যেখানে কোনো দিক থেকেই সূর্যের আলো পৌঁছয় না , শহরের উন্নয়নমুখী প্রান্তে সেরকম এক বসতবাড়ির নাম sunny view apartment ! তৈরী হওয়ার আগেই লাখ লাখ টাকায়ে বিকিয়েছিল এক একটি ফ্ল্যাট। দালাল বাহিনী তখন এই বলে ক্লায়েন্টদের ছোট্ট ছোট্ট খুপড়িগুলো গছিয়েছিল যে সারা দিনে কোনো না কোনো সময় আপনার সাধের ফ্ল্যাটে সূর্যের আলো ঠিক পৌছবে। বেডরুমে বা লিভিং রুমে না হলেও নিদেনপক্ষে কিচেন কিম্বা বাথরুমে তো বটেই। ওই এক চিলতে রোদ্দুরের আশায় অনীকও দুম করে একটা দক্ষিনমুখী ফ্ল্যাট কিনে বসলো sunny view apartment-এ । ৩ বিএইচকে ওই ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্টটার জন্য অনীক অনেক কষ্টে তাদের শহরতলির পুরোনো দু কামরার পৈতৃক বাড়িটা বিক্রি করানোয় মা’কে রাজি করিয়েছিল। অনীকের বিধবা মা, মীরা দেবীর যদিও শেষ বয়সটা শহর থেকে দুরে থেকে স্বামীর ভিটেতেই কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এখান থেকে ছেলে ও বউয়ের কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের অসুবিধা ,গাড়ির তেল ও ড্রাইভার-এর খরচ , চিকিত্সার অসুবিধা ও এক মাত্র নাতির কলেজের পর রাত করে টিউশন থেকে ক্লান্ত হয়ে ফেরা – এসব কথা ভেবেই সে ছেলের প্রস্তাবে শেষমেষ রাজি হয়ে যায়। অনীকের ঘাড়ে অন্যান্য খরচের ভার থাকার দরুন বেশিরভাগ লোনটা অনীকের স্ত্রী মিতাই নিয়েছিল। শুরুতে ঘরগুলোতে এক চিলতে রোদ্দুর এদিক সেদিক থেকে ফাঁক গলে এসে পরত বটে কিন্তু পরের দিকে আসে পাশে আরো বড় বড় সব মল ও অফিস স্পেস তৈরী হওয়াতে সেটুকুও কিরকম যেন কপ্পুরের মতন আলতো ভাবে উবে গেল।

লাগোয়া বাথরুম সহ সব থেকে বড় মাস্টার বেডরুমটা অনীক ও মিতার, আপেক্ষিক ভাবে আধুনিক আসবাবে সজ্জিত হলো। মাঝারিটি অনীকের পুত্র বুম্বার যেটার সাথে আবার একটা ছোটো ব্যালকনি আছে । নানাবিধ পোস্টার ও বই-এ ভরা সেই ঘরটি যেন তার ব্যক্তিগত মুক্তাঞ্চল! তার কাছের বন্ধুবান্ধব ছাড়া বাকিদের সেখানে ‘নো এন্ট্রি’ । স্বাভাবিক ভাবেই তিনটি বেডরুমের সব থেকে ছোটটিতে ঠাই হলো মীরা দেবীর। এক কোণে customized ঠাকুরের সিংহাসন আর একটা সিঙ্গেল খাটটা বাদ দিলে বাকি জায়গাটা ট্রাঙ্ক,প্যাকিং বাক্স ,পুরোনো খবর কাগজ ,নাতির বইখাতা দিয়ে অগোছালো ভাবে ঠাসা । প্রথম প্রথম তবু মীরা দেবী বিকেলবেলা ছাদে গিয়ে কাপড় তুলে আনতেন, সন্ধেবেলা ধুপধুনো দিয়ে বাইরের ঘরে বসতেন , চা খেতেন, আত্মীয়স্বজনদের ফোন করতেন। টিভি-তে সিরিয়াল দেখা পছন্দ না করলেও খবরটা নিয়মিত শুনতেন । কিন্তু হাঁটুর ব্যথাটা এখানে আসার মাস ছয়েকের মধ্যে এতটাই বেড়ে যায় যে ডাক্তার না পারতে বিছানা ছেড়ে উঠতে নিষেধ করেন । অনীক ও মিতা অফিস বেড়িয়ে গেলে সারাদিন দেখাশোনার করার জন্য একটি মেয়েকে রাখা হলো। সেই মীরা দেবীকে স্নান খাওয়া কিম্বা ঠাকুরকে জল বাতাসা দিতে সাহায্য করে । ছানির জন্য চোখের অবস্থা অনেকদিন ধরেই খারাপ তাই সেরকম ভাবে পড়াশোনাও করতে পারেন না। আর সত্যি বলতে কেন জানি আজকালকার লেখার ধরনও তার খুব একটা পছন্দ হয় না। মাঝে মাঝে পরিচারিকা মেয়েটির সাথে এটা সেটা নিয়ে কথা বলেন তবে সেও আর কতক্ষণ ? মেয়েটি সুযোগ পেলেই টিভি খুলে বসে যায় বা মোবাইল ফোনে ব্যস্ত হয়ে পরে। তাতে অবশ্য মীরা দেবী রাগ করেন না , তারই এই বয়সে আটকে থেকে এক ঘেয়ে লাগে তো এই বাচ্চা মেয়েটির তো দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা ! অসুর্য্যপশ্যা এই কারাবাসে তার রোজকার দিননামচা বলতে এই ! কয়েক মাস আরো কাটলো এভাবে কিন্তু চোখ আর হাঁটুর অবস্থা ক্রমশ আরো খারাপের দিকে গেল। পরপর ছানি ও হাঁটুর অপারেশন হওয়ার পরে তার গন্ডি অবশেষে ওই ছোট্ট ঘরের খাটটা অব্দি সীমিত হয়ে গেলো। দিনে পরিচারিকার হাত ধরে এক বার বাথরুম , স্নান , আধা শুয়ে ঠাকুরের উদ্দ্যেশ্যে কোনরকমে দুটো মন্ত্রবলা ও চামচে গোনা ডাল ভাতের স্বল্পাহার। রাতে ছেলে বা বৌএর নিয়মিত অসুধ খাওয়া নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও সবশেষে রাতে দুটি দুধ খই ! অবশ্য নাতি এসে মাঝে মাঝে মজার মজার সব গল্প করে। যখন মোবাইল ফোনে নানা রকম ছবি কিম্বা ভিডিও দেখায়, তখন বেশ লাগে মীরা দেবীর। পরীক্ষার পর বুম্বার ছুটি ছিল কয়েকদিন। বন্ধুবান্ধবরা আসতো গান বাজিয়ে হই হুল্লোর করতো ও ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে মীরা দেবীর সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে যেত। কোনদিন হয়ত বুম্বার ক্লাসমেট মোনালি আদিখ্যেতা করে তাকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেয়ে বলল , “ঠাম্মি , ইউ আর সো gorgeous , কি নরম গাল তোমার ! ” আবার কোনদিন হয়ত পাবলো গিটার বাজিয়ে ‘যদি তোর সাথে কেউ না আসে ‘ শুনিয়ে গেলো। তবে যে ঘটনাটা তার জীবনে নতুন করে আবার এক চিলতে রোদ্দুর ও বাতাস নিয়ে এলো তার জন্য বুম্বার ফটোগ্রাফার বন্ধু আর্জবই দায়ী। সে একটা ম্যাগাজিনে urban old faces নামে একটা ফীচারের কাজ পায় ও জিনিসে ঠাসা ঘরে, খাটে বসা বুম্বার ঠাম্মির ছবি দিয়ে কভার করবে ঠিক করে। মীরা দেবীর খাটের পাশের জানলাটা শুরুর থেকেই বন্ধ ছিল। জানলার ধার ঘেসে transistor ,ওষুধ পত্র, থার্মোমিটার, মুড়ির কৌটো ইত্যাদি রাখা থাকত। আর্জব শুট করতে এসে সেই সব জিনিস বিছানায়ে নানা অ্যাঙ্গেলে ছড়িয়ে দিল। ন্যাচারাল আলোর জন্য জানলা খুলতেই হবে তাই বুম্বার সাথে হাত লাগিয়ে সেটা খুলতে গিয়ে খানিকক্ষণ ধস্তাধস্তি করতে করতে আর্জব বলল , “কিরে তুই খালি ল্যাপটপেই windows খুলিস নাকি? এই উইণ্ডোটা তো জম্মে খোলা হয়নি দেখছি !” বিভিন্ন মুডের ফটো উঠলো, ঠাম্মির সাথে আড্ডা হলো , চা মুড়িমাখা খাওয়া হলো। সব কিছু আগের মতন গোছগাছ করে রাখা হলো শুধু জানলাটা খোলাই রেখে দিলেন মীরা দেবী।

সকালে উঠে জানলার পর্দা সরাতেই উনি দেখলেন ঠিক উল্টো দিকে ফ্ল্যাটটার ব্যালকনি দেখা যাচ্ছে । তাতে এক বৃদ্ধ ইজিচেয়ারে বসে কাগজ পড়ছেন ও একটি ছোট্ট ফুটফুটে শিশু তার চারপাশে খেলে বেড়াচ্ছে। খাওয়াবার উদ্দেশ্যে একজন মহিলা হাতে বাটি নিয়ে মেয়েটির পিছনে পিছনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ লাগলো মীরা দেবীর, ঠিক যেন বয়সের ভারে স্থবির হয়ে যাওয়া পৃথিবীর চারদিকে ছটফটে চাঁদ ঘুরে বেড়াচ্ছে আর সে নিজে অন্য এক গ্রহ থেকে তা ঝাপসা ভাবে দেখতে পাচ্ছে। হোক না ঝাপসা , কাউকে না জানিয়েই মীরা দেবী দিনের পর দিন ওই বারান্দার দিকে দেখতে লাগলো। নেশার মত নিয়মিত দেখেন আর কল্পনা করেন – ভদ্রলোকের বুঝি স্ত্রী গত হয়েছেন ! আচ্ছা ওনারও কি arthritis আছে? শিশুটা কি ভদ্রলোকের নাতি না নাতনি? কোনদিন বকা খেয়ে শিশুটি কেঁদে উঠলে ভারী মন খারাপ হয় মীরা দেবীর। আবার দাদুর সাথে যখন সে খেলে তখন মীরা দেবীর মন আনন্দে ভরে যায় , মনে হয় ইসস আরো কয়েকটা দিন আগে জানলাটা খুললেই হত। চরম জীবনবিমুখী অবস্থায়ে বাঁচার রসদ আমরা ঠিক আসেপাশের থেকে জুটিয়ে নি। মীরা দেবী এখন সুযোগ পেলেই তার পরিচারিকাকেও ‘বৃদ্ধ ও শিশুর’ হালনাগাদী গল্প বলতে শুরু করেন । কিছুটা দৃষ্টি ও সিংহভাগ কল্পনার ওপর নির্ভর করেই সেই গল্পগুলোতে নতুন করে প্রাণ খুঁজে পায় মীরা দেবী। অফুরন্ত জীবনের রসদ আমরা জুটিয়ে নিলেও তার মেয়াদ তো অফুরন্ত হয় না ! তাই একদিন সকালে জানলা খুলে তিনি দেখলেন যে বারান্দায় লোকজন ভর্তি, সবাই নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। একটু মাথা তুলে নিচে রাস্তার দিকে তাকাতেই মর্চুয়ারী ভ্যানের কাঁচের ভেতরে রজনীগন্ধায় ঢাকা বৃদ্ধের অস্পষ্ট দেহখানি দেখা গেলো । মীরা দেবী দেখলেন শিশুটি কার একটা কোলে ঘোরাফেরা করছে অথচ হয়তো বুঝতেই পারছেনা যে বারান্দায় আর কেউ কাল থেকে তার সাথে খেলবে না। পরিচারিকা মেয়েটিকে ডেকে জানলা বন্ধ করে দিতে বললেন তিনি , যেন সেটা কোনদিন খোলাই হয়নি !

জীবন কিছু নিছক মায়ার রকমারি প্রতিফলন যা ধীরে ধীরে আমাদের অভ্যেস হয়ে দাড়ায়। মীরা দেবীও সেই অভ্যেস বশতই জানলাটা মাস খানেক বাদে আবার খোলালেন । পর্দা সরাতে ফাঁকা ইজিচেয়ার ও দড়িতে টাঙানো গামছা ছাড়া আর কিছু দেখা গেলনা। একবার বাচ্চাটাকে দেখলেও মন ভালো হতো। পরিচারিকা তার মনের কথা বুঝতে পেরে বলল , “সে বাচ্চাটাকে কি করে দেখবে? আমি আসার সময় দেখলাম সে ইস্কুল গাড়ি চেপে চলে যাচ্ছে ..জানলাটা বন্ধ করে দি? ” চোখ বন্ধ করে মীরা দেবী হাত নেড়ে মানা করে দিলেন। হয়ত খুব শীঘ্রই কোনো ভিনদেশী গাড়ি এসে তাকেও এই জানলা দিয়ে বের করে উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে !

অপাঙতেও
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments