আবার ভেসে উঠল। স্বেচ্ছায় কেউ যদি নিজের হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চায়, কারও কিছু করার নেই। মোটামুটি ঘা শুকিয়েই এসেছিল, সবাই জানেন ঘা যখন শুকোয় তখন প্রবল চুলকানি হয় কিন্তু ভুল করে চুলকে ফেললেই মুশকিল। আবার সেই পুরনো জায়গায় নতুন করে ব্যান্ডেজ কর, অ্যান্টিবায়োটিক খাও, হাজার হ্যাপা। তবে অনেকেই আছেন এ জগতে যাঁরা চান সমস্যার একেবারে মূলে গিয়ে সবকিছু ধ্বংস করতে। আর এই করতে গিয়েই হল যত বিপত্তি। কান্নাকাটি, শহীদ মিনারের ওপর থেকে ঝাঁপ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ, ভারতবর্ষের একটি অঙ্গরাজ্যে আগুন জ্বালানোর হুমকি, মানহানির মামলা, আপাতত যার শেষ সুনন্দ সান্যালের মত প্রবীন শিক্ষাবিদের ওপর শারীরিক নিগ্রহ এবং গ্রেপ্তার ও সর্বত্র এক নৈরাজ্য সৃষ্টির সম্ভাবনা উস্‌কে দিয়ে। যত রকম কুনাট্য সম্ভব তার প্রায় সবই অভিনীত হয়ে গেল প্রাক্‌ শীতের এই কলকাতায় আরও অভিনয়ের প্রতিশ্রুতি রেখে।

নিকট অতীতে বারবার প্রশ্ন উঠেছে যে সংগঠিত আর্থিক প্রতারণা ঠেকাতে যে সব সরকারি পরিকাঠামো বর্তমান সেইগুলি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে কিনা? পয়লা বৈশাখের ওই ঘটনার প্রায় ছয় মাস পরে মনে হচ্ছে হয়নি অথবা হলেও ইচ্ছাকৃত ভাবে তাদের নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। একমাত্র সারদা নামাঙ্কিত অর্থলগ্নি সংস্থাটি যে বাজার থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে তা নয়, আরও বেশ কয়েকটি সংস্থাও একই রাস্তা ধরেছে। তাদের কিছু হয়েছে কি হয়নি, সেটা অন্য প্রসঙ্গ, কিন্তু খবরের কাগজের সংবাদ অনুযায়ী এদের একটি সম্প্রতি অন্য অবতারে আত্মপ্রকাশ করেছে। অর্থাৎ একেবারে শুরুতেই যে ভেসে ওঠার কথা লিখেছিলাম, সেটা অন্য অর্থেও সঠিক।

এই নব অবতারটির নাম কোয়াসি ব্যাঙ্ক। কোয়াসি শব্দটির অর্থ সবাই জানেন। তবু একবার বলি, এর অন্যতম অর্থ ‘Apparently’ বাংলা করলে ‘আপাতভাবে’। নামে ব্যাকরণগত কোনও ভুল নেই। এই খবরটি পেয়ে চেষ্টা করলাম একটু জানতে। ভরসা সেই গুগলবাবু। আশাহত করলেন উনি। মোট চারটি এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের খবর পেলাম। তার মধ্যে দুটির ওয়েবসাইট আছে, একটি ফেসবুক পেজে আপডেট দেয়, অন্যটার অস্তিত্ব দেখতে পেলাম একটি চাকরি খোঁজার ওয়েবসাইটে, লোক নেওয়ার জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছেন।

এগুলি কি খুব বড় ব্যাপার? একেবারেই নয়। আমিও একটা ওয়েবসাইট খুলতে পারি, চাকরি দেওয়ার জন্য লোক খুঁজতে পারি। কিন্তু আমি যদি কোনও সরকারি অনুষ্ঠানে টাকা ঢেলে সেই মঞ্চকে নিজের বিজ্ঞাপন দেওয়ার কাজে ব্যবহার করি, তাহলে আমার উদ্দেশ্য অন্য মাত্রা পায়। মূলত এই ঘটনাটির সূত্র ধরেই পুরো বিষয়টি জনসমক্ষে আসে।

যাই হোক একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক এদের কর্মপদ্ধতিতে, মানে যেইটুকু এঁরা ওয়েবসাইটে জানিয়েছেন। ফিক্সড ডিপোসিট, রেকারিং ডিপোসিট, মান্থলি ইনভেস্টমেন্ট স্কিম এবং সেভিংস অ্যাকাউন্ট। সুদের হার অবশ্যই বাজার চলতি হারের চেয়ে বেশি। একটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। সেভিংস অ্যাকাউন্টে সুদের হার বছরপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ। যেখানে ক্রমাগত সুদের হার কমছে, সেখানে এই মাত্রাছাড়া সুদের হারের জন্য ক্যাপিটাল রোলিংয়েরও নিশ্চয় কিছু সুবন্দোবস্ত আছে। কাজেই একবার দেখা যাক সুব্যবস্থাটা ঠিক কি? বিবিধ লোন। গাড়ি, বাড়ি, জুয়েলারি, সরকারি সংস্থার ইনভেস্টমেন্ট এই সবের বিনিময়ে। আর ব্যক্তিগত সূত্রে এদের মধ্যে একটির সম্বন্ধে খোঁজখবর করে যা জানতে পারলাম তা এই রকম। আগামী ২০১৪ সালের মার্চ মাসে এরা চেকবই ইস্যু করবে, এটিএম মেসিন বসাবে, গাড়ি বাড়ি কেনার জন্য বাজার চলতি সুদের হারের চেয়ে কম সুদে ধার দেবে। এইখানে আরেকবার লক্ষ্য করুন দেয় সুদের হার বেশি আর প্রাপ্য সুদের হার কম। যাই হোক, আরেকটু চেপে ধরতে জানা গেল এরা নন-সিডিউল ব্যাঙ্ক। কিন্তু সুদের হার ইত্যাদি বাদ রাখলে অন্যান্য কর্মপদ্ধতি আর পাঁচটা সত্যিকারের ব্যাঙ্কের চেয়ে বিশেষ কিছু আলাদা নয়। এছাড়াও আরও বেশ কিছু মিল আছে এই দুটি বা চারটি কোয়াসি ব্যাঙ্কের মধ্যে। নিজেদের নিধি কোম্পানি হিসেবে দাবি করলেও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অনুমোদিত নিধি তালিকায় একটিরও নাম নেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য – এদের মধ্যে একটি ছাড়া কারও কোনও রেজিস্টার্ড অফিস কিংবা কর্পোরেট অফিসের ঠিকানা পাওয়া গেল না। যে একটির পাওয়া গেল সেটির রেজিস্টার্ড অফিস উড়িষ্যার বালেশ্বরে, কর্পোরেট অফিস পশ্চিমবঙ্গের খড়গপুরে। কিন্তু অন্তত তিনটি যে পশ্চিমবঙ্গে সক্রিয় তার অকাট্য প্রমাণও পাওয়া গেল।

এখান থেকেই শুরু হয় ধোঁয়াশা। কোনও গ্রুপ নয়, এবারে সরাসরি ব্যাঙ্ক। নামের মধ্যে ব্যাঙ্ক ঢুকিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য কি খুব সাধু বলে মনে হয়? নন-ব্যাঙ্কিং ফিনান্সিয়াল অর্গানাইজেশনগুলির সাথে রাজনৈতিক দলগুলির যোগাযোগ নিয়ে মূল অভিযোগ হল যে প্রকাশ্যে এদের পাশে নামী রাজনৈতিক নেতা, উচ্চপদস্থ, ক্ষমতাশালী প্রশাসনিক কর্তাদের দেখে অধিকাংশ লগ্নিকারী ধরে নিয়েছিলেন যে এইগুলি সরকারের আশীর্বাদধন্য। তো যাঁরা এই রকম ভাবতে পারেন তাঁরা ‘হস্তিমূর্খ কোয়াসি ব্যাঙ্ক’ জাতীয় নাম দেখলে কি ভাববেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলে কোনও পুরস্কার দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি? বরং জেনে রাখা ভাল যে যদ্দুর খবর পাওয়া গেছে ইতিমধ্যেই এই আপাতভাবে ব্যাঙ্কগুলি সম্মিলিত ভাবে প্রায় হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করে ফেলেছে।

পশ্চিমবঙ্গের শাসক কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক দল, কারও এই বিষয়টি নিয়ে কোনও মাথাব্যথা আছে বলে তো এখনও পর্যন্ত মনে হচ্ছে না। কারণ বাজার অন্য কিছুতে গরম করে রেখেছে। কে জানে হয়ত আবার সবাই মিলে বলে বসবে ‘কিছুই তো জানতাম না। এইমাত্র জানলাম।’

এখন প্রশ্ন হল আমাদের সতর্ক হওয়ার সময় কি এসেছে নাকি অপেক্ষায় থাকব কবে এই সব কোয়াসি ব্যাঙ্কগুলি রাতের অন্ধকারে শাটার নামিয়ে পাততাড়ি গোটায়?

 

 

তথ্যসূত্র – দৈনিক সংবাদপত্র -এই সময়, ২৮-১১-২০১৩, ২৯-১১-২০১৩

অবতারান্তর
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments