কথা ছিল ইং ২০১৬ সালের পয়লা জানুয়ারী নবুদা, হুলো আর পচা জেল থেকে ছাড়া পাবে । কিন্ত কারাগারে দীর্ঘ ৯ মাস মোটের ওপর বিশেষ বাওয়াল বাট্টা না করে, সংযত থাকার দরুন তাদের সাজাপর্বের মেয়াদে ৫ দিনের ডিসকাউন্ট জুটল। অর্থাত বড়দিনেই এক্কেবারে সিনেমাটিক শুক্কুরবারের মত মুক্তি পেল নবুদা এন্ড কোং। বলা বাহুল্য স্টেশন চত্তর অনেক দিন পর আবার সেই পুরনো মেজাজে কলরবিত হলো। চ্যালা চামুন্ডা ও শুভাকাঙ্খীদের আবদারে ওদের মুক্তি ও বড়দিনের জোড়া আনন্দ উজ্জাপিত হলো বাপুজি কেক সহযোগে আদা চা দিয়ে। এখানেই শেষ নয়, মোচ্ছব পুরো করতে রাতে পাঠার ছাঁট দিয়ে ঘুগনি,ফাটা পরোটা ও বাংলার আয়োজনও করা হলো। নবুদা প্রথম বার প্লাস্টিকের বোতলে ভরা বাংলু টেনে হেব্বি আনন্দ পেল, পচাকে বল্লো , ” দেখ ‘বাংলা’ কে কিরকম মোড়কে মুড়ে দিয়েছে, আবার নাম দিয়েছে জয়, এককথায় জয় বাংলা !! খোলো আর ঢালো, কাঁচের বোতল হলেই ভাঙ্গাভাঙ্গি-মারামারি এবার পেলাস্টিক দিয়ে কত প্যাঁদাবি, নে প্যাঁদা ! ”
হুলো তাতে জুড়ল , “বাংলার ঘরে ঘরে এবার ‘বাংলার’ কুটির শিল্প ছড়িয়ে পরবে। আহা কি সব নাম – দাদা, বাঘ, জয়, কেন ‘বাংলার’ নামই যখন দিচ্ছিস তখন দে না অরুপরতন , মনোহরণ কিম্বা পতিতপাবন !! ” পচা মাথা ঝাকিয়ে বলল , ” ধুর বোকা অত বড় নাম দিলে দোকানে লাইনে পোত্যেকের গড়ে ১০ মিনিট লেগে যাবে পুরোটা বলতে , দেখছিস না নতুন মেট্রো ইস্টিশানে টিকিট কাটতে কত ঝামালা। ” নবুদা এবার গলা খাঁকারি দিয়ে থুতু ফেলে বলল, ” আরে সামনে ইংরিজি বছর ঘুরছে, আর তোরা এখনও বাংলায় পরে আছিস ! আর তো জেল-সরকার খাওয়াবে না , বলি ডেইলি তিন দুগুনে ছটা মিলের জোগারটা কি করে হবে শুনি ?
এবার হুলো আর পচার একটু হুঁশ ফিরল, পচা একটু সাহস করে বলল , “তুমি রাত বিরেতে খামোখা টেনসন কোর না, একটা ব্যবস্থা ঠিক হবে খন। ”
হুলো কি একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই নবুদা বলল , “টেনসন করছি না , প্ল্যান আমি জেলে বসেই ছকে ফেলেছিলাম, এখন ভাবছি নামাব কি করে ?”
হুলো আর পচা অসীম উত্সাহের সাথে জিজ্ঞেস করলো , ” কি প্ল্যান, নবুদা?”
“ডিটেকটিভ এজেন্সী খুলবো !! ”
পচা কিরকম একটা যেন হতাশ হয়ে বলল , “আমরা গোয়েন্দা হলে তো চোর চিটাররা কেস নিয়ে আসবে , মানে সেই কেসগুলো সাল্টাতে গিয়ে আমরা কি আবার সেই গারদের ভেতরে ঢুকবো?”
হুলোর গলায় আবার উল্টো সুর ,” নাহ নবুদা আইডিয়াটা বেড়ে, তুমি গোয়েন্দা আর আমরা অ্যাসিস্ট্যান্ট, জমে যাবে ! আর এখন ব্যম্কেস টু ফেলুদা হেব্বি কাটছে মার্কেটে , চলো নিউ ইয়ারেই শুরু করে ফেলি। ”
নবুদা এবারে একটু ভরসা পেয়ে বলল, “হুম, শুরু তো করবই তবে আমাদের ব্যাপারটা হবে একটু অন্যরকমের, মানে এখনও পর্য্যন্ত দিশি বিদেশী সব সাহিত্যেই পুরুষ গোয়েন্দারা বেশ বুদ্ধিমান, ব্যায়াম করা জাঁদরেল চেহারা তাদের, ভারী গলার আওয়াজ ,ভদ্র ভাষায় কথা বলে আর তাদের মক্কেলরাও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বনেদী পাবলিক যাদের পেল্লায় পরিবারের কেউ না কেউ আসল কান্ডটা ঘটিয়েছে , সবই শার্লক হোমসের টুকলি। তবে উনি অবশ্য আমাদের মতন নেশা ভাং করতেন। ”
পচা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো , ” সেটা আবার কে?”
হুলোর জ্ঞানের দৌড় একটু বেশি তাই সে উত্তর দিল, ” বিলিতি গোয়েন্দা, বউ বাচ্চা নিয়ে এখন আমেরিকায় থাকে, হেব্বি নাম ডাক !”
নবুদা আবার শুরু করলো, “আসলে এখানকার গোয়েন্দাদের লেখকরা এমন করে তৈরী করে যাতে বাঙালি মধ্যবিত্ত পাঠকদের চোখে তাদের বীরপুরুষের মত লাগে। পাঠক কিম্বা দর্শকের তো সুরসুরি না লাগলে পয়সা উসুল হবে না। অপরাধ জগতের আসে পাশে এরা সারাদিন ঘোরা ফেরা করে ও বড়জোর চিনে রেস্তোরায় দু পেগ মদ গিলে রাতে বাড়ি ফিরে ভালো ছেলের মতো ঠিক সময় মতন ঢাকা দেওয়া মাছ ভাত খেয়ে শুয়ে পরে। এরা পকেটমারের সাথে মাঝরাতে চুল্লু খেতে খেতে ইনফরমেশন বার করে না , এরা শালা বানচোত বলে বস্তির আনাচে কানাচে লোকানো রেপিস্টদের উদমা ক্যালায় না। কোনদিন রিকশাওয়ালার হর্ন কিম্বা মাছওয়ালির বাটখারা চুরি নিয়ে কেস হয় শুনেছিস?এ সব কেস নিয়ে এরা কেউ মাথাই ঘামায়না। তাই চোর-চিটার নয় যারা আইনের কাছে সুবিচার পায়না সেই আম পাবলিকদের কেস আমরা নেব, হুলো তুই তাড়াতাড়ি একটা খালি চেম্বারের ব্যবস্থা কর আর পচা তুই দুটো চেয়ার, একটা টেবিল ও দু তিনটে টুলের জোগার লাগা । ”

পরের দিন হুলো উঠে পরে লেগে, লবি ও কায়দাবাজি করে বটতলার এক পাশে পরিত্যক্ত লটারির দোকানটা কব্জা করলো। পচা সেখানে ধারে কাল্লু কাবাড়িওয়ালার থেকে আনা ভাঙ্গাচোরা আসবাবপত্র দিয়ে ভরিয়ে দিলো। নবুদা দোকান খুলছে শুনে কাল্লু আবার দুটো ভাঙ্গা মোড়াও ফ্রিতে দিয়েছে। নবুদা স্বয়ং একটা কুঁজো, দুটো গ্লাস , একটা ক্যালেন্ডার, ডায়েরি,দুটো কলম, কিছু পুরনো ক্যালেন্ডারের উল্টো দিক থেকে কেটে বানানো সাদা কাগজ একটা বাঁশি ও একটা হাতল ভাঙ্গা ম্যাগনিফায়িং গ্লাস নিয়ে এলো।
হুলো জিজ্ঞেস লড়ল , “ওই বাঁশিটা দিয়ে কি হবে নবুদা?”
নবুদা বলল, “আহ বড় বড় অফিসে দেখিস না কিরকম পিঁক পিঁক করে বেল বাজিয়ে অ্যাসিস্ট্যান্টদের ডাকে, এটা দিয়ে খানিকটা সেরকমই কাজ হবে। ”
সব মোটামুটি জোগার হয়েছে সুধু দরকার একটা সাইনবোর্ড ও তাতে একটা যুতসই নাম ! পচার ইচ্ছে নাম হবে ইংরেজিতে – এই ‘রয়াল অলিম্পিক ডিটেকটিভ এজেন্সীর’ মত জমকালো। হুলোর আবার এই সার্কাস মার্কা নামে প্রবল আপত্তি , তার মতে নাম হওয়া উচিত বাংলায় এবং একেবারে ধোয়া ওঠা হাতে গরম পিঠের মতন যেরকম – ‘স্যাটাস্যাট সমাধান কেন্দ্র, এখানে হরেক রকম কেস সাল্টানো হয়ে থাকে, সাত দিনে ফল না মিললে ফুল টাকা ফেরত’ । নবুদার আবার এই ধরণের জ্যোতিষী মার্কা নমেনক্লেচারে বেজায় এলার্জি। তাই শেষ মেষ ঠিক হলো যেহেতু এটা অতি সাধারণ মানুষের সমস্যার সমাধানের সাথে জড়িত তাই এর নাম হবে ‘ছিন্নমূল সহায়ক সংস্থা ‘ , প্রথমেই সব্বাইকে বুঝতে দেওয়া যাবেনা যে এটা আদপে একটা গোয়েন্দা সংস্থা। হুলো একটা ভাঙ্গা টীনবোর্ড নিয়ে ছুটল সেই নাম লিখিয়ে আনতে। কিন্ত যাওয়ার পথে হুলোর ধাঙ্গরপারে বন্ধুদের সাথে অনেক দিন পর দেখা হয়ে যেতে সে একটু গপ্প গুজব শুরু করলো। সুখ দুখের কথা বলতে বলতে গাঁজার কল্কেতে দু একখানা টানও পড়ল , যা হয় আর কি। সুধু অনুপ পেন্টারের কাছে গিয়ে সংস্থার নাম লেখাতে গিয়ে খেয়াল পড়ল যে সে নামটা কিরকম ভুলে ভুলে যাচ্ছে। খৈনি দিয়ে গাঁজা টেনে এরকম শর্ট সার্কিট হুলো অনেক বার হয়েছে, যেটুকু মনে আছে পাছে সেটাও সে ভুলে যায় তাই বলল , ” অনুপ্দা, এই নাও টিনের পিস্। একটু পিটিয়ে সোজা করে, ঘষে টসে পরিষ্কার করবে আর বড় বড় করে সাদার ওপর নিল দিয়ে লিখবে….দাড়াও…হুম লিখবে ‘ছিন্নমস্তা গোয়েন্দা সেন্টার ‘। ”

নবুদা তো সাইন বোর্ড দেখে ক্ষেপেই ফায়ার , একটা কাজ যদি ঠিক ঠাক হয়েছে এই হুলোটাকে দিয়ে। কিন্ত মা কালির নাম ও ইংরেজি ভাষা থাকার দরুন পচা আর হুলো দুজনেরই নামটা প্রচন্ড মনে ধরল। নবুদার প্রবল আপত্তি থাকা সত্তেও তাতে শেষমেশ আর কোনো পরিবর্তন করা গেল না। অবশেষে পয়লা জানুয়ারী স্টেশন চত্বরের অদুরেই জনা দশেক ভিকিরি, বুটপালিশওয়ালা ও দুটো পাগলের উপস্থিতিতে উদ্বোধন করা হলো ‘ছিন্নমস্তা গোয়েন্দা সেন্টারের ‘ ও সেই ‘নার্স আয়া সাপ্লাই সেন্টারের’ মতন দেখতে সাইনবোর্ডটা ত্যাড়াব্যাঁকা ভাবে ঝোলানো হলো বৃদ্ধ বটবৃক্ষের গায়।

(ক্রমশ)

আবার নবুদা -১
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments