আগের পর্ব প্রথম পর্ব দ্বিতীয় পর্ব তৃতীয় পর্ব চতুর্থ পর্ব

মাঠ ঘাট সব পেরিয়ে যাচ্ছে দুপাশে। দৌড়নোর আনন্দে খেয়ালই করে নি যে পুরনো কালীমন্দিরের কাছে চলে এসেছে। সামনেই কাপালিক কালিধরের ডেরা। অদ্ভুত কিছু উচ্চারণ কানে আসতে এগিয়ে গেলো। মন্দিরের পাশের ভাঙা দেওয়ালের গায়ে একটা বহু প্রাচীন অশ্বত্থ গাছ রয়েছে। তার একটা ঝুড়ি প্রায় জাপটে ধরে আড়াল থেকে দেখতে লাগলো। একটা সস্তা ফুটিফাটা ছাপানো ব্যাঘ্রচর্মের আসনে কালিধর কাপালিক বসে রয়েছে ধুনি জ্বালিয়ে। যজ্ঞ মতন কি একটা যেন হচ্ছে। সামনে একটা খুলি তোবড়ানো নরকঙ্কালের মাথা। সেদিকে তাকাতে বুকটা একটু ছাঁৎ করে উঠল যেন। তবে সেই ভয়টা খুব তাড়াতাড়িই সামলে নিতে পারলো। পাশে হাত জোড় করে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন কবিরাজ মশাইয়ের সহধর্মিণী ক্ষেন্তিমণি। চোখে জল। তার কাজের ঝি চণ্ডীবালা সঙ্গে এসেছে তবে একখানা বড়সড় গাছের ডাল দিয়ে মন্দিরের সামনেটা ঝাঁট দিতে লেগেছে। চণ্ডীবালার সবকিছু পরিষ্কার রাখবার বাতিক আছে। কোথাও একটুও আবর্জনা সহ্য করতে পারে না। তাছাড়া চল্লিশ বছরের অভ্যাস। কাপালিকের কাছে এসেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। ডুরে শাড়িটা গাছ কোমর করে বেঁধে নিবিষ্ট মনে কাজ করে যাচ্ছে। মাঝেমাঝে বিড়বিড় করে ছাগল চোরের বাপ বাপান্ত করছে। কবিরাজ গিন্নীর চোখ কিন্তু পড়ে আছে ধুনির আগুনের দিকে। কালিধর একটু একটু দুলছে আর গোল গোল করে জব্বর মাথা ঝাঁকাচ্ছে। তারপর অনেকক্ষণ হিং ক্রিং ইত্যাদি করে খালিহাতেই আগুনের একধার থেকে একচিমটে ছাই তুলে নিয়ে বাতাসে ছেড়ে দিলো। মুহূর্তে সেটা উড়ে গেলো। সেদিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠে কালিধর চ্যাঁচ্যাঁতে লাগলো- পুবদিকে পুবদিকে। মা তোর আদরের ধন আছে পুব দিকে যেখানে সূর্য্যি ঢোকে না। বলতে বলতে হেঁড়ে গলায় একখানা শ্যামাসংগীত গেয়ে উঠল এবং গাইতে গাইতেই ভেতরে চলে গেলো। কবিরাজ গিন্নী খানিকক্ষণ ওভাবেই বসে থেকে চোখ মুছে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেলেন। জায়গাটার হাল ফিরিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে চণ্ডীবালাও তার সঙ্গ নিল।
এই কালি কাপালিকেরও একটা ইতিহাস রয়েছে। আর সেটা অবলাকান্তর থেকে ভালো আর কেউ জানে না। কারন ছেলেবেলায় দুজনে একই স্কুলে এবং একই ক্লাসে পড়েছে। ভালো বন্ধুত্বও ছিল বলা যায়। কালির পড়াশোনার ইচ্ছে ছিল ষোল আনা। চেষ্টাও কম করত না। কিন্তু অঙ্ক বিষয়টা কিছুতেই তার নিরেট মাথায় ঢোকে নি। অঙ্কের মাস্টার পাঁচুগোপাল বাবুর কাছে মারও খেত বিস্তর। একদিন ক্লাস ফোরে সাতের নামতা না বলতে পাড়ায় পাঁচু গোপাল বাবু তাকে বেধড়ক মারেন। সেদিনই পড়ার বই রাখবার টিনের বাক্সটুকু সম্বল করে ঘর ছেড়ে বিবাগী হয় কালি।
তারপর তার আবির্ভাব হয় পাক্কা একত্রিশ বছর পরে। পরনে লাল চেলিবস্ত্র, মাথায় ছোপানো রক্ত চন্দনের তিলক, মুখ ভর্তি ছন্নছাড়া দাড়ি গোঁফ। রটে যায় গায়ের কালি হিমালয় থেকে দীক্ষা নিয়ে এসে কালিধর কাপালিক হয়ে এসেছে। এমনকি কয়েকজন মায়ের মূর্তির সঙ্গে তাকে কথা বলতেও দেখেছে। তারপর থেকে সে পুরনো কালীমন্দিরের এককোণে ডেরা বেঁধেছে। গ্রামের লোক মান্যি গণ্যি করে ,ভয়ও পায়। তাই মাঝে মাঝে এর ওর ক্ষেত পুকুর থেকে কলাটা মুলোটা ভেট হিসেবে জুটেই যায়। আজ যেমন কবিরাজ গিন্নীর নিয়ে আসা একটা মাঝারি মাপের বাঁশের ঝুড়ি থেকে কিছু সবুজ সবজি উঁকি দিচ্ছে।
শেকড়ে কামড় দেওয়ার পর থেকেই সাহসটা খানিক বেশি আর বুকটা অনেক চওড়া লাগছে অবলাকান্তর। কাপালিক বলে এতদিন কাছে আসবার সাহস পেতো না। কিন্তু আজ তার ইচ্ছে হল ভেতরে তার ছেলেবেলার বন্ধু কি করছে সেটা দেখবে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। মন্দিরটার পেছন দিকে ভাঙা ইটের স্তূপ বেয়ে তরতর করে উঠে গেলো অবলাকান্ত। কয়েকটা খসে যাওয়া ইটের ফাঁক দিয়ে ভেতরে উঁকি মারল। পায়ে বিছুটি জাতীয় কিছু লাগায় বড্ড কুটকুট করছে। পরোয়া করল না অবলাকান্ত। ভেতরে একটা উনুন জ্বলছে। মনে হয় ভাত টাত কিছু সেদ্ধ হচ্ছে একটা তোবড়ানো ডেকচিতে। কালিধর ঘরে ঢুকল। আবার বেরিয়ে কবিরাজ গিন্নীর আনা জিনিসপত্রগুলো একে একে তুলে এনে ভেতরে রাখল। তারপরের দৃশ্যটুকু দেখবার জন্য প্রস্তুত ছিল না অবলাকান্ত। দেখল কালিধর একটা জীর্ণ পুঁটুলির মধ্যে থেকে ততোধিক জীর্ণ কিছু ছেঁড়াখোঁড়া বই বের করে আনল। চিনতে পারলো অবলাকান্ত। সেই বইগুলো, যেগুলো সঙ্গে নিয়েই কালি বাড়ি থেকে পালিয়েছিল। এখনকার দোর্দণ্ডপ্রতাপ কাপালিক কালিধর সেই বইগুলো জড়িয়ে ধরে ভেউ ভেউ করে কাঁদছে। চোখে কাজল জাতীয় কিছু ছিল সেগুলো থেবড়ে একশা। চুলকুনির জ্বালায় নেমে এলো অবলাকান্ত। ভাবল সেই ছেলেবেলার অঙ্ক না শেখার দুঃখ তাহলে কালি এখনো ভুলতে পারে নি। ঠিক করে ফেলল কালিকে পরে কখনো নিয়ম করে এসে অঙ্ক শিখিয়ে যাবে। বাল্যবন্ধুকে এভাবে দেখে আবার মনটা ভারি হল অবলাকান্তর। এই মনের ফাঁদে পড়েই ছোটবেলা থেকে তার আর কিছু করে ওঠা হল না। তার মনটা যেন কেমন হাওয়া দেওয়া বেলুনের মত। কখনো এদিক ওড়ে, কখনো ওদিক। আবার কখনো চুপসে যায় ইচ্ছে মত। স্থায়ী হয়ে একটা কিছু ভাববে সেটা কি আর হওয়ার জো আছে।
হঠাৎ বিশেকে দেখে সাঁৎ করে আড়ালে চলে গেলো অবলাকান্ত। ছোটবেলায় প্রচুর লুকোচুরি খেলেছে, এখন সেই বিদ্যে কাজে লাগছে। গোয়েন্দাগিরির ম্যানুয়ালে এই খেলাটা বাধ্যতামূলক রাখা উচিৎ বলে বোধ হল তার। তারপর আড়াল রেখেই অনুসরণ করতে লাগলো।

পরের পর্ব ষষ্ঠ পর্ব

 

অবলাকান্তর দপ্তর… পঞ্চম পর্ব
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments