আগের পর্ব প্রথম পর্ব দ্বিতীয় পর্ব

পরদিন সকালে উঠে রেডিওতে খান দুই পুরাতনী আর রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে পড়ল অবলাকান্ত। তার বাড়ির বিশাল বাগানটা যেখানে ছিল যেখানে সেখানে এখন আগাছা এবং বিশাল বিশাল গাছ ভর্তি। দু খানা সাদা পাথরের পরীর মূর্তি ছিল; তারা এখন মাটিতে ধরাশায়ী।গরমের সময় সাপের উপদ্রবে চলাই মুশকিল। দাশু এদিক ওদিক কিছু শাকপাতা লাগিয়েছে বটে কিন্তু বিশেষ খোলতাই হয় নি। অবলাকান্ত বাগানের নিমের গাছ থেকে একটা জুতসই ডাল ভেঙ্গে দাঁতন করতে করতে ভাঙা পাঁচিলের ফোকর দিয়ে বেরিয়ে গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরল। এ সময়টা খুব মজা লাগে তার। ফুরফুরে হাওয়া বয়। সূর্যটাও নিজেকে উত্তাপ দেওয়া থেকে গুটিয়ে রাখে। দূর থেকে কুয়াশা ফিকে হয়ে আসতে থাকে। চোখের সামনে অন্য একটা পৃথিবী খুলে যায় যেন। গ্রামের মানুষ ভোরেই উঠে পড়ে ঘুম থেকে। তাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়, কুশল বিনিময় হয়। এই তো কটা ঘর । সবাই সবাইকে চেনে। ওই যে দূরে নিবারণ সামন্ত আসছেন। বিচিত্র মানুষ। যৌবনে ইনি নাকি ভারি অলস ছিলেন। কুটোটি নাড়তেন না। বৌ ছেলে মেয়েদের হাড় মাস এক করে দিয়েছিলেন বলতে গেলে। মেয়েদের বিয়ে হল। বৌ মারা গেলো। ছেলেরাও কাজকম্ম নিয়ে অনেকদিন দূর দেশে থাকে। গ্রামে আসে না বড় একটা। একা থাকতে থাকতে কেমন একটা হয়ে গিয়েছিলেন যেন। কয়েক বছর আগে একদিন হঠাৎ সকালে উঠেই তার মনে হয়েছিলো সারা জীবনটা শুয়ে বসে কাটিয়ে এসেছেন। এখন আর সময় নষ্ট না করে কিছু কাজ করা তার কর্তব্য। তারপর থেকেই সক্কাল সক্কাল লোকের উপকার করবেন বলে বেরিয়ে পরেন গ্রামে। কাজকর্ম করবেন কি, কোনদিন তো কিছু করতে শেখেন নি। ফলে রঙ্গটাই হয় বেশি। গ্রামের লোক তাকে পারতপক্ষে এড়িয়ে চলে অথবা তামাশা দেখে। দূর থেকে তাকে একটা গেঁটে লাঠি হাতে হনহন করে আসতে দেখে অবলাকান্ত একটা গাছের গুঁড়ির পেছনে লুকিয়ে পড়ল।
ক্লাবের ছেলেগুলো এই সকালেই বটতলার রোয়াকে বসে তাস পিটতে লেগেছে । বেশ উত্তেজনা। মনে হয় বাজি টাজি চলছে। কে যেন পাশ থেকেই ক্যাবলাকান্ত বলে ডেকে সুট করে সরে গেলো। অবলাকান্ত জানে এসব কাদের কাজ। কিন্তু প্রমান নেই। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে ব্যাজার মুখে হাঁটা দিলো। পেছনে তখন হাসির জোয়ার। সে চলার গতিটা একটু বাড়াল সেটা বলাই বাহুল্য। জোরে জোরে হাঁটবার পর একটু জিরোবার জন্য দাঁড়ালো। দেখল সামনের পুকুরের পাড়ে একখানা ছাতার চাঁদোয়া বানিয়ে ছিপ ফেলে বসেছেন ইন্দ্রকুমার। ইন্দ্রকুমারের আসল নাম গণেশ সাপুই। যাত্রাপালার হিরো হওয়ার পর থেকে ইন্দ্রকুমার নামটা বোম্বের কোন এক হিরোর থেকে ঝেঁপেছিলেন। লম্বা লম্বা কেয়ারী চুল। ত্বকের যত্ন হয় বোঝাই যায়। এখন বয়েস পঞ্চাশের ওপর। তাই হিরো হতে এখন কেউ আর ডাকে টাকে না। তারও জিদ হিরো না হলে তিনি পার্ট করবেন না। তিনি বলেন – বাবা কাকার রোল করার জন্য যাত্রার সুপারস্টার ইন্দ্রকুমারের জন্ম হয় নি। তাই সারাদিনটা পুকুরের জলে ছিপ ফেলেই কেটে যায়। সাঙ্ঘাতিক নেশা। তিনি নিরামিষাশী। শুধু ধরাতেই তার আনন্দ। তাই মাছ ধরে ধরে ফের পুকুরেই ছেড়ে দেন। ভোররাত থেকেই একটা পুকুর বেছে ছিপ ফেলে বসে থাকেন ধ্যানগ্রস্ত ঋষির মত। এ সময় কথা বলতে গেলে খুব জোর হুঁ হাঁ বেরোয় তার মুখ দিয়ে। অবলাকান্ত গলা বাড়িয়ে দেখল ইন্দ্রকুমার চ্যাপ্টা মত কি একটা মাছ বড়শি থেকে খুলে ছুঁড়ে দিলেন। এই জীবনদান করবার সময় তার চোখটা যেন একটু চকচক করে উঠল। আবার যে কে সেই। অবলাকান্ত তাকে বিরক্ত না করে আবার পথে নেমে এলো।
পা ফেললেই ধুলো উড়ছে। তার ওপর পাশ দিয়ে একদল গরু লাফাতে লাফাতে চলে গেলো। ধুলোর ঝড় বয়ে গেলো যেন। সূর্য অনেক পরিষ্কার। আঁচ লাগছে রোদের। আলোয়ানটা হাতে তুলে নিলো অবলাকান্ত। দু দিকের চাষের জমিগুলোতে ব্যস্ত চাষিদের ভিড়। ফসল কাটার সময় এটা। তেড়েফুঁড়ে কাজ না করলে শীতের আলস্যি কাটবে না। কয়েকটা শিশু মাঠের মধ্যে একটা রবারের পুরনো বল লাথিয়ে যাচ্ছে। মন দিয়ে খেলা দেখছিল অবলাকান্ত। এমন সময় দেখল হারান কবিরাজ আসছেন। এই হিজলগঞ্জের সবেধন নীলমণি চিকিৎসক বলতে তিনিই। তার পিতার ছিল বিশাল খ্যাতি । রাজা মহারাজারা পালকি পাঠিয়ে খাতির করে তুলে নিয়ে যেতেন তাকে। সেই পঞ্চানন ধন্বন্তরির ছেলেই হারান কবিরাজ। এরও হাতযশ মন্দ নয়। তবে অনেকের মতে হারান কবিরাজ মৃত মানুষকে যেমন জাগিয়ে দিতে পারেন তেমনি সর্দি গর্মির রুগীকেও শ্মশানে পাঠাতে তার জুড়ি নেই। মাঝে একটা প্যান্ট শার্ট ছোকরা হোমিওপ্যাথির আসর বসানোর তালে ছিল। জমাতে না পেরে কেটে পড়েছে। হারান কবিরাজ কি একটা ভীষণ চিন্তা করতে করতে পথ হাঁটছিলেন। হাতের মুঠোতে কয়েকটা লতা পাতা আর শেকড় বাকড়। বোধহয় আরও খুঁজতে এদিক ওদিক চললেন। কথা বলার লোক পেয়ে অবলাকান্ত তাকে দেখে ভারি খুশি হলেও তিনি অন্যমনস্কভাবেই বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই থমকে গেলেন।
আরে অবলা যে। আর বোলনা ভাই। মন ভালো নেই।
কেন ভালো নেই সেটা শুনবে বলে অবলাকান্ত পথ আটকে চোখ বড় বড় করে চেয়ে থাকে। উপায় না দেখে কবিরাজ মশাই মুখ খুললেন
ক্ষেন্তির মানে তোমার গিন্নিমার মানে ইয়ে আমারও একটা কচি ছাগল ছিল বুঝলে। যাকে বলে ছাগলছানা। আদর করে নাম রেখেছিল চাঁদনী। কপালে চাঁদের মত একটা সাদা টিপও ছিল বৈকি। সেই চাঁদনী কাল সন্ধ্যে থেকে বেপাত্তা। কেউ গলার দড়ি খুলে চুরি করে নিয়ে গেছে। সঙ্গে বারান্দা থেকে বড় একগাছি দড়িও নিয়ে গেছে।
আমাদের গাঁয়ে চোর ! বলেন কি কবিরাজ মশাই। বিস্মিত হয় অবলাকান্ত।
কিন্তু নিয়ে যাওয়ার সময় চ্যাঁচাল না?
অকারনে ডেকে ওঠাটা ছাগলদের মজ্জাগত। এটা তার খুব জানা আছে।
কি করে ডাকবে বল । জীবটার গলায় ভগবান আওয়াজ দিতেই ভুলে গেছেন।
জিভ দিয়ে একটা চুক চুক করে শব্দ করল অবলাকান্ত। হারান কবিরাজ বললেন
না হলে আর বলছি কি। আমাদের তো আর ছেলেপুলে নেই। আমার ক্ষেন্তি ওই ছাগলছানাটাকেই ছেলের মত আদর যত্ন করত। ওটাও ভারি ন্যাওটা ছিল তোমার গিন্নিমার।
বলে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর মাথাটা নিচু করে পাশ কাটিয়ে হাঁটা দিলেন। অবলাকান্ত হতবুদ্ধির মত খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো একজায়গায়। সে ভেবে পাচ্ছিল না কিছু। বহুদিন পরে একটা চুরির কথা শুনল। একসময় চোর ছিল বটে তাদের গাঁয়ে। পবন মিস্ত্রী । পবনের মতই যাওয়া আসা করত সে। হাতের কাজ আর গলার কাজ ও নাকি দেখার মত ছিল। যার তার গলার স্বর ইচ্ছেমত নকল করতে পারত। অবলা না দেখলেও গল্প আছে সে নাকি এক গামলা দুধের ওপর থেকে পুরো সর তুলে আনতে পারত। কিন্তু দুধে একটুও ঢেউ খেলত না। কিন্তু সেই মহাত্মা শহরে গিয়ে এক পুলিশের পকেট মেরে এখন যাবজ্জীবনে। তাছাড়া পবন ওস্তাদ নিজের গাঁয়ের ঘর দোর সাফ করতেন না মোটেও। গ্রামে তার একটা সম্মান ছিল গুণীজন হিসেবে।তাহলে কি অন্য গায়ের চোর ? একটা ছুটন্ত সাইকেলের বেলে ভড়কে রাস্তা থেকে নেমে দাঁড়ালো অবলাকান্ত। দেখল সামনে কয়েকটা শেকড়বাকড় পথের ধুলোতে পড়ে রয়েছে। অন্যমনস্কভাবে কবিরাজ মশাই ফেলে গেছেন নিশ্চয়ই। পরে ফেরত দেবে মনে করে ফতুয়ার পকেটে ঢুকিয়ে নিলো সেগুলো।

পরের পর্ব চতুর্থ পর্ব

 

অবলাকান্তর দপ্তর… তৃতীয় পর্ব
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments