মনে আছে তো সেই বিখ্যাত ঠাঁইবদলের কথা ? অসময়ে গান ধরে যে দোষ করে ফেলেছিল বিদেশিরা তারপর রাজার নিদান – “বিদেশী! তা হলে নিয়ম খাটবে না। একবার সকলে ঠাঁই বদল করে নাও, তা হলেই দোষ যাবে কেটে”। অথচ কি মজা দেখুন, সেই বিদেশিরা তো রাজাকে খুশিই করতে চেয়েছিল, কিন্তু কে জানত হিতে বিপরীত হবে। যাকগে, এসব সে রাজরাজড়ার যুগের কথা, আমাদের মত প্রজাদের এসব ভেবে কি লাভ।

এরপরে নিশ্চয় অনেকেই প্রশ্ন করবেন ভেবে যদি সেরকম কোনও লাভই নেই তখন অনর্থক ঢেঁকির সামনে বসে শিবের গাজন ধরেছ কেন হে মূর্খ ? বলেছেন ঠিকই। কিন্তু এত কথা বলার কারণ ঐ দোষ এবং দোষ কাটাতে ঠাঁইবদল। প্রশ্ন উঠে যায় তখন, যখন দেখা যায় সেরকম কোনও দোষ না থাকা সত্ত্বেও ঠাঁইবদল ঘটে। আজ্ঞে হ্যাঁ, বহুদিন হল একটি এইরকম ঠাঁইবদল নিয়ে কথা উঠেছিল, এখনও আড়ালে আবডালে চলছে। যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বই এবং তার পরিসীমা বরাবর বিখ্যাত পিতা-পুত্র। বইটির নাম – আবোল তাবোল। বাকিদের পরিচিতি নিঃসন্দেহে নিষ্প্রয়োজন।

এই ঠাঁইবদল-এর কাহিনীতে প্রবেশ করার আগে যেসব কুশীলবদের সাহায্য পেয়েছি তাদের সম্বন্ধে সংক্ষেপে কিছু কথা

আবোল তাবোল – নব-সংস্করণ ১৩৫১, প্রকাশক সিগনেট প্রেস

জন্মশতবার্ষিকী সংস্করণ সুকুমার সাহিত্যসমগ্র, প্রথম খন্ড – সম্পাদক সত্যজিৎ রায় ও পার্থ বসু, প্রথম সংস্করণ – ১৯৭৩, দ্বিতীয় মুদ্রণ ১৯৯৫, প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড

আবোল তাবোল প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯শে সেপ্টেম্বর ১৯২৩ তারিখে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ইউ রায় অ্যান্ড সন্স এই বইটির প্রকাশক ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সুকুমারের মৃত্যুর মাত্র আড়াই বছরের মাথায় এই প্রকাশনা সংস্থার হাতবদল হয় এবং যদ্দূর জানা যায় ১৯৩৮ সাল নাগাদ সেই মালিকানাধীন প্রকাশনা সংস্থা থেকেই এই বইটির ষষ্ঠ তথা খুব সম্ভবত এই প্রকাশনা সংস্থা থেকে শেষ সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

এর আরও পাঁচ বছর পরে প্রতিষ্ঠিত হয় সিগনেট প্রেস। প্রতিষ্ঠার এক বছর পরে প্রকাশিত হয় আবোল তাবোল – নব-সংস্করণ। অর্থাৎ লেখকপুত্র তখন তেইশ বছর বর্ষীয় নবীন যুবক। এই বইটির প্রিন্টার্স লাইন থেকে জানা যায় এই বইটির কিছু ছবি সত্যজিৎ রায় এঁকেছিলেন। যদিও বইটি দেখে খুব পরিষ্কার করে বোঝা মুশকিল যে ঠিক কোন ছবি ওঁর আঁকা। সেটা বুঝতে ব্যর্থ হলেও এইটুকু অন্তত বোঝা যায় যে আবোল তাবোল খুব সম্ভবত এই নব-সংস্করণেই প্রথমবার পরিবর্তিত হয় যদিও সেখানে সত্যজিৎ রায়ের কোনও ভূমিকা ছিল কিনা সে বিষয়ে আমার সংশয় আছে। যেমন ইউ রায় অ্যান্ড সন্সের আবোল তাবোল না দেখতে পাওয়ার কারণে এটাও অজানা যে এই নব-সংস্করণ কোনও ঠাঁইবদলকে প্রশ্রয় দিয়েছিল কিনা। যদিও সন্দেহ উস্কে দেয় বইটির শুরুতেই “মূল-সংস্করণে যা কিছু ছিলো সবই এ নব-সংস্করণে বর্তমান – অদল-বদল শুধু সজ্জা-বিন্যাসে” (বানান গ্রন্থানুগ) এই স্বীকারোক্তি।

যাই হোক, এবারে আসা যাক দ্বিতীয় ঠাঁইবদলের প্রসঙ্গে (যদি সিগনেট প্রেসের নব-সংস্করণে প্রথম ঠাঁইবদলটি হয়ে থাকে)। এরপর থেকে ১৯৪৪ এবং ১৯৭৩ এইভাবে বইদুটির উল্লেখ করব।

প্রথমেই একটি কথা। ১৯৪৪ সালের বইটিতে দেখা যাচ্ছে একটি কৈফিয়ৎ। “যাহা আজগুবি, যাহা উদ্ভট, যাহা অসম্ভব, তাহাদের লইয়াই এই পুস্তকের কারবার। ইহা খেয়াল রসের বই, সুতরাং সে রস যাঁহারা উপভোগ করিতে পারেন না, এ পুস্তক তাঁহাদের জন্য নহে। গ্রন্থকার" (বানান গ্রন্থানুগ)। গ্রন্থকারকৃত এই কৈফিয়তটি ১৯৭৩ সালে অদৃশ্য। অবশ্য পুরোদস্তুর অদৃশ্য এমন কথা বলা ভুল, এটি প্রথম খন্ডের শেষে পুস্তক পরিচয় অংশে স্থানলাভ করেছে। ঠিক এইভাবেই ১৯৪৪ এবং ১৯৭৩ ছড়াগুলিও এদিক ওদিক। ১৯৪৪ সালে ‘গানের গুঁতো’ ছয় নম্বর স্থান দখল করলেও ১৯৭৩ সালে আট নম্বরে পিছিয়ে গেছে। একইভাবে ‘খুড়োর কল’ নড়তে নড়তে সপ্তম স্থানচ্যুত হয়ে দশম স্থানে স্থির হয়েছে। তবে শুধু পিছিয়ে যাওয়া নয়, ভাল ফলও করেছে কেউ কেউ। ১৯৪৪ সালে অষ্টাদশস্থানাধিকারী ‘ভাল রে ভাল’-র ঊনত্রিশ বছর পেরিয়ে এসে ষষ্ঠস্থান দখল কিংবা একবিংশস্থান থেকে ‘শব্দ-কল্প-দ্রুম’-এর নবম স্থান অধিকার এর উদাহরণ। যদিও সুচীপত্রে ‘শব্দ-কল্প দ্রুম’-কে হাইফেনটি ত্যাগ করতে হয়েছে।

অবশ্য এর চেয়েও অনেকবড় বিস্ময় সূচীপত্রে অপেক্ষা করে আছে। ১৯৪৪ সালে তালিকায় মোট সাতচল্লিশটি ছড়ার হদিশ পাওয়া গেলেও ১৯৭৩ সালে একটি কমে এসে ছেচল্লিশটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। এমন হওয়ার কারণ কি ?

আমার ব্যক্তিগত ধারণা এই কমে যাওয়ার সাথে ঠাঁইবদলের একটা যোগসূত্র রয়েছে এবং সেই যোগসূত্রের সাথে সাহিত্য ইত্যাদি সম্পর্করহিত। খুব সম্ভবত পাতার হিসেব ঠিক রাখতে এই সংক্ষিপ্তকরণ এবং ঠাঁইবদল। এই অবধি পড়ে অনেকেই, বিশেষত যাঁরা আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত দুটি গ্রন্থে ‘আবোল তাবোল’ পড়েছেন তাঁরা ভাবতে পারেন তবে কি পুরো ‘আবোল তাবোল’ পড়া হয়ে ওঠেনি, তাঁদের আশ্বস্ত করার জন্যে বলি – আবোল তাবোল-এর মোট সাতটি ছড়া শিরোনামবিহীন (ঊনত্রিশ বছরের ব্যবধানে এরাও নিজেদের মধ্যে জায়গা বদল করেছে)। এই সাতটি ছড়ার দুটি ‘মাসি গো মাসি’ এবং ‘বলব কি ভাই হুগলি গিয়ে’ এই দুটি ছড়া একসাথে ‘মাসি গো মাসি’ এই শিরোনাম বাহিত হয়ে ১৯৪৪ সালে সূচীপত্রে স্থান পেলেও বইটিতে শিরোনামহীন অবস্থায় প্রকাশিত হয়।

এই সব ঘটনাই ঘটেছে লেখকের মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। খুব সম্ভবত ইউ রায় অ্যান্ড সন্সের হাতবদলের পরে রায় পরিবারের কোনও সদস্যের বইয়ের কপিরাইট তাঁদের উত্তরাধিকারদের কাছে ছিল না কারণ এই প্রকাশনা সংস্থা থেকে পরবর্তী সময়ে কেউ কোনো রয়্যালটি পাননি। এটা মেনে নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যায় ১৯৩৮ সাল যে বইয়ের শেষ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে, মাত্র ৩৫ বছরের মধ্যে সেই বই কি এতটাই দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেল যে মূল বইটিকে অক্ষুণ্ণ রাখা কঠিন হয়ে উঠল। অস্বস্তি আরও বাড়ে যখন দেখি সাম্প্রতিককালে একটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে মূল বইটি পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে।

ঐতিহাসিক দিক দিয়েও আবোল তাবোল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বই। কারণ এই একটিমাত্র বইয়ের বুকমেকিং সুকুমার করে যেতে পেরেছিলেন। সেই বুক মেকিং কিভাবে হয়েছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ, ছড়াগুলি কিভাবে সুকুমার পাল্টে ফেলেছিলেন সে সবই রয়েছে জন্মশতবার্ষিকী সংস্করণ সুকুমার সাহিত্যসমগ্রে, শুধুমাত্র মূল বইটিই ব্যতিক্রম। এই বইটি যে গুরুত্ব, যে সম্মান দাবি করত, সেই গুরুত্ব, সেই সম্মান আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত দুটি সমগ্রে (একটি শিশুসাহিত্য, অন্যটি সাহিত্যসমগ্র) অন্তত অনুপস্থিত।

তো, এই হল অবস্থা। যদিও এ অবস্থাতেও 'আবোল তাবোল' একই রকম সুস্বাদু রয়ে গেছে। গ্রন্থকার তো বলেই দিয়েছেন ‘খেয়াল রসের বই’। খেয়াল রস নিয়ম মেনে চললেই তো বরং বিপদ। তবু একটা কথা বলতেই হচ্ছে। যতদিন ১৯৪৪ সালের বইটি চোখের বাইরে ছিল তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে অজ্ঞাত ছিলাম, ততদিন মনটা বেশ ফুরফুরে ছিল, কিন্তু দুটি রঙে মুদ্রিত এই বইটি দেখে প্রিয় গায়কের দুটি লাইন বারেবারেই গুনগুনিয়ে উঠছি

“কখনও সময় আসে, জীবন মুচকি হাসে, ঠিক যেন পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা”

ওহ, বলতে ভুলে গেছি – ১৯৪৪ সালে সুকুমারের আরও দুটি বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছিল – একটি বহুরূপী, দাম এক টাকা বারো আনা, অন্যটি ঝালাপালা, দাম দু’টাকা। এবারে যে বইটি পড়ে এত কথা মনে এল তার দাম – একটু বেশিই – দু টাকা বারো আনা

আবোল তাবোল মূর্খামি
  • 4.67 / 5 5
3 votes, 4.67 avg. rating (90% score)

Comments

comments