ভোরবেলা উঠেই গুঁড়ো গুঁড়ো , টুকরো টুকরো ফুলের পাপড়ি কে যেন আপনার চন্দ্রবদনে উন্মত্তের মত ছুঁড়ছে । স্বরস্বতী পুজোর খানদানী অঞ্জলিও এর কাছে নস্যি । চোখ খোলার উপায় নেই। ফুলের রেনু ঘরময়। নাকে চোখে মুখে অনাবৃত শরীরের আনাচ কানাচ জুড়ে আদরে ব্যস্ত সেই রেনুর দল। কিছু দৃশ্যমান আর কিছু স্পর্শের কাব্যিকতায় ঋদ্ধ। মোহময় সৌরভে নেশাতুর ঘর , রং চটা সিলিং , পুরনো কার্পেট , এমনকি জানালার সিনথেটিক পর্দাটাও । পুরনো রেডিওর নবে হাত ছোঁয়ালেই নরম সোনাটা । ঘ্রাণেন্দ্রিয় অজান্তেই ডোবারম্যান বা হাউনডের ভঙ্গিমায় যুদ্ধং দেহি রূপে কোন বিজাতীয় ঘ্রানের অপেক্ষায় শাখা প্রশাখা মেলেছে । আকাশ বাতাসে ব্যপ্ত মেখলা রঙে টেরিবাগানো স্বর্ণযুগের নায়ক ওপর থেকে টুইট করছেন ভালোবেসে- “ আজ ভ্যালেন্টাইনস ডে ” ।
বইমেলাতে বাংলা বই কম বিকোতে পারে , কিন্তু প্রেম দিবসে মিনি কবিতা বিকোয় দেদার। খামের ওপর চকচকে ভোঁতা কলম দিয়ে মনের হায়ারোগ্লিফিক্স আর ভেতরে তুলিঢালা কাব্যি । তারে আর ঠেকাবে কে ? চেনা ল্যাম্পপোস্ট , চেনা দোতলা , চেনা কলের জলের স্বাদ , চেনা পাড়া । চেতনায় অদূর ভবিষ্যতের আশকারা । “ সাক্ষাৎ আলাদীন তোর প্রদীপ ভরা জীনে ; আরও আছে কত , কেটে দেওয়া সিনে ”।
স্বপ্নের বেলুন ওড়ে । শরীর মন ভাগাভাগি করে সুতো ধরে রাখে । পুরনো হিন্দি ছবির গানের মত আদরের ধুয়ো তুলে দিয়ে বাকিটুকু আপাতঊহ্য অথবা মনের গহনে চোখ বুজে শুয়ে । শপিং মল , কলেজ ক্যান্টিন , কফি হাউজ , টালমাটাল । ভাবনার দরজায় গ্রেগ্ররী পেক – অ্যাডরিউ হেপবারন ; আস্ত রোমান হলিডে । তালা খুলছে একে একে । চিন্তায় মশগুল হলে খিদে বাড়ে আর খিদের সাথে ইচ্ছে । অফলাইনে বাকির খাতায় আর অনলাইনে ক্রেডিট কার্ডে অঙ্ক বাড়তে থাকে । উপহার বাছাবাছির ঝড়ে সারা শরীরে পারফিউমের দোকান । আগামী সাতটা দিন নিশ্চিত তরল সুগন্ধিদের আত্মীয়তা থেকে রেহাই নেই । রাংতায় , রিবনে বাঁধাছাঁদা হয়ে ঘড়ি , ব্যাগ , চকোলেট পকেটে কিংবা পিঠে দুলতে দুলতে ট্র্যাফিক সিগন্যাল পার হয় । গাড়ির ব্যাকসিটে পড়ে থেকে হাওয়া খেতে খেতে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যায় কিছু মোড়ক । শুধু হাত বদলের অপেক্ষা । আর তারপরই তাদের মুক্তি । “ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন ” থেকে ইস্তেহার পৌঁছে যায় যথাস্থানে । সেই কবেকার সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের গল্পের খেই ধরে দোলনা বাঁধার চর্চা যুগ যুগ ধরে আরও চর্চিত , আরও বর্ধিত । হোক না গল্প কথা ; লোক টানবার খ্যামতা আছে । কোন শিং ওয়ালা অপদার্থ পঞ্চনদের বাসিন্দার ক্রিয়াকলাপ পর্যন্ত ভুলে থাকার ইচ্ছে যোগায় এক দিনের ক্যালেন্ডার ছোপানো ভালোবাসা ।

মানুষ তো হুজুগ খোঁজে । খোঁজে ক্ষেপে ওঠা সময়ের আঁচড় কামড় থেকে কিছুক্ষন গা বাঁচিয়ে রাখবার জন্য একটা শিখণ্ডী । চুমু খাবার বা জড়িয়ে ধরবার দিন ঠিক করে দিলেই তো আর প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসে আপামর জনগণ ঠোঁট আর বুক বাগিয়ে ঘুরে বেরাবে না । অনুভূতি চেনা ছকে হাঁটে না। তাই আমাদের এটাও জানা যে ভালবাসাকে মেগাসিরিয়ালের ছাঁচে কয়েকদিন পরপর ঢেলে দিলেই তা উত্তাপে হীরে হয়ে যায় না। যেতে পারে না। গপ্পো কাহিনী পড়েও যেটুকু জানা যায় তাতে দেদার কষ্ট। অনেক মেলা , না মেলার কবিতা। অনেক বিষণ্ণ দৃষ্টিপাত । অনেকবার পুড়ে গিয়ে ছাই গাদা থেকে অনু অনু শরীর সংগ্রহ করে ফিনিক্স হয়ে ওঠার যন্ত্রণা। যারা পারে বা পেরে থাকেন তাদের নিয়ে নাটক , নভেল , গপ্পো , সিনেমা হয় ; আর যারা পারে না তাদের নিয়ে আদিখ্যেতা আরও বেশি । ট্র্যাজিক চরিত্ররা কালজয়ী । আর যাদের হাল এই দু দলের মাঝখানে শাখামৃগের লাঙ্গুলের মত ভাসমান হয় , তারা সময়ের ধুলোতে ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। হয়তো বছরে এমনই একটা দিনে সঞ্চিত উত্তাপে চাহিদামত ফসফরাস খুঁটে নিয়ে জোনাকি হওয়ার অপেক্ষায় ।

আর একটা দিন…
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments