অলীক তো অবশ্যই, তবে নাটকটি কি কুনাট্য ছিল? ঠিক জানি না। কেউ বলবেন – হ্যাঁ, কুনাট্য তো বটেই, কেউ বলবেন – তবে কি মানুষকে বিশ্বাস করা যাবে না?

ঘটনাটি ঠিক কি ঘটেছিল? বোধহয় এতদিনে সবাই জেনে গিয়েছেন। তবু এখনও যাঁদের অজ্ঞাত তাঁদের উদ্দেশ্যে ছোট করে। একটি মেয়ে, নাম তার যাই হোক, মূল গল্পটি মোটামুটি এইরকম। মেয়েটি ছোটবেলায় তার মা-বাবাকে হারায়, অনাথ আশ্রমে নানাবিধ অত্যাচারের শিকার, শেষ পর্যন্ত শৈশবে আশ্রয় পায় আমেরিকার এক সহৃদয় ডাক্তার দম্পতির কাছে। সেই দম্পতির একজন, মা বাঙালি, এবং বাবা বিদেশী। এই মায়ের প্রতি আকর্ষণ তাকে টেনে আনে ইন্টার্নেটে আরও প্রিসাইসলি বলতে গেলে ফেসবুকে বাংলা ভাষাচর্চার জগতে। অভিধান দেখে সে বাংলা শেখে এবং লেখেও। প্রথমে অন্যান্যদের বড় বড় পোস্টে ছোটখাট কিছু কমেন্ট করে, আত্মবিশ্বাসী হয়, সিদ্ধান্ত নেয় নিজেও বড় পোস্ট লিখবে। নাই বা হল তা দুর্ধর্ষ কিছু, কি হয়েছে তাতে? এভাবেই শুরু হয় মোটামুটি ঝরঝরে এবং অকপট বাংলা লেখা। ব্যক্তিগত অনেক ব্যাপার যা আমরা অনেক সময়ই এড়িয়ে যেতে বেশি পছন্দ করি, তাও সে খুলে লেখে, সাহসী। বিদেশে তুলনামূলক উদার সমাজে বড় হয়ে ওঠা, তাদের সংস্কৃতি চমৎকার মেশায় সে তার লেখাতে। অচিরেই বেশ কিছু অকৃত্রিম গুণগ্রাহী সৃষ্টি হয়। অনলাইন উৎসাহ দেন তাঁরা, ভুল করলে যত্ন করে শুধরে দেন, বুঝিয়ে দেন কোথায় ভুল, তাঁদের উৎসাহে সে-ও এগিয়ে নিয়ে যায় তার ভাষাচর্চাকে। প্রায় মাস তিনেক কাটে এভাবেই। একদিন আকস্মিকভাবে তার মায়ের ই-মেল মারফত জানা যায় সে মারা গিয়েছে। অসুস্থ সে ছিলই, জানিয়েছিল তার ফেসবুকের অভিন্নহৃদয় বন্ধুদের। কিন্তু তাই বলে এত তাড়াতাড়ি! মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই!! দাবানলের মত খবর ছড়াল বিভিন্ন জায়গায়। সাধারণভাবে এরপর যা হওয়ার তাই হচ্ছিল। শোকজ্ঞাপন, তার আত্মার শান্তি কামনা, স্মৃতিচারণ। কিন্তু এরপর হঠাৎই ঘটল ছন্দপতন। দুয়েকজন বললেন – ‘না, ভুল। এ মৃত্যুসংবাদ ভুল। কারণ ওই নামে কেউ ছিলই না, কোনোদিন। কাজেই এই মৃত্যুসংবাদ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, খুঁজে বের করা হোক কে বা কারা কি উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটিয়েছে।’ এখান থেকেই শুরু।

খুব স্বাভাবিকভাবে সঙ্গে সঙ্গেই এইসব অবিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে তীব্র ঘৃণা বর্ষিত হতে শুরু করলেও দ্রুত দৃশ্যপটের পরিবর্তন ঘটল। দেখা গেল এই মতবাদের সমর্থকরাই হয়ে উঠলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। দেওয়ালে দেওয়ালে চাপান-উতোর শুরু হল বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী দুই পক্ষের মধ্যে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অশ্রাব্য গালিগালাজ থেকে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে হুমকি, ঘটনা ঘটানোর মোটিফ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, শখের গোয়েন্দা, ‘যেভাবেই হোক ফেসবুককে ফেক-অ্যাকাউন্টমুক্ত করতেই হবে’ ব্রত নিয়ে এই মৃত্যুসংবাদ-বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সুপার ডুপার সাইক্লোনের গতিতে উচ্ছেদ অভিযান (অবিশ্যি বাস্তবে দেখা গেল খুব বেশি কষ্ট করতে হল না, উচ্ছেদের জন্যে প্রস্তুতি নেওয়াই ছিল, যেন বেসরকারি জমির জবরদখলদার), এই মওকায় ‘ফেকু’ শব্দটির দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা, সাইবার ক্রাইম ল’, সেক্স পারভার্শান (আইটেম ডান্স থাকবে না, তাও কি হয়! বিশেষ করে ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে যখন একটি সদ্য তরুণী এবং যার মৃত্যু নিয়ে জমে উঠেছে রহস্যের মেঘ), একের পর এক চরিত্রবদল, দমবন্ধ সাসপেন্স, সব জুড়ে গেল একই দৃশ্যে, শুধু ঠাঁই পেল না কতগুলি প্রাথমিক বিষয়। কেউ কেউ তুলতে চেয়েছিলেন সেই সব কথা, কিন্তু কে শুনবে? কার অত সময় আছে? যেদিক থেকেই গুনি না কেন উত্তর তো সেই চব্বিশ, আর কে অস্বীকার করতে পারে যে ভার্চুয়াল নেটওয়ার্কিংয়ের জগতকে দুগ্ধপোষ্য শিশুর বিচরণযোগ্য করে তোলা অনেক বড় দায়িত্ব ফলত টপ প্রায়োরিটি। সুতরাং ভেসে উঠেই বুদবুদের মতই মিলিয়ে গেল সে সব।

যদি সৎ হই, তাহলে এটাও স্বীকার করে নিতে হয়, এই যে ঘটনাটি ঘটল এবং আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ হল, যা খুব কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করার দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্য, যেটাই বলুন আমার হয়েছে, এটি আসলে প্রবল অ্যাসিডের মত সৃষ্টি হওয়া নিজ ব্যর্থতা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা। যা কিছুতেই মানবশরীরে থাকতে পারে না, অস্থান কুস্থান যেখান দিয়েই হোক, যে ফর্মেই হোক, ঠিক বেরিয়ে আসবে। আমি প্রতারিত হয়েছি কিংবা সম্মুখ সমরে পরাজিত, মেনে নেওয়া খুব কঠিন। বাজারে কেউ এক টাকা ঠকালেও মনে থাকে বহুদিন। আর এ তো আবেগ নিয়ে রীতিমত ছেলেখেলা! তাও আবার দিনের পর দিন!! কিন্তু কেন অ্যালাও করেছিলেন সবাই? যাঁরা এই মানসিক ধাক্কাটা খেলেন তাঁরা তো সবাই প্রাপ্তবয়স্ক এবং মনস্ক! কেন প্রশ্ন করেননি নিজেকে? উত্তর নেই। আসলে আছে, কিন্তু উত্তর দিতে গেলেই তো আবার ব্যর্থতা মেনে নিতে হয়। যাকে চোখে দেখলেন না, ফোনে গলা শুনলেন না জীবনে, তার প্রতি সেন্টিমেন্টে ভিজে জবজবে কেন হতে গেলেন? অনেকেই বলছেন এটা একটি মেয়ে বলেই সম্ভব হয়েছে। সবিনয়ে বলি, না, একটি পুরুষ হলেও হত। খালি রান্নার রেসিপিটা ঠিকঠাক জেনে নিলেই যথেষ্ট। কারণ শোষিত হওয়ার ইচ্ছে আমাদের মজ্জাগত। নিজে যদি না-ও হই, কেউ হচ্ছে শুনলে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারি না। যুক্তিবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে আমাদের অন্তরাত্মা জেগে ওঠে তাকে যেনতেন প্রকারে উদ্ধার করার জন্যে।

যাই হোক, ব্যর্থতার উদ্গীরণ একটু থামার পরেই দেখা গেল বিশ্বাস নামক বস্তুটি বিলকুল উধাও। উত্তপ্ত লাভাস্রোতে কোথায় যে ভেসে গেছে কে জানে। নিতান্ত ব্যক্তিগত আলাপচারিতা প্রকাশ্যে এনে জাস্টিফাই করার চেষ্টা হল কেন আমি আপনাকে অবিশ্বাস করছি। খুব স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হিসেবে জুটল রুচিহীন ব্যক্তিগত আক্রমণ। ঘণ্টাখানেক আগেও যাকে পরম বিশ্বস্ত মনে করা হয়েছিল বন্ধু হিসেবে, এখন তাকেই বিশ্বাস করতে বাধো বাধো ঠেকতে শুরু করল। সংক্রামক ব্যাধিগ্রস্তের মত সবাই কেমন যেন সরে সরে যেতে লাগল। ওই যে যাঁদের কথা শূন্যে মিলিয়ে গিয়েছিল, তাঁরা কিন্তু বারবার করে এই বিষয়টি নিয়েই সতর্ক করতে চেয়েছিলেন, বলেছিলেন জিনিসটিকে একটু সামলে-সুমলে রাখতে।

প্রশ্ন আরও উঠল। এই যে বিস্তীর্ণ প্রান্তর, কে কোন অবতারে বিরাজ করছে বোঝা প্রায় অসম্ভব, সেখানে একজন কিভাবে নিজেকে অ্যাকোমোডেট করবে? কোনও গ্রুপে আমার সঙ্গে যে কেউ অনেকক্ষণ ধরে খিল্লি করতেই পারেন বা কেউ কোথাও আমার প্রশংসা করতেই পারেন, কিন্তু তৎক্ষণাৎ একটি বন্ধুত্বের আহবান পাঠিয়ে দেওয়া কদ্দূর যুক্তিসঙ্গত? বা সেই আহবান প্রত্যাখ্যান না করতে পারা? তার চেয়েও বড় কথা তার সাথে প্রায় ড্রয়িংরুমে আপ্যায়ন করার মত ব্যবহার করা? নিজেকে সহজলভ্য করে ফেলাটাই কি মানুষের মত জটিল প্রাণীকে চিনতে পারার সহজ পন্থা? বায়বীয় বন্ধুসংখ্যার নিরিখে নিজেকে আর পাঁচজনের চেয়ে এগিয়ে রাখার চেষ্টায় কি লাভ?

এইসব কথাগুলি তুলতে চেয়েছিলেন যে সব মানুষ, হার্ডলি দেয়ার ওয়াজ এনিওয়ান টু লিসন দেম। নিজেদের সম্মান বাঁচাতে এঁরাও আর কথা বাড়াননি। নীরবতা অবলম্বন করেছিলেন।

এতদূর লেখার পরে মনে হল, লেখাটা কে লিখছে? আমি না অন্য কেউ? যদি আমিই লিখি তবে আমার কোন সত্ত্বা লিখছে এসব? আমিও তো ছিলাম উচ্ছেদকারীদের দলে, এখনও এই লেখাটি তৈরির সময়েও আছি। আমিও তো পাত্তা দিইনি তাঁদের, যাঁরা এই কথাগুলি তুলতে চেয়েছিলেন।

এতসব বুঝেও কি পাল্টে ফেলব নিজেকে? মনে তো হয় না, নিজেকে আরও জনপ্রিয় দেখতে চাওয়ার নেশা অনেকটা কমলির মত। ছেড়ে দিলেও ছাড়তে চায় না। তাহলে চলুন ছেড়ে দিন, যা হওয়ার তা হবে। ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যেই করেন।

আগে, মৃত্যু, পরে
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments