বেশ খানিকটা চাপে ছিলাম। আসলে বেশ অস্বস্তিতে ভুগছিলাম। রাজ্য জুড়ে এক অসহনীয় নৈরাজ্য, অথচ রাস্তা-ঘাট শুনশান, একেবারে ফাঁকা। সামনে কেউ ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়ালে মনের মধ্যে বল পাই, উৎসাহ জাগে। কিন্তু কি আশ্চর্য যাঁরা পথ দেখাবেন তাঁরা নিশ্চুপ। এক রকম লুকিয়ে লুকিয়েই সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি, আবার ওই চোরের মত বাড়ি ফিরি। পাছে কেউ জিজ্ঞেস করে ফেলে – ‘কি ব্যাপার, আন্দোলন করছ না?’ তাহলেই তো আবার আমতা আমতা শুরু হয়ে যাবে। আমি অবশ্য মনে মনে একটা যুক্তি ঠিক করে রেখেছিলাম। সেটা হল – ‘আগে তো উন্নয়ন ছিল না, এখন উন্নয়নের ঢেউয়ে সাঁতার কাটতে গিয়ে মাইরি বলছি, বিশ্বাস করুন, দেখছেন না সেই কোন সকালে বেরিয়ে যাই আর এই ফিরছি। একদম সময় পাচ্ছি না। কেন কোথাও কিছু হয়েছে নাকি? আমি তো জানি না।’ পাড়ার মুদিখানার দোকানদার পর্যন্ত মিচকি হেসে একদিন জানতে চাইল আমি কেন মোমবাতি কিনছি না। মটকা গরম হয়ে গিয়েছিল।  ‘তাতে তোর কি ছেঁড়া গেছে রে শালা? নিজের কাজ কর বান…’ পর্যন্ত বলে, পাশে আকস্মিক ভাবে পিতৃদেবকে আবিষ্কার করে চুপ করে গিয়েছিলাম।

মাত্র গতকাল এই হতাশ হতাশ ভাবটা কেটে গিয়ে এক প্রবল আত্মবিশ্বাস জেগে উঠল। আরও প্রিসাইসলি বলতে গেলে ঘটনাটা ঘটল গতকাল রাত সাড়ে আটটা থেকে ন’টার মধ্যে। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে আমাদের একজন পথপ্রদর্শকের একটি সাক্ষাৎকার দেখে। বাড়ির উল্টোদিকের চায়ের দোকানটা খোলা ছিল, বন্ধু-বান্ধবরা কেউ বেঞ্চে বসে, কেউ দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। আমি একটা বারমুডা পরে, টি-শার্ট গায়ে চাপিয়ে, হ্যাঁ অবশ্যই কলার তুলে চলে গেলাম ফুরিয়ে যাওয়া সিগারেট আনতে। আর ভিড় কমার জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। এখন আমায় পায় কে? আমি জানতে পেরে গেছি কেন আমি রাস্তায় নামিনি। খেয়াল করে দেখবেন ইদানিং আমার লেখালেখি-ও বেশ কমে গিয়েছিল। কারন ওই একই। যাই হোক ফিরেই যখন এসেছি তখন আমি প্রথমেই কৈফিয়ত দেব, মানে ওই যে কৈফিয়তটা আমি গতকাল রাতেই শিখেছি আর কি (সাড়ে আটটা – ন’টা কে কি ঠিক রাত বলা চলে? জানি না)।

শুনুন এবার কেন পথে নামিনি। যখন পথে নেমেছিলাম তখনকার পরিপ্রেক্ষিতটা একবার কষ্ট করে ভাবুন। বিশেষ কিছু অঞ্চলে নেমে এসেছিল রাষ্ট্রের নিপীড়ন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে দিশেহারা মানুষ, আমরা পথে নেমেছিলাম। অর্থাৎ আমাদের প্রতিবাদটা ছিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। কারন আমরা শুধু শিল্প নিয়ে ভাবি এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আবহে সৎ শিল্প সৃষ্টি করা যায় না। এখন কি হচ্ছে? খুন, ধর্ষণ, সমুদ্র চুরি এইসব। কারা করছে? কিছু দুষ্কৃতি। তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের কি সম্পর্ক? কিছু মাত্র নেই। কেন করছে? সামাজিক অবক্ষয়। আমাকে কি রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর ঠাউরেছেন নাকি, যে সামাজিক উন্নয়ন করব? আর ভাবুন তো দিল্লিতে তো সেই একটা ধর্ষণ নিয়ে কত কান্ড হল। দিনের পর দিন প্রতিবাদে উত্তাল ভারতের রাজধানী। কি লাভ হয়েছে? একটা, একটা উদাহরণ দেখিয়ে দিন তো যে এসব কুকীর্তি বন্ধ হয়েছে বা কমেছে। পারবেন না। তা হলে মশাই, এই সব ছেলে ভোলানো, লোক দেখানো প্রতিবাদ করে ফালতু সময় নষ্ট করে কি লাভ? যদি কাঙ্ক্ষিত ফললাভই না হল। নেমেছিলাম যার বিরুদ্ধে, তা বন্ধ করে দেখিয়ে দিয়েছি কত ধানে কত চাল। রাস্তায় নামব তখন, যদি একটা কিছু বদলাতে পারি। না হলে আপনাতে আপনি থেকো মন, যেয়ো নাকো কারও ঘরে। তো যেটা বলছিলাম, আমাদের রাস্তায় নামার কিছু প্রাথমিক শর্ত আছে। যদি কোনও ঘটনা সেই শর্ত পূরণ করতে সমর্থ হয় নিশ্চয় পথে নামব, কেন নামব না? কে বলেছে নামব না? মনে রাখবেন, আপনার মত আমরাও দিনে ওই চব্বিশ ঘণ্টাই সময় পাই।

মোটামুটি এতদূর বলে ফেলার পর গলা শুকিয়ে এল। খুশির চোটে আসলে যে কাজে এসেছিলাম সেটা ভুলে, সবার জন্য এক রাউন্ড স্পেশাল চা অর্ডার করে দিলাম। খালি এক সিনিয়র দাদা চা রিফিউজ করে উঠে পড়লেন। বললেন – "সবই তো বুঝলাম খোকা, কিন্তু একটা জিনিস বুঝলাম না, নাগরিকদের যথাযথ নিরাপত্তা না দিতে পারাটাও কি আসলে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নয়?"

আমার কৈফিয়ত
  • 4.00 / 5 5
2 votes, 4.00 avg. rating (80% score)

Comments

comments