আগের পর্ব প্রথম পর্ব দ্বিতীয় পর্ব তৃতীয় পর্ব চতুর্থ পর্ব পঞ্চম পর্ব ষষ্ঠ পর্ব

বাড়ি এসে একটু চা খাবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু দাশু কোথাও নেই। এই ছেলেটা হঠাৎ হঠাৎ জলে জঙ্গলে বাঁশি বাজাতে গিয়ে উধাও হয়ে যায়। তাই মাঝে মাঝেই পাওয়া যায় না। তবে বাজায় যে বেশ সুরেলা এটা স্বীকার করে অবলাকান্ত। যেমন রাঁধে, তেমনি সুরের দমক। এক গ্লাস লাল চা বানিয়ে আধশোয়া হয়ে ভাবতে চেষ্টা করল অবলাকান্ত। গোয়েন্দারা ভাবনার সময় সিগারেট খান। সেও চেষ্টা করেছে। কিন্তু ওসব খেতে তার একদম ভালো লাগে নি। তার চেয়ে জানালার বাইরে তাকালে মনটা স্বচ্ছ হয়ে যায়। সবকিছুর গভীরে দেখতে পায় যেন। সে ঠিক করে নিল আজ রাতটা জেগে থাকবে। যদি কিছু হয়। কাল থেকে তো পাহারা বসবে। সে কথা গ্রামে সবাই এতক্ষনে জেনে গেছে। তাই কিছু হলে সেটা আজকেই। দাশুকে দেখল দরজা ঠেলে উঁকি দিতে। কটমট করে তাকাতে মুখটা সরে গেল।অবলাকান্ত একটা বালিশ আঁকড়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল। রাত জাগতে হবে। গ্রামে এখনো সব ঘরে ইলেকট্রিক নেই। লণ্ঠন জ্বলে। তাছাড়া রেড়ির তেলের সলতে ভেজানো প্রদীপ জ্বলে সন্ধ্যে হলেই। তাই পুরো গ্রামটায় রাত নামলেই অন্ধকার গিলে খেতে আসে। তবে আজ ভাগ্যটা ভালো। পূর্ণিমা ছিল গত পরশু। তাই খানিকটা আলো রেখে গেছে আকাশে। নিরীহ ছাগলটার কথা ভেবে খারাপ লাগছে অবলাকান্তর। মাংস তার অতি প্রিয় খাদ্য। কিন্তু এখন আর সে দিন তো নেই। কালেভদ্রে কারো বাড়ির নিমন্ত্রণ হলে জোটে আর কি। কিন্তু কবিরাজ মশাইয়ের আদরের চাঁদনী তার মাথায় ঘুরপাক খেয়েই চলেছে। ঘুম থেকে উঠে সন্ধ্যে থেকেই কানটাও বাজছে মনে হয়। থেকে থেকে চাঁদনির আওয়াজ যেন কানের পর্দায় আঘাত করছে। কিন্তু ছাগলটা তো বোবা। ডাক ছাড়ে না মোটেও। সত্যি অবলাকান্ত দিনে দিনে ক্যাবলাকান্তই হয়ে যাচ্ছে। চিন্তাগুলো এভাবে কায়ামূর্তি ধারণ করতে পারে জানা ছিল না। কানের বারোটা বেজে গেছে একেবারে। সব মনের ভুল। দু কানে তুলো গোঁজে সে। তারপর দাড়ি আঁচড়ে জানালার ধারে গিয়ে বসে। এই জানালাটা থেকে গ্রামের অনেকটা দেখা যায়। অভ্যাস নেই তবুও প্রাণপণে জেগে থাকার চেষ্টা করছিল অবলাকান্ত। এভাবে বসে থাকতে থাকতেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। দেওয়াল ঘড়িতে বারোটার ঘণ্টা বাজলো। পুরো গ্রাম ঘুমিয়ে কাদা। হঠাৎ চটকা ভেঙ্গে জানালার বাইরে কয়েকটা আলো দেখতে পেলো অবলাকান্ত। আলোগুলো ঘুরছে কালদিঘির সামনে। কিছুক্ষণ ঠাহর করেও কিছু বুঝতে পারলো না। দাশুকে ডেকে কাজ নেই। হাঁক ডাক করে সব নষ্ট করে দেবে। খানিক সাহস জোগাড় করে রাম রাম বলতে বলতে একটা লাঠি নিয়ে রওয়ানা হল সেদিকে। গা ছমছম করছে। নাক বন্ধ।সর্দিতে মাথাটা ধরে রয়েছে। ঝোপঝাড়ের আড়ালে আড়ালে হাঁটতে লাগলো অবলাকান্ত। কালদিঘির ধারে তিন চারটে ছায়া মূর্তি ঘোরাঘুরি করছে। চাঁদটাও সুযোগ বুঝে মেঘের আড়ালে ডুবেছে । “কে র‍্যা” বলে কাঁপা কাঁপা গলায় হাঁক দিতে গেলো অবলাকান্ত। ভয় আর সর্দি মিলিয়ে নাকি গলায় যে আর্তনাদটা বেরোলো সেটা শুনতে সে নিজেই তৈরি ছিল না। ফাঁকা এলাকায় প্রতিধ্বনি শুনে সে নিজেই ভয় পেয়ে জড়সড় হয়ে গেলো। হঠাৎ করে একটা হুটোপাটির আওয়াজ। কতোগুলো পা দৌড়ে পালাচ্ছে মনে হল। কি একটা যেন গায়ে এসে লাগলো। হাতড়ে দেখল পিছল মত কিছু। তারপরই ধারালো কি একটা এসে কপালের বাঁ দিকে লাগলো। অবলাকান্ত অনেকক্ষণ সাহসীর অভিনয় করেছে। আর পারলো না। মেছো ভুতই তাকে নির্ঘাত কামড়ে দিতে এসেছে। যুক্তি টুক্তি বিসর্জন দিয়ে অ্যাঁ অ্যাঁ করে অজ্ঞান হয়ে গেলো সে।. যখন সম্বিৎ ফিরল, ভোরের আলো ফুটে গেছে। একটা আঁশটে গন্ধ সারা গায়ে। এতক্ষণ নাক বন্ধ থাকায় বোঝে নি। ধড়মড় করে উঠে বসতে গিয়ে কপালের বাম পাশটা চিনচিন করে উঠল। এদিক ওদিক তাকাতেই আবিষ্কার করল অনতিদূরেই একখানা হুমদো মত বেড়াল মাঝারি আকারের একটা পোনা মাছ নিয়ে টানাটানি করছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের যেটা সেটা হল বগলের নিচেই একটা দাঁতের পাটি হাঁ করে রয়েছে। এবার ধীরে ধীরে গতরাতের কথা মনে পড়ল সব। ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়াতে লজ্জাও বোধ হল। তার মানে গতকাল রাতে কেউ বা কারা কালদিঘি থেকে মাছ চুরি করতে এসেছিল। তার আওয়াজ শুনে ভড়কে গিয়ে এসব ছুঁড়ে দিয়ে পালিয়েছে। দাঁতের পাটিটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আবার ভালো লাগতে লাগলো তার। কপালের ব্যথা চাগাড় দিয়ে উঠলেও ওটা দেখলেই প্রলেপের কাজ করল। বুড়ো মানুষটাকে খুশি করা যাবে। কিন্তু মাথা থেকে ছাগলের ডাকটা যে কিছুতেই যাচ্ছে না। চোখ বন্ধ করলেও কোন লাভ হচ্ছে না। এতো ছাগলের ডাক শুনে নিজেকেই কেমন ছাগল ছাগল মনে হতে লাগলো তার। পেছন দিকে একবার তাকিয়ে আড়চোখে দেখেও নিলো লেজ টেজ গজিয়েছে কিনা। বাগান থেকে বেরিয়ে দূরে একটা গাছতলায় হেলান দিয়ে বসে গত রাতের কথা ভাবতে লাগলো। দাশুকে দেখা গেলো একখানা রামদা নিয়ে কাঁঠালগাছের পাতা কেটে পরিষ্কার করছে। দেখে ভালো লাগলো অবলাকান্তর। বাগানটা পরিষ্কার হলে মোক্ষদা বুড়ির মত বেশ শাক সবজি ফলানো যেতে পারে। রোজ এই পুকুরের চুনোমাছ আর বন বাদাড়ের ঢেঁকিশাক খেতে খেতে অরুচি ধরে গেছে। দাশু ভালো রাঁধে বটে কিন্তু কিছু না পেলে বেচারারই বা কি করার থাকতে পারে। বাবা মাও কিছু না রাখতে পেরে হুট করে চলে গেলেন। এসব ভাবলেই জিভের নিচটা কেমন উচ্ছে চেবানোর মত তিতকুটে লাগে। কিন্তু এই মুহূর্তে ছাগলের আওয়াজটা কানে বাজলেও বেশ মৃদু। দুর্বল শরীর। বেশি পরিশ্রম সয় না। গাছের নিচেই ঘুমিয়ে পড়ল অবলাকান্ত। দাশু একগোছা পাতাসহ গাছের ডাল টানতে টানতে অবলাকান্তর সামনে এসে কিছু বলতে গেলো। তারপর তাকে ঘুমন্ত দেখে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। একটু পরে দাশুকে দেখা গেলো বাঁশি হাতে জঙ্গলের দিকে যেতে।

পরের পর্ব অষ্টম পর্ব

 

অবলাকান্তর দপ্তর… সপ্তম পর্ব
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments