শেষমেশ আলু। বাজারে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ এক ভদ্রলোককে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল – ‘আচ্ছা বলুন তো আলুর কেজি কত’? উনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন –‘ত্রিশ-চল্লিশ হবে’। সবাই হেসে উঠতেই ভদ্রলোক বেজায় ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছিলেন – ‘শুনি তো সব জিনিসেরই দাম খুব বাড়ছে। তা আলুর যে খুব বাড়েনি কি করে জানব’? আজকের দিন হলে নিশ্চয় উত্তর দিতেন – ‘আগামীকাল বাজারে গিয়ে জেনে নিও’। প্রায় শেয়ার বাজার ওঠাপড়ার মতই আলুর হাল হল। আমিও বাজারে অনভিজ্ঞ। আগে ভাবতাম বৈজয়ন্তীমালা, সুপ্রিয়া দেবী, মাধুরী দীক্ষিতকে একসাথে আর রেকর্ড সৃষ্টিকারী মুখ্যমন্ত্রীকে একক ভাবে সম্মান জানাতেই বোধহয় আলুর অমন নামকরণ। পরে জানলাম যে আমি ভুল জানি।

বাজারে অনভিজ্ঞ বলেই আমার এত কথা জানার কোনও দরকার ছিল না, আমি তো খালি কাঁচালঙ্কা দিয়ে আলুসিদ্ধ খেতে খুব ভালবাসি। আর শীতকালে নতুন আলুর ঝোল বা আলুর দম আমার বড়ই প্রিয়। এছাড়া আলুর পরোটা, মাইরি বলছি আলুকাবলি, ফুচকা নিয়ে আরেকটু লেখার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু আকস্মিক ভাবে কি-বোর্ডের ওপর কোথা থেকে যেন এক ফোঁটা জল পড়ে চিন্তাটা ছিঁড়ে দিল। তো যেটা বলছিলাম, যে এর বাইরে আমার সাথে আলুর কোনও সম্পর্ক নেই। আলু চাষ করি না, হিমঘরে আলু রাখি না, রপ্তানি করি না, এমনকি কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা বা অন্য কোথাও থেকে আলুর বন্ডও কিনি না। নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার পরে আলুবোমও ফাটাই না।

এই সিধেসাধা গোলগাল জিনিসটি এরই আরেক জাতভাইয়ের মত ঝাঁঝ দেখাতেই আমার অনেক কিছু জানা হয়ে গেল। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই আলুর রাগ স্বাভাবিক। কারণ সে খুব একটা পাত্তা পেত না। এমনকি আলু খেলে ডায়াবেটিকদের ক্ষতি হয়, এই রকম একটা চোখ রাঙানি সত্ত্বেও তাকে কেউ ভয় পেত এরকমটা বড় শুনিনি। উল্টে আলুবাজ, আলুর দোষ এই সমস্ত অশালীন শব্দবন্ধের সাথে তাকে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রায় দশ-বারো গুণ বেশি দামের মুরগির মাংস ছুটির দিনে সাপ্লাই দিয়ে কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছে না, অন্তত ত্রিশগুণ দামের পাঁঠার মাংসও দেদার বিকোচ্ছে অথচ দেখুন সেই মাংসেরই ঝোল রান্না করতে গেলে অপরিহার্য আরেকটি জিনিসের জন্য বেশি দাম দিতে হলেই মাথা গরম। এতদিনে আলু একটু জাতে উঠল। কাগজে নাম উঠল, ছবি ছাপা হল, টিভি চ্যানেলের প্যানেল কোয়্যারেলে মুখ্য ভূমিকা নিল, সকালে আলু পাওয়া যেতে পারে শুনেই রাত থাকতে জনগণ লাইন লাগাল। সাত সমুদ্র তের নদী পারে আইফোন কিনতে কি রকম লাইন পড়ে খবরের কাগজে পড়েছিলাম, আমার সেই কথা মনে পড়ে গেল। ভেবে দেখুন শীতের শুরুতে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবও যে ফিলিংস জাগাতে পারল না, তা জাগালো আলু। আরও কি করল? পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে শিল্পের বহির্মূখী যাত্রা, সূর্যালোকে হত্যা, চন্দ্রালোকে ধর্ষণ যা করতে পারেনি সেটাও করে দেখাল। বেচারি কৃষি বিপণন মন্ত্রীটির ডানা ছাঁটা গেল। লোম হ র্ষ ক ব্যাপার স্যাপার!! তবে এটুকু আশ্বাস পাওয়া গেছে এই ডানা ছাঁটা কিছুদিনের জন্য। আলুকে বাগ মানাতে পারলেই আশা করা যায় আবার ডানাটি জুড়ে দেওয়া হবে যদি না এর মধ্যে অন্য কেউ আবার নিজের মাখনের মত নাকটা নিয়ে এসে হাজির হয়।

যাই হোক, আলু আমজনতার খাদ্য, সুতরাং উৎসাহ নিয়ে সরকার বাহাদুর নিজেই নেমে পড়লেন প্রতিবিধানে। একটা তো আগেই বলেছি। এছাড়া যা হল, নির্দিষ্ট মূল্যে আলু বিক্রি করতে হবে ফতোয়া জারি হল, বাজারে বাজারে শাসকদলের সদস্য-সমর্থকদের নজরদারি শুরু হল, জনকল্যাণের স্বার্থে আলু বোঝাই ট্রাক রাস্তায় থামিয়ে তা সঠিক মূল্যে বিক্রির সুব্যবস্থা করা হল, রাজ্যের আলু বেরাজ্যে পাঠানো বন্ধ হল। মানুষ আলু পেয়ে বাঁচল। যেটা জানি না, সেটা হল এই আলু বেচা নিয়ে কোথাও সিসিটিভি বসানো হয়েছে কিনা। হলে ভাল হত। এইভাবে পুরোটা না হলেও কিছুটা বাগ মানার পরে আসরে এল আরেক নিরীহ, অবহেলিত নুন। আরেক বিচিত্র জিনিস। গুণপনায় আলুর ওপরে। স্রেফ গুজবের ওপর ভিত্তি করে সচিন তেন্ডুলকরকেও পিছু হটিয়ে দিল। তিরাশি বছর পরে আবার সংবাদ শিরোনামে। নুন খাদ্যের মধ্যেই পড়ে। অতএব মাননীয় খাদ্যমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে জানালেন এটা বিরোধীদের চক্রান্ত। তাঁকে আর নিজের বেজোড় ডানা দেখতে হল না। এ যাত্রা সবাই রক্ষা পেল। কিন্তু নিজের ছায়াকেও কোরো না বিশ্বাস। কে জানে আবার কুমড়োশাক, লাউশাক এরাও যদি আলু-নুন-এর মূর্তি ধারণ করে! খুউব চাপ! সবাই কিন্তু বঞ্চিত।

এই ডামাডোলের বাজারে সেদিন কে যেন জানতে চাইল – ‘ন্যায্য মূল্যের দোকান ছাড়া অন্যত্র তো যে কোনও জিনিসই অন্যায্য মূল্যে বিক্রি হতে পারে। এই নিয়ে এত লম্ফঝম্ফ করার কি আছে’? হক কথা। ন্যায্য মূল্যের দোকান আর নো রিফিউজাল ট্যাক্সি জিন্দাবাদ।

কি বললেন? ফড়ে? ধুর মশাই, থামুন তো। আগে বিউলির ডাল আর আলুপোস্ত দিয়ে ভাত খেয়ে শনিবারের দুপুরে একটু গড়িয়ে নিই, তারপর ওসব নিয়ে ভাবা যাবে ’খন।

আলুনি অধ্যায়
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments