২১ সেপ্টেমর ১৯৯৫,

এই দিনটির কথা আশাকরি মনে আছে? কেননা এই দিনটিতেই এক বিশেষ ঘটনার সারা ভারত প্রায় তোলপাড় হয়েছিল।       কী সেই ঘটনা?     গণেশের মূর্তি নাকি দুধ খাচ্ছেন। দিল্লি থেকে প্রচার হল এই গুজবের আর আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ল ভারতের কোনায় কোনায়। প্রত্যেকটা শহর কি গ্রাম-গঞ্জ যেখানেই গণেশের মূর্তিওয়ালা মন্দির আছে সেখানেই কাতারে কাতারে লোক ছুটল "গণেশের দুধ খাওয়া" দেখতে।

ঘটি,বাটি,কাঁসার গেলাস, গামলা যে যাতে পেরেছে দুধ নিয়ে আর হাতে চামচ নিয়ে লাইন দিয়েছে মন্দিরে মন্দিরে, যেন ৭১-র লঙ্গরখানার দৃশ্য। দুধ বাড়ির থেকে না আনতে পারলেও ক্ষতি নেই মন্দিরের সামনে দুধওয়ালাদের রমরমা…. সব গোয়ালারা দুধ ডেলিভারি বন্ধ করে মন্দিরে মন্দিরে বালতি, কলসি নিয়ে বসে গেছেন চড়া দামে দুধ বিক্রিতে।

মন্দির প্রতিনিধিরাও উৎসাহী প্রণামীর থালা  এগিয়ে দিয়ে, ঝনঝনিয়ে তাতে খুচরো পয়সা থেকে মাওড়া ব্যবসায়ী-গিন্নিদের বড় নোট পড়ে চলেছে। ভেতরে গণেশের মূর্তি শুন্ড উচিয়ে বসে তিনি, চামচে করে দুধ নিয়ে মুখে থুড়ি শুঁড়ে ধরতে হবে… চামচে হেলিয়ে ধরলেই ব্যাস– মিরাক্যল অব দি সেঞ্চুরি । পাথরের মূর্তি দুধ খেয়ে নিল।

শেষে সামাল দিতে বিজ্ঞানমঞ্চের কর্মীরা ময়দানে নামলেন। মন্দিরে মন্দিরে গিয়ে হাতে কলমে দেখালেন শুধু গণেশ নয়…. পাথরের কি কাঠের লক্ষ্মী, দুর্গা, কালী মায় দেবতা ভিনে কাগা-বগার মূর্তিও দুধ খায়। দেখালেন চামচে করে মুখে দুধ ছোয়ানো মাত্র মূর্তিটি দুধ টেনে নিচ্ছে এবং দুধ মূর্তির গা বেয়ে  দুধ নিচে পড়ে যাচ্ছে….. (ফুলের মালার আতিশয্যে যা লক্ষ্য করা মুশকিল ছিল আসল কেসে)। সকলকে বিজ্ঞানমঞ্চের কর্মীরা বোঝালেন সারফেস টেনশন এবং সান্দ্রতা বলে তরলের দুটি ধর্ম আছে। এর প্রভাবে পাথর, ইট কি কাঠে দুধ স্পর্শ করলে দেখা যাবে সেগুলি যেন দুধ টানছে। এ ব্যাপার যে শুধু দুধের জন্য প্রযোজ্য তা নয়…. জল, কেরোসিনের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। যা হোক এতে পাবলিক কতটা বুঝল কে জানে….  এই বোঝানোর জন্যই হোক বা গুজবের ভ্যালিডিটি বা আকর্ষণ কমে যাবার জন্যেই হোক এই ঘটনাটা ধীরে ধীরে থেমে আসে।

 

এবার আসি আরেকটি গুজবে যেটি  আমাদের শিলিগুড়ি আর আশেপাশের অঞ্চলে দাবানলের মত ছড়িয়ে গিয়েছিল। গুজবটি অত্যন্ত হাস্যকর। এটি ঘটে ২০১০সালের সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ।

সে সময় উত্তরবঙ্গে পান দোকানে হঠাৎ চুনের দরকার বেড়ে যায়.. কেননা গুজব ছড়ায় —- পুরুষদের গোপনাঙ্গ নাকি ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে (যা বাবা ঢুকে যাবেই বা কোথায় কে জানে)।  আর নারীদের স্তন ছোট হয়ে যাচ্ছে। খবরে প্রকাশ মারাত্মক এই গুজবটির প্রচার নাকি ফালাকাটা থেকে ফুলে ফেঁপে সেটি ছড়িয়ে পড়ে উত্তরবঙ্গে সমস্ত জায়গায়। আর ঐ চুনের ব্যাপারটা, ঐটেই নিদান… কানের পাতার তলায় চুন লাগিয়ে রাখলে নাকি এটা ঠেকানো যায়।

যা হোক… সেই সময় খবরের কাগজে প্রকাশ হওয়া একটি প্রবন্ধ থেকে জানতে পারি যে   এই গুজবটি নতুন কিছু নয়। কয়েক হাজার বছর আগেও সমাজে এই ধরণের কথা জানা ছিল। এসব কথাবার্তা এক ধরণের মানসিক রোগীর খেদোক্তি। ওরা রোগটির নাম দিয়েছিল — "কোরো"। 

রোগটি প্রথম ধরা পড়ে চীনে, তিনশো খ্রীষ্টপূর্বে। ভারতের আসামে এই রোগ পরিচিত– "ঝিনঝিনিয়া বিমারী" নামে। ১৮৭৪ সালে ডিকশনারি অফ বিজনেস ল্যাংগুয়েজে "কোরো" শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এর অর্থ কুঞ্চিত হওয়া। বিজ্ঞানীরা এর ব্যখ্যা দিয়েছেন এভাবে– "Belief in fatally retracting genitals or a belief in genital theft is usually known as Koro."

কোরো রোগের লক্ষণও তাই বেশ চমকপ্রদ। পুরুষেরা নিজেদের লিঙ্গ ধরে রাখে পাছে কেউ চুরি না করতে পারে। কেউ কেউ চুপচাপ থেকে হীনম্মন্যতায় ভোগেন। বলেন লিঙ্গ ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। অনেকে আবার প্রস্রাব না হওয়ার কথা বলেন। মেয়েদের ক্ষেত্রে স্তন ধরে টানতে দেখা যায়ল

১৯৬৭সালে সিঙ্গাপুরের এক মেডিকেল জার্নালে জানা যাণ সেখানকার হাসপাতালগুলো ভরে গেছে কোরো রোগীতে। তাদের ধারণা এরা এমন শুকরের মাংস খেয়েছেন যার লিঙ্গ শুকিয়ে ভেতরে ঢুকে গেছিল। তাই তাদেরও লিঙ্গ ছোট হয়ে ভেতরে ঢুকতে শুরু করেছে।।

কোরো রোগীরা হলেন মনোরোগী। নানা কারণে হীনম্মন্যতা থেকে জন্ম নেয় কোরো। এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল এই রোগের কথা চারিদিকে আগুনের মত ছড়ায়। সমাজে দেখা দেয় গণহিস্টিরিয়া। তাই যুগে যুগে এই রোগটি মাঝে মাঝে নিজের গুজবকে ছড়িয়ে দিয়ে যায়।

যা হোক উত্তরবঙ্গে বেশ খানিকটা চুন ধ্বংস করে কোরো রোগের গুজবটি ছয়মাসের মধ্যে বিদায় নেয়।  এবং অশিক্ষিত পাবলিক হাঁফ ছেড়ে বাঁচে… তাদের মালপত্র সব ঠিক রেখে রোগটি বিদায় নিয়েছে।

আজব গুজবের রঙিন কথা (১৮+)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments