আগের পর্ব প্রথম পর্ব

কাঁসার গ্লাসে করে পেল্লায় এক গ্লাস ছাতুর ঘোল খেয়ে এক টুকরো পাটালী গুড় চুষতে চুষতে অবলাকান্ত কালো দীঘির দিকে এগোল। কালো দীঘি বলবার কারণ জলের রঙটা। গ্রামের পুকুরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আর বড় মাছ এখানেই পাওয়া যায়। তবে একটাও নেওয়ার জো নেই কারো। কারণ এটার মালিক মুখুজ্জেরা। এককালের অভিজাত বাড়ি। এখনকার ঝরতি পড়তি অবস্থায় কিছু ফলের বাগান আর এই দিঘীটা ভাড়া দিয়েই তাদের চলে। তাছাড়া নগেন মুখুজ্জের কৃপণ আর ঝগড়ুটে বলে দুর্নাম আছে। তাই সামনে মাছ ঘাই মারছে দেখলেও কেউ ধরবার সাহস করে না। অবলাকান্ত দূর থেকে দেখল কেউ একজন দীঘির ধারে ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সামনে আসতেই চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে এলো। বটকেষ্ট হালদার। এ অঞ্চলের নামকরা সাঁতারু ছিলেন। পাঁচটা গায়ের লোক একডাকে বটু সাঁতারুর নাম জানত। তার সাথে ডুব সাঁতারে বা চিত সাঁতারে পাল্লা দেওয়ার মত সাহসী কেউ ছিল না ত্রিসীমানায়। এখন বয়েস হয়েছে সত্তরখানেক। তাই খিটখিটে হয়েছেন। মাঝে মাঝে মাথা বিগড়ে গিয়ে একটু আধটু পাগলামোও করে ফেলেন। বটকেষ্টর সবচেয়ে পেয়ারের ছিল এই কালোদিঘি। সাঁতারের বয়েস চলে গেছে। কিন্তু নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার অভ্যাসটা যায় নি। প্রায় রোজই বুড়োকে দেখা যায় দীঘির জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে। কিন্তু কি খুঁজছেন বটু সাঁতারু এই বিকেলে ? একটু পরেই তো দিনের আলো মরে যাবে ; ভাবে অবলাকান্ত। সে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে বুড়োর সামনে এসে একটা গলা খাঁকারি দেয়। বটকেষ্ট তার দিকে এক পলক তাকিয়ে নাক দিয়ে একটা ফুত করে শব্দ করে আবার ছড়ি দিয়ে পাড়ের গাছপালাগুলো একমনে নাড়তে থাকেন। বেগতিক দেখে অবলাকান্ত মরিয়া হয়ে গেলো। এমনিতেই পেশাদার গোয়েন্দাদের নাক গলানোর স্বভাব মজ্জাগত।
কিছু খুঁজছেন জ্যাঠামশাই?
জবাবে বটকেষ্ট মুখ হাঁ করতেই এক ঝলক বাতাস বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ফোকলা মাড়িটা দেখতে পেলো অবলাকান্ত। তারপর অস্পষ্ট শব্দের মিছিল থেকে সার কথাটুকু উদ্ধার করা গেলো। বটকেষ্ট রোজকার অভ্যাস মতই দীঘির ধারে বসে পা দোলাচ্ছিলেন। ছোট ছোট মাছ এসে পায়ে ঠুকরে যায়। ওতে নাকি তার ভারি আমোদ হয়। এমনই এক মোলায়েম মুহূর্তে চোখ বন্ধ করে মুখ থেকে বাঁধানো দাঁতের একটা পাটি খুলে মাড়িটা একটু খেলাচ্ছিলেন। ডাক্তার বলে দিয়েছিল মাঝে মাঝে খুলে রাখতে। এমন সময় একখানা ঘোড়েল মাছ… বটকেষ্টর আন্দাজমত সিঙ্গি জাতীয় একটা ধেড়ে কেউ পায়ে জোরদার খোঁচা দিয়ে যায় এবং হাত থেকে তার সাধের দাঁতের পাটিখানি জলে পড়ে যায়।
অবলাকান্ত মন দিয়ে শুনতে শুনতে দাড়ি থেকে একটা জংলি পোকা খুঁজে বের করে দীঘির জলেই ছুঁড়ে ফেলে দিলো। তারপর চোখ থেকে চুলের গোছাটা সরিয়ে নিয়ে বলল
তাহলে পাড়ে খুঁজছেন যে বড়। পড়েছে তো জলে।
দাঁত হারানোর শকে বট কেষ্টর পাগলামো তা চাগাড় দিয়েছে মনে হল। খিঁচিয়ে উঠলেন।
আমার ইচ্ছে আমি যেখানে খুশি খুঁজব। এখন কি আর জলে নেমে খোঁজার বয়েস আছে আমার? কত বয়েস তোর? জল নিয়ে আমাকে জ্ঞ্যান দিতে এয়েছিস?
বুড়োর ধরন ধারন দেখে আর বেশি ঘাঁটানো সমীচীন মনে করল না অবলাকান্ত। কথার প্যাঁচেই আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টা করল যেন।
হ্যাঁ। যা হাওয়ার তোড়। ঢেউ পাড়ে এনে ফেলতেই পাড়ে। জানেন তো জ্যাঠামশাই, জল সব কিছু ফিরিয়ে দেয়।
মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াতে অথবা অবলার যুক্তিতে খুশি হয়েই বটকেষ্ট ছড়িটা তুলে দেখালেন। এই ইশারাটুকুই যথেষ্ট। বটকেষ্টর ছড়িকে ভয় পায় না এমন কুকুরও বোধহয় হিজলগঞ্জে নেই। অবলাকান্ত পিছু হটে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে ফিরল। কিন্তু মনটা ভারি খারাপ হয়ে গেলো। বুড়ো মানুষ। এই দাঁতের পাটিই তার গর্ব ছিল। ছেলে গড়িয়ে দিয়েছিল কলকাতার কোন নামকরা দোকান থেকে। যাই হোক। ফোকলা বুড়োর জন্য কষ্ট হলেও তার তো কিছু করার নেই। গ্রামে বড় হলেও এই ইস্তক জলে তার ভীষণ ভয়। তাছাড়া কালোদিঘিতে জাল ফেলাতেও মুখুজ্জেদের বারণ আছে। একটু দূরের ঘাসগুলো মরা আলোতে কালো কালো ঠেকছে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিলো গোধূলির শেষ আলোতে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে হাঁটা একটা নুয়ে পড়া বৃদ্ধের শরীর…।

পরের পর্ব তৃতীয় পর্ব

 

অবলাকান্তর দপ্তর… দ্বিতীয় পর্ব
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments