গুজব সৃষ্টি, প্রকাশ এবং প্রচার হইতে বিরত থাকুন

ইহা সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত একটি কাল্পনিক কাহিনী। ইহার সহিত যদি কেহ কোনও হোয়াটস অ্যাপ কিংবা ফেসবুক গ্রুপ অথবা তাহার পরিচালক / পরিচালকবৃন্দ অথবা সেইসব গ্রুপের কোনও সদস্য / সদস্যার কোনও মিল খুঁজিয়া পান তবে তাহা অনিচ্ছাকৃত

ধূমপান কর্কটরোগের কারণ

মদ্যপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর

 

প্রধানশিক্ষক শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করিয়াই পুনরায় দিনের পঠনপাঠন শুরু হইতে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করিয়া বলিলেন। এরপরে উনি সেই বোর্ডটির দিকে তাকাইলেন। বিস্মিত হইয়া দেখিলাম যাহা যাহা লিখিত হইয়াছিল তাহা আর মুছিয়া ফেলিবার কোনও পন্থা নাই এবং যিনি লিখিয়াছেন আপনা হইতেই তাঁহার নাম খোদিত হইয়া গিয়াছে। এই কারণেই তাহাকে বিচিত্র আখ্যা দিয়াছিলাম। যাহা হউক, প্রচুর পরিমাণ ফুল, পাখি, গাছ, সূর্য ইত্যাদির ছবি দেখিয়া প্রধান শিক্ষক সকলকে স্মরণ করাইয়া দিলেন বোর্ডে ইতিহাস সম্বন্ধীয় বিষয় ভিন্ন অন্য কোনও লেখা কিংবা ছবি আঁকা হইতে বিরত থাকিবার জন্যে। এইরূপে বোর্ডে আকস্মিক নজরে পড়িল একটি লেখা – ভারতবর্ষের তিন যুগপুরুষ, প্রথমজন সতীদাহপ্রথা রদ করিয়াছিলেন, দ্বিতীয়জন বিধবাবিবাহপ্রথা শুরু করাইয়াছিলেন, তৃতীয়জন তিনতালাকপ্রথা ধ্বংস করেন। এই লেখাটি দেখিয়া এক শিক্ষার্থী প্রশ্ন করিল – কীরূপে ইহা ঐতিহাসিক বিষয় হইল ?

অতঃপর কথোপকথন নিম্নরূপ

- ইহা অবশ্যই ঐতিহাসিক বিষয়

- প্রথমোক্ত প্রথাদুটি লইয়া দুইজন যুগপুরুষ এক সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন কিন্তু তিনতালাকপ্রথা রদ হইয়াছে আদালতের আদেশক্রমে, ইহাতে তৃতীয় যুগপুরুষের ভুমিকা কি

- যুগপুরুষগণ তাঁহাদের চিন্তা অন্যের অন্তরে প্রবেশ করাইতে সক্ষম, এইরূপে এই মহাপ্রাণের ইচ্ছাই আদালতের মাধ্যমে প্রকাশিত হইয়াছে

উক্ত শিক্ষার্থী বিনা বাক্যব্যয়ে বসিয়া পড়িলেন। প্রধানশিক্ষক মহাশয় পুনরায় বোর্ড দেখিতে লাগিলেন। আবার একটি স্থানে আসিয়া উনি ভাল করিয়া দেখিলেন। সেই স্থলে হিন্দিতে লিখিত আছে – বুঢ়ে দিন ওয়াপস লাও (অর্থ – খারাপ দিবস ফিরাইয়া আনো)।

পুর্ব্বেই বলিয়াছি কিছু লিখিলেই যিনি লিখিয়াছেন তাঁহার নাম আপনা হইতে বোর্ডে খোদিত হইয়া যায়। দেখিলাম প্রধানশিক্ষক পূর্ব্বোক্ত শিক্ষার্থী যিনি প্রশ্ন করিয়াছিলেন ‘ঐতিহাসিক ঘটনা কীরূপে হইল’, তাঁহার নিকটে আসিয়া তীব্র কর্ণাকর্ষণপূর্ব্বক পশ্চাতে পদাঘাত করিয়া শ্রেণী হইতে বিতাড়িত করিলেন। প্রধানশিক্ষকের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বহুগুণ বর্দ্ধিত হইল। আমি ভাবিয়া পাইলাম না কি প্রকার নীচমনোবৃত্তির বশবর্তী হইলে মানুষ খারাপ দিবস ফিরাইয়া আনিবার কথা চিন্তা করিতে পারে। 

প্রধানশিক্ষক মহাশয় আপন স্থান গ্রহণ করিয়া আমাদিগের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করিলেন যে আজ কি বিষয়ের পাঠ হইবে। একজন পুরাতন শিক্ষার্থী তাঁহাকে স্মরণ করাইয়া দিলেন যে ভারতবর্ষ যে বর্ত্তমানে পরাধীন সেই বিষয়টি পূর্ব্ব হইতেই স্থির হইয়া আছে। ইহা আমার নিকট নবীন তথ্য। আমার ধারণামতে আমরা স্বাধীন ভারতের নাগরিক কিন্তু এক্ষণে বিপরীত শুনিয়া আমিও সাগ্রহে অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। প্রধানশিক্ষক মহাশয় শুরুতেই বলিলেন – “ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংক্রান্ত আইন হইয়াছে বৃটিশ পার্লিয়ামেন্টে”। ইহা শুনিয়া একজন বলিলেন – “সেক্ষেত্রে কল্য যদি বৃটিশ পার্লিয়ামেন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত লইয়া এই আইন বাতিল করিয়া দেয়, তবে আমাদিগকে পুনরায় পরাধীনতা বরণ করিতে হইবে”। এই মন্তব্য শুনিয়া অনেকেই হাসিয়া উঠিলে প্রধানশিক্ষক মহাশয় সকলকে তিরস্কার করিয়া বলিলেন – “ইহা কোনওপ্রকারেই হাস্যউদ্রেককারী ঘটনা নহে। মনে রাখিতে হইবে এইরূপে কোনও দেশের পক্ষে স্বাধীনতাপ্রাপ্তি অসম্ভব।“ কানাডা দেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির উদাহরণ টানিয়া উনি বাল ফোঁড়াইবার কথা উল্লেখ করিয়া বলিলেন এইরূপেই কোনো পরাধীন দেশ স্বাধীন হয়। আমাদের দেশ বাল ফোঁড়াইয়া স্বাধীনতা অর্জ্জন করে নাই জানিয়া আমি যৎপরোনস্তি ক্ষুণ্ণ হইলাম এবং স্পষ্ট অনুধাবন করিলাম আমরা পরাধীন।  ইহার সহিত উল্লেখ করিলেন যে দেশীয় কমিউনিস্টগণ ইহা ধরিতে পারিয়া স্লোগান বাঁধিয়াছিল – ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়। কিন্তু উক্ত কমিউনিস্টগণ অত্যন্ত অসৎ অর্থগৃধ্নু ছিল, সেই কারণেই নেহেরু উহাদিগকে অনায়াসেই যথোপযুক্ত মূল্য দিয়া ক্রয় করিতে সক্ষম হইয়াছিল। এইসময় এক শিক্ষার্থী প্রশ্ন করিলেন – “কমিউনিস্ট পার্টি কাহার দ্বারা নিষিদ্ধ ঘোষিত হইয়াছিল ?”  যেহেতু কমিউনিস্ট পার্টি কাহার দ্বারা নিষিদ্ধ ঘোষিত হইয়াছিল তাহা পাঠ্যবিষয়বহির্ভুত সেহেতু প্রধানশিক্ষক মহাশয় তাঁহার কথার উত্তরে বৃথা বাক্য এবং সময়ব্যয় না করিয়া আমাদিগের শিক্ষার নিমিত্ত বলিতে লাগিলেন। প্রথমেই বলিলেন এই ইতিহাস ‘ওনার ধারণা হইলেও ইহাই সত্য। তৎসত্বেও যদি কেহ যুক্তি দিয়া অন্যমত স্থাপন করিতে পারে সেক্ষেত্রে তিনি তাহা নির্দ্বিধায় মানিয়া লইবেন’। ইহা অমান্য করিবার কোনও কারণ আমার নিকট অনুপস্থিত ছিল। যে মহাত্মা স্বেচ্ছায় প্রকৃত ইতিহাস শিক্ষার ভার লইয়াছেন তাঁহার ধারণাকে সত্য বলিয়া মানিয়া লইতে আমি দ্বিধান্বিত হইবার কোনও অজুহাত খুঁজিয়া পাইতে ব্যর্থ হইলাম। বিশেষত কবিগুরু স্বয়ং যখন এক কাব্যে উল্লেখ করিয়াছেন – সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে।

(মধ্য-অন্ত পর্বের অপেক্ষায় থাকিলে বাধিত হইব)

আমার ইতিহাস শিক্ষা – আদি-মধ্য পর্ব (U/A)
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments