আরও একটি শিশুধর্ষণের ঘটনার সামনে আসা, আবারও জনগণের (পড়ুন নেটিজেনদের) ক্ষোভে ফেটে পড়া… এই সবই নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা এখন। চারিদিকে কেবল ক্ষোভ আর ক্ষোভ, ফাঁসি হোক, পিটিয়ে মেরে ফেলা হোক, যৌনাঙ্গ কেটে নেওয়া হোক, এই দাবি। আবার এ-ও দাবি, সমস্ত ধর্ষণের সমান প্রতিবাদ কেন হবে না? 'সিলেক্টিভ আউটরেজ' নামক এক বহুব্যবহৃত অভিযোগের মাধ্যমে এর ওর হিপোক্রিসি ধরতে আমরা ব্যস্ত। এ সব হয়ে চলেছে, হয়েই চলেছে। তারপর ক'দিন পরে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া। তারপর আবার ফিরে দেখা, এত্ত এত্ত আউটরেজের পরও কেন ধর্ষণের ঘটনা কিছুতেই কমছেনা? তার মানে প্রয়োজন আরও, আরও কড়া শাস্তি, বা আরও নিখুঁত হিপোক্রিট ধরার ফাঁদ! অতএব, আই = আই+১।
 
এই দুই প্রসঙ্গে কিছু কথা বলার।
 
প্রথম, ধর্ষণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি দমনপীড়নের অস্ত্র এবং কখনও দুর্বলের থেকে জোর করে কিছুটা যৌনক্ষুধা মিটিয়ে নেবারও অস্ত্র। এই অস্ত্র হাতে গোনা কয়েকটি জঘন্য অ্যান্টিসোশাল/ক্রিমিনাল, বা ভিনগ্রহী মানুষের হাতে নেই, যে তাঁদের টাঙিয়ে দিলেই সমাধান হয়ে যাবে। যদি তাই হত তবে প্রতি ঘন্টায় ৪টে করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটতনা, বা রেপ পর্ন রমরমিয়ে চলতনা। এই অস্ত্র সরবরাহ করছি আমরা, গোটা সমাজ, প্রতি মুহূর্তে, আমাদের পিতৃতান্ত্রিক ধর্ষণ সংস্কৃতির আবহে। সেই সরবরাহ বন্ধ না হলে ক'জনকে টাঙাবেন? তর্কের খাতিরে ধরা গেল কঠিন শাস্তি দিলে অপরাধী ভয়ে অপরাধ করবে না। কম পক্ষে সাত বছর থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, বিশেষ ক্ষেত্রে ফাঁসি, এগুলো কি খুব কম শাস্তি? যে অপরাধী এই শাস্তির ভয় পায় না, তাকে আরো কঠিন শাস্তির ভয় পাওয়ানো যাবে তো? নাকি ব্যাপারটা একটু অন্যরকম? একটু তলিয়ে দেখা যাক। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর শেষ রিপোর্ট বলছে লক্ষাধিক ধর্ষণের কেস আদালতে ঝুলে আছে। তার মধ্যে শেষ পর্যন্ত কনভিকশন হবে হয়তো মাত্র ২৫-৩০% এর (গত কয়েক বছরের হিসাব অনুযায়ী)। সেও কবে হবে তার কোনো ঠিক নেই (প্রতি বছর যতগুলি রেপ কেসের ট্রায়াল হয় তার মাত্র ১২-১৫% কেসের ফয়সালা হয় সেই বছর)।
              এই সমস্ত রেপ কেসের ৯৫% ক্ষেত্রে অভিযুক্ত (কি আশ্চর্য!) অন্ধকার গলির অসামাজিক ক্রিমিনাল নয়, অভিযোগকারিনীর পূর্বপরিচিত কোনো ব্যক্তি, প্রায় ৪০% ক্ষেত্রে পরিবারের কেউ অথবা প্রতিবেশী! এই নিয়ে যাঁরা কাজকম্ম করেন তাঁদের কথা অনুযায়ী এই সমস্ত রেজিস্টার্ড কেস আসলে হিমশৈলের উপরিভাগ। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ জমাই পড়েনা, লোকলজ্জার ভয়ে, পুলিশের অসহযোগিতায়, অথবা আইনের ফাঁক গলে (উদাঃ বৈবাহিক ধর্ষণ)। ওপরের কথাগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে অপরাধীর পক্ষে ধরা পড়া এবং শাস্তি পাওয়ার চেয়ে পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এই সম্ভাবনার হিসাবকে যতক্ষণ না উলটে দিতে পারছি, শাস্তির ভয় দেখিয়ে কাজ হবার সম্ভাবনাও কমই থেকে যাবে। পাবলিক আউটরেজ সামলাতে কঠিনতর শাস্তির আইন পাশ হবে তড়িঘড়ি, কিন্তু তাতে ধর্ষণের ঘটনা বোধ করি বিশেষ কমবেনা। ক্রাইম ব্যুরোর সাম্প্রতিক রেকর্ডও সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। তবু দ্রুত বিচারের দাবি, সঠিক পদ্ধতিতে তদন্তের দাবি, পুলিশি এবং সামাজিক সহযোগিতার দাবি, এগুলোর চেয়ে যৌনাঙ্গকর্তনের দাবিটাই বার বার উঠে আসে কেন? সহজে প্রতিহিংসা মিটিয়ে নেওয়া যায় বলে? আমরা ক্ষুব্ধ, সেটাই স্বাভাবিক, কিন্তু ক্ষোভকে সঠিক পথে চালনা করতে আমরা কবে শিখব? নিজের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা স্লাট শেমিং, ভিক্টিম ব্লেমিং, এর বিরুদ্ধে তো বলাই যায়, অন্তত আমার আশেপাশের ক্ষেত্রটুকুতেই কমানোর চেষ্টা করা যায় এই ধর্ষণ সংস্কৃতি। অথবা চোখের সামনে ঘটা মোলেস্টেশন দল বেঁধে রুখে দেওয়া, কিম্বা পুলিশ অভিযোগ নিতে না চাইলে দল বেঁধে তার প্রতিবাদ? নাঃ, "টাঙিয়ে দেওয়া হোক" বলে দায় মেটানোই বরং সহজ।
 
দ্বিতীয় প্রসঙ্গ। সিলেক্টিভ আউটরেজ। কথাটা বেশ চালু। সত্যি কতটা? প্রোপাগান্ডাই বা কতটা? আসলে একে অপরকে জাজ করতে পেলে আমরা কিছু চাইনা। কে বড় হিপোক্রিট সেটা প্রমাণ করাটাই যেন সমাধান! একটু তলিয়ে ভাবা যাক, ঘন্টায় ৪টে করে হয়ে চলা ধর্ষণের কতগুলো নিয়ে পাবলিক আউটরেজ হয়? বলাই বাহুল্য, নগন্য। তার মানে এই আউটরেজের ব্যাপারটা আসলে পুরোটাই সিলেক্টিভ, এটা গোড়াতেই স্বীকার করে নেওয়া যাক। এবার প্রশ্ন হল, এই সিলেকশনের ভিত্তি কি? প্রধান কারণ হিসাবে বলা যেতে পারে কোনো ঘটনা বেশি খবরে আসার পিছনে রয়েছে ধর্ষণের ভয়াবহতা, আক্রান্তের পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের নিজেকে রিলেট করতে পারা, এবং অবশ্যই রাজনৈতিক কারণ। প্রথম কারণটি ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়টি প্রসঙ্গে এ কথা মনে করিয়ে দিতে হয় যে এই পাবলিক আউটরেজ মূলত শহর এবং মফঃস্বলের মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের। নিম্নবিত্তের আউটরেজ নেই তা নয়, কিন্তু মিডিয়া আমাদের সামনে সেগুলো নিয়ে আসে তুলনায় কম। তাই জ্যোতি সিং এর ধর্ষণের ঘটনা, যেটার সঙ্গে এই শহুরে জনতা অনেক বেশ একাত্ম বোধ করতে পারে (এবং যা প্রচন্ড ভয়ঙ্করও), তাতে প্রতিবাদ উঠে আসে বেশি, গ্রামকে গ্রাম আদিবাসীদের ধর্ষণের চেয়েও বেশি।
               এই ধরনের প্রতিবাদ কিসের বিরুদ্ধে? নিশ্চয়ই "ও কেন ধর্ষণ করবে? এর প্রতিবাদ করছি", এমনটা ন্যাকা বক্তব্য নয়। এই প্রতিবাদ কখনও ধর্ষকের প্রতি শাসকের সমর্থনের বিরুদ্ধে, কখনও রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে, আর অল্প কিছু ক্ষেত্রে ওই ধর্ষণ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। দলমতনির্বিশেষে সরকারী নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহির্প্রকাশ যে সঙ্গত, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। শাসকের ধর্ষককে তোল্লাই দেবার ঘটনায় প্রতিবাদ হয় সাধারণত রাজনৈতিক দিক থেকেই, এবং সেটাও খুবই স্বাভাবিক। যদি শাসকদলের কাছের মানুষদের বিরুদ্ধে আনা কেসে সাক্ষীরা বেমালুম খুন হয়ে যান, বা শাসকদলের প্রোমোট করা আইডিওলজি বুক বাজিয়ে ধর্ষকের সপক্ষে মিছিল করে, আক্রান্তের আইনজীবিকে ক্রমাগত থ্রেট দেয়, আর শাসকদল থেকে তার কোনো প্রত্যক্ষ বিরোধিতার সুর শোনা না যায়, সেই রাজনৈতিক আইডিওলজিরও বিরোধিতাও হবেই, রাজনৈতিকভাবেই। যেটা হওয়া কাম্য নয়, তা হল কেবলমাত্র ধর্ষকের নাম খুঁজে বার করে তার ধর্মের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার। "ওরা যখন করে তার বেলা?" এই সাম্প্রদায়িক তরজা। এই হোয়াটঅ্যাবাউটারির যুগে দাঁড়িয়ে সাম্প্রতিক দাবি আক্রান্তের ধর্ম মুসলমান এবং ধর্ষকের ধর্ম হিন্দু হলে তবেই নাকি প্রতিবাদ হয়! এই প্রসঙ্গে আসিফা এবং মধ্যপ্রদেশের সাম্প্রতিক শিশুধর্ষণের ঘটনার তুলনা শুরু হয়ে গেছে। শুরু হয়ে গেছে রাজনৈতিক তরজা এবং কোনটি বেশি ভয়ঙ্কর তার চুলচেরা বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক দিক থেকে দুটোর তফাত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও আমরা দেখছিনা, অন্যকে ভুল আর নিজেকে ঠিক প্রমাণের তাগিদে। এই বিশ্লেষণে নেই কোনো কমপ্যাশন, কোনো সমাধানের দিশা, শুধু পড়ে আছে "আমরা-ওরা"র জঞ্জাল আর উগরে দেওয়া ঘেন্না। রাজনৈতিক ভাবে চরম পোলারাইজড একটি সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি, তবে ধর্ষণের ঘটনাকেও এভাবে পোলারাইজড হতে দেখতে হবে এমন আশঙ্কা এত দিন ছিল না। ধর্ষিতা হিন্দু, না মুসলমান? ধর্ষকের নাম কি? সে হিন্দু না মুসলমান? এই প্রশ্নগুলো আজকাল আগের চেয়ে বেশিই জেগে উঠছে আমাদের মনে। বন্ধু থাংকমনি এই প্রসঙ্গে লিখেছেন "কে ধর্ষণ করেছে, আপনার এই কৌতুহল এক বিপজ্জনক ট্রেণ্ডের জন্ম দিচ্ছে "। ঠিকই। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলোর আইটি সেল খুঁজে খুঁজে অপর ধর্মের ধর্ষকের নাম বার করবে, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। হিপোক্রিট খোঁজার নেশায় মত্ত হয়ে আপনিও সেই স্রোতে গা ভাসাবেন কিনা সেই চয়েসটা কিন্তু আপনার।
 

পুনশ্চ – মধ্যপ্রদেশের শিশুধর্ষণের ঘটনা বলতে মন্দসৌরের ঘটনার কথা বলেছি। তার ক'দিন পরেই মধ্যপ্রদেশেই ঘটা চার বছরের মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনার কথা নয়, যা প্রতিনিয়ত ঘটে চলা আরো বহু ঘটনার মতই আমাদের চোখ এড়িয়ে যাবে, বা আউটরেজের উপযুক্ত বলে গণ্য হবেনা। সে ভালোই হবে, চোখের বদলে চোখ খুবলে নেওয়ার জিঘাংসা প্রকাশ করা আর হিপোক্রিট ধরার খেলার বাইরে আমাদের ওই আউটরেজের কোনো গুরুত্ব যখন নেই, সে আউটরেজ হলেই বা কি, আর না হলেই বা কি?

 

আমাদের ক্ষোভ আর কিছু তেতো কথা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments