গুজব সৃষ্টি, প্রকাশ এবং প্রচার হইতে বিরত থাকুন

ইহা সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত একটি কাল্পনিক কাহিনী। ইহার সহিত যদি কেহ কোনও হোয়াটস অ্যাপ কিংবা ফেসবুক গ্রুপ অথবা তাহার পরিচালক / পরিচালকবৃন্দ অথবা সেইসব গ্রুপের কোনও সদস্য / সদস্যার কোনও মিল খুঁজিয়া পান তবে তাহা কাকতালীয়

ধূমপান কর্কটরোগের কারণ

মদ্যপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর

 

শিশুকাল হইতেই আমার বড় সখ ছিল আমি ইতিহাস পড়িব। পিতার কঠিন শাসনে বিজ্ঞান সাধনা করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম বলিয়া আমার সে সাধ অপূর্ণ রহিয়া যায়। কিন্তু মনে মনে ইহা নিশ্চয় জানিতাম সুযোগ হইলে আমি একদিন ইতিহাস পড়িব। সে সুযোগ যখন আসিল তখন আমি বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াছি।

একদা প্রত্যুষে গৃহে একখানি লিফলেট কুড়াইয়া পাইয়া তাহা পড়িয়া দেখিলাম যে কোনও এক স্থলে কোনও এক মহাত্মা বিনা পারিশ্রমিকে প্রকৃত ইতিহাস শিক্ষার ব্যবস্থা করিয়াছেন। সংবাদ লইয়া জানিলাম সে স্থলে দিনের বেলা তো বটেই এমনকি রাত্র নয়টা-সাড়ে নয়টার পূর্ব্বে পড়াশোনা করিবার সুবিধা নাই। আরও জানিলাম প্রতিষ্ঠানে সকল শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক এই সময় হইতেই ইতিহাস চর্চ্চা শুরু করেন। শুনিয়া বক্ষে শেল বিঁধিল। তবে কি এক্ষণেও আমার ইতিহাস শিক্ষার আয়োজন বৃথা যাইবে। তবু আশায় বাঁচে চাষা। এবং এতদিনে ঈশ্বর মুখ তুলিয়া চাহিলেন। যে গৃহিণী রাত্রে একাকিনী থাকিবে এই আশঙ্কায় আমার চিত্ত বিকল হইয়াছিল সেই গৃহিণী আমার হস্ত তাঁহার মস্তকোপরি স্থাপন করিয়া কহিলেন যে তাঁহার মাথার দিব্বি আমি যেন অবশ্য অবশ্য আপন ইচ্ছা পূর্ণ করি।

এইরূপে সাহস অর্জ্জন করিয়া আমি সেই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আরও বিস্তারিত খোঁজখবর লইয়া জানিলাম যে উক্ত লিফলেট লইয়া প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাইতে পারিলেই প্রবেশাধিকার পাওয়া সম্ভব। ভর্ত্তি হইবার কোনও নির্দ্দিষ্ট দিনক্ষণ নাই। যে কোনও দিন ভর্ত্তি সম্ভব। এমত অবস্থায় পঞ্জিকা দেখিয়া এক শুভক্ষণে গৃহদেবতার উদ্দেশ্যে অনেকানেক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া আমি প্রতিষ্ঠানে গমন করিলাম।

একেবারেই প্রথমদিন একটি বড় হলঘরে সমস্ত নবীন শিক্ষার্থীর বসিবার ব্যবস্থা হইল। এতক্ষণ পর্য্যন্ত কোনও প্রকার অসুবিধা হইল না। আমি বসিয়া আছি, কেহ বা নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করিতেছেন এমন সময় প্রধানশিক্ষক মহাশয় স্বয়ং প্রবেশ করিলেন। প্রত্যেকে প্রথমাবধি জানিতেন যে প্রধানশিক্ষক প্রশ্ন করিলে আপন আপন পরিচয় প্রদান করিতে হইবে। কিন্তু তাহা কি প্রকারে হইবে সে বিষয়ে বোধ করি অনেকেই সংশয়াবিষ্ট ছিলেন। প্রধানশিক্ষক প্রত্যেকের নিকটে যাইয়া যখন পরিচয় জানিতে চাহিলেন তখন কেহ বা আধার কার্ড বাহির করিয়া দিলেন, কেহ বা রেশন কার্ড বাহির করিলেন। একজন কহিলেন তিনি আধার কার্ডের নিমিত্ত দরখাস্ত করিয়াছেন সেই দরখাস্ত জমা করিবার প্রমাণপত্রটি আপনার সহিত লইয়া আসিয়াছেন। বুঝিতে পারিতেছিলাম প্রধানশিক্ষক কুপিত হইতেছেন কিন্তু নীরব রহিয়াছেন। তাঁহার ধৈর্য্য বড় বেশিক্ষণ অটুট রহিল না। এক শিক্ষাপ্রার্থী পরিচয় দিবার ছলে একখানি আপন ফোটোগ্রাফ বাহির করিতেই তিনি ক্রোধে ফাটিয়া পড়িয়া যাঁহারা নিজ পরিচয় প্রদানের কারণে নাম এবং বাসস্থানের নাম বলা ভিন্ন অন্য অন্য উপায় অবলম্বন করিয়াছিল তাঁহাদের প্রত্যেকের প্রবেশাধিকার রদ করিয়া দিলেন। আমি নিয়মমাফিক কর্ম্ম করিয়া সর্ব্বশক্তিমান পরমেশ্বরের কৃপায় শ্রেণীতে প্রবেশ করিবার অনুমতি লাভ করিলাম।

শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করিয়া বুঝিলাম যে সেই স্থলে পূর্ব্ব হইতেই আরও অনেক শিক্ষার্থী উপস্থিত হইয়াছেন। কেহ আমার ন্যায় নবীন, কেহ বা পুরাতন। যাহা হউক, আমি একটি স্থান নির্ব্বাচন করিয়া বসিলাম। আমার ন্যায় নবীনেরা অধিকাংশই নিশ্চুপ বসিয়া ছিলেন এবং পুরাতনেরা নিজেরা আলোচনা করিতেছিলেন। সেই আলোচনায় কান পাতিয়া একটি পরিচিত শব্দ কর্ণে আসিল। শব্দটি হইল – তাজমহল। তাঁহাদিগের নিকটে গিয়া বলিলাম তাজমহল সম্পর্কে তাঁহারা যে আলোচনা করিতেছেন, অনুমতি পাইলে আমি তাহা শুনিতে ইচ্ছুক। আমার ইচ্ছা শুনিয়া আমাকে একজন প্রশ্ন করিলেন আমি তাজমহলের নাম শুনিয়াছি কিনা, শুনিলে সে বিষয়ে কি জানি। আমি বিদ্যালয়ে পাঠরত থাকিবার কালে তাজমহল শুনিয়াছিলাম, বলিলাম। আরও যাহা শুনিয়াছিলাম তাহাও বলিলাম। এমনকি এও বলিলাম যে শুনিয়াছি কোন এক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তাহাকে বিশেষ স্বীকৃতি প্রদান করিয়াছে। আমার উক্তি শুনিয়া সেই দলের একজন কহিল আমি এই বিষয়ে যাহা জানি তাহা মিথ্যা। এই মিথ্যা কমিউনিস্ট ঐতিহাসিকগণ বিশেষ উদ্দেশ্য লইয়া প্রচার করিয়াছে। এমত বাক্য শুনিয়া কিঞ্চিৎ হতোদ্যম হইয়া সত্য জানিতে ঔৎসুক্য প্রকাশ করিলাম। যাহা শুনিলাম তাহাতে রক্ত উষ্ণ হইয়া উঠিল, শোণিতপ্রবাহ দ্রুত হইল। শুনিলাম তাজমহলের নিম্নে তেজো মহালয়া নামক এক হিন্দু শিবমন্দির নিস্তেজ হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। আমি শিশুকাল হইতে পিতামহীর আশ্রয়ে যে ধর্ম্মশিক্ষা করিয়াছি, সেই হিন্দুধর্ম্মের এই অবমাননা জানিয়া হৃদয় বিদীর্ণ হইল। প্রশ্ন করিলাম এখন উপায়। তাঁহারা জানাইলেন যে আমি যেন এই কথা এতজনকে বলি এবং তাহাদিগকেও যেন এতজনকে বলিতে বলি যাহাতে জনমানস হইতে ভ্রান্ত ধারণা দূর হইয়া যায় এবং একমাত্র তাহা হইলেই স্বীকৃতিপ্রদানকারী সংস্থা বাধ্য হইবে সত্য মানিয়া লইতে। আমি সম্মত হইলাম।

এই সমস্ত কাহিনী শুনিতে শুনিতে খেয়াল হয় নাই কক্ষে বেশ গোলযোগ শুরু হইয়াছে। “এক্ষণেও কেন পঠনপাঠন শুরু হইল না” এই রব তুলিয়া অনেকেই উচ্চৈস্বরে প্রতিবাদ জানাইতেছেন। এমন সময় পুনরায় সেই মহাত্মা প্রধানশিক্ষক কক্ষে প্রবেশ করিয়া জানাইলেন লিফলেট লইয়া অনেকেই আসিয়াছেন সেই কারণেই বিলম্ব। তবে অচিরেই পাঠদান শুরু হইবে। প্রধানশিক্ষক কক্ষের ডানদিকে একখানি বিচিত্র (কেন বিচিত্র পরে বলিব) বোর্ড দেখাইয়া বলিলেন যে যাহা জানিতে চায় তাহা যেন ঐ বোর্ডে লিখিয়া দেয়। এই বাক্য শুনিয়া কেহ কেহ উক্ত বোর্ডের নিকটে গিয়া ফুল আঁকিল, কেহ বা একখানি পাখির ছবি আঁকিল। আমি আমার স্থানে বসিয়া রহিলাম। একে একে আমার উভয়পার্শ্ব হইতে কতিপয় নবীন শিক্ষার্থী ‘আর কতক্ষণ এই প্রকারে অপেক্ষা করিতে হইবে’ বলিয়া বিরক্তি প্রদর্শন করিয়া শ্রেণীকক্ষ ত্যাগ করিল। ইঁহাদের দেখিয়া একবার আমিও বিরক্ত বোধ করিয়া ভাবিলাম এই স্থান ত্যাগ করাই সঙ্গত। কিন্তু করুণাময় ঈশ্বর তৎক্ষণাৎ আমাকে আমার আপন সহধর্ম্মিনীর কথা স্মরণ করাইয়া দিলেন। সে হতভাগিনী কত ক্লেশ শিকার করিয়া শয্যায় একাকিনী নিশি যাপন করিতেছে তাহা মনে আসিতেই বিরক্তি নামক পাষণ্ড প্রবৃত্তি আমার অন্তর হইতে একেবারে দূরীভূত হইল। আমি দৃঢ় সঙ্কল্প করিলাম যে কোনো প্রকারেই হউক, ইতিহাস শিক্ষা ব্যতিরেকে এই স্থান পরিত্যাগ করিব না।

 

 

(মধ্যপর্বের অপেক্ষায় থাকিলে বাধিত হইব)

 

 

আমার ইতিহাস শিক্ষা – আদি পর্ব (U/A)
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments