আগের পর্ব প্রথম পর্ব দ্বিতীয় পর্ব তৃতীয় পর্ব চতুর্থ পর্ব পঞ্চম পর্ব ষষ্ঠ পর্ব সপ্তম পর্ব

অবলাকান্ত স্বপ্ন দেখছিল একটা মেছো ভূত তাকে তাড়া করে এসে টিপ করে করে মাছ ছুঁড়ে মারছে আর মাঝে মাঝেই জোর গাঁট্টা লাগাচ্ছে। অবলাকান্ত পালাতে পালাতে পেছন ফিরে দেখল ভুতের মাথাটা অবিকল কেষ্টার মত। সেই হাড়গিলে লম্বা চেহারা, কড়াইশুঁটির ডানার মত ছোট্ট ছোট্ট চোখ, খাড়া খাড়া চুল। কালদিঘির ধার দিয়ে দৌড়চ্ছে সে। হঠাৎ করে কোত্থেকে বটু সাঁতারু এসে তার ছড়িটা এগিয়ে দিলেন। অবলাকান্ত হোঁচট খেয়ে পড়ল ছপছপে কাদার তালে। আর পালানোর পথ নেই। সামনে জল আর পেছনে কেষ্টারুপী মেছোভূত। মুখ চোখ থেকে কাদা মুছে তাকাতে চাইল সে। হাত মুখের ওপর বোলাতেই চিটচিটে পদার্থটা আঙুলে উঠে এলো। ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠে বসতেই ডানা ঝাপটে কয়েকটা কাক চলে গেলো মাথার ওপর দিয়ে। তার মানে কাদা নয়, এসব ওই কাকেদের কাণ্ড। ঘুমন্ত মানুষ দেখে আর সামলাতে পারে নি। ঝটপট ফতুয়ার কোনটা দিয়ে মুখ মুছে পুকুরের দিকে হাঁটা দিলো।
শীতকালে স্নান টান বিশেষ করে না অবলাকান্ত। পুকুরপাড় থেকে হাত মুখ ধুয়ে সোজা ঘরে এসে ঢুকল। দেওয়ালঘড়িতে বেলা একটা। কিন্তু নিস্তার নেই। সেই ব্যা ব্যা চিৎকারটা আবার খানিক অন্তর অন্তর কানের গভীরে জগঝম্পের মত বাজতে লেগেছে। অনেকক্ষণ রোদে ঘুমনোর ফলে সর্দিটা বেশ কম। তবে কানটা কবিরাজ মশাইকে না দেখালেই নয়। তার আগে একটু উষ্ণ গরম তেল দিয়ে দেখা যেতে পারে। একটা কৃত্তিবাসী রামায়ণে চিবুক রেখে এসব ভাবছিল অবলাকান্ত। দাশু ঘরে এসে ঢুকেছে। একখানা প্রাচীন কাঁসার থালায় ভাত আর গোটা দুয়েক বাটি। এসে হাঁক দিলো
খেয়ে নিন কত্তা।
দাশু এমনিই কথা ভীষণ কম বলে। শুনতে ভালবাসে কিন্তু কাজের বাইরে কিছু বলাতে ভীষণ কৃপণ। নিঃশব্দে আসন পেতে দিয়ে চলে গেলো। সেদিকে তাকাতেই অবলার খেয়াল হল সকাল থেকে কিছুই পেটে পড়ে নি। ওই কেষ্টার দলবলের পেছনে সারারাত খরচ করে আর ঘুমিয়ে খিদেটা বিপজ্জনকভাবে চাগাড় দিচ্ছে। সময় নষ্ট না করে হামলে পড়ল সে। দাশু অবলাকান্তর খাবার সময় পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকে বরাবর। কিছু লাগলে এনে টেনে দেয়। খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে আঙুল চাটতে চাটতে অবলাকান্ত বলল
ডাঁটার তরকারিটা জব্বর হয়েছে রে। আর লাউ চিংড়ীর তো জবাবই নেই।
চওড়া হাসি ফুটল দাশুর মুখে। কাল আরও ভালো খাওয়াবো কত্তা। বিকেলে এটটু সওদা করতে হবে। এই তেল টেল…
কথা কেড়ে নিয়ে খোস মেজাজে বলল অবলাকান্ত
কেন কিসের মেনু হচ্ছে কাল?
পাঁঠার মাংস কত্তা।
আঙুল চাটতে গিয়ে কামড় দিয়ে ফেলল অবলাকান্ত। সে হিসেবে চালাক চতুর না হলেও বোঝে যে সংসারে রেখে যাওয়া টাকার পরিমাণ তলানিতে, ফি হপ্তায় নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, সেখানে কচি পাঁঠা ?
সোজা উঠে দাঁড়িয়ে বলল
কেউ দিয়েছে তোকে?
একটু ঘাবড়ে গেলো দাশু
না কত্তা। হেঁটে হেঁটে এসেছে।
অবলাকান্ত প্রায় হিড়হিড় করে দাশুর হাত ধরে নীচে ছুটল। গিয়ে দেখল বাড়ির পেছনে যেখানে এককালে গোশালা ছিল, এখন অবশ্য কাঠকুটো, কয়লা ইত্যাদি রাখে দাশু; সেখানে এককোনে একটা চকচকে ছাগল সোজা হয়ে পরিত্রাহি চ্যাচাচ্ছে। সামনে পাতার স্তুপ এবং এটাওটার খোসা। চেবাচ্ছে আর মাঝে মাঝেই নিখুঁত ব্যা ব্যা উচ্চারণে হাঁক পাড়ছে । নিশ্চিত হওয়ার জন্য ছাগলটার কপালের কয়লার গুঁড়ো সরিয়ে নিশ্চিত হল অবলাকান্ত। সাদা একটা দাগ রয়েছে। তার মানে এই সেই কবিরাজ মশাইয়ের চাঁদনী। ভাগ্যিস এতক্ষনে রান্না হয়ে যায় নি। একটা অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে দাশুর দিকে তাকাল অবলাকান্ত। বাবুর কীর্তি কলাপ দেখে ভয় পেলেও চোখে মুখে একফোঁটাও টলেনি দাশু। এমন দেখে অভ্যস্ত সে। সব শুনে বোঝা গেলো যে এতে দাশুর কোন দোষ নেই বরং আকস্মিক ভাবে একটা কাজের কাজ করে ফেলেছে।
দাশু একলা বাঁশি বাজাতে ভালবাসে। গত পরশু গ্রামের পূর্বদিকের জঙ্গলটায় গিয়েছিলো সে। সেখানেই শুকনো পাতা ভাঙবার আওয়াজ শুনে দেখতে পায় একটা ছাগলকে কেউ গাছে বেঁধে রেখে চলে গেছে। বেচারা ছাড়াবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে আর ততই লম্বা দড়িটা আরও তার শরীরে পেঁচিয়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ দেখেও কেউ নিতে না আসায় আর না থাকতে পেরে দাশু ওর দড়িটা খুলে দেয়। ভাবে ছাড়লে মালিকের কাছে চলে যাবে। কিন্তু যখনই সে বাড়ি ফেরার জন্য হাঁটতে থাকে দেখে তার পেছন পেছন সেটাও আসছে। ওই জঙ্গলে বাঘ টাঘ না থাকলেও একলা ছেড়ে আসতে মন চাইল না। তাই পেছন পেছন আসায় বাধা দেয় নি সে।
কিন্তু? অবলাকান্ত ভাবল কবিরাজ মশাইয়ের ছাগল তো বোবা। মোটেও ডাকবার কথা নয়। আর এ ছাগল এমন ডাক ডেকেছে যে অবলাকান্ত সেটাকেই অজ্ঞাতে কানের ব্যামো ভাবছে। সেটাই জিজ্ঞেস করে দাশুকে। উত্তরে দাশু যেটা বলল সেটা আরও আশ্চর্যের। কত্তা ঠিকই বলেছেন। ছাগলটা মোটেও ডাকত না। কাল বিকেল থেকেই ডাকতে লেগেছে। পাতা টাতা কিছুই খাচ্ছিল না দেখে দাশু কত্তার টেবিলে কয়েকটা গাছের পাতা, শেকড় বাকড় ছিল ওগুলো স্রেফ মজা করেই ছাগলের সামনে ধরেছিল। ব্যাটা চিবিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গেই। ছাগলে কিনা খায় আর কি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার। ওগুলো খেয়ে দেয়ে ঠিক তারপরই সামনের দুপা তুলে অবিশ্রান্ত চরকি পাক দিয়ে টানা দশ মিনিট গোয়াল ঘরের মাটি ফাটি খুঁড়ে ফেলে ছাগলটা চোখ উল্টে পড়ে যায়। দাশু তো প্রথমে ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলো। মরে টরে গেলো নাকি ! কিন্তু পশুটা খানিক পরে উঠেই যা চেল্লানো আরম্ভ করে সেটা আর থামছেই না। তার সাথে গব গব করে যা সামনে পাচ্ছে গিলে চলেছে। এই চিৎকারের আর খাবার যোগাড়ের চাপে দাশু বিরক্তির শেষ পর্যায়ে পৌঁছে ভেবেছিল এর অন্ত করে ফেলবে।
ছাগলের মুখের সামনে থেকে সাবধানে পাঞ্জাবীটা সরিয়ে নিয়ে অবলাকান্ত হো হো করে হেসেই কুটিপাটি। কবিরাজের ওষুধ পত্তর নিজেরই ছাগলের রোগ সারিয়ে দিলো।এদিকে কবিরাজ জানতেও পারলো না। ব্যাটা তো চেঁচাবেই। এতো দিন কার কথা জমানো ছিল যে। এবার দেখার যে কবিরাজ গিন্নী নিজের পুত্রসম চতুষ্পদের বচনামৃত কতদিন সহ্য করতে পারেন।
এবার পুরো ঘটনাটা পরিষ্কার হয়ে এলো অবলাকান্তর কাছে। কেষ্টা আর তার দলবলের পিকনিকের ব্যাপারটা সে ঠিকই ধরেছিল। সে জন্যই ছাগলটাকে চুরি করেছিল তারা। পুব দিকের জঙ্গলে সাপ খোপের ভয়ে এমনিই কেউ যায় টায় না। গাছ গাছালির ছায়ায় জায়গাটা দিনের বেলাতেও কেমন অন্ধকার হয়ে থাকে। তার ওপর ছাগলটা বোবা। চরে ঘাস খাওয়ার জন্য একটা লম্বামত দড়ি বেঁধে নিশ্চিন্তে কেষ্টারা ওখানে রেখে গিয়েছিলো। সময় হলেই নিয়ে যেত অথবা ওকে দিয়ে ওখানেই পিকনিক হয়ে যেত। ওদিকে হতভাগা দাশু গত বিকেলে বাঁশি বাজাতে গিয়ে না জেনেই চোরের ওপর বাটপারি করে ফেলেছে।
আর গত রাতে মাছ চুরি করতে এসেও কেষ্টারা সুবিধে করতে পারে নি। অবলাকান্তর কাঁপা কাঁপা সর্দি বসানো হেঁড়ে গলার ডাক শুনে ওকেই ভূত ঠাউরে পালিয়েছিল। কিন্তু ব্যাটা কালিধর কিভাবে জানল যে ছাগলটা পুব দিকেই লুকিয়ে রাখা আছে। কে জানে হিমালয় থেকে সত্যিই কিছু তন্ত্র মন্ত্র শিখে এসেছে হয়তো। অথবা সব আন্দাজের বুজরুকি। না হলে হয়তো কোনভাবে কেষ্টাদের আড্ডায় অবলাকান্তর মতই লুকিয়ে শুনেছে। ওর ডেরা থেকে বেশি দূরে তো নয়। সে অঙ্ক সেখাতে গিয়ে সুযোগ বুঝে জিজ্ঞেস করে নেবে না হয়। এক নিশ্বাসে এতো কিছু ভেবে ফেলে অবলাকান্তর নিজের পিঠ নিজেরই চাপড়ে দিতে ইচ্ছে হল। নিজের পিঠ টাকে কব্জা করা সহজ নয়। তাই সামনে পেয়ে দাশুর পিঠটাই চাপড়ে দিয়ে বলল
যা একটু গড়িয়ে নে। রোদ পড়লে বেরোব।

পরের পর্ব অন্তিম পর্ব

 

অবলাকান্তর দপ্তর… অষ্টম পর্ব
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments