আমরা তখন ক্লাস ইলেভেনে। মাধ্যমিক পাশ করে সবে অদৃশ্য পাখনা গজাতে শুরু করেছে। স্কুলে পুজোর ছুটি পরেছে। কম খরচে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার একটা পরিকল্পনা আমাদের দু’চারজনের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কয়েকদিন ধরেই। কানুর মুখেই প্রথম শুনলাম অযোধ্যা পাহাড়ের কথা। কানুর বাবা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ইন্সপেক্টর ছিল। ওনার বছর দুয়েক পোস্টিং ছিল অযোধ্যা পাহাড়ের নিকটবর্তী জনপদ বাঘমুণ্ডিতে। ঠিক হল পুজোর পরেই আমরা যাব পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়। দলে জুটে গেল কানু ছাড়াও সিধু, গৌতম আর কৌশিকও। কিন্তু আসল সমস্যাটা হল আমাদের কারও বাড়িতেই আমাদের একা ছাড়তে রাজী হল না। অবশেষে সমস্যার সমাধান মিলল চন্দনদার কাছে। চন্দনদা আমাদের থেকে অনেকটাই বড়, মানে বছর দশেকের বড় তো হবেই। চন্দনদা ছিল আমাদের ফুটবল আর ক্রিকেট, দুই দলেরই অঘোষিত নেতা। বড় দলে না খেললেও এক সময় কলকাতা ময়দানের জায়েন্ট কিলার ছোট দল গুলোয় অনেক বছর খেলেছে দাপটের সঙ্গে। ক্রিকেটটাও খেলত ভালোই। টেনিস বলের টুর্নামেন্টে সমীহ করার মত লেগস্পিন বোলার ছিল। তা সে হেন চন্দনদার সঙ্গে আরও জুটে গেল গদুদা, কাচ্চুদারাও। অবশেষে আমরা দলে মোট বারোজন। চন্দনদার অভিভাবকত্বে আমাদের অযোধ্যা পাহাড় অভিযানের অনুমতি মিলল বাড়ি থেকে। সবাই মিলে খোঁজ খবর নিয়ে ঠিক করলাম প্রথমে কাটোয়া থেকে বাসে দুর্গাপুর সেখান থেকে পুরুলিয়ার বাসে সিরকাবাদ আর তারপর ১৩ কিমি আঁকাবাঁকা পাহাড়ি চড়াই উৎরাই পেরিয়ে পৌঁছব অযোধ্যা পাহাড়ে। শুরু হয়ে গেল ব্যাগপত্তর গোছানোর পালা।

তখনও মাওবাদীদের অভয়ারণ্য হয়নি পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়। অনির্বচনীয় সরলতায় মোড়া ডাগর চোখের কালো পাথরে খোদাই করা শরীরগুলো তখনও দু’হাতে তীর ধনুক নিয়ে ছুটে বেড়াত বুনো খরগোসের পেছনে অথবা শাল-শিমুলের আড়ালে নিঃশব্দে অপেক্ষা করত বামনি ফলসের শীর্ণ জলের ধারায় তৃষ্ণা মেটাতে আসা বুনো শুয়োরের প্রতীক্ষায়। তখনও মরদগুলোর শক্ত সমর্থ হাতে উঠে আসেনি একে৪৭, তখনও ওরা বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে আকাশের চাঁদকে সাক্ষী রেখে মহুয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে বাঁশিতে ঝড় তুলত আদিম সুরের। ধামসা মাদলের উদাস অথচ উদ্দাম তালে কানে গলায় পলাশের রঙে রাঙিয়ে সীতাকুণ্ডের স্থির জলে ভেজা ঠাণ্ডা হাওয়ায় দল বেঁধে কোমর দোলাত মেয়েরা।

অযোধ্যা পাহাড় আসলে ছোটনাগপুর মালভূমি রেঞ্জের পূর্বঘাট পাহাড়ের এক্সটেণ্ডেড পার্ট, ঝাড়খণ্ডের দলমা পাহাড়ের একটা অংশ। রাতটা দুর্গাপুরে কাটিয়ে ভোর ভোর পুরুলিয়ার বাস ধরলাম। যত তাড়াতাড়ি সিরকাবাদ পৌঁছানো যায় ততোই ভালো। ওখান থেকে হাঁটা পথে চুড়োয় পৌছনোর ওই ১৩ কিমি পথ পেরোতেই সাত আট ঘণ্টা লেগে যাবে। তাছাড়া পাহাড়ি পথে দিনের আলো থাকতে থাকতেই বনবাংলোয় পৌঁছে যাওয়া ভালো। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ সিরকাবাদের সেই চায়ের গুমটিতে আখের গুড়ের চায়ে চুমুক দিয়ে শুরু হল আমাদের অভিযান। সকলের পিঠে একটা করে ব্যাগ তাতে কিছু জামা কাপড়, জলের বোতল আর মুড়ি-নাড়ু জাতীয় হালকা খাবার। পাহাড়ের গা বেয়ে কাঁকুড়ে মেঠো পথ দুদিকে অসংখ্য অজানা গাছের ঝোপঝাড় আর শাল-শিমুল-পলাশের জঙ্গলকে পেছনে ফেলে এঁকে বেঁকে এগিয়ে গেছে অজানার উদ্দেশ্যে। মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছে বাঁদর, বনবিড়াল অথবা প্যাঙ্গোলিন। কানুর মুখেই শুনেছি রাত বীরেতে নাকি চিতাও দেখা যায় অথবা রাতের পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয় হায়েনার ভয়াল হাসির শব্দ। মহুয়া ফল পাকলে দলমার হাতির পালও মাঝেমাঝেই হামলা করে এই অঞ্চলে।

ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীরে টুরগা ফলস থেকে বেরিয়ে আসা শীতল জলধারায় চান করে, ঝরনার ধারে বসেই মুড়ি-চানাচুর আর নারকেল নাড়ু সহযোগে মধ্যাহ্নভোজনেও যেন স্বর্গীয় অনুভূতি হল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু পথচলা। একে শেষ অক্টোবর তার ওপর জঙ্গলঘেরা পাহাড়ি পথ, একটা শিরশিরে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। রোদের তেজও কমে এসেছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে আর ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই সন্ধে নামবে, তাই চন্দনদা নির্দেশ দিল জোরেজোরে পা চালানোর আর সেটা মেনেই আমরা মিনিট দশেকেই পৌঁছে গেলাম একটা সবুজ ঘাসে মোড়া সমতল চত্বরে যার মাঝে মাঝে অসংখ্য লাল-হলুদ-বেগুনী নানা রঙে ভরা ঝোপঝাড় আর দুরে দেখা যাচ্ছে একটা এসবেস্টসের চালওয়ালা হলুদ রঙের পাকা বাড়ি। বুঝতে পারছি ওটাই সেই বনবাংলো, আমাদের পরবর্তী ৩/৪ দিনের ডেরা। ক্লান্ত শরীরটা ছেড়ে দিলাম প্রকৃতির কোলে। ২৮০৫ ফুট (৮৫৫ মিটার) উঁচু অযোধ্যা পাহাড়ের সর্বোচ্চ চুড়া গোরগাবুরুর বুকে দাড়িয়ে চারিদিকে তাকাতেই নজরে এলো অসংখ্য ছোট ছোট পাহাড় ঘিরে রয়েছে, তাদের কারও নাম মাথাহীল তো কারও নাম ময়ূর পাহাড় অথবা পাখীহীল। পলাশ আর শিমুলের রঙে লাল হয়ে যাওয়া মাথাহীলের বুকে কমলা সূর্যটা কখন হারিয়ে গেল তা বোঝার আগেই ঝপ করে সন্ধে নামলো পাহাড়ের বুকে। ততক্ষণে আমরা সদলবলে পৌঁছে গেছি বনবাংলোর নিশ্চিত আশ্রয়ে। ইলেক্ট্রিসিটি আসেনি এই অঞ্চলে। বনবাংলোর পিছনদিকে ভটভট শব্দে চলছে একটা ছোট্ট জেনারেটর, যাতে কেবল ৩/৪ টে বাল্ব আর ফ্যান ছাড়া কিছু চলে না। অবিশ্যি আর দু’দিন পড়েই লক্ষ্মী পূর্ণিমা তাই পুরো পাহাড় হাসছে ফুটফুটে জ্যোৎস্নায়। বনবাংলোর কেয়ার টেকার এসে জানালো আজ রাতে ডিমের ঝোল আর ভাত, কাল পাশের গ্রাম থেকে মুরগী এনে খাওয়াবে। কেয়ারটেকার চলে যেতেই টর্চ হাতে বেরিয়ে গেল চন্দনদা সঙ্গে কৌশিক। আমদের মধ্যে কেউ কেউ সঙ্গে আনা রাম বা হুইস্কির বোতল খুলে বসল আর আমার মত ২/৩ জন আনাড়ি, যারা বমি করার ভয়ে মদ খেতাম না তারা বিড়ি ধরিয়ে শারীরিক ক্লান্তি দুর করতে করতেই দুই হাতে দুটো ছোট ছোট মাটির হাড়ি ধরে উদয় হল চন্দনদা আর কৌশিক। খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে তাচ্ছিল্যের সুরে কাঁচা খিস্তি দিয়ে চন্দনদা বলে উঠল,

- “বাঁ* ভদ্দরলোকের বাচ্চা সব। হুইস্কি মারাচ্চে… শালা! মহুয়া এনেচি বে, খাঁটি মহুয়া, এক গেলাসেই কাজের মাসি মাধুরী দীক্ষিত…..”

বলেই একটা হাঁড়ি কানুর হাতে দিয়ে অন্যটাতে দিল লম্বা চুমুক। ততক্ষণে রাম হুইস্কি সব অপাংক্তেয়, সবাই মেতে গেল মহুয়ার মাতাল রসে।

*****

প্রথম রাতটা ভালোই কাটল। মাথার চাঁদি গরম করে দেওয়া ঝাল ঝাল ডিমের ঝোলের সাথে মোটা চালের ভাত। সারাদিন ভাত না জোটা ভেতো বাঙালীর কাছে ওটাই তখন অমৃত। হুইস্কি, রাম আর মহুয়ার রসের ককটেল পেটে চন্দনদা গদুদাদের তখন তুরীয় অবস্থা। সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে অথবা নেশার ঘোরে কখন যে সবাই ঘুমিয়ে পরেছি বুঝতেই পারিনি। ঘুম ভাঙল সিধুর ধাক্কায়। বাইরে তখনও ভালো করে আলো ফোটেনি। কেমন যেন শীত শীত করছে। অলস শরীরে আড়মোড়া ভেঙে ঘুম জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলাম,

- “কটা বাজে রে? এখনও তো সকাল হয়নি, শুধুমুধু ডাকছিস কেন?”

কোনও কথা না বলে হ্যাঁচকা টান মেরে আমার হাত ধরে টানতে টানতে এনে সিধু আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল বনবাংলোর বারান্দায়। দু’হাতে চোখ কচলিয়ে তাকাতেই চোখের সামনে এক অপার্থিব অনুভূতি। চারিদিকে দিগন্ত বিস্তৃত কত বিচিত্র সবুজ রঙ। এখানে না এলে জীবনে জানাই হত না পৃথিবীতে এত রকমের সবুজ রঙ আছে। দুরে পাখীহিল থেকে ভেসে আসছে অসংখ্য পাখির কোরাস। পাখীহিলের সবুজের মাঝে মাঝেই পলাশের লাল ঝুটি আর তার মাঝখান থেকেই উঁকি দিচ্ছে টকটকে লাল সূর্যটা। সামনের ঘাসে মোড়া লম্বা লনটা ভিজে আছে হেমন্তের শিশিরে। পাখীহিলের মাথা টপকে চুইয়ে পরা সূর্যের লালিমায় প্রতিটা শিশির বিন্দুও তখন রক্তাক্ত। দুচোখ ভরে দেখলাম সকালের অযোধ্যা পাহাড়ের জেগে ওঠা। বুঝতে পারলাম জীবনের সব সৌন্দর্য ক্যামেরা বন্দি করা যায় না, কিছু কিছু জিনিষ চিরকালের জন্যে বন্দি হয়ে যায় শুধুই অনুভবে।

রাতে যেখানে বিরাট মাটির উনুনে কাঠের আঁচে পেল্লাই লোহার কড়াইয়ে টগবগ করে ফুটতে থাকে মহুয়ার রস, দিনের আলোয় সেটাই হয়ে যায় চপ ফুলুরির দোকান। হরেন মুণ্ডা আর তার বউ ফুলমনি, দুজন মিলে চালায় দোকানটা। পাশের দুকুরি গ্রামে আরও পঁচিশ ত্রিশ ঘর কোল মুণ্ডর সঙ্গে সহবাস ওদের। গোরগাবুরু থেকে মাত্র ৩/৪ ক্রোশ দুরে ময়ূর পাহারের কোল ঘেঁষা দুকুরি গ্রাম। হরেনের সঙ্গে চন্দনদা আর কৌশিকের পরিচয় হয়েছে গত রাতেই। সন্ধে সাতটা নাগাদ দোকানের ঝাঁপ ফেলার ঠিক আগে আগেই ওরা গিয়েছিল হরেনের দোকানে। ওরা দুজনেই গত রাতে হরেনের শেষ খদ্দের ছিল। কড়কড়ে দশটা টাকা দিয়ে চার হাঁড়ি মহুয়া নিয়ে ফেরতের দু’টাকা হরেনকে বকশিস দিয়েছিল বলে চন্দনদাকে খুব মনে ধরেছে হরেনের। তাই সাত সকালে ওর দোকানে সদলবলে আমাদের আগমন ঘটতেই হরেন মুণ্ডার ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করা কান এঁটো করা হাসিতে অভ্যর্থনা মিলল আমাদের। চন্দনদার দিকে তাকিয়ে গদগদ স্বরে জিজ্ঞেস করল,

- “কি রে বাবু, কি খাবি বটেক? চপ, ফুল্লুরি… মুড়ি দিব সাথ্থে…..”

চন্দনদা সম্মতি সূচক ঘাড় নাড়াতেই কাঁচা শালপাতার ঠোঙা বানিয়ে একএক করে সকলের হাতে দিল মুড়ি আর দুটো করে আলুর চপ আর ফুলুড়ি সঙ্গে কাঁচা লঙ্কা। দাম মিটিয়ে মুড়ি চিবোতে চিবতে হাঁটা দিলাম অজানার পথে। সকলে মিলে ঠিক করলাম আজ আমরা শুধুই আশপাশটা ঘুরে দেখব। কালকের পরিশ্রমের জের এখনও সকলের শরীরে। হাঁটতে হাঁটতে কিছু দুর এগোতেই নজরে পরল একটা মাঠে গোটা দশ বারো ছেলে ফুটবল খেলছে। প্রত্যেকটা ছেলের শক্তপোক্ত সুঠাম চেহারা। আমাদেরও তখন এমনই বয়েস যে ফুটবল দেখলেই পা সুড়সুড় করে। চন্দনদা কিভাবে কে জানে ছেলেগুলোকে ম্যানেজও করে ফেলল। ঠিক হল ওদের সাথে প্রীতিম্যাচ খেলা হবে। গোলপোস্ট নেই তাই বড় বড় চারটে পাথরের টুকরো দিয়ে গোল পোস্টের সীমানা চিহ্নিত হল। কিন্তু মুশকিলটা হল ওদের শক্তপোক্ত চেহারার সঙ্গে আমাদের ল্যাকপ্যাকে শরীরের অসম লড়াই তার ওপর আবার ওদের সঙ্গে খালিপায়ে খেলা। ওদের যে কারও সঙ্গে সামনা সামনি চার্জ হলে যে আমাদের হাঁটু খুলে হাতের তালুতে চলে আসবে তাতে আর আমার কোনও সন্দেহই রইল না। আমাদের মধ্যে যে শারীরিক ভাবে সব থেকে দুর্বল সেই বিভাস কিছুতেই রাজী হলনা খেলতে। ওর দোষটাই বা কি? মাত্র ৩৫ কেজি ওজন বলে গত মাসেই রক্তদান শিবিরে রক্তদানে রিজেক্টেড হয়ে একেবারেই মনোবল ভেঙে গেছে ওর। তাই দু’দলের সম্মতিক্রমেই রেফারি নির্বাচিত হল বিভাস। হুইসেল নেই তো কি হয়েছে, বাঁশপাতা দিয়ে বানানো চ্যাপ্টা মত একটা বাঁশি নিয়ে এলো একটা ছেলে, যাতে ফুঁ দিলেই কোকিলের মত একটা আওয়াজ বের হয়। অগত্যা সেই কোকিলকণ্ঠী আওয়াজেই শুরু হল আমাদের ম্যাচ। ঠিক হয়েছে আধ ঘণ্টার ম্যাচ কারণ পাহাড়ি জায়গায় ওই আদিবাসী ছেলেগুলোর সঙ্গে যে দমে পেরে উঠবো না তা আমাদের বিলক্ষণ জানা ছিল। তাছাড়া আমাদের দলে চন্দনদার মত কলকাতা ময়দান কাঁপানো প্লেয়ার ছাড়াও জেলাদলের নিয়মিত প্লেয়ার গদুদা বা কাচ্চুদাও রয়েছে বলে শুরুর দিকে আমরা বেশ আত্মবিশ্বাসীই ছিলাম। কিন্তু ভুল ভাঙল খেলা মিনিট দশেক গড়াতেই। ওদের কোনও প্লেয়ারই বিশেষ স্কিলফুল না হলেও কি অসম্ভব গতি আর সঙ্গে অকল্পনীয় শারীরিক সক্ষমতা। মিনিট পনেরো পেরতে না পেরতেই দু’গোল মেরে দিল আমাদের আর দুটোই আমার দোষে। অবিশ্যি ঠিক দোষ নয় আসলে ওটা ভয়। ওইরকম বুনো মোষের মত সিং বাগিয়ে কেউ এগিয়ে এলে তাকে প্রতিহত করতে যাওয়াটাও তো বোকামিই। আর বিভাসও অফসাইডের বাঁশি বাজাতে গিয়েও কেন কে জানে চেপে গেল, আসলে ওরও জানপ্রাণের মায়া আছে তো নাকি? রেফারি বলে কি মানুষ নয়? যাই হোক কোনও মতে মান বাঁচল সেই চন্দনদার কৃপায়, প্রায় একার কৃতিত্বেই ওদের দেওয়া দু’গোল শোধ করতেই লম্বা বাঁশি বাজিয়ে খেলা শেষ করে দিল বিভাস, তখনও খেলার বয়েস পঁচিশ মিনিটও গড়ায় নি।

পাতে ভাতের সঙ্গে মুরগির ঝোল পরায় দুপুরে খাওয়াটা সকলেরই একটু বেশি বেশিই হয়ে ছিল। দুপুরের ভাতঘুম থেকে উঠতে উঠতে পাহাড়ের কোলে সূর্য উধাও। সূর্য চোখে না পরলেও আকাশে তখনও গোধূলির কনে দেখা আলো। ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা পেরিয়ে সাড়ে পাঁচের দিকে। বনবাংলোয় শুধু দুবেলার খাবারই মেলে, চা জলখাবারের জন্য ভরসা ওই হরেন মাণ্ডির কেন্দুপাতার ছাউনি দেওয়া মাটির ঘর। বড় মাটির উনুনে ইতিমধ্যেই চেপে গেছে সেই পেল্লাই লোহার কড়াই। টগবগ করে ফুটছে তরল নেশা, বাতাসে মহুয়ার মাতাল করা গন্ধ। দোকানের সামনে বেঞ্চে বসে আমরা ক’জন ছাড়াও বেশ কিছু আদিবাসী মেয়ে-মরদ। কড়াইয়ে ফুটতে থাকা গরম তরল হরেন মুণ্ডা কাঁচের গ্লাসে ঢেলে দিচ্ছে আর তা সকলের হাতে হাতে পৌঁছে দিচ্ছে ফুলমনি। মাত্র চার আনা প্রতি গ্লাস। সঙ্গে নুনের টাকনা দিয়ে বেশ কয়েক গ্লাস করে তরল গরল গলায় ঢেলে বিদায় হল আদিবাসী মেয়ে-মরদের দল। ততক্ষণে দু’তিনটে বড়বড় শালপাতার ঠোঙায় ছোলার ছেঁচকি নিয়ে হাজির হল ফুলমনি আর পেছনে একহাতে কটা বড় মগ ভর্তি মহুয়ার রস অন্য হাতে আঙুলে চেপে খানকতক কাঁচের গ্লাস নিয়ে হরেন মান্ডি। কাঁচের গ্লাসে আমার আর বিভাসের জন্যে গরম চা আর বাকিদের জন্যে ঢালা হল মহুয়ার রস সঙ্গে চাট হিসেবে ছোলার ছেঁচকি। কোন ফাঁকে চন্দনদা এই সবের আয়োজন করে গেছে কেউ জানতেও পারে নি। সকলে মিলে মহুয়ার রসে ডুবতে থাকলো ততক্ষণ যতক্ষণ না কড়াই খালি হয়।

শুক্লা চতুর্দশীর ঝকঝকে চাঁদের আলোয় দুর থেকে বনবাংলোটাকে কেমন যেন ভুতুড়ে বাড়ির মত দেখাচ্ছে। মোহময় রূপোলী আলোর চাদরে মুড়ে নিয়েছে চরাচর। তারমধ্যেই বনবাংলোর খোলা জানলা দিয়ে ছিটকে বেরোচ্ছে বাল্বের হলুদ আলো। আমরা ফিরে এলাম বনবাংলোয় এবং ফিরেই শুরু হল চন্দনদার নেশাতুর হুঙ্কার,

- “আব্বে কানু! তোর ওয়াকম্যানটা চালা… আমি শালা নাচবো এখন….”

অনেক চেষ্টা হল কানুর ওয়াকম্যানটা চালাবার কিন্তু ব্যাটারি শেষ। অনেক চড় থাপ্পড়েও যখন ওয়াকম্যানটা টুঁ শব্দও করল না, হটাতই চেঁচিয়ে উঠল চন্দনদা,

- “ওইতো! ড্যাং ড্যাডাং ড্যাং! ঢাক বাজছে.. আমি নাচব….”

বলেই চন্দনদা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল আর পেছু পেছু আমি আর বিভাস। বনবাংলোর পিছনে এসে আমাদের অকল্পনীয় ভাবে চমকে দিয়ে শুরু হল চন্দনদার নাচ আর সঙ্গতে সেই ঢাকের বাদ্যি? সত্যি বলছি, সেদিন নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না যে কেউ মহুয়ার নেশায় জেনারেটরের ঘড়ঘড় আওয়াজের তালে তালেও উদ্দাম নাচতে পারে। বিড়ি টানতে টানতে উপভোগ করছি চন্দনদার উদ্দাম নাচ। কখন যে গদুদা আর কৌশিকও দলে ভিড়েছে বুঝতেও পারিনি। সম্বিৎ ফিরল কেয়ার টেকার পিন্টু সোরেনের ডাকে। রাতের খাবার রেডি, কালকের মতই আজ রাতেও ডিমের ঝোল আর ভাত। সবাই বসে পরলাম মাটিতে চাটাই বিছিয়ে। শালপাতায় বাড়া গরম ভাত থেকে ধোঁয়া উঠছে কিন্তু পাতে ডিমের ঝোল পরতেই আচমকাই জড়ানো স্বরে হুঙ্কার ছাড়ল চন্দনদা,

- “আব্বে পিন্টু! বিভাসের ইয়ের সাইজের কিসের ডিম দিয়েছিস বে?”

- “আজ্ঞে! ছ্যার! ইটা মুরগির ডিম বটেক….”

ভয়ে ভয়ে কেয়ার টেকার উত্তর দিতেই দিগুণ উৎসাহে চন্দনদার পুনঃ হুঙ্কার,

- “হারামজাদা! ঢ্যামনামির জায়গা পাস নি? শালা, পায়রার ডিমকে মুরগির ডিম বলে চালানো? যা ব্যাটা আর একটা ডিম দে আমায়…”

- “আজ্ঞে ছ্যার আর তো নাই….”

পিন্টুর ভয়ে ভয়ে দেওয়া উত্তর শুনে চন্দনদা হটাত ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরল। পরনের লুঙ্গির গিঁট খুলে পুরো লুঙ্গিটা আমার হাতে দিয়ে খালি গায়েই জামার হাতা গুটানোর মক প্র্যাকটিস করতে করতে এগিয়ে গেল পিন্টু সোরেনের দিকে এবং হুঙ্কার ছাড়ল,

- “শালা! চন্দন চ্যাটুজ্জের সাথে পেঁয়াজী? মুখে মুখে তক্ক? দেব শালা…….”

জামা বা লুঙ্গি ধরে যে আটকাব চন্দনদাকে সেই উপায়ও তো নেই। অগত্যা ওর হাত ধরে আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছি আর মুখ দিয়ে অনর্গল মনিমুক্ত ঝরে পরছে চন্দনদার। ততক্ষণে অভূতপূর্ব আতঙ্কে সেই তল্লাট ছাড়া হয়েছে ভীত সন্ত্রস্ত পিন্টু সোরেন।

*****

পরদিন সকাল সকাল বেরিয়ে পরলাম পাখীহিলের উদ্দেশ্যে। হরেন মুণ্ডার দোকান থেকে গতকালের মতই প্রথমে চা খেয়ে মুড়ি তেলেভাজা হাতে নিয়ে শুরু হল আমাদের পাখীহিল অভিযান। ২/৩ ঘন্টার পথ, পুরোটাই শাল-মহুয়ায় ঘেরা আর মাঝে মাঝে জটলা বেঁধে আছে শিমুল-পলাশের দল। আরও কত অচেনা নাম না জানা গাছের সারি। চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। আদিগন্ত সবুজে চোখের আরাম আর মনের অনাবিল প্রশান্তি। বামনি ফলসের ঠাণ্ডা মিষ্টি জল পেট ভরে খেয়ে, চোখে মুখে মেখে পৌঁছলাম পাখীহিলে স্বর্গীয় জগতে। অনবরত পাখীর কিচির মিচির আর মাঝে মাঝেই নিস্তব্ধ নৈসর্গের অসীম নীরবতাকে ছিন্নভিন্ন করে ভেসে আসা ময়ূরের কর্কশ আওয়াজ। পাখীর কিচিরমিচির আর প্যাঙ্গোলিন অথবা কাঠবেরালির লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতে কখন যে ঘড়ির কাঁটা বারোটা পেরিয়েছে বুঝতেই পারিনি। ততক্ষণে তরল রসের রসিকরা একটা জায়গায় গোল হয়ে বসে একটা বোতল খালি করে দ্বিতীয় বোতলও খুলে ফেলেছে। গদুদা আর আর কাচ্চুদার এই ভরদুপুরেই ক্যাম্প ফায়ারের খেয়াল চাপল মাথায়। কিছু শুকনো কাঠ আর পাতা জোগাড় হল। দেশলাই কাঠির ছোঁয়ায় নাচে গানে জমে গেল ক্যাম্প ফায়ার। দ্বিতীয় বোতলটাও শেষ করে রণে ভঙ্গ দিল চন্দনদা এন্ড কোং। সকলের পেটে ততক্ষণে ছুঁচোয় ডনবৈঠক মারতে শুরু করেছে। ক্যাম্প ফায়ারের জ্বলন্ত আগুনকে পেছনে ফেলে ফেরার পথ ধরলাম বনবাংলোর উদ্দেশ্যে।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই গতরাতের নেশা তাড়িত দুর্ব্যবহারের জন্যে পিন্টু সোরেনের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিল চন্দনদা। তাই কালকের মতই আজ দুপুরেও মুর্গির ঝোল ভাতের মহাভোজ। লম্বা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বনবাংলোয় ফিরতে ফিরতে তিনটে সাড়ে তিনটে। তারপর ভাতঘুম দিয়ে চোখ খুলতেই বুঝলাম আঁধার নেমেছে পাহাড় জুড়ে। আধখোলা জানলা দিয়ে তেরছা ভাবে আসা চাঁদের আলোয় ভসে যাচ্ছে বিছানা। মনে পরল আজ লক্ষ্মী পূর্ণিমা, লাফ দিয়ে উঠলাম। ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালাম উন্মুক্ত লনে। কেউ নেই আশেপাশে। বুঝতে পারলাম সবাই মিলে আসর জমিয়েছে হরেন মাণ্ডির ডেরায়। পূর্ণিমার নরম আলোয় দুচোখ ভরে প্রকৃতির রূপ শুষে নেব বলে দিগন্তে চোখ মেলতেই নজরে এলো দাউ দাউ করে জ্বলছে পুরো পাখীহিল। সে এক ভয়ঙ্কর সুন্দর দৃশ্য। ছুটে গিয়ে হাত ধরে টেনে আনলাম পিন্টু সোরেনকে, ওকে কোন প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই। সামনে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা পাহাড় দেখিয়ে ওর কাছে জানতে চাইলাম,

- “ওটা কি? কিভাবে…..”

- “জঙ্গলে আগ লাগিছেরে বাবু.. পাখী পাহাড়ে……

বলেই অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলাম,

- “কিন্তু আগুন লাগল কি করে?”

- “সে তুরাই জানিস বটেক….”

বলেই গম্ভীর মুখে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল পিন্টু সোরেন। মনে পরে গেল পাখীহিলে কাটানো আমাদের কয়েক ঘণ্টার কথা। আমরা ফিরছি বনবাংলোয়, পেছনে ফেলে এলাম জ্বলতে থাকা আগুন, বেপরোয়া উৎসবের আগুন। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা পাখিহীলের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই কখন যে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে বুঝতেই পারিনি। তবে কি আমাদের ফেলে আসা আগুনেই…….
আর ভাবতে পারছি না। নিজের চোখ মেলাতে পারছি না পাখিহীলের জ্বলন্ত চোখে এমনকি তাকাতে পারছি না পিন্টু সোরেনের নির্বাক আগুন ঝরা চোখের দিকেও। লক্ষ্মী পূর্ণিমার রূপোর থালার মত গোল জ্বলন্ত চাঁদটাও যেন মুখ লুকোতে চাইছে জঙ্গল পোড়ানো কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে থাকা কালো ধোঁয়ার……

আগুন রঙা পলাশবন
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments