নিউট্রন-এর জন্মের আগে আমি অভিভাবকত্ব ব্যাপারটা নিয়ে অত বেশি মাথা ঘামাই নি, মাঝে মাঝেই আমার নিজের বাবামার উপর ঢের রাগ হত, মনে হত অনেক কিছু আমার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, অনেক কিছু অন্যভাবে করতে পারলে ভালো হত ইত্যাদি। কিন্তু নিজে মা হবার পর মনে হল বাবামারা যা করে, সেটা সন্তানের ভালোর জন্যেই, তাতে সর্বদা কতটা ভালো হয় জানি না, কিন্তু সব বাবামাই বোধ হয় চায় তার সন্তান পাক সমস্ত ভালো কিছু, হয়ে উঠুক ভালো মানুষ। যেমন আমি চাই নিউট্রন সত্যবাদী হবে, পরার্থপর না হোক অন্তত স্বার্থপর হবে না। কিন্তু দুদিন দুটো ঘটনায় আমি নিজেই খুব গুলিয়ে গেলাম, আমি কি শিক্ষা দিতে গিয়ে ওকে স্বাভাবিকত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি?? জানি না এই লেখাটা কেউ পড়বে কিনা, যদি পড়েন আমি সত্যি মতবাদ জানতে চাই।।

১। মিথ্যা বনাম কল্পনা
ভালো মানুষ হওয়ার একটা দিক আমি মনে করি যথাসম্ভব মিথ্যা এড়িয়ে চলা। কিন্তু কল্পনা আর মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য ঠিক কতটা? নিউট্রন এখন আমি যা করি, সেটাই অনুকরণ করার চেস্টা করে, যেমন ঘর ঝাঁটা দেওয়া, জামাকাপড় কাচা, খাতায় হিজিবিজি কাটা ইত্যাদি। সেদিনকে দেখলাম ওকে আমি যে বোতল থেকে গ্লাসে জল ঢেলে দি, সে বোতলে কোন জল নেই; কিন্তু ও বোতল খুলছে, মিছিমিছি জল ঢালছে গ্লাসে আর আমাকে খেতে বলছে। আমি বলার চেষ্টা করলাম ‘জল নেই তো খাব কি করে?’ সে অত কিছু বুঝল না, আমাকে অনুরোধ করল জলটা খেয়ে নিতে। আমি মিছিমিছি জল খেয়ে গ্লাস ওকে ফিরত দিলাম, এরকম চার-পাঞ্চ বার করার পরে, মানে ওর যখন মনে হল আমার যথেষ্ট জল খাওয়া হয়ে গেছে, তখন ও বোতল বন্ধ করে জায়গায় রেখে দিল। প্রথমটা আমি বেশ আনন্দ পেলাম, ওর কল্পনা দেখে, যে জিনিষ নেই, তাও আমাকে দিব্য খাইয়ে দিল। কিন্তু তারপরেই মনের মধ্যে খুঁত খুঁত শুরু হল, এটা কি শুধু এক স্বপ্ন দর্শন শুরু হল, নাকি মিথ্যের সাথে পরিচয় হল ওর? নিজেই ভাবলাম, যদি মিথ্যেও হয়ে থাকে, ও তো কোন স্বার্থ নিয়ে করছে না, নিছক মজা করেই করেছে অর্থাৎ নির্দোষ মিথ্যে একখানা। তারপর আর কি, নিজেকেই নিজে বকুনি দিলাম ১৬ মাসের ছানাকে নিয়ে অত গবেষণা করে লাভ নেই বলে, কিন্তু মনের মধ্যে প্রশ্ন টা রয়েই গেছে। কল্পনা না করলে সৃষ্টিশীল হবে কি করে, তাই কল্পনা দরকার কিন্তু কল্পনার ফাঁক দিয়ে যদি মিথ্যা ঢুকে পড়ে তাকে এড়াই কি করে?পাঠক কি বলেন?

২।নিজের বনাম অন্যের
যদিও নিউট্রন আপাতদৃষ্টিতে নিজের এবং পরের সম্পত্তি বোঝার মত বড় হয়েছে বলে আমি মনে করি নি, কিন্তু দুটো ঘটনায় আমি একটু ঘাবড়েই গেলাম। প্রথম ঘটনা, সেদিন এক বন্ধুর বাড়ি আড্ডা মারতে গেছি, গিয়ে থেকে আমি একটি নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে ছিলাম, মাঝে আমি উঠে যাওয়াতে অন্য একজন সেই চেয়ারে বসতে গেছিল, সেটি নিউট্রনের এক্কেরে পছন্দ হয়নি, হাউকাউ করে তাকে উঠিয়ে ছেড়েছে, তারপর আমি সেখানে বসতে তার ফুর্তি আর ধরে না, আমার সামনে এসে হাততালি দিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচানাচি। সবাই মজা করে মন্তব্য করল “তুই তো খুব ট্রেনিং দিয়ে এনেছিস, ছেলে এসে মায়ের জন্যে ইন্ট পাতছে!!!”। যদিও মজা করে বলা, তবুও ভাবলাম না শেখাতেই ১৬ মাসের ছেলের মাথায় দিব্য ঢুকেছে তো মায়ের সম্পত্তি আগলানোর ব্যাপারখানা! দ্বিতীয় ঘটনা, বাজার থেকে সরাসরি পার্কে চলে গেছি সেদিন, কাঁধের ঝোলাটা মাঠের এককোণে রেখে অন্যদিকে গিয়ে বসে আছি, নিউট্রন খেলছে বন্ধুদের সাথে, আমিও যোগ দিচ্ছি। খেলতে খেলতে নিউট্রন সেই এককোণে রাখা ব্যাগটার কাছে গিয়ে উপস্থিত। তারপর খেলা ভুলে ভারী ব্যাগটাকে মাটিতে ঘষে ঘষে আমার কাছে নিয়ে এসে খুব একচোট হাউমাউ করল। ভাবখানা দেখে মনে হল, যেখানে সেখানে ব্যাগ ফেলে রাখার কারণে আমার উপরে খুবই বিরক্ত এবং কি করে শাসন করবে বুঝে উঠতে পারছে না। আমি অবাক হলাম। ‘নিজের জিনিষ’ এটা তো আমি কখনো শেখাইনি নাকি শিখিয়েছি? যখন অন্যদের খেলনাতে হাত দিয়েছে, গম্ভীর মুখে বলেছি, এটা ঐ দাদাটার খেলনা, ওকে দিয়ে দাও। কিম্বা যখন পার্ক থেকে ফেরার সময় হয়েছে, ওকে বলেছি যাও তোমার বোতল নিয়ে এস। এসব থেকেই কি শিখেছে কোনটা নিজের, কোনটা পরের? আমি কি কিছু ভুল করেছি নাকি এটাই স্বাভাবিক? পাঠক কি বলেন? যাকগে শিখুক আপত্তি নেই, শুধু একটাই প্রার্থনা, যেন স্বার্থপর না হয়।

অভিভাবকত্বের ডিলেমা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments