সত্যি কি সুপুরুষ মানুষটা!! ছোটখাটো ফর্সা, টুকটুকে আপেলের মত গায়ের রং, মুখে যাকে বলে শ্বেতশুভ্র দাড়ি। একটা সাদা কাফ লাগানো টকটকে লাল রংয়ের কোট, লাল ট্রাউজার আর মাথায় ছোট্ট সাদা বলওয়ালা লাল টুপি পরিয়ে দিলে কে বলবে স্বয়ং সান্টাক্লজ নয়, ইনি একজন ছা-পোষা বাঙালি গেরস্থ। আবার যদি অঙ্গে গেরুয়া কিংবা দুধসাদা পোশাক ওঠে তখন তাঁকে দেখলে মনে হয় যেন এক ঋষি স্বর্গ থেকে এইমাত্র নেমে এলেন। সৌম্যকান্তি পুরুষ বলতে এক কথায় যা বোঝায়, উনি তাই।

আমার কাকু। কাকু আমার ভচ্চাজ বামুন। পুজো-আচ্চা নিয়েই দিন কাটাতেন। তবে হ্যাঁ, এলিতেলি-র বাড়ির পুজো উনি করতেন না, একটু এলিট শ্রেণী ওনার পছন্দ ছিল। আমাদের গ্রামের জমিদার বাড়িতে উনি পুজো করতেন। সেবার কি হল কে জানে, সুর্য সবে একটু পাটে নামব নামব করছে, কাকু আমায় ডেকে, খোদ গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে বললেন – “বুঝলি মূর্খ, এবার ভাবছি, জমিদারের ভাইকে একটু ঈশ্বর দর্শন করিয়ে দিই। ঈশ্বর দর্শন হলেই তো বাড়ির মালিক বদলে যাবে। যে দেখতে পাবে সেই মালিক হবে, এই তো বাড়ির নিয়ম” আমি বেশ অবাক হলাম শুনে। একে তো শুনি লোকে বলে ওই ভাইটার নাকি মাথায় ছিট আছে, তার ওপর জমিদার কাকুকে দেয় থোয়ও শুনেছি, যেখানে সবাই জানে যে জমিদার আর তার ভাইয়ের সম্পর্ক খুব একটা ভাল নয়, তবে!!! আর ভগবান দেখানো!!!!! সে কি সহজ কথা নাকি!!!!! ভগবান আর সাবান তো প্রায় একই গোত্রের, ধরতে গেলেই পিছলে যায়!!!!!!!! কাকুকে সেসব বলতেই হাঁইহাঁই করে উঠলেন – “তুই তো শুনি আর্কেমে যাস টাস, মাথায় কি তোর গোবর পোরা?” মুহূর্তের মধ্যে আমার কান-ফান লাল হয়ে মটকাটা ফ্যাট করে গরম হয়ে গেল। মুর্খ হতে পারি, কিন্তু আর্কেম তুলে কথা!! তবু বহু কষ্টে সামলে সুমলে জানতে চাইলাম এর সাথে আমার আর্কেমে যাওয়ার সম্পর্ক কোথায়। “কোথায় আবার? আর্কে কিভাবে মা কালীর দর্শন পেয়েছিল জানিস তো? কালীঘরে গিয়ে সারাদিন পড়ে থাকত, কিছুতেই কিছু হয় না, শেষকালে যখন মায়ের খাঁড়া খুলে নিয়ে নিজেকে মারতে গেল, তখন মায়ের দর্শন পেল। কি বুঝলি? অবসেসড হতে হবে, প্যাশনেট হতে হবে, তবে না হবে।” সেরকম কিছু বুঝতে না পারলেও পাছে আবার গালি খেতে হয় তাই বললাম “সে তো বুঝলাম, কিন্তু জমিদারের ভাইটা তো শুনি পাগল, আর দাদা কি দোষ করল?” কাকু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল – আর বলিস না, কিছুই টের পাস না। আজকাল সে বড় অত্যাচারী হয়ে উঠেছে। আমাদের কিছুই আর দেয় টেয় না।

-       হ্যাঁ, এইটা আমি শুনেছি – উৎসাহিত হয়ে বললাম

-       আর ভাইটাকে পাগল বললি!!! পাগল হলে তবেই তো ঈশ্বর পাওয়া যায় রে। ঈশ্বরের দর্শন পাওয়ার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছে

সন্ধ্যে হয়ে আসছিল, ওপার-এপার থেকে মন্দিরের সন্ধ্যারতির কাঁসর ঘণ্টার আওয়াজ ভেসে এল। উঠে পড়লাম। পরের দিন স্কুলে অঙ্ক পরীক্ষা, বাড়িতে ফিরে লসাগু, গসাগু কষায় মন দিলাম। তবে মন বলছিল, কাকু যখন ধরেছে, তখন জমিদারের ভাইয়ের ঈশ্বর দর্শন হবেই। কাকু আমার খুব ফোকাসড। ইন্টেনডেড রেজাল্ট পাবে না বুঝলে কোনও কাজে হাত দেয় না। এবং কাকু সফল হলেন। প্রথমে আমাদের গ্রামের যাত্রাদলের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে একটা প্ল্যাকার্ড বুকে ঝুলিয়ে নিয়ে কিছুদিন গ্রামের রাস্তাঘাট চষে ফেললেন। সেই প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল – দাদা জমিদার বদলে দাও, ভাই জমিদার গ্রামে লাও। তারপর ধীরে ধীরে সবাই জেনে গেল ভাই জমিদারের ভগবান দর্শন হয়েছে, গ্রামের লোক কাকুদের কথায় সায় দিয়ে জমিদার বাড়ির মালিকানা বদলে দিল। এতদিন ওই হাতে গোণা কয়েকজন যজমান ছাড়া কেউ কাকুকে চিনত না, এখন কাকুর নাম ঘরে ঘরে, টিভিতে কাকুর ডাক পড়ল, নামী ম্যাগাজিনে কাকু নিজের জীবনী লিখতে শুরু করলেন, চারিদিকে কাকুর জয় জয়কার শুনে আমার আমার বুকের ছাতি ফুলে উঠল, গ্রামের মুখ উজ্জ্বল হল, আমাদের পাগলা জগাই, শখের কবি, ছড়া বেঁধে চণ্ডীমণ্ডপের দেওয়ালে সেঁটে দিল – সবাই বলে সমস্বরে ছেলে জোয়ান বুড়ো, অতুল কীর্তি রাখল গ্রামে মুর্খের ওই খুড়ো, অন্ধকার থাকতে থাকতেই যাত্রাদলের সদস্যরা সব গ্রামবাসীদের জড়ো করে প্রভাতফেরীতে কোরাস ধরল – ধইন্য ধইন্য বলি খুড়ারে। ভাই জমিদারের সংবর্ধনা সভায় কাকু সাদা দাড়ি চুমড়িয়ে গাইলেন – আমরা শক্তি, আমরা বল, আমরা ছাত্রদল।

সবই বেশ ভাল চলছিল, গ্রাম জুড়ে উন্নয়ন, ফিল গুড পরিবেশ, আগে যে গ্রামের আকাশে ধোঁয়া ছাড়া কিছুই দেখা যেত না, এখন পরিষ্কার, নির্মল, মুক্ত আকাশ, রবিকিরণস্নাত দিন, জ্যোৎস্নালোকিত রাত, বেশ আনন্দেই সময় কাটছিল, নানা রকম উৎসব, খেলাধূলা, বেশ একটা স্বর্গ স্বর্গ ভাব। এর মধ্যে, ওই দাদা জমিদারের আমলেই একজন জাদুকর এসে ঘাঁটি গেড়েছিল গ্রামে, এই নতুন অনুকূল পরিবেশ পেয়ে সে-ও নানা রকম জাদু দেখিয়ে আমোদের চূড়ান্ত করে দিল। গ্রামে একদিন হরির লুটের আসরও বসালো জাদুকর। সবাই ধন্য ধন্য করে উঠল।

এই সবের মাঝেই একদিন সকালে একদম হঠাৎ করে শুনলাম জাদুকর গ্রামান্তরী হয়েছে, আর তার আগে নাকি কিসব কেলো করে গেছে। তবে যাবে কোথায়? আমাদের ভাই জমিদারের সজাগ দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া সহজ হল না। সময়মত খবর না পেলেও ঠিক পেয়াদা পাঠিয়ে তাকে ধরে এনে একেবারে অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করলেন। তার সাথে আরও কয়েকজনকে ধরে পুরে দিলেন। ব্যস, ফের শুরু হয়ে গেল অনন্ত স্বর্গবাস। মৃদুমন্দ দখিনা হাওয়া, কোকিলের ডাক, গোটা গ্রাম জুড়ে কানাকানি – বসন্ত এসে গেছে।

এই বসন্তের কলকাকলির মধ্যেই গ্রামের আকাশে আবার ধোঁয়া দেখা গেল। আমাদের গ্রামে কিছু লোকের কোনও কাজ নেই। তারা গিয়ে সদরে জানালো যে ওই জাদুকর নাকি হরির লুট দেওয়ার জন্যে যাদের থেকে চাঁদা তুলেছিল, তাদের সে আসরে ঢুকতেই দেয়নি, অন্য লোকে বাতাসা পেয়েছে। সদরে আমাদের ভাই জমিদারের শ্ত্রুর অভাব নেই, তাদের উস্কানিতে শক্ত শক্ত পেয়াদা এসে গ্রামে ঢুকে জনে জনে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল – “সেদিন কে কে সেই বাতাসা খেয়েছে?” ভাই জমিদার অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন সেই জাদুকরটাকে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে, যাদের থেকে চাঁদা নিয়ে সে হরির লুট দিয়েছিল, কোষাগার থেকে টাকা দিয়ে তাদের হয় বাতাসা কিনে দেওয়া হবে নয় চাঁদার টাকা ফেরত করা হবে, এইরকম বন্দোবস্ত হচ্ছে, কিন্তু সদরে কেউ সে কথা কানে তুলল না। সদর পেয়াদাদের সেই হাঁকডাক শুনে সেদিনের হরির লুটে উপস্থিত অমিতক্ষমতাশালী ভাই জমিদারের ডানহাত বামহাত বদন-বকুলকে পর্যন্ত মুখ শুকনো করে ঘোরাঘুরি করতে দেখে আমার আত্মার প্রায় পোশাক পাল্টানোর জোগাড়। কাকুরও তো যাওয়ার কথা ছিল হরির লুটে!! দুপুরবেলা স্কুল ছিল বলে আমি যেতে পারিনি। তড়িঘড়ি কাকুর কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম – “তুমি সেই বাতাসা খাওনি তো?” কাকু স্মিত হেসে জানালেন – “ওরে পাগলা, খাইনি, হরির লুটেও যাইনি। জাদুকর আমার বাড়িতে এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, আমার বয়স হয়েছে আমি যেন আর ভিড়ভাট্টার ভেতরে না যাই। ও আমাকে ছ’টা বাতাসা পাঠিয়ে দেবে। দিয়েছিল। ভাবলাম সাড়ে পাঁচখানা আমার পূর্বপুরুষদের উৎসর্গ করে আধখানা খাই। তবে কি জানিস কপাল খারাপ, আমার ভাগের আধখানা বাতাসাতে পিঁপড়ে ছিল, ফেলে দিতে হল। কোনও কাজের ছিল না।” আমার ধড়ে প্রাণ ফিরে এল। বাড়িতে ফিরে এসে আবার দুলে দুলে মোগল সাম্রাজ্য পতনের মূল কারণগুলি মুখস্থ করতে শুরু করলাম।

তাও মাঝে মাঝেই কাকুকে সদরের পেয়াদারা ডাকে, কাকুও যায়, কিসব জিজ্ঞেস করে, আমিও কাকুর কাছ থেকে সব জেনে নিই। ‘বুঝলি না, বাতাসা না খেলে কি হবে, দিয়েছিল তো, তারপর ধর, আমি না খেলেও আমার পুর্বপুরুষেরা তো খেয়েছে, সেজন্যেই বারবার করে আমার কাছে জানতে চাইছে হরির লুট নিয়ে। চিন্তা করিস না, আমার কিচ্ছু হবে না’ –  - “তোমার পূর্বপুরুষেরা!!! তাঁরা তো এখন আর নেই!!!!!!”  – আমাকে অবাক হতে দেখে কাকু আমার চিবুকটা ধরে একটু নাড়িয়ে দিয়ে বললেন – “কবে যে একটু বুদ্ধিশুদ্ধি হবে তোর কে জানে!!! তর্পণ বুঝিস? পূর্বপুরুষদের জল দেওয়া। না খেলে এত মানুষ এত কষ্ট করে এমনি এমনি দেয় ভাবিস? পৃথিবীতে না থাকলে কি হবে, ওঁদের আধ্যাত্মিক উদর আছে। পরশুরাম পড়িসনি তো তাই জানিস না।” বুঝি আর না বুঝি, শুনে বাড়ি ফিরে আসি। কাকু আমার মিথ্যা বলে না মা, কাকু আমার ভারী সাধুমানুষ।

আমার এই কাকুকে দিন কয়েক হল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভাই জমিদারকে জিজ্ঞেস করাতে বললেন – “তোর কাকু ভাল পুরোহিত ছিল, পুজো টুজো করত,ব্যস। বাতাসা খেয়েছে কিনা এসব আমার জানার কথা নয়, জানিও না, বাতাসা খেয়ে থাকলে আমার সাপোর্ট নেই।” সদরের পেয়াদারাও কাকুকে ধরেনি। তবে গেলেন কোথায়?

কেউই বলতে পারছে না, কাকু আমার কোথায় গেলেন। আমার চুল ছেঁড়ার দশা, কয়েক রাত ঘুমোতে পারিনি, বিশ্বাস করুন, ওই এক কাকু ছাড়া এই জগত সংসারে আমার আর কেউ নেই। সকাতরে আবেদন জানাচ্ছি, সুশীলমানুষজনের কাছে – রাস্তাঘাটে যদি দেখতে পান, সান্টার মত দাড়ি, সুপুরুষ, ভাল পুজো করতে পারে, একটু দেখুন অনুগ্রহ করে, যদি কেউ সন্ধান দিতে পারেন। 

আমার কাকু ফিরিয়ে দাও
  • 5.00 / 5 5
2 votes, 5.00 avg. rating (94% score)

Comments

comments