ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এবং বসন্ত সমাগত এরকমই এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে আমার ঘরের ডাঁই হয়ে থাকা অদরকারি ধুলো-আস্তরণে ঢাকা বইপত্র হাঁটকাতে হাঁটকাতে একটা বহু পুরনো ডাইরি আবিস্কার করলাম আজ, এবং ১৯৯৯ সালের ৩রা মার্চ থেকে ওই বছরেরই ২১শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে, পৃথিবীর আর কারুরই সম্ভবত কোন কাজে লাগবেনা, আমার জীবনের এরকম কিছু অকিঞ্চিৎকর সংলাপ-এর মুখমুখি হলাম। জানা গেল, দাবদাহ-লোডশেডিং-ক্রিকেট ওয়ার্ল্ডকাপ-অ্যানুয়াল পরীক্ষার রেজাল্ট ইত্যাদি বিবিধ মনোজ্ঞ বিষয়। এছারা প্রেম ও যৌনতা বিষয়ক অজস্র সাংকেতিক শব্দ প্রতিশব্দ আঁকিবুঁকি স্কেচ অশ্লীল ছড়া ও তার তর্জমা, বন্ধুদের নিয়ে পিকনিক-এর লিস্ট (যাতে বিশেষ বান্ধবীটির নাম-এর ওপর একাধিক বার পেন বোলানোর চিহ্ন), আনন্দমেলা ও শুকতারা থেকে সংগৃহীত সাধারনজ্ঞান ভিত্তিক কুইজ-এর প্রশ্ন ও উত্তর, প্রিয় খেলোয়াড়দের লিস্ট, প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী-গায়ক-গায়িকা-চলচ্চিত্রের লিস্ট এবং আরও বিবিধ সব বিস্মৃত ঘটনা ও প্রবাহের প্রতি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত সমূহ।

বড়ই অদ্ভুত, প্রায় বারো-তেরো বছর আগের সেই কৈশোর থেকে সদ্য যৌবনে পা রাখতে যাওয়া হারানো ‘আমি’ টা কে, তার ধুলোধুসর অবয়ব প্রতিমুর্তির কিছু পর্ণ মুহুর্ত ও উন্মোচন ও প্রলাপ-আপলাপ ইত্যাদি, এইভাবে, সম্পূর্ন আচানক, যখন আমার ক্ষেপচুরিয়াস মস্তিস্কে বাসা বেঁধে আছে ‘অন্য’ এক শালিখ ঠাকুর, আবিস্কার করবার মধ্যে সাধারন ভাবে এক ধরনের রোমাঞ্চ / স্মৃতিমেদুরতা / নষ্টালজিয়া আছে বৈকি। ছোটবেলায় আমাদের সবারই বোধহয় এরকম একটা খাতা বা ডাইরি বা নোটবই থাকে। নানাবিধ উদ্ভট প্ল্যান, আইডিয়া, তথ্য, বিভিন্ন জিজ্ঞাসা যা সেই বয়সে চট করে কাউকে করে ওঠা যায়না, এবং তার থেকে উপজাত নানা ফ্যান্টাসি কথনে ঠাসা, যেন নিজের একান্ত ব্যক্তিগত এক পৃথিবী নির্মান করে চলা এবং অতি সযত্নে, অপত্য স্নেহে তাকে বাইরের সমস্ত কুনজর এবং প্রভাব থেকে রক্ষা করে চলার এক অবান্তর প্রচেষ্টা। আর কোন একদিন, বহুদিন পরে, হয়তো কোন রেল ষ্টেশনে ট্রেন-এর জন্য অপেক্ষা করতে করতে কিম্বা আফিসে কাজের ফাঁকে আনমনে সিগারেট খেতে খেতে হঠাৎ-ই মনে পড়ে যায় যে সেই খাতা টা আর নেই, নিজেরই অজান্তে কবে যেন হারিয়ে ফেলেছি সেটাকে।

 

এ প্রসঙ্গে শৈশব-এর কিছু স্মৃতি মনে এলো। ’৮৯ এর গোড়ার দিকে আমরা পাকাপাকি ভাবে হুগলী তে চলে আসবার আগে, অর্থাৎ আমার শৈশবের প্রথম চার সাড়ে চার বছর পর্যন্ত সময় টা আমার কেটেছে ব্যারাকপুরে। এটা সেই সময়েরই কথা। মনে পড়ে ব্যারাকপুরের গাঁজা গলির সেই ভাড়া বাড়ি, স্যাঁতস্যাঁতে ঘুপচি ঘরগুলো, মলিন ও ঘষা কাঁচের মত কিছু মানুষের মুখ যাদের আমি এক কালে চিনতাম, অদ্ভুত নৈঃশব্দ নিয়ে সেই সব স্মৃতি-বিস্মৃতি মস্তিষ্কের রক্ত ক্লেদ জ্বালিকার গভীরে গত জন্মের সেপিয়া মেদুরতায় কেঁপে কেঁপে ওঠে, মা, বাবা, দাদি, দাদামশাই, ‘হেলেন’ নামক কো-ভাড়াটিয়া মহিলা, ওপরের বাড়িওয়ালা বৃদ্ধ মতিলাল দাদু (যিনি আমাকে লুকিয়ে তাঁর মুখ থেকে লাল-ঝোল-কফ মেশানো পান খেতে দিতেন এবং ছাতের ধারে প্রস্রাব করবার সময় “ও দাদুভাই টিয়া পাখি দেখবে নাকি, টিয়াপাখি?” বলে হাতের আড়াল সরিয়ে দিয়ে জর্দা আর খয়েরের প্রভাবে কালো হয়ে যাওয়া দাঁতগুলো বের করে খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসতেন), সেই অপ্রতিভ টিউব-এর আলোয় চুনকাম করা ঘর ও শ্যাওলা ধরা উঠোন, তুলসী মঞ্চ, বিকেল পেরিয়ে ক্রমে সন্ধ্যে নেমে আসছে আর দেওয়ালের বেশ খানিকটা ওপরে চৌকো জানালার মত ঘুলঘুলি দিয়ে গাঢ় বেগুনি আলো এসে পড়েছে আমাদের চোখে মুখে…

ঠিক কিভাবে জানিনা, তবে এই জট পাকানো স্মৃতির মধ্যে থেকেই একটা অদ্ভুত ঘটনা আমার আজো মনে রয়ে গেছে। ব্যারাকপুরের সেই বাড়ি, বাইরের ঘরে খাটের ওপর দাদামশাই-এর কোলে আমি। সেই প্রথম দাদামশাই কে অত কাছ থেকে, সেই অনাবিল স্নেহ, সেই প্রথম, সম্ভবত। কিন্তু আমার তখন সেসবে মন নেই, আমি তখন মহা-উৎসাহে তাঁকে আমার সঙ্গে বরফের দেশে যাওয়ার ব্যাপারে রাজী করাচ্ছি, আর কি কি উপকরন আমাদের এই অভিযানে সঙ্গে নিতে হবে (যথা তাঁবু, বরফের ওপর দিয়ে হাঁটবার ভারী জুতো, স্লেজ গাড়ি ইত্যাদি) তার লিস্ট বানাচ্ছি (লিস্ট বানানোর ব্যারামটা বোধহয় আমার সেই তখন থেকেই!) একটা ছোট্ট নোটবই তে।

সাল টা সম্ভবত ১৯৮৭-৮৮ হবে, বাবা সেবার বইমেলা থেকে একটা বই কিনে দিয়েছিলঃ রাদুগা প্রকাশন-এর রংচঙে মলাটে বাঁধানো ‘রুশ দেশের উপকথা’। আর এই বই এরই গল্প মা আর দাদি পড়ে শোনানোর নাম করে আমাকে প্রতিদিন ভাত খাওয়াত (কার্টুন নেটয়ার্ক আসতে তখনও ১০ বছর দেরী), আর আমার চোখের সামনে পরিস্কার ভেসে উঠত বরফের দেশ- সাইবেরিয়ার সেই ধপধপে সাদা প্রান্তর আর বরফ জমাট নদী, বল্গা হরিণ আর শিকারি কুকুরে টানা স্লেজ গাড়ি-তে করে ছুটছি সেই জনশূন্য ধূধূ উপত্যকা দিয়ে আমি আর আমার বৃদ্ধ দাদামশাই একটা ঝোড়ো রাত্তির অথচ দিব্বি ফুটফুটে জ্যোৎস্নাও আছে আর আমাদের এক বন্দিনী রাজকন্যা কে ছাড়িয়ে নিয়ে আসতে হবে একটা বজ্জাত রাজার হাত থেকে যার অনেক সেপাই-সান্ত্রী বিরাট অট্টালিকা বহুদূরের কোন এক বিপদসঙ্কুল পাহাড়ের চুড়ায় আর আমরা ম্যাপ দেখে রাস্তা চিনে নিয়ে চলেছি চলেছি চলেছি…

মনে আছে, পরের দিন দাদামশাই-এর দোগাছি (মামারবাড়ির গ্রাম) ফিরে যাওয়ার কথা, তাঁরা ব্যাগ পত্তর নিয়ে বেরচ্ছেন, আর আমি ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছিনা কিছুতেই, আবাক এবং হতাশ, চলে যাবে? সত্যি? আর আমাদের বরফের দেশে যাওয়া? তার কি হবে তাহলে? দাদামশাই তাঁর স্নেহময় হাসি হেসে আমায় কোলে তুলে নিয়ে বলেছিলেন, বড় হও দাদু, তারপর যাবো আমরা সেই বরফ আর বল্গা হরিনের দেশে, স্লেজ গাড়িতে চেপে। আমি খুব গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলেছিলাম, ঠিক আছে আমি খাতাটা রেখে দিলাম, সব লেখা রইল কিন্তু, তুমি কথা দিলে লিখে দাও তবে। দাদামশাই কলম বের করে লিখে দিয়েছিলেন- কথা দিলাম, যাবো।

 

**                                                    **                                                        **

 

সে আজ প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর আগেকার কথা। দাদামশাই কথা রাখেননি। আমাদের সবাই কে রেখে দিয়ে তিনি একলাই পাড়ি দিয়েছেন সেই ধপধপে সাদা বরফ আর বল্গা হরিনের দেশে, তাও আজ প্রায় ছ’বছর হল।

আর আমার সেই ছোট্ট নোটবই-টা, যাতে সব কিছু লিখে রেখেছিলাম, সেটাও আর নেই, নিজেরই অজান্তে কবে যেন হারিয়ে ফেলেছি সেটাকে।

***

আমার সাইবেরিয়া অভিযান
  • 5.00 / 5 5
2 votes, 5.00 avg. rating (94% score)

Comments

comments