শহরে পাশাপাশি ফ্ল্যাটগুলো একে অন্যের ঘাড়ে অসভ্যের মতন নিশ্বাস ফেলে। আগে বুঝতাম না , এখন ফ্ল্যাটগুলোতে এসি চললেই সেই গরম নিশ্বাস হাড়ে হাড়ে টের পাই। উচ্চতাও এক একটার একেক রকম , কোনোটার সিলিং দশ ফুট তো কারো আবার বারো । আমার লেখার টেবিল মানে হালের ভাষায় বৈদ্যুতিন রাইটিং স্টেশনে বসে নিচের দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে পাশের জানলা দিয়ে বাইরে চোখ রাখলেই উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের ব্যালকনিটা দেখা যায়। আমি লেখার মাঝে সিগারেট খেতে খেতে দেখতে পাই , সেখানে প্রায়শই সেই ফ্ল্যাটের সর্বকনিষ্ঠা সদস্যা তিন্নি তার পুতুলগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছে , বিড়বিড় করে কি সব যেন আপন মনে বলছে কিম্বা মার কাছে বকা খেয়ে গুম মেরে এক কোণে কনুই গুটিয়ে বসে আছে। ওর কীর্তিকলাপগুলো ভারী মজার ও প্রত্যেকবার নিজের অজান্তেই ওর নতুন একটা কিছু করাটা আমাকে ক্ষনিকের জন্য হলেও , অনেকখানি টাটকা আনন্দ দিয়ে যায়। একদিন হটাতই ওপরে তাকিয়ে আমার দিকে চোখ পড়তেই দুম করে সে ঘরের ভেতরে পালিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই দেখলাম সে জানলার পর্দা সরিয়ে আমাকে দেখছে, আমি হাসি মুখে ব্যালকনিতে আসার ইঙ্গিত করলাম।
অমনি চলে এলো সে, ও এসেই আলাপপর্ব শুরু করলো প্রশ্ন দিয়ে।
“সিগারেট খেলে কি ক্যান্সার হয় ?”
“হয়ত হয় , ঠিক জানি না ” আমি বললাম, দেখলাম এখনো কিছুটা ভয় মিশ্রিত সন্দেহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
“কাক সিগারেট খায় না কেন?” আবার প্রশ্ন।
“ওর ভালো লাগে না হয়ত, তাই খায় না, তোমার কি খেতে ভালো লাগে?”
“আমার শুক্ত খেতে ভালো লাগে না। ”
“আচ্ছা কি খেতে ভালো লাগে সেটা শুনি। ”
ওদিকে তিন্নির মার চিত্কার শুনলাম, ” তুই স্নানে গেলি?”
তিন্নি অমনি হুশ করে ভেতরে চলে গেল। হয়তো স্নান সেরেই শুক্তদিয়ে ভাত খেতে হবে। ক্রমশ ওরে সাথে আলাপ জমিয়ে জানতে পারলাম তিন্নি ক্লাস ফোরে পড়ে। দুটো টিউটর আছে , একজন অঙ্ক ও বিজ্ঞানের ও অন্যজন ইংরিজি, বাংলা, ভূগোল, ইতিহাস মানে বাকি সবই পড়ায়। প্রথম জন সপ্তাহে দু দিন আসে ও তার মাইনে ৪৫০ টাকা ও আরেকজন বাকি পাঁচ দিন আসে এবং তার মাইনে ৩০০ টাকা। তিন্নির কাছ থেকে আরো জানলাম যে ওর বাবা ব্যাঙ্কে চাকরি করে ও মা এককালে স্কুলে চাকরি করত , এখন তিন্নির জন্যই নাকি সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে।

একদিন তিন্নি বারান্দায় আসতেই জিগ্গেস করলাম, ” কিরে পরীক্ষা তো এসে গেল !”
মুখটা কিরকম উর্দুর ‘ঋ’-এর মতন করে জবাব দিল , ” হ্যাঁ, প্রথম পরীক্ষাই অঙ্ক। ”
আমি বললাম , ” অঙ্ক কে যত ভয় পাবি তত ভুতের মতন চেপে বসবে , চল মুখে মুখে অঙ্ক করি.”
দেখলাম ওর মুখে একটা হাসির ঝিলিক খেলে গেল , বলল , ” করো ..করো… ”
“তোদের বাড়িতে কজন থাকে ও কে কে ?”
“আমি, মা, বাপি, আম্মা ও দাদান ..পাঁচ। ”
“বেশ, এবার তিনজন গেস্ট এলো , এখন তোদের বাড়িতে কজন হলো ?”
“আমাদের বাড়িতে তো গেস্ট আসেনা …”
“আচ্ছা ধরে নে তোর্ তিনজন বন্ধুই এলো …”
“আমার বন্ধুরা তো অনেক দুরে থাকে….এখানে কখনো আসেনা !”
“বেশ দুধওয়ালা , ধোবি , নিউসপেপারওয়ালা এরা এলো …”
“মা তো এদের ঘরে ঢুকতেই দেয় না , বাইরে থেকেই দুধ, পেপার নিয়ে নেয় । ”
আবার তিন্নির মার চিত্কার শোনা গেল , ” aunty আসার আগে টাস্ক গুলো সব করেছিস কিনা চেক করে নে ..”

এই যাহ , টিউটর দুজন আর কাজের লোক, এই দিয়ে তো আরো তিনজন হয়ে যেত। আমার চিন্তা ভাবনাও দেখছি নেহাতই সাবেকি হয়ে যাচ্ছে, একটা শিশুর মত করে ভাবতে পারছি না। ওঁত পেতে থাকলাম কখন তিন্নি আবার বারান্দায় আসে ও আমি তাকে আবার মুখে মুখে অঙ্ক কষাবো। তিন্নি এলো, এবার বেজায় খুশি !
আমি জিগ্গেস করলাম,”কিরে এত ফুর্তি কিসের?”
তার জবাব, ” জানো জানো ,মা বলেছে, এবার অঙ্কে ফেল করলে স্যারকে ছাড়িয়ে দেবে ও আমাকেও আর স্কুলে পাঠাবেনা …”
“বটে, তার মানে তুই ফেলই করবি ঠিক করেছিস ?”
মিচকে হাসি দিয়ে সে বলল “হ্যাঁ..”
“তা ফেল করে , আবার একই ক্লাসে পড়বি ?”
“নাহ , মা বলেছে এইবার ফেল করলে , মিষ্টির দোকানের সামনে যে ওই পাগলটা বসে থাকে না, ওর সাথে বিয়ে দিয়ে দেবে …”
“ওহ, আর বাবা কি বলেছে ?”
“বাপি বলেছে, ছেলে হলে পান বিড়ির দোকান খুলে দিতাম। তুই মেয়ে, রান্না বান্না ভালো করে শিখে নে, পাগলও তো খাবার খায় !”
“তা পাগলটাকে তুই বিয়ে করবি, সেটা একপ্রকার ঠিকই করে ফেলেছিস আর তার জন্য অঙ্ক আর তোর্ ভাল্লাগছেনা , তাই তো ?”
“নাহ , তুমি ওই মুখে মুখে জিগ্গেস করো , আমি ওই ভাবে অঙ্ক করতে পারি। ”
“বেশ, তোর্ টিউটর এলো , এবার বাড়িতে কজন ?”
“কোন টিউটর , স্যার না ম্যাডাম ?”
” যে কেউ একজন এলো ..”
“স্যার তো রাতে আসে তখন বাপি অফিস থেকে ফিরে আসে , তাহলে তখন বাড়িতে ছ-জন। আর ম্যাডাম যখন এমনি দিনে বিকেলবেলাতে আসে তখনও বাপি অফিসে , তার মানে তখন আমাদের বাড়িতে পাঁচ-জন। ”
“আর অমনি দিনে যখন তোর্ ম্যাডাম আসে , তখন?”
“শনিবার ম্যাডাম যখন আসে তখন বাপি বাজারে যায় আর দাদান মর্নিং ওয়াকে , তখন আবার বাড়িতে চার-জন !”
“বাহ , এই যে তুই বলছিলিস অঙ্ক কঠিন,দেখ কত সোজা করে দিলাম। ”
“ওই দেখো , আবার সিগারেট ধরায়…” বলেই কিরকম মুখ ভেংচে তিন্নি ভিতরে চলে গেল।এইবার কিন্ত ওর মা চিত্কার করে ভেতরে আসতে বলেনি !

আমিও এর মধ্যে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম , ঠিক খেয়াল করিনি কখন তিন্নির পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে ! রেজাল্টও যে বেড়িয়ে গেছে সেটাও ঠাওর করে উঠতে পারিনি। হটাত কলিং বেল বাজতেই , দরজা খুলে দেখলাম তিন্নির মা এক বাক্স মিষ্টি নিয়ে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। একটু লাজুক ভঙ্গিতেই জানালো যে তিন্নি পাশ করেছে , ও অঙ্কে তিরাশি পেয়েছে।
“ও আপনার কথা খুব বলে , বলে কাকুটা জানলা থেকেই কি ভালো অঙ্ক বোঝায় , স্যারের মত ঘরে ঢুকে কথায় কথায় ধমকায় না….”
আমিও আমতা আমতা করে প্যাকেটটা নিয়ে বললাম , ” তা ভালো খবর তো , কিন্ত তিন্নিকে তো দেখছি না ?”
“আর বলবেন না , মেয়েতো মুখ গোমড়া করে বসে আছে ! ”
“সেকি , কেন ?”
“কি জানি , পাগলি গোছের তো …কি ভর করেছে মাথায়। তা দাদা এবার তো ওর ক্লাস ফাইভ হলো। এবার থেকে একটু বাড়িতে এসে দেখে দিন না , বলেন তো ওকে বিকেলে ঘন্টাখানেকের জন্য পাঠিয়ে দেবখন…”
“নাহ নাহ , আমি ওরকম নিয়ম করে পড়াতে পারি না। ওই ব্যালকনিতে আসলে গল্পগুজব করার ফাঁকে আমি কিছু জিনিস শিখব, ও কিছু শিখবে , ব্যাস এই আর কি ..”
তিন্নির মা কি বুঝলো কে জানে , কিন্ত তিনি যে ঠিক হাসিমুখে ফিরলেন না , সেটা বেশ বোঝা গেল। পরে অবশ্য খোজ নিয়ে জেনেছিলাম যে ওর মা যখন নিজেদের ও আসে পাশের ফ্ল্যাটের সবার জন্য মিষ্টির প্যাকেট বানাবার প্ল্যান করছিল , তখন তিন্নি মিষ্টির দোকানের বাইরে বসা পাগলটার জন্যও মাকে একটা প্যাকেট ধরে হিসেব করতে বলে। তাতে ওর মা খেঁকিয়ে ওঠে, ” হ্যাঁ উনি অঙ্কে পাশ করেছে তাই পাগল ফকির সব্বাইকে মিষ্টি বেলাতে হবে ! যানা ,ব্যালকনি তে যা ।

তিন্নি আর আজকাল ব্যালকনিতে আসে না। ওর নাকি পড়ায় এখন খুব মন হয়েছে, টিউটরও নেই কোনো। সুধু সন্ধ্যে হলেই জানলার ধারে বসলে একটা একঘেয়ে গুনগুন আওয়াজ নিয়ম করে শুনতে পাই !

আলোকপ্রাপ্তি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments