গ্রাম গঞ্জে শীত একটু বেশিই পড়ে। চারিদিক ফাঁকা ফাঁকা। বাতাস আসা যাওয়ার অঢেল রাস্তা। নীল আকাশটা সবসময় ঝকঝকে পরিষ্কার থাকে। আর সূর্যের আলো যখন ঝিকিয়ে পড়ে, পুকুরের জল যেন স্বচ্ছ আয়নার মত দ্যাখায়। তার সাথে গায়ে আলপিন ফোটানো হাওয়া তো আছেই। দাড়িটা একদফা চুলকে নিয়ে একটা ছুঁচে সুতো পরাবার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল অবলাকান্ত। সে বড় আপনভোলা মানুষ। চার দেওয়ালে মন টেকে না। তাই থেকে থেকেই জানালার বাইরে চোখ চলে যাচ্ছিলো আর সুতো ঢোকাতে ভুল হয়ে যাচ্ছিলো। এই নিয়ে গত পরশু থেকে সাত বারের বার এই আলোয়ানটাই সেলাই করতে বসেছে সে। কিন্তু, কোন এক দুর্জ্ঞেয় কারণে কখনই কাজটা করে ওঠা হয় নি। যে গ্রামের কথা আমি বলছি তেমন গ্রাম আমাদের বাংলায় অনেক রয়েছে। বসতি বলতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মাত্র গোটা পঞ্চাশেক ঘর । সভ্যতার ছোঁয়াচ বলতে কিছু পাকা দেওয়াল আর খান দুই সাদা কালো টেলিভিশন। বেশীর ভাগ ঘরই মাটির। খুব বেশি হলে টালির ছাউনি দেওয়া। কাজ চলে যাওয়ার মত দোকান পাট। রবিবার দিন করে নাম কা ওয়াস্তে একটা হাট বসে। আশেপাশের গাঁয়ের লোকজন আসে। সামান্য বিক্রি-বাট্টাও হয়-টয়। আসলে চলাচলের মধ্যে বড়লোকি ধাঁচটা এখনো ঢোকেনি। কাছাকাছি যাতায়াতের মাধ্যম বলতে পনেরো কিলোমিটার দূরে একটা অখ্যাত রেল ষ্টেশন। সেখানকার টিকিটঘরটাও সাধারনত বন্ধই থাকে। কারণ গ্রামের লোক খুব একটা বাইরে যায় না বা বাইরে থেকেও লোকজন প্রায় আসে না বললেই চলে। গ্রামের লোক নিজের নিজের ক্ষেতেই সবজি ফলায়। আসে পাশের অনেক পুকুর থাকায় অন্তত ছোট মাছের অভাব নেই। এবার বরং নামটা বলি। গ্রামের নাম হিজলগঞ্জ । এহেন হিজলগঞ্জে ক্লাবও আছে একটা। নাম আকাশবাণী সঙ্ঘ। এই আকাশবাণী নামটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর-প্রাপ্ত নয়। আসলে ক্লাবের আদৌ কোন নামই নেই। ক্লাবে সারাদিন তারস্বরে রেডিও বাজে বলেই গ্রামের লোক এই নাম দিয়ে রেখেছে । আকাশবাণী ক্লাবের ছেলেরাই মাঝে মাঝে শহর থেকে প্রোজেক্টর ভাড়া করে সিনেমা দ্যাখায় বা যাত্রা টাত্রা নিয়ে আসে। বাকি সময় তাস খেলে,ক্যারাম পেটায় আর গ্রামময় দৌরাত্ম্য করে বেড়ায়। তবে অবলকান্তর এসব তুচ্ছ ব্যাপার স্যাপার নিয়ে মাথাব্যথা বড় একটা নেই। তার পূর্বপুরুষ এককালে হিজলগঞ্জ এবং তার আশেপাশের গ্রামগুলোর জমিদার ছিলেন। সে রাজাও নেই, সে রাজ্যও নেই। পড়ে আছে একখানা বিশাল ভিটে বাড়ি আর লাগোয়া বেশ কিছু জমি পুকুর ইত্যাদি। খাজনার প্রথা তো সেই কোন কোম্পানির আমলেই উঠে গিয়েছে। তাই বাড়িটার বেশীর ভাগই এখন ধ্বংসস্তূপ বললে ভুল বলা হবে না। পুকুর ব্যবহার না হলে বা নিয়মিত পরিষ্কার না করলে শীতকালে ঘাস জন্মায়, বর্ষায় কচুরিপানায় ছেয়ে যায়। তাই একখানা পুকুর ছাড়া বাকিগুলো পানায় মজে গিয়ে এখন পাঁকালমাছের থাকারও উপযুক্ত নয়। সেই বাড়ির কয়েকটা ঘর সাফ সুতরো করে আছে অবলাকান্ত। সে লেখাপড়া ছেড়েছিল এগারো ক্লাস পড়ে। জন্ম থেকে শরীর দুর্বল। তাই অভাবের মধ্যেও আদর যত্নে মানুষ হয়েছে আর ছোট থেকেই গুচ্ছের গল্প বই গিলেছে। এখন অবশ্য মুখে ঝুপো ঝুপো দাড়ি গোঁফ। চুলও কালে ভদ্রে আঁচড়ায়। তবু জমিদার রক্ত। দেখতে শুনতে মন্দ নয়। দাড়ি গোঁফের জঙ্গলের মাঝে মনটা এখনো শিশুর মত। পুরনো জমিদারীর দেমাক নেই বলে গ্রামের লোকজনও বেশ ভালবাসে তাকে। পিতা মাতা গত হয়েছেন সেই বছর দশেক হল। তারপর থেকে তার চাকর কাম অভিভাবক কাম বন্ধু দাশু তাকে আগলে রেখেছে। দাশু নামটা অবশ্য অবলাকান্তরই দেওয়া। অবলার থেকে খানিক ছোটই হবে বয়েসে। কিন্তু টুকটাক রান্না বান্না আর ঘরের কাজে বেশ চৌকস। নেশা বলতে একখানা বাঁশের বাঁশি বাজানো। তায় আবার সে সাধারণত বাজায় না। যখন তখন একলা নির্জনে চলে যায় বাজাতে। অবসর সময় দুজনে মিলে একটা পুরনো রেডিও শোনে। কখনো সখনো অবলা দাশুকে গল্প উপন্যাস পড়ে শোনায়। অবলাকান্তর সখ গোয়েন্দা গল্পের দিকে। ফেলুদা, ব্যোমকেশ, কিরীটী ইত্যাদি হজম করে নিজেকেই পুরোদস্তুর গোয়েন্দা ভাবে সে। গোয়েন্দা হতে গেলে আবার একজন সহকারী ভীষণ জরুরি। তাই দাশুকেই মাঝে মাঝে সহকারী বানিয়ে বোলচাল ঝাড়ে অবলাকান্ত। দাশুও সেয়ানা ছেলে। জানে বাবু খেয়ালখুশি মত চলেন। চাইলে কামড়েও দিতে পারেন। তাই বেশি না ঘাঁটিয়ে চুপচাপ দেখে যায়। গল্প শুনে শুনে গোয়েন্দাগিরিতে তার বিদ্যাও নেহাত কম নয়। অবলাকান্ত একশো হলে দাশু পঞ্চাশ তো বটেই। তবে গ্রামে আর গোয়েন্দাগিরির উপযুক্ত ঘটনা কটা ঘটে ! এলাকায় ঝাল না থাকলেও হাল ছাড়ে না অবলাকান্ত। এ কাজে তার হাতেখড়ি অবশ্য হয়েই গেছে। রাধু পাকরাশীর নস্যির ডিবে খুঁজে দেওয়া। গ্রামের হিসেবে স্মরণীয় ঘটনা তো বটেই। গত শীতকালের কথা। পাকরাশী মশাই বাড়ির উঠোনে মাদুর পেতে আদুর গায়ে রোদে পিঠ দিয়ে দিবানিদ্রায় মগ্ন ছিলেন। মাদুরের একপাশেই রাখা ছিল তার সর্বক্ষণের সঙ্গী নস্যির ডিবেটি। দুষ্টু লোকে বলে ওই ডিবেটি নাকি রাধুবাবুর কাছে নিজের স্ত্রীর থেকেও বেশি প্রিয়। তা সেটাই যখন ভর দুপুরবেলায় নিমেষে বেপাত্তা হয়ে যায় তখন সেটা রহস্যজনক তো বটেই। নাওয়া খাওয়া এমনকি দুপুরের প্রিয় দিবানিদ্রার অলসতাটুকুও ত্যাগ করলেন তিনি। আবির্ভাব হল অবলাকান্তর। আশেপাশের অনেকের অনেকরকম জবানবন্দী নিয়েও অপরাধীর এই তুচ্ছ ডিবেটা নিয়ে মাথাব্যথার কারণ খুঁজে পায় নি সে। পাকরাশী গিন্নী তো ঝাঁটা নিয়ে তাড়াও করেছিলেন। সব প্রতিবন্ধকতা টপকে শেষে দাশুর পরামর্শেই খুঁজে দিতে পেরেছিল সেটা। সামনের গাছের একটা ফিঙ্গেপাখীকে ঠোঁটে করে খড়কুটো পোকামাকড় নিয়ে যেতে দেখে জানায় তাকে দাশু আর তৎক্ষণাৎ আসামিকে চিহ্নিত করে অবলাকান্ত। শুধু সেটা উদ্ধার করতে পুরনো ছাতিম গাছটায় হ্যাঁচর প্যাঁচর করে উঠতে হয়েছিলো এবং আসামী ফিঙ্গে পাখীর বেশ কিছু ঠোক্কর বেমালুম হজম করতে হয়েছিলো। খানিকটা পাঞ্জাবী গাছের ডালে এবং গাছের গুঁড়ির শরীরে রেখে এসে বিজয়ীর মত যখন ডিবে নিয়ে নেমেছে তখন গাছের নীচে সারা গ্রামের ভিড় জমে গেছে। কেসটার ফয়সালা করেছিল সে কিন্তু তাকে ওই নাজেহাল অবস্থায় দেখে আকাশবাণী ক্লাবের ছেলেরা নাম দিয়েছিল ক্যাবলাকান্ত। আড়ালে আবডালে তার সেই নাম বহাল তবিয়তেই বজায় আছে।

পরের পর্ব দ্বিতীয় পর্ব

 

অবলাকান্তর দপ্তর … প্রথম পর্ব
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments