– “এই একটু শুনবে।”

ল্যাপটপটা থেকে মুখ না তুলে তমাল আনমনে উত্তর দিল, “হু।” ওর যাবতীয় মনোযোগ তখন সামনে খোলা পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনটায়। কালকে সকাল সাড়ে নটাতে ক্লায়েন্টের সাথে জরুরী মিটিংটায় তাকে এই রিপোর্টটা প্রেজেন্ট করতে হবে। তাই শুতে যাবার আগে একবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল যাতে কালকে কিউ অ্যান্ড এ সেশনে সব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারে।

একটু অপেক্ষা করে সায়নী আবার ডাকল, “এই শোনো না গো একবার!”

এবার ল্যাপটপটা থেকে মুখ সরিয়ে বউয়ের দিকে ফিরল তমাল, “হ্যাঁ, বল।”

– “জানো, বুবাই না আবার ওই ছেলেটার কথা বলেছে।” সায়নীর গলায় চাপা উদ্বেগ।

অবাক হয়ে গেল তমাল, “কে বলেছে?”

– “আরে আমাদের বুবাই! তোমার ছেলে।”

তমালের চোখে একটা তীব্র হতাশার ছায়া ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। একটু সময় নিয়ে বলল, “সায়নী, তোমাকে কতবার বলেছি…”

তমাল শেষ করার আগেই বলে উঠল সায়নী, “হ্যাঁ, আমি জানি কাজের সময় কথা বললে তোমার রাগ হয়। কিন্তু প্লীজ একটু শোনো। আমি বেশীক্ষণ সময় নেব না।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তমাল বলল, “কিন্তু…এনিওয়ে। বল, কি বলছিলে।”

বড় বড় চোখদুটো মেলে বলল সায়নী, “তোমাকে কয়েকদিন আগে বলেছিলাম না, বুবাই একদিন আমাকে বলছিল একটা ছেলে নাকি রোজ রাতে ওর কাছে আসে, গল্প করে। ও খালি দেখতে পায়। আমরা কেউ দেখতে পাই না। মনে নেই তোমার?”

কিছুক্ষণ গুম হয়ে থেকে জবাব দিল তমাল, “হুম, মনে আছে।”

– “জানো আজকেও বুবাই আবার এরকম কথা বলল। আমি একটু আগে গেছিলাম ওকে গুড নাইট বলতে, ঘরে ঢোকার সময় শুনি ও জানি কার সাথে কথা বলছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘একা একা কার সাথে কথা বলছিস?’ তখন ও আমাকে ওর স্টাডি টেবিলের সাথের চেয়ারটার দিকে দেখিয়ে বলল, ‘ওই তো! ওর সাথে।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কি বলছিস! ওখানে তো কেউই নেই।’ তখন বুবাই বলল, ‘আছে মাম্মা! তোমরা ওকে দেখতে পাও না। কিন্তু আমি পাই।’ জানো, আমার সারা গা কেঁপে উঠল। আমি বুবাইকে বললাম, ‘তোকে আজ আর একা শুতে হবে না। আমাদের সাথে শুবি আয়।’ কিন্তু ও রাজী হল না। শোনো না, আমার না খুব ভয় করছে।”

চুপ চাপ পুরোটা শুনল তমাল। তারপরে ধীরে ধীরে বলল, “সায়নী, শোনো…”

আবার বরের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলল সায়নী, “হ্যাঁ, আমি জানি তুমি বলবে, ওসব নাকি বাচ্চাদের কল্পনা। এগুলো সব মনের ভুল ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কিন্তু সত্যি খুব ভয় পেয়ে গেছি। এইটুকু ছেলে সবে আটে পড়ল, এরকম কথা কেন বলবে বল? তাও একবার দুবার নয় বার বার? না না তুমি প্লীজ কৌশিকদার সাথে এটা নিয়ে একবার কথা বল।”

কৌশিক তমালের ছোটবেলার বন্ধু। নামকরা সাইক্যাট্রিস্ট। ক্লাস টুয়েলভ অব্দি একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে জয়েন্ট এনট্রান্স দিয়ে দুজনের পথ আলাদা হয়েছে। একজন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছে, আরেকজন ডাক্তারি। কিন্তু কাছাকাছি বাড়ি হওয়ায় বন্ধুত্বটা এখনও আগের মতই জোরদার রয়ে গেছে।

সায়নীর দিকে একবার ভাল করে তাকাল তমাল। ওর চোখদুটো দেখে মনে হল সত্যিই খুব ভয় পেয়ে আছে। বউয়ের করুণ মুখটা দেখে কি একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল সে। হাত বাড়িয়ে সায়নীকে কাছে টেনে নিল। সায়নীও যেন বরের কাঁধের নিরাপদ আশ্রয়ে মাথা গুঁজে একটু শান্তি পেল। অন্য হাতে সায়নীর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল তমাল, “ঠিক আছে, তুমি চিন্তা কর না, আমি কথা বলব কৌশিকের সাথে। নিশ্চয়ই কথা বলব।”

এতক্ষণে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সায়নী। কিছুক্ষণ পর অস্ফুটে বলল, “তুমি কি এখন কাজ করবে?”

– “হুমম, এই জাস্ট আর আধ ঘণ্টা। তুমি বরং শুয়ে পড়। আলোটা নিভিয়ে দিতে পার। আমার অসুবিধা হবে না। আমি রীডিং লাইটটা জ্বালিয়ে নেব।”

– “না, আলোটা জ্বালানোই থাক। আমার ভয় করছে।”

এক দুই মুহূর্ত কি যেন ভাবল তমাল। তারপর ল্যাপটপটা লক করে দিয়ে বলল, “ঠিক আছে, চল আমি তোমাকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ঘুম পাড়িয়ে দিই। তুমি ঘুমিয়ে পড়লে আমি বাকী কাজটা করে নেব। আর আজ শোবার আগে একটা অ্যাল্প্রাজোলাম খেয়ে নাও।”

বেশীক্ষণ নয়, মিনিট পনেরর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল সায়নী। ঘুমন্ত সায়নীকে দুচোখ ভরে কিছুক্ষণ দেখে আস্তে আস্তে শব্দ না করে উঠল তমাল। বেডসাইড টেবিলে একটা ফটোফ্রেমে ওদের তিনজনের একটা ফটো রাখা। বুবাই-এর সাত বছরের জন্মদিনে তোলা। ছবিটায় একবার আলতো হাত বুলিয়ে আদর করল তমাল। ল্যাপটপটা চালাতে গিয়ে কি একটা মনে করে আবার বন্ধ করে দিল। যা হবার কাল মিটিং-এ দেখা যাবে। এখন আর কাজে মন বসবে না। পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে একবার দেওয়াল ঘড়িতে চোখ রাখল। পৌনে এগারোটা বাজে। কৌশিক রাতে দেরীতে ঘুমোয়। এখনও কল করলে পাওয়া যাবে। ফোনটা কাল করলেও হত, কিন্তু যদি কাজের চাপে পরে মনে না থাকে। কিন্তু এঘর থেকে কথা বললে সায়নীর ঘুমের অসুবিধা হতে পারে। তাই সন্তর্পণে আলোটা নিভিয়ে দিয়ে বেডরুমের বাইরে বেরিয়ে এল তমাল। পাশেই আরেকটা বেডরুম। বুবাই-এর। নীলচে নাইটল্যাম্পের আলোয় ঘরের ভিতরটা উদ্ভাসিত। খোলা দরজাটা দিয়ে ঘরের ভিতরে একবার উঁকি মারল তমাল।

ছোট্ট ঘরখানা। ডানদিকে একটা সিঙ্গলবেড। মিকি মাউস আঁকা একটা বেডশীট পাতা। তার পাশেই বুবাই-এর স্টাডি টেবিল আর চেয়ার। বইখাতাগুলো সুন্দর করে সাজানো। তার পাশেই একটা বুকশেলফ। প্রচুর গল্পের বই থরে থরে রাখা তাতে। দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে বুবাই-এর ক্রিকেট ব্যাটটা রাখা। পাশেই একটা ফুটবল। অন্যদিকের দেওয়ালে একটা ওয়ার্ডরোব। ডোরেমনের ছবি আঁকা তাতে। মাথার ওপর ফ্যানটা বন বন করে ঘুরছে। সিলিং জোড়া চাঁদ আর অসংখ্য তারার ‘গ্লো ইন দ্য ডার্ক’ স্টিকারগুলো অন্ধকারে ঝকমক করছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ড্রয়িংরুমের সোফাটাতে গিয়ে বসে কৌশিকের নাম্বারটা ডায়াল করল তমাল। দু তিন বার রিং হতেই ফোনটা ধরল কৌশিক, “কি রে, এত রাতে। ইজ এভ্রিথিং অলরাইট?”

– “না রে।” বিষণ্ণ গলায় বলল তমাল, “তুই কাল সন্ধ্যেবেলা একবার আসতে পারবি? তোর সাথে কিছু কথা আছে।”

– “কেন কি হয়েছে? খুলে বল আমাকে।”

– “সমস্যাটা সায়নীকে নিয়ে। ও কিছুতেই মানতে পারছে না রে সত্যিটা। প্রায় ছমাস কেটে গেল অ্যাকসিডেন্টটার পরে। কিন্তু ও এখনও মনে প্রানে বিশ্বাস করে যে বুবাই বেঁচে আছে।”

 

সমাপ্ত

"এখন নৈঋত" ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত

অমূলপ্রত্যক্ষ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments