই। নির্ভয়ার ওপর আক্রমণকারীরা শুধুমাত্র রেপিস্ট বা খুনি ছিলোনা , তারা ছিল জিউস কিংবা ইন্দ্রের অমানবিক অবতার। তাদেরকে ফাঁসি দেওয়া মানে তো অপরাধ থেকে খুব তাড়াতাড়ি মুক্তি দেওয়া। মানে কারো সুইসাইড করার মতো ক্ষমতা না থাকলে সে রেপ করে যোনিতে লোহার রড ঢোকাবে ও থানায় সারেন্ডার করে সে খুশি হবে যে খুব তাড়াতাড়ি তার মৃত্যু আসন্ন। এই দন্ডের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলকতা কোথায়? এতে করে তো স্লো পয়জনের মতো সিরিয়াল রেপিস্ট ও কিলারদের সংখ্যা বাড়বে, এক মারলেও মরবো যখন দশজন কেই মারি ‼ মৃত্যুদণ্ড ‘ম্যাজিক বাক্স’ নয় যেটা সমাজের অন্যায় কে ন্যায়ে পরিণত করতে পারে। মৃত্যুর ভয়ে কি আদৌ রেপ কমবে না কি আইনের ফাঁক ফোকর মেনে রেপিস্টরা আরো সাবধানে রেপ করবে সেটা কারোর জানা নেই। অনেকেই বলছেন এদের উচিত স্বাস্তি কি হবে তা এই মুহূর্তে ঠিক যাচ্ছে না , তবে তারা এটাও বলছেন না যে সেটা কবে ও কি করে ঠিক করা হবে। কেউ বলছে লিঙ্গচ্ছেদ কর, আবার কেউ কেউ বলছে ‘গে রেপিস্টদের’ সাথে এক ঘরে বন্ধ করে রাখো। আবার বলছি এইরকম বিরলতম ঘটনা ঘটলে সেটা শুধু কোর্টের আইনের এক্তিয়ারভুক্ত কেস হয়ে আটকে থাকেনা। এর পরিধি ছুঁয়ে যায় সমাজের সকল স্তর ও মানব অস্তিত্বের সকল অংশকে। ঘৃণা না ধৈর্য্য? কুসংস্কার না যৌক্তিকতা? আমরা আসলে কেউ কিছু ভাবছিনা,শুধু চোখ বন্ধ করে, নিশ্বাস চেপে, অনর্গল কথা বলে যাচ্ছি।

অপদণ্ড
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments