অভ্যেস হয়ে গেছিল রাত্রি হলেই ওয়ার্ড বুক নিয়ে হা করে লন্ঠন এর আলো  দেখা । নিচের দিকটা দিব্য হলদে। ওপরের  দিকটা ধীরে ধীরে কলঙ্ক মাখছে গায়ে। ইতি উতি কিছু পোকা প্রেম নিবেদন করে উল্টে পরে আছে। সুধু মশা গুলো  কাচের গায়ে বসে না। না বসুক গে লন্ঠন এর মাথায় গুড নাইট জলছে আর তাছাড়া আমার "হাত হি কাফি হ্যায় ".  হাতের তেলোয় মশা মেরে লন্ঠন এর কাছে ফেলে রাখতাম শিকার এর গর্বে । সেই সব অলৌকিক রাত গুলোতে  একটা ঘোর ঘোর ব্যাপার ছিল। চোখ দুটো আধ বোজা করে রাখলে আলোর পলতে টা ঝাপসা  আলোর বল হয়ে যেত। তখন-ও ডি এস এল আর কাধে "বোকে" তোলার পেছন পাকামি আসেনি। অন্য ছবি দেখার ইচ্ছে হলে অগুন্তি অপশন ভিড় করে আস্ত একটা জগত তৈরী করে নিতে পারতাম। লন্ঠন ছিল সেই জগতের একটা প্রপার প্রপ্স।   সে আলোর গন্ধ ছিল একটা। মানে আলোর গন্ধ টা  হয়ত একটু বেসি কাব্যিক হয়ে গেল … কিন্তু আমার কাছে কেরোসিন আর পলতে পোড়ার সেই আলো আর গন্ধ আলাদা করে এগজিস্ট করে না। ততদিনে আমি কনে দেখা আলো উপমা জেনেগেছি রবি বাবুর দৌলতে। কিন্তু সম্যক জ্ঞান নেই। মনে মনে ধারণা করে নিয়েছিলাম হলুদ রং এর গুড়ো গুড়ো  আলোকে। হ্যারিকেন এর আলো উস্কে দিত সেই বিশ্বাস। নতুন কনে বাড়িতে এসেছে …কোন আলোয় দেখবে মুখ? লম্ফো-র নগ্নতায় একটা যৌন আবেদন আছে আর আছে নতুন শাড়ির পাড়ে আগুন লাগার সম্ভাবনা। দিন এর কড়াকড়ি তে আমার কনে আসে না। কেউ বলেনি তবু মনে মনে জেনে গেছিলাম সন্ধ্যে বেলার হ্যারিকেন এর আলোই  কনে দেখা আলো। তার সারা গায়ে বচ্ছর ভর "গায়ে হলুদ" লেগে আছে। তার সার্সি তে মাথা কুটে মরছে  নায়ক পোকা, ভিলেন পোকা,  আর পুটকে পুটকে সাইড রোল এর পোকা গুলো।

এই অভ্যস্ত চোখে আমি দেখতাম নিবিড় হয়ে আসা ঘুমেরা ,শব্দেরা হলুদ আলোয় ঝিকমিক করছে।
সেই সব আলোদের আর দেখি না। যেমনটা দেখতাম পুরুলিয়া-র ইস্কুল বাড়ির ছাদ থেকে দোলগোবিন্দ মাহাতোর বাড়িতে জলছে ষাট পাওয়ার এর। আমার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকত নিম্নবিত্তের ম্যাক্সিমাম উদ্ভাসন । তার সাথে ছিল আমার পলাতক পিরিত। স্টাডি আওয়ার এ টুক করে ছাদ থেকে ঘুরে আসার সময় দেখতে পেতাম তাকিয়ে আছে বিন্দু বিন্দু  বাল্ব । নিরাসক্ত অবয়বহীন …নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দেখা যায় না সেই আলোয়। সে আলো  বড় মগ্ন থাকে আমার পরিচয়ে।
ধান খেত এর পাশ দিয়ে চলে গেছে ট্রেন লাইন . তার ওপর দিয়ে চলে যায় রূপসী বাংলা ট্রেন। রাত্রি বেলা আওয়াজ  হয়  আমাদের হোস্টেল এ। কাব্যি করছি না। ……মাইরি বলছি। সে ধানক্ষেত, ট্রেন আলো ….সবই আছে . সারদা সদন এর ছাদে উঠলেই দেখা যায়।বিশ্বাস করুন সময় থেমে যাবে। সে হাওয়া যখন কানের লতি ছুয়ে হাস্নুহানার চিঠি দিয়ে যায়। বলে দিতে হয় না …. মানুষ এমনিই আনমনা হয়। সে আমার বড় ছোটবেলার কথা কিন্তু সেই হাওয়া মানুষকে আরো পিছু টানে। সেই হাওয়ায় মানুষ জাতিস্মর হয় । পাড়ার লোকে যাকে ভাতারখাগী বলে গালাগাল দিত .. সে যবে মারা গেল সেও নাকি নিশি ডাকত এই ঔজ্জল্যে। পাড়ার লোকে স্বীকার করে নিল ভাতাখাগী-র নোলা বেড়েছে। আমি দেখতাম দুলুর বাড়ি থেকে সেই ষাট পাওয়ার এর বাল্ব আমার বর্তমান কে ভিজিয়ে নিছে সেপিয়া কালার এ। আর খেলার মাঠে শরত্কালে ঠিক দুক্কুরে সোনা রোদ উঠত। আমাদের বয়সন্ধি কালের ব্রণ গুলোকে অব্দি কি অপূর্ব দেখাত সেই আলোয়। রোববার করে ছেলেদের গার্জেন আসত। সাথে আসত তাদের বোন্ দিদি। সেই সেদিন যেদিন আমার বন্ধুর বোন্ আমায় প্রথম ভাই ফোটা দিল, সেদিন-ও এমনি রোদ  ছিল। কি আশ্চর্য তার পরের বছর চিলতে হাসি বিনিময়। এবং প্রেম। কড়ে আঙ্গুলের চন্দন এর থেকে অন্য ঘ্রাণ ভেসে আসে, শরত এর রোদ ঝলমল করে চোখ মটকায়।

অপূর্ব সে আলো
  • 5.00 / 5 5
3 votes, 5.00 avg. rating (95% score)

Comments

comments