আগের পর্ব প্রথম পর্ব দ্বিতীয় পর্ব তৃতীয় পর্ব চতুর্থ পর্ব পঞ্চম পর্ব

এই বিশে কেষ্টার ডান হাত। ভালো ফুটবল খেলত; এখন তাস পেটা ছাড়া কিছুই করে না। কালীমন্দিরের থেকে খানিকটা দূরে শ্মশানের সীমানা যেখানে শুরু হয়েছে সেখানেই ওদের আড্ডার ঠেকে এসে পৌঁছেছে বিশে। কেষ্টা ছাড়াও জনা চারেক উঠতি ছোকরা সেখানে উপস্থিত। শেকড়ের দৌলতে কানটা দিব্বি কাজ করছে। কিন্তু ওরাও ভীষণ ফিসফিসিয়ে কথা বলছে। এতো গোপনীয়তা কিসের ভাবে অবলাকান্ত। তবে “পিকনিক” আর “রাত” কথাটা কানে এলো বেশ কয়েকবার। তাহলে তার আশঙ্কাই সত্যি। কিন্তু কোন প্রমাণ নেই যে এরাই চোর। লোপাট করে গোপনে কোথাও চোরাই মাল রাখা আছে তাহলে। কিন্তু “রাত” কথাটা এতবার শুনেও তার বোধগম্য হল না। গ্রামের রাত বলতে তো খুবজোর সন্ধ্যে সাতটা। তারপর রাত কি বা কেন সেটা কেউ বেরিয়ে দেখতে যায় না। তাছাড়া রাত বাড়লে তেনারাও বেরোন শুনেছে সে। এত গাছগাছালি আর জলাশয়। দু চারটে বেহ্মদত্তি আর মেছো ভূত থাকাটা একটুও অসম্ভব নয়। ভূত না দেখলেও ভুতে ভারি ভয় অবলাকান্তর। এসব ভাবতে গিয়েই সর্দিটা আরও চেপে ধরল। জোরে একটা হ্যাঁচ্চো দিতে গিয়েও সেটা চেপে রেখে ধীরে ধীরে পালিয়ে এলো সে।

ততক্ষনে বেলা দ্বিপ্রহর। বুড়ির বাড়িতে পেট পুরে মুড়ি আর নাড়ু খেয়ে এসে এখনো অবলাকান্তর পেট বেশ শান্ত। ফেরার পথে দেখল যে গ্রামের সালিশি সভা বসেছে। গ্রামের মাথারা আর বয়োজ্যেষ্ঠরা সব আছেন। সে এসেছে তাতে কেউ তেমন গা করল না।অবলাকান্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলো। বাজারের সবচেয়ে বড় মুদির দোকানের মালিক হারাধন শিল মধ্যমণি হয়ে আছেন। উপস্থিত বুদ্ধিতে একটু খাটো হলেও ব্যবসায় চৌকস। এসব সভায় কিছু বলার সুযোগ তিনি পারতপক্ষে হারান না। তিনি বলতে লাগলেন
আমাদের হারান কে পাঁচ গায়ের লোক শ্রদ্ধা করে। তার ওপর আক্রোশ কার হতে পারে? তাছাড়া ওই ছাগল তো গ্রামের হাটে বিক্রি করাও যাবে না। কেউ না কেউ দেখেই ফেলবে।
দু একজন মাথা নাড়ল। কিন্তু ,অনেকদিন আগে দোকানে বাকি দেওয়া নিয়ে হারাধন শিল রাধু মুখুজ্জেকে বেশ দু কথা শুনিয়েছিল।তারপর থেকে রাধু মুখুজ্জে হারাধনের ওপর খাপ্পা। নস্যি নেওয়া শেষ করে টিপ্পনী কাটলেন
রাগটা হারানের ওপর না হারানের ছাগলটার ওপর সেটা আগে ভাবো হে হারাধন। সারাদিন মুদির দোকান করে কি আর ভাবনার সময় পাওয়া যায়। চাল ডাল তেল নুনের হিসেব কষে আর জায়গা আছে মাথায় ?
হারাধন শিল রেগে গেলেও ভঙ্গিতে প্রকাশ হতে দিলেন না। তবে খোঁচাটা বহাল রইলো।
আসলে সারাদিন নস্যি নিয়ে না ঘুমোলে তো ঠিক ভাবা যায় না। এই আর কি। কেউ খেটে খায়, কেউ নাকে তেল দিয়ে…
ঠাণ্ডা ঝগড়াটা জমাট বাঁধতে যাচ্ছিলো। এমন সময় ইন্দ্রকুমার দুহাত তুলে গম্ভীর কণ্ঠে একটা হুম করলেন। সবাই চুপ করে গেলো। হাতের ছিপটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে গলাটা যথাসম্ভব উচুতে তুলে বললেন
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের গায়ে চুরি হয়েছে। পারিবারিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে। এবার সেই চোর কে হাতেনাতে খুঁজে বের না করলেই নয়।
হারাধন বলে ফেললেন
একদম তাই। তাহলে তো চোরকে আগে খুঁজে বের করতে হয়। তারপর সে যখন চুরি করবে…
রাধু মুখুজ্জে খুক খুক করে হাসলেন না কাশলেন বোঝা গেলো না। বটকেষ্ট পাশে হাঁ করে বোধ হয় মাড়িটাকেই আবার খেলাচ্ছিলেন।বললেন
বলি ও নগেন, জাল ফেলে আমার দাঁতটা তুলে আনতে পারছ না তোমার দীঘি থেকে
সবাই মন দিয়ে শুনলেও ফোকলা দাঁতের মধ্যে অবিরাম হাওয়ার আসা যাওয়াতে পুরোটা বুঝতে পারলো না।
তবুও বন্ধুর মন রাখার জন্য নগেন মুখজ্জে তাকে সায় দিলেন
তা ঠিকই বলেছ ভায়া। চোর ধরতে গেলে আগে সাঁতার জানা জরুরি।
বটকেষ্ট এবার তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন
সাঁতার জেনে কি করবে তুমি কিপটে বামুন। আমার বাঁধানো দাঁতটা কবে জাল ফেলে তুলে দেবে সেটা জানতে চাই।
নগেন মুখুজ্জে এতক্ষনে ব্যাপারটা ধরতে পেরেছেন। তেড়েফুঁড়ে উঠলেন তিনিও
হ্যাঁ তোমার একপাটি দাঁতের জন্য দীঘির সব মাছ তুলে ফেলি আর কি। ইয়ার্কি পেয়েছেন। কিপটে আমি। তুমি তো নও। সেটা ভেবেই খুশি থাকো না ! কোন সত্যযুগে সাঁতরাতে। এখনো জলকেলির সখ গেলো না।
বটকেষ্ট ছড়ি বাগিয়ে এগোতে যাচ্ছিলেন। আবার ইন্দ্রকুমার এসে বাগড়া দিলেন।
বটকেষ্ট বাবু, অনেক মহত্তর উদ্দেশ্যর জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়। আজ আমাদের গ্রামের ঘর থেকে ছাগল চুরি হয়েছে। কাল গরু চুরি হবে। পরশু ছেলে চুরি হবে। তরশু…
তাকেও থামতে হল। কারন নিবারন সামন্ত এসে গেছেন
তরশু কি হবে জানি না। আমাদের আজ থেকেই পাহারা বসাতে হবে রাতে। না না সন্ধ্যা থেকেই। আর আপনাদের সুরক্ষার দায়িত্ব আমার। রোজ পুরো গ্রাম টহল দেবো। একটা মাছিও চোখ এড়িয়ে গ্রামে ঢুকতে পাবে না। চোর একজন আসুক বা এক ঝাঁক সবাই মিলে সামলে নেওয়া যাবে। মনে রাখবেন পৃথিবীর মানুষের জন্য কিছু করাতেই মহত্ত্ব। একলা বেঁচে থাকায় নয়…
একসাথে এতো কথা বলে কাশতে লাগলেন নিবারন সামন্ত। কিন্তু ফেলে দেওয়ার মত কিছু বলেন নি এটাও ঠিক। তবুও সবাই দোনামনা করতে লাগলো। এই শীতের রাতে বুড়ো বয়েসে পাহারা দিতে কারই বা ইচ্ছে করে। তবুও অবস্থার গুরুত্ব বুঝে নিবারন মণ্ডলের ইচ্ছেরই জিত হল। স্থির হল আজ নয়, আগামীকাল থেকে সন্ধেবেলায় পালা করে পাহারা দেওয়া হাবে। মিটিং ভাঙল। সবাই বাড়ির পথ ধরল। কালোদিঘির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অবলাকান্ত দেখল বটকেষ্ট আগে বেরিয়ে এসে দীঘির জলে পা ডুবিয়ে বসে আছেন। অদ্ভুত মানুষ বটে।

পরের পর্ব সপ্তম পর্ব

 

অবলাকান্তর দপ্তর… ষষ্ঠ পর্ব
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments