কয়েকদিন ধরেই ইচ্ছেটা ছিল। অতনু সম্প্রতি আবার সেটাকে উস্কে দিল। ফলত আবার সেই বর দেখার গল্প। সব রকম মিলিয়ে এই লেখাটি ইন্টারনেটে আমার প্রথম পূর্ণাঙ্গ পোস্ট।

১৯৮০ সাল। আমার দ্বিতীয় শ্রেণী। আমার বোন আমার চেয়ে আরও চার বছরের ছোট। এখনকার দিন হলে স্কুল কাকে বলে জেনে যেত, কিন্তু সে সময় সে তখনও ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। তো বছর পড়তে না পড়তেই আমাদের বাড়িতে বিয়ের দামামা বেজে উঠল। আমার একমাত্র পিসির বড় মেয়ের বিয়ে।

খুব কাছাকাছি থাকতাম আমরা। কিন্তু আমাদের দুই ভাইবোনের গায়ে ঠিকঠাক আঁচ লাগল তখন যখন আমরা লটবহর সঙ্গী করে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঐ বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। বাড়ি বলতে একটা দু কামরার বাংলো, সঙ্গে আর যা যা থাকে। লাগোয়া ছোট সার্ভেন্ট কোয়ার্টার গোছের কিছু একটা যেখানে কেউ থাকে না। তবে সামনে একটা বিশাল বাগান ছিল, আমরা দু’জনে ওখানেই প্যান্ডেলের জন্য বেঁধে রাখা বাঁশে দোল খেয়ে, এদিক ওদিক লুকোচুরি খেলে সময় কাটাতে লাগলাম। খাওয়ার সময় হলে কেউ না কেউ ঠিক ডেকে খাইয়ে দিচ্ছে, ঘুম পেলে ঘুমিয়ে পড়ছি, পড়াশোনা মোটে নেই, এক অনাস্বাদিত স্বাধীনতা। মাঝে মাঝে বাবা আমাদের দুজনকে একসাথে নিয়ে নিজের বক্স ক্যামেরাতে ছবি তুলছেন। এভাবে এক-দু’দিন কাটল। বিয়ের দিন উপস্থিত হল। বিয়ে বাড়িতে ঘোরাফেরা করার অভিজ্ঞতাগুলো আমার মধ্যে চাগিয়ে উঠল। এতদিন বিভিন্ন জায়গায় খেয়েদেয়ে চলে এসেছি, এবার বাড়িতে বিয়ে, একটা সুযোগ পাওয়া গেছে নিজেকে একটা জায়গায় দেখার। যে সমস্ত বিয়েবাড়িতে শুধুমাত্র খাওয়া দাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে যেতাম সেখানে আমাকে সর্বাধিক আকর্ষণ করত কোমরে গামছা জড়িয়ে হাতে মাঝারি সাইজের অ্যালুমিনিয়ামের বালতি নিয়ে শশব্যস্ত পরিবেশকবৃন্দ। আমি এটাও খেয়াল করেছিলাম ঐ বালতিগুলি বেশ ভারী, কিন্তু লেবু আর নুনের পাত্রগুলি অনেক হাল্কা। লেবু-নুনের পাত্র যদি বাগানো যায় তাহলে বেশ হয়। মনের কথাটা খুলে বললাম আমার মেজদিকে। মেজদি বিনাবাক্যব্যয়ে সকালবেলাতেই আমায় জানিয়ে দিল যে আমি একদম ঠিকই ভেবেছি, এই দায়িত্বটা আমার পাওয়া উচিত বলেই ও মনে করে। আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে আবার নিজের কাজে মন দিলাম। খানিকবাদে কানাঘুঁষোয় কানে এল বাসর বলে কি যেন একটা আছে, সেটাও বেশ আকর্ষণীয়। তবে ওটা হবে বিয়ে মিটে যাওয়ার পর রাতের দিকে। আবার সুযোগ বুঝে মুশকিল আসান মেজদির শরণাপন্ন হতে হল। এবারও মেজদি আমাদের বিমুখ করল না। তবে একটা শর্ত জুড়ে দিল। একদম লক্ষ্মীটি হয়ে থাকতে হবে নাহলে কিন্তু কিছুই হবে না। এর মানে আমরা দুজনেই বুঝতাম। ঐ গেটের বাইরে যাওয়া চলবে না, সময়মত খেয়ে নিতে হবে, খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে হবে, এইসব আর কি। তা গেটের বাইরে আমরা এমনিতেও যাচ্ছিলাম না, বাকিগুলিও ঠিক আছে। মহৎ কাজের জন্য অনেক সময়ই ক্ষুদ্র স্বার্থের কথা ভুলে থাকতে হয়।

ঘুম থেকে উঠতে উঠতে বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যে। মা আমাদের সাজগোজ করাচ্ছেন এমন সময় একটা রব উঠল বর এসেছে। এইটা যে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সকাল থেকে সাত ঝামেলায় মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। নিজের মান বাঁচাতে তড়িঘড়ি চুলটুল ভাল করে আঁচড়ে অনুজাকে সঙ্গে নিয়ে দৌড়ালাম পাশের একটা বাড়িতে যেখানে বর বসার কথা। পৌঁছালাম। নির্দিষ্ট ঘরে ঢোকার আগেই দরজার বাইরে থেকে চোখে পড়েছে একজনকে। সে একাই রয়েছে ঘরে। পা আটকে এল। এ কে? ধুতি-পাঞ্জাবিতে সুসজ্জিত গলায় একটা মালা পরে সামনে কে বসে আছে? এই বর? এ তো আমাদের অমুকদা। এই তো ক’দিন আগে কালীপূজোর সন্ধ্যে বেলায় একসঙ্গে বাজি ফাটালাম, একসঙ্গে দোল খেলেছি, আরও কত সময় একসাথে কাটিয়েছি। তবু ভদ্রতা কড়ে ভেতরে ঢুকলাম। আমি চুপ, বোনের মুখেও কথা নেই। কেউ একজন এই সময় ঢুকল। আমরা বেরিয়ে এলাম। বোনের মুখের দিকে তাকানোর ইচ্ছে ছিল না। বর বলে অমুকদাকে দেখানোয় কি ভাবছে কে জানে? একদম ধীর গতিতে ফিরলাম। সেটাই শেষ। তারপরে আর কোনোদিন বিয়েবাড়িতে বর বা বউ দেখার কোনও উৎসাহ আমার জাগেনি। আজও পর্যন্ত। সহধর্মিনী বলে বলে ক্লান্ত হয়ে গেছেন। না, আমি যাই না। বিয়ে বাড়িতে আমার একমাত্র লক্ষ্য থাকে খাওয়ার জায়গা। কি বললেন? সেদিন লেবু-নুন আর বাসরের কি হল? লেবু-নুন খেয়াল নেই। তবে বাসরে উপস্থিত ছিলাম না আমার বাবার চক্রান্তে। ‘হ্যাঁ জাগবি তো? এখন একটু ঘুমিয়ে নে, নাহলে জাগবি কি করে? ডেকে দেব’। কথা রেখেছিলেন। ডেকেছিলেন। পরদিন সকালে। ‘কিরে, তোদের কতবার ডাকলাম, উঠলি না। চল, সকাল হয়ে গেছে।’ সামান্য কিছু খাইয়েই বাবা সটান নিয়ে গেলেন আমাদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা গঙ্গার ঘাটে। সঙ্গে সেই বক্স ক্যামেরা। শেষ হতে চলা জানুয়ারির সকালে বয়ে চলা গঙ্গা অন্তত তখনকার মত আমদের মন থেকে মুছে দিয়েছিল গতদিন।

আমার প্রথম ব্লগ (পুরনো কাসুন্দি)
  • 4.00 / 5 5
3 votes, 4.00 avg. rating (80% score)

Comments

comments