আগের পর্ব প্রথম পর্ব দ্বিতীয় পর্ব তৃতীয় পর্ব চতুর্থ পর্ব পঞ্চম পর্ব ষষ্ঠ পর্ব সপ্তম পর্ব অষ্টম পর্ব

বিকেলের দিকে অবলাকান্তকে দেখা গেলো একটু নতুন একটা ফতুয়া পরে শিস দিতে দিতে হাঁটছে। তার পেছনে দাশু। দাশুর হাতের দড়িতে বাঁধা চাঁদনী। সে একমনে দাশুর হাতের ডাল থেকে ঝুলন্ত কাঁঠাল পাতা চিবুচ্ছে আর থেকে থেকেই পরিত্রাহি চিৎকার ছাড়ছে।একদিনের অনুশীলনে গলা আরো খোলতাই হয়েছে। কালদিঘির পারে বটকেষ্ট কে দেখা গেলো ফোকলা দাঁতে বিড়বিড় করছেন আর ছড়ি দিয়ে ঝোপঝাড়গুলো খুঁচিয়ে চলেছেন। অবলাকান্ত সোজা গিয়ে বটকেষ্টর হাতে তার দাঁতের পাটিটি ধরিয়ে দিলো। বটকেষ্ট চমকে তাকালেন। অবলাকান্ত তাড়াতাড়ি বলে উঠল
ঢেউ এসে দিয়ে গেছে জ্যাঠামশাই।
বুড়োর চোখে কান্নার জল না কালদিঘির জলের ছিটে বুঝতে পারলো না অবলাকান্ত। কিন্তু জীবনে প্রথমবার ঝকমকে আলোয় ফোকলা দাঁতের হাসি দেখে ভারি ভালো লাগলো তার । বটকেষ্ট আর কিছু জিজ্ঞেস না করে অবলার হাতটা চেপে ধরলেন। তারপর ধুতির কোঁচায় চোখটা মুছে চাঁদনির দিকে তাকালেন।
কোবরেজের ছাগলডা না ?
অবলাকান্ত মৃদু মাথা নাড়ল। তারপর কেষ্টাদের কীর্তিকলাপ আর ছাগল উদ্ধারের কাহিনী সবিস্তারে বলল। এবার যাত্রায় বটকেষ্টও তাদের সঙ্গী হলেন। রাস্তায় যেতে যেতে নিবারন মণ্ডলের সাথে দেখা।এবারটা এড়িয়ে যেতে পারলো না অবলাকান্ত। তিনি এখন থেকেই রাতের পাহারার তদারক করতে বেরিয়েছেন। তাকেও সবিস্তারে সব বলতে হল। গ্রামের লোক গল্পগাছা পেলে আর কিছু চায় না। জীবনের নিস্তরঙ্গ জলে একটা নুড়ি পড়লেও সেই আলোড়ন টুকু সম্বল করে খানিকক্ষণ বেঁচে থাকতে চায়। নিবারন মণ্ডল একটু মনমরা হয়ে গেলেন কারন রাতে পাহারার তাহলে আর দরকার পড়বে না। কিন্তু তিনি যথারীতি তাদের সঙ্গী হলেন এবং কেষ্টাদের থেকে ছাগলটা উদ্ধার করে অবলা আর দাশু যে কি গভীর পরোপকার করেছে সেটা বারবার বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। শোভাযাত্রাটা একটা দেখার মত হল। সামনে নিবারন মণ্ডল অবিশ্রান্ত বকবক করতে করতে চলেছেন। তার পেছনে অবলাকান্ত। তার পেছনে চাঁদনির দড়ি হাতে দাশু এবং সর্বোপরি বাহারি দাঁতের পাটি সবাইকে দেখাতে দেখাতে যাওয়া বটকেষ্ট। বটতলার কাছে কেষ্টার দলবল দাঁড়িয়ে। কিছু একটা নিয়ে চরম বচসা বেধেছে। কারন আন্দাজ করা শক্ত নয়। দাশুর হাতে চাঁদনিকে দেখে কেষ্টা সহ পুরো দলটাই কেমন থমকে চোখ গোল গোল করে চেয়ে রইল যেন ভয়ংকর কিছু দেখে ফেলেছে। অবলাকান্তর মুখে এক চিলতে যুদ্ধজয়ের হাসি। ছেলেগুলো ক্যাবলাকান্ত ডাকটাও ডাকতে ভুলে গেছে অথবা সঙ্গে ছড়ি হাতে বটকেষ্টকে দেখে ট্যাঁ ফোঁ করার সাহস পেলো না। তাদেরকে পেছনে ফেলে শোভাযাত্রা পৌঁছল কবিরাজের বাড়িতে। পথে যেতে যেতে গ্রামের প্রায় সবাই কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করেছে। ব্যতিক্রম শুধু ইন্দ্রকুমার। একখানা ছিপ হাতে নিয়ে ফাতনার দিকে নিবিষ্টমনে তাকিয়ে ছিলেন। তাদেরকে দেখেও দেখলেন না।
অতএব মধুরেন সমাপয়েত। পুরো গ্রামে ততক্ষণে রটে গেছে ছাগল উদ্ধারের ঘটনা।কবিরাজ গিন্নী অনশনে ছিলেন। চণ্ডীবালা একটা ঝাঁটা হাতে অতিথিদের তদারক করছিল। ঘরের ছাগল ঘরে ফিরে আসতে তাকে জড়িয়ে ধরে কবিরাজ গিন্নী এমন ডুকরে কাঁদতে লাগলেন যে কে বলবে চাঁদনী একটা ছাগল মাত্র। কবিরাজ মশাইও ঘরের এককোণে একটা খল হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। জড়িয়ে ধরলেন অবলাকান্তকে। অবলাকান্তর এসব আদিখ্যেতা দেখে প্রথমে একটু হাসি হাসি পাচ্ছিল কিন্তু খেয়াল করেনি যে পশু মানুষের এমন মর্মান্তিক মিলন দৃশ্য দেখে তারও চোখ কখন জলে ভরে গেছে। নরম মানুষ তো। কিন্তু ছাগলের ডাক ফিরে পাওয়ার মন্ত্রগুপ্তি কাউকে বলে নি সে। বারবার জানে না বলে এড়িয়ে গেছে। আর দাশু তো এমনিই কথা কম বলে। বটকেষ্ট নগেন মুখুজ্জে কে সামনে পেয়ে তার দাঁত উদ্ধারের কাহিনী হাত-পা নেড়ে বলতে লাগলেন। দুই বন্ধুর আড্ডা আবার জমে উঠল।
পরদিন নেমন্তন্ন ছিল কবিরাজ মশাইয়ের বাড়িতে। পেটপুরে খেয়ে দেয়ে আসতে আসতে দেখল দাশু আপন মনে বাঁশিতে একটা সুর ধরেছে। মনটা ভারি নরম হয়ে গেলো অবলাকান্তর। গোয়েন্দাদের ও মন বলে তো একটা জিনিস আছে। সে তো আর গল্পের বইয়ের অতিচালাক গোয়েন্দা নয়। নেহাত বোকাসোকা গ্রামের মানুষ। দাশুকে আর জিজ্ঞেস করতে মন চাইল না যে সেদিন চাঁদনিকে আবিষ্কারের সময় ভাঁড়ারে যে গোটা দুই লাউ দেখেছিল সেগুলো কোথা থেকে এলো বা গোয়াল ঘরে চাঁদনির সামনে গুচ্ছের লাউএর খোসার উৎস কোথায় ! লম্বামত আর খাড়াচুলো বললে কি দাশু আপত্তি করবে? মনে হয় না। তবে লাউ চিংড়ীটা বেড়ে রাঁধে ছেলেটা। মোক্ষদা বুড়িকে পরে সাবধানে বুঝিয়ে সুঝিয়ে গোটা দুই টাকা দিয়ে এলেই চলবে।

- শেষ -

অবলাকান্তর দপ্তর… অন্তিম পর্ব
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments