তারপর তো সেই শাহ্জাদা চললো জাদুকরের কাছে। ভোর হবার আগেই পৌঁছানো চাই নাহলে আমু দরিয়ার আসে পাশে রাখা মুলুক-এ-হিন্দের সুলুক সন্ধান হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই ক্ষুদা তৃষ্ণা ভুলে শাহ্জাদা ও তার ঘোড়া ছুটছে তো ছুটছেই। শুষ্ক মরু পেরিয়ে গন্তব্য কোহেস্তান অঞ্চলের এক জনমানবহীন গুহা যেখানে জাদুকর কয়েকমাস হলো ডেরা বেঁধে দিন রাত গিলি গিলি হোকাস পোকাস করছে। জাদুকর বেজায় ধূর্ত,এমনি এমনি সে ওই গোপন তথ্যটি দিয়ে দেবে না, রীতিমতো মগজ ও শরীরের যোগ্যতা প্রমান করে তা অর্জন করতে হবে শাহ্জাদাকে। পূবে আলো ফোটবার আগেই যখন গুহাতে পৌঁছলো ওরা, জাদুগর তৈরীই ছিল। একটু জিরিয়ে নেওয়া কিংবা জল খাওয়ারও সুযোগ পেলো না, শুরু হলো একের পর এক কঠিন ও বাধাপ্রবণ পরীক্ষা। সারাদিন বেজায় ক্লান্তিতে কাটলেও ডিস্টিংকশন সহকারে দুর্ধর্ষ রেজাল্ট করলেন শাহ্জাদা ! জাদুকর মোগাম্বোর মতন খুশ হয়ে তাকে হিন্দুস্থান যাওয়ার গোপন নক্সার সঠিক ঠিকানা বলে দিলো তবে এও জানালো যে সেটা একবারে স্বর্তঃহীন নয়। আর স্বর্তগুলো হলো যেহেতু হিন্দুস্থান এক বিশাল দেশ তাই তাকে ভালো করে বুঝে উঠতে হিন্দুকুশ পর্বত পেরোলে পরেই শাহ্জাদাকে জাদুকর জাদুবলে চারটি আলাদা আলাদা ব্যক্তিতে রূপান্তরিত করে দেবে। প্রথম জন মালিক রাই যে কিনা তুখোড় একজন রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে নয়া মুলুকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। দ্বিতীয়জন, কবুল ভাই যে হবে সমগ্র দেশের একমদ্বিতীয়ম ধর্মরক্ষক। তৃতীয় ব্যক্তি আমির সাই যে কিনা দেশের সমাজ সংস্কার করে কুসংস্কার দূর করতে আমৃত্যু কাজ করে যাবে। আর শেষ জন হাতেম তাই হবে দেশের সবথেকে উমদা শায়ার, খামখেয়ালি বোহেমিয়ান ও কবিসুলভ পাগলামোর পরাকাষ্ঠ। পরের স্বর্তঃটি হচ্ছে একবার চিচিং ফাঁক বলে ওখানে ঢুকে পড়লে কিন্ত ফেরত আসার আর কোনো উপায় থাকবেনা। শাহ্জাদা মেনে নিল জাদুকরের উদ্ভট সেই দাবি দাওয়া গুলি ও চললো তার গন্তব্য হিন্দুস্থানের দিকে।

দুর্গম গিরি কান্তার মরু লঙ্ঘিয়া চার বান্দা যখন নতুন এই দেশে এলো তখন সেখানে মোদিরাজ পুরো জাঁকিয়ে রাজত্ব করছে। বঙ্গ, মৌর্য, কলিঙ্গ ও চোলরাজ্য ছাড়া পুরোটাই প্রায় তার দখলে। তাদের এখানকার খাদ্যাভ্যাস , ভাষা, সামাজিক আচরণ , ধর্মীয় অনুভূতি সবই কেমন বিচিত্র রকমের ঠেকলো। যেরকম বিচিত্র সেরকমই আবার বৈচিত্রে ভরা। মালিক জানলো দেশের রাজনৈতিক আখড়া হলো দেহলী শহরে। সে গেলো সেখানে সবার সাথে মিলে মিশে মালুম করতে যে এ দেশের রাজনীতি কি ভাবে চলে। কয়েক সপ্তাহ এদিক সেদিক করে সে যা বুঝলো তাতে হলো এ দেশে একশোরও বেশি দল আছে যার মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টিই শুধু গোটা পঁচিশেক। সব দলই দাবি করে তারা দেশের ভালো চায়, তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিবাদী ও উন্নয়নকামী। মুশকিল হলো অন্য দলের ক্ষেত্রে তারা ঠিক উল্টো কথাটাই বলে থাকে মানে ওরা দেশদ্রোহী, অগণতান্ত্রিক, সাম্রদায়িক ইত্যাদি। আবার গণতন্ত্রের জন্য তিনটে জিনিস বিশেষ ভাবে দরকার – এক নির্বাচন, দুই একটা সব বলা আছে টাইপের মোটা বই যার নাম সংবিধান ও তৃতীয় যারা নির্বাচনে জিতবে তারাই রাজত্ব করবে কিন্তু যারা হারবে তারা বাড়ি বসে থাকবেনা। তারা বিরোধী হিসেবে একটা বিশাল শ্বেতপাথরের সভাগৃহে রাজার দলের সাথে রোজ তর্ক বিতর্ক এমনকি হাতাহাতি পর্যন্ত করবে। মালিক লক্ষ্য করলো রাজা ও বিরোধী দলের লোকেরা সকাল বেলায় হয়তো একই গাড়িতে চড়ে হা হা হি হি করতে করতে সেই বড় সাদা বাড়িতে ঢুকলো। কিন্তু ঢোকার মুহূর্তের মধ্যে তারাই আবার কি একটা সাদা কাগজের টুকরো যার নাম বিল তাই নিয়ে ঝগড়া মারপিট করে সভা তুলকালাম করে তুললো। বিরোধী দলের সবাই তো সেই কাগজ ছিঁড়ে হাওয়ায় ওড়াতে লাগলো। একজন করুন বয়ষ্ক লোক সবাইকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে গেলো ও অবশেষে সভা মুলতুবি ঘোষণা করা হলো। আবার সন্ধেবেলায় সেই দুই মক্কেল হা হা হি হি করতে করতে এক ধনী ব্যবসায়ীর কুকুরের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বিনি পয়সায় কাবাব সহযোগে এন্তার মদ্যপান করতে করতে কি যে সারাক্ষন ফিস ফাস করলো কে জানে কিন্ত অদ্ভুত ভাবে পরের দিন সেই সভায় আগের দিনের ছেঁড়া কাগজ মানে বিল সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়ে গেলো। এতো গেলো রাষ্ট্রের রাজধানী এরকম গোলমেলে ব্যাপারস্যাপার প্রত্যেক রাজ্যে, জেলায়, ব্লকে, পঞ্চায়েতে ও শেষ মেশ ছোট ছোট গ্রাম গুলোতেও হয়ে থাকে। আমির রাই বুঝলো এ জম্মে আর তার এখানে রাজনীতি করা হবে না।

এবার আসি কবুল ভাইয়ের কিস্সায়। মালিক রাইকে যতটা বৈচিত্র সামলাতে হয়েছিল কবুলকে ধর্মের ক্ষেত্রে ততটা হলো না। মানে মূল ধর্ম বলতে পাঁচ কি ছটা কিন্তু এক একটি ধর্মের ভেতর আবার এইধারী ও ঐধারী মার্কা মতান্তরের বিভাজন রয়েছে। এইধারীরা আবার নদীর এপার ও ওপার গোষ্ঠীতে বিভক্ত। তারপর এপারের ভক্তরা আবার একঠ্য়াং তুলে দাঁড়ানেওয়ালা কিংবা দুঠ্যাং তুলে শীর্ষাসনকরনেওয়ালা। এইরকম ঈশ্বর বেদানা খাওয়া পছন্দ করেন না করেননা অব্দি মতবাদের ভিত্তিতে আলাদা আলাদা নমুনা কুবুল ভাই দেখেন এই দেশে । সবাই মানে ঈশ্বর এক , সবাই বলে তাদের ধর্ম হিংসা শেখায় না ,সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতি তাদের মূল মন্ত্র কিন্তু মওকা পেলেই এরা লাঠি বল্লম পেটো নিয়ে একে ওপরের ওপর হামলা চালায়। সব ধর্মেই ঈশ্বরের উপাসনার ইজারা গুটিকয়েক প্রিভিলেজড মানুষের ওপরই বর্তে থাকে ও তারা কঠিন কঠিন ভাষায় কি সব আগডুম বাগডুম বলে ঈশ্বরকে ডাকতে থাকে। কেউ আবার গড়াগড়ি খায় তো কেউ আবার ঘুরপাক। কেউ কাকভোরে চিৎকার করছে তো কেউ মাঝরাতে ঢাক পেটাচ্ছে। কবুল ভাই সব দেখে শুনে বুঝলো এ দেশে ঈশ্বরও আজব। এবার আসা যাক পরের বান্দা অর্থাৎ সমাজসংস্কারি আমির সাইয়ের অভিজ্ঞতার কাহানিতে। ভারতবর্ষ অগুনতি সমাজের এক সমষ্টি। জাত, অর্থনীতি,বর্ণ, ক্রিকেট ,পকেটমারি -কি নেই সেই সমাজগুলোর মুলে। তবে এখন আর আগের মতন যুগে যুগে কোনো মহাপুরুষ জন্ম নেয় না সেই সমাজকে পরিশ্রুত করার জন্য। যারা করেন তাদেরকে বলে এনজিও ও মিডিয়া। আমির দেখলো ক্ষমতা ও অর্থের জোরে একই সমাজে কি পরিবর্তনটি না আনছে এরা। বিদ্যুৎ পৌঁছনোর আগেই সেলফোন পৌঁছে যায় আর পানীয় জলের আগে কোকা কোলা। ডাক্তার থাকলেও ওঝা ফকিরদের একেবারে সরিয়ে দেয়নি কেননা এতে মিডিয়ার স্টোরি কম পরে যাবে। মানে পণ থেকে রেপ আর চড়ুই পাখি থেকে বেহ্মদত্তি সবই নিজের মতো করে তৈরী করা যায় ও দরকার পড়লে তাদের সপক্ষে বা বিপক্ষে শত শত মোমবাতি হাতে মানুষদের দিয়ে মিছিল করিয়ে দেওয়া যায়। আমির বুঝলেন এখানে সমাজ সংস্কারিত হয় না, মর্গে সংরক্ষিত করে রাখা হয় !

শেষ করবো আমাদের হাতিম তাইয়ের তাজুর্বে-এ -হিন্দ শুনিয়ে। বাকিরা সবাই একটু গম্ভীর গোছের হলেও শাহ্জাদার এই সখসটি পুরো মস্ত মাওলা। সে আসার পর থেকেই আজ শাস্ত্রীয় সংগীত শুনছেন তো কাল বাউলমেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সব ঘুরে টুরে সে বুঝলো যে এ দেশের সংস্কৃতির মাপকাঠি হলো সিনেমা। সারা দেশে এক বছরে, মাসের পর মাস, লক্ষাধিক লোক খেটে খুটে হাজারের বেশি চলচিত্র তৈরী করে ও এই একেকটা ‘জিনিস’ মাথা পিছু ৫০০ টাকায় বিক্রি হয় ও ৩ ঘন্টায় ফুরিয়েও যায়। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে সেই সিনেমার গল্পের বইটা যদি ২০০ টাকাও দাম হয় এরা কেউ সেটা কিনবেনা ! এরা পরিমার্জিত রুচিশীল বলে দাবি করলেও এদের মধ্যে খেয়োখেয়ি পেছনে বাঁশ দেওয়া এসব গুনুরঞ্জিত ব্যাপার স্যাপার লেগেই আছে তবে যেখানে ক্যামেরা চালু হলো , হাত ধরা ধরি করে তামাম কবি সাহিত্যিক সংগীত বিশারদ সব গিয়ে ঠেকলো ওই একই পীঠস্থানে। যতদিন সিনেমা তৈরী হয় ততদিন পরিচালক ঠিক করে দেয় নিজের ফ্রি সময়তেও ঠিক কতটা দাঁত কেলিয়ে নায়ক হাসবে, কেননা অযথা বেশি হাসলে চরিত্রে প্রভাব পড়তে পারে। এরা সবাই আবার অ্যাওয়ার্ড পেতে খুব ভালোবাসে, হোক না সে মোহিনী হোসিয়ারি অ্যাওয়ার্ড । এখন হালের ফ্যাশন হয়েছে যে যত কন্ট্রোভার্সি তৈরী করতে পারবে সে তত সফল। তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হলো সোশ্যাল মিডিয়া , রাত বিরেতে সেলিব্রিটি শুধু ‘হুঁ ‘ লিখে পোস্টালে তাতে ২৪০০ কমেন্ট ও ‘উঁহু’ লিখলে সাড়ে পাঁচ হাজার – কেন তা অবশ্য যে লিখেছে সেও জানেনা ! আর কি সব বীভৎস সে কমেন্টগুলো ’2me vala a66o?’ – মনে হয় এর চেয়ে হরপ্পালিপি তাড়াতাড়ি ডিসিফার করা যায়। যাই হোক বলা বাহুল্য হাতেম তাইএর মাথাও সব দেখে শুনে ঘুরেই গেলো। তাই বলছি যদি কোনোদিন কোনো অখ্যাত স্টেশনে আমির খান, ঋত্বিক রোশান,রণবীর কাপুর কিংবা সালমান খানের মতন সুপুরুষ কাউকে সন্দেহজনক ভাবে ছিন্নবস্ত্র পরিহিত অবস্থায় একমনে বীবিড়বিড় বা গুনগুন করতে দেখেন ভাববেন না যে কোনো শুটিং চলছে কিংবা ওরা সিআইডির চড় । একটু আলাপ জমলেই বুঝতে পারবেন ওরাই শাহ্জাদার আটকে পড়া চার বান্দার কোনো একজন।

আরবান ফ্যান্টাসি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments