[শ্রদ্ধেয় শ্রী সুকুমার রায় বিরচিত গল্প “আশ্চর্য কবিতা” অবলম্বনে একটি ভুলভাল গল্প, বাস্তবের সাথে মিল থাকলে তা নেহাতই কাকতালীয় বলে মার্জনা করে দেবেন।]

আশ্চর্য স্বপ্ন

আহাম্মকদের দেশে একটি নূতন রাজা আসিয়াছে। সে আসিয়া প্রথম দিন‌‌ই সকলকে জানাইল, “আমি স্বপ্ন দেখাইতে পারি !” একথা শুনিয়া দেশের অনেকেই অবাক হ‌‌ইয়া গেল; কেবল দুই-একজন হিংসা করিয়া বলিল, “আমরাও ছেলেবেলায় ঢের ঢের স্বপ্ন দেখিয়েছি।” নূতন রাজাটি বোধহয় ভাবিয়াছিল, সে স্বপ্ন দেখাইতে পারে শুনিয়া দেশে খুব হুলুস্থুল পড়িয়া যাইবে এবং স্বপ্নের নমুনা শুনিবার জন্য সকলে হা হা করিয়া উঠিবে। যখন সেরূপ কিছুর‌‌ই লক্ষণ দেখা গেল না তখন বেচারা, যেন আপন মনে কি কথা বলিতেছে, এরূপভাবে, ঘুমপাড়ানির মতো সুর করিয়া একটা স্বপ্নের কথা আওড়া‌‌ইতে লাগিল—

ওহে ডেভেলপমেন্ট, তুমি কিসের আশায়
বসিয়াছ উচ্চ ধর্মে সুন্দর বাসায়?
কৃষ্ণ-অর্থমণ্ডলেতে উড়িয়া উড়িয়া
কত সুখ পাও, আহা ঘুরিয়া ঘুরিয়া।
যদ্যপি থাকিত মম শিক্ষা এবং ডানা
উড়ে যেতাম তব সনে নাহি শুনে মানা-

স্বপ্ন শেষ হ‌‌ইতে না হ‌‌ইতে, ভবেশ নামে এক প্রাক্তন রাজা তাহার মতো সুর করিয়া মুখভঙ্গী করিয়া বলিল-

আহা যদি থাকত তোমার
শিক্ষার উপর ডানা
উড়ে গেলেই আপদ যেত-
করত না কেউ মানা!

নূতন রাজা তাহাতে রাগিয়া বলিল, “দেখ বাপু, নিজেরা যা পার না, তা ঠাট্টা করে উড়িয়ে দেওয়া ভারি সহজ। চালাকি ও নাটকফলের গল্প শোনোনি বুঝি?”
একজন দেশদ্রোহী অত্যন্ত ভালোমানুষের মতো মুখ করিয়া বলিল, “চালাকি এবং নাটকফল! সে আবার কি গল্প?” অমনি নূতন রাজাটি আবার সুর ধরিল-

রাজ্য হতে নাটকফল ভক্ষণ করিতে
সততা শৃগাল প্রবেশিল এক নাটক ক্ষেতে
কিন্তু হায় নাটক যে অত্যন্ত উচ্চে থাকে
শৃগাল নাগাল পাবে কিরূপে তাহাকে,
বারম্বার চেষ্টায় হয়ে অকৃতকার্য
‘নাটক টক’ বলিয়া পালাল ছেড়ে রাজ্য।

সেই হ‌‌ইতে আহাম্মকদের দেশপ্রেমিক একেবারে তাহার চেলা হ‌‌ইয়া গেল। দেশপ্রেমিকের কাছে আমরা আহাম্মকেরা শুনিলাম যে রাজার নাম শ্যামলাল। সে নাকি এত স্বপ্ন দেখাইয়াছে যে, একখানা আস্ত ইস্তাহার প্রায় ভরতি হ‌‌ইয়াছে আর আট-দশটি স্বপ্ন হ‌‌ইলেই তাহার একশোটা পুরো হয়; তখন সে নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পা‌‌ইবে।

ইহার মধ্যে একদিন এক কাণ্ড হ‌‌ইল। গোপাল বলিয়া একটি বণিক দেশ ছাড়িয়া যা‌‌ইবে এই উপলক্ষে রাজা শ্যামলাল এক প্রকাণ্ড স্বপ্ন দেখিয়া ফেলিল। তাহার মধ্যে ‘বিদায় বিদায়’ বলিয়া অনেক ‘অশ্রুজল’ ‘দুঃখশোক’ ইত্যাদি কথা ছিল। গোপাল স্বপ্নের আধখানা শুনিয়াই একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠিল। সে বলিল, “ফের যদি আমার নামে স্বপ্ন দেখবি তো মারব এক থাপ্পড়।” দেশপ্রেমিক বলিল, “আহা বুঝলে না? তুমি দেশ ছেড়ে যাচ্ছ কিনা, তা‌‌ই ও দেখিয়েছে।” গোপাল বলিল, “ছেড়ে যাচ্ছি তা যাচ্ছি, তোর তাতে কি রে? ফের জ্যাঠামি করবি তো তোর স্বপ্নের গুলপট্টি ছিঁড়ে দেব।”

দেখিতে দেখিতে রাজা শ্যামলালের কথা দেশময় রাষ্ট্র হ‌‌ইয়া পড়িল। তাহার দেখাদেখি আরও অনেকেই স্বপ্ন দেখিতে ও দেখাইতে শুরু করিল। ক্রমে স্বপ্ন দেখার ও দেখাইবার বাতিকটা ভয়ানক রকম ছোঁয়াচে হ‌‌ইয়া নিচের দিকের প্রায় অর্ধেক দেশবাসীকে পা‌‌ইয়া বসিল। ছোট ছোট দেশবাসীদের মাথায় ছোট ছোট স্বপ্নের প্রতিশ্রুতি দেখা দিল। বড়দের মধ্যে কেহ রাজা শ্যামলালের চেয়েও ভালো স্বপ্ন দেখাইতে পারে বলিয়া শোনা যা‌‌ইতে লগিল। দেশের দেয়ালে, পড়ার কেতাবে, পরীক্ষার খাতায়, চারিদিকে স্বপ্ন গজাইয়া উঠিল।

পাঁড়েজির বৃদ্ধ গোরু যেদিন প্রচন্ড রৌদ্রে শিং নাড়িয়া দড়ি ছিঁড়িয়া দেশের খরাক্রান্ত চাষজমিতে দাপাদাপি করিয়া মরিয়াছিল, আর রাজা শ্যামলালকে তাড়া করিয়া বিড়ম্বনায় ফেলিয়াছিল, তাহার পরদিন ভারতবর্ষের তাবড় মিডিয়ায় বড় ম্যাপের উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা স্বপ্ন দেখানো হ‌‌ইল—

পাঁড়েজির গোমাতার একহাত লেজ,
অপরূপ রূপ তার, কী দারুণ তেজ !
ক্ষেতেতে দাপটি করি নেচেছিল কাল
তারপর কি হ‌‌ইল জানে শ্যামলাল।

রাজা শ্যামলালের রঙটি কালো কিন্তু এরকম স্বপ্ন দেখিয়া সে যথার্থ‌‌ই চটিয়া লাল হ‌‌ইল, এবং তখনি তাহার নিচে ভক্তলোক দিয়া একটা কড়া স্বপ্ন দেখাইতে লাগিল। সে সবেমাত্র দেখাইয়াছে— ‘রে অধম কাপুরুষ পাষণ্ড বর্বর-’ এমন সময় গুরু গম্ভীর গলা শোনা গেল— “ইতিহাসের উপর কি লেখা হচ্ছে?”

ফিরিয়া দেখে প্রথম বিশ্বের এক দেশের মহারাজা মহাশয় !
রাজা শ্যামলাল একেবারে থতমত খা‌‌ইয়া বলিল, “আজ্ঞে স্যার, ওরা আগে লিখেছিল।”
“ওরা কারা?”
রাজা শ্যামলাল বোকার মত একবার আহাম্মকদের দিকে, একবার মন্ত্রীসভার দিকে তাকাইতে লাগিল, কাহার নাম করিবে বুঝিতে পারিল না।
সেই মহারাজা মহাশয় আবার বলিলেন, “ওরা যদি মায়ের বাড়ীতে মানুষ কাটতে যায়, তুমিও কাটবে?”

যাহা হ‌‌উক সেদিন অল্পের উপর দিয়াই গেল, রাজা শ্যামলাল একটু ধমক-ধামক খা‌‌ইয়াই খালাস পা‌‌ইল।

ইহার মধ্যে একদিন আহাম্মকদের এক বুদ্ধিজীবীমশাই গল্প করিলেন যে, তাঁহার সঙ্গে যাহারা এক রাজ্যে থাকিত, তাহাদের মধ্যে একজন নাকি অতি সুন্দর স্বপ্ন দেখাইতো। একবার প্রথম বিশ্বের মহারাজামশাই রাজ্য দেখিতে আসিয়া, তাহার স্বপ্ন দেখিয়া এমন খুশি হ‌‌ইয়াছিলেন যে, তাহাকে একটা সুন্দর ছবিওয়ালা প্রকল্প উপহার দিয়াছিলেন।

ইহার মাসখানেক পরেই রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উপলক্ষ্যে দেশ দেখিতে আসিলেন। প্রায় বিশ-পঁচিশটি মন্ত্রী সাবধানে হৃদয়ের মধ্যে লুকা‌‌ইয়া স্বপ্নের প্রতিশ্রুতি আনিয়াছে। বড় হলের মধ্যে সমস্ত দেশের রাজাদের দাঁড় করানো হ‌‌ইয়াছে, প্রথম বিশ্বের মহারাজা মহাশয় রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রেসিডেন্টকে ল‌‌ইয়া পার্লামেন্টে ঢুকিতেছেন— এমন সময় রাজা শ্যামলাল আস্তে আস্তে মাথা হ‌‌ইতে একটি স্বপ্ন বাহির করিল। আর যায় কোথা ! পাছে রাজা শ্যামলাল আগেই তাহার স্বপ্ন দেখাইয়া ফেলে, এই ভয়ে ছোট বড় একদল স্বপ্নওয়ালা একসঙ্গে নানাসুরে চীৎ‌কার করিয়া যে যার স্বপ্ন হাঁকিয়া উঠিল। মনে হ‌‌ইল, সমস্ত দেশটা কর্তালের মতো ঝন্‌‌ঝন্‌‌ করিয়া বাজিয়া উঠিল, রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট মহাশয় মাথা ঘুরিয়া মাঝ পথেই মেঝের উপর বসিয়া পড়িলেন। কাশ্মীরের উপর একটা জঙ্গীগোষ্ঠী ঘুমা‌‌ইতেছিল, সেটা হঠাৎ‌ হাত পা ছুড়িয়া আদর্শ হ‌‌ইতে পড়িয়া গেল, দেশের দারোয়ান হ‌‌ইতে অফিসের আমলা বাবু পর্যন্ত হাঁ হাঁ করিয়া ছুটিয়া আসিল।
সকলে সুস্থ হ‌‌ইলে পর রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট মহাশয় বলিলেন, “এতো স্বপ্ন দেখাইলে কেন?”
সকলে চুপ করিয়া রহিল।
আবার জিজ্ঞাসা করা হ‌‌ইল, “কে কে স্বপ্ন দেখিয়েছিল?”
পাঁচ-সাতটি রাজ্যের মন্ত্রী একসঙ্গে বলিয়া উঠিল— “রাজা শ্যামলাল।”
রাজা শ্যামলাল যে একা অত মারাত্মক রকম স্বপ্ন দেখাইতে পারে, এ কথা কেহ‌‌ই বিশ্বাস করিল না। যতগুলি মন্ত্রী ও নেতার মাথায় স্বপ্নের ইস্তাহার পাওয়া গেল, নির্বাচনের পর তাহাদের দেড় দশক আটকা‌‌ইয়া রাখা হ‌‌ইল।

অনেক তম্বিতম্বার পর একে একে সমস্ত কথা বাহির হ‌‌ইয়া পড়িল। তখন রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট মহাশয় বলিলেন, “স্বপ্ন দেখাইবার রোগ হয়েছে? ও রোগের ওষুধ কি?”

এক বৃদ্ধ পণ্ডিতমহাশয়, যাঁহার জ্ঞানের কোন দাম আহাম্মকদের কেউ দেয় নাই কোনোদিন, সবাই শেষে তাঁহার পায়ে পড়িলো। তিনি বলিলেন, “বিষস্য বিষমৌষধম্‌‌, বিষের ওষুধ বিষ। বসন্তের ওষুধ যেমন বসন্তের টিকা, ভূয়া স্বপ্ন দেখাইবার ওষুধ তস্য টিকা। তোমরা যে যে স্বপ্ন দেখিয়েছো তার টিকা করে দিচ্ছি। তোমরা এক মাস প্রতিদিন পঞ্চাশ বার করে এটা দেখে এসে দেশের প্রত্যন্ত গাঁয়ের প্রাইমারি স্কুলে এনে আমায় দেখাবে”, এই বলিয়া তিনি টিকা দিলেন—

চোরে চোরে মিল খুঁজে, মাসতুতো চৌদ্দ
এই দেখ লিখে দিনু কি ভীষণ পদ্য !
করবো না করছি না, ভর্তসনা, তোপ? No!
দুর্নীতি গুঁতো মেরে গিলে ফেলি স্বপ্ন!!

একমাস তিনি রাজা ও মন্ত্রীদের এই স্বপ্ন প্রতিদিন পঞ্চাশবার না দেখাইয়া ছাড়িলেন না। এ স্বপ্নটিকার কি আশ্চর্যগুণ— তারপর হ‌‌ইতে স্বপ্ন দেখিবার ও দেখাইবার ফ্যাশান দেশ হ‌‌ইতে একেবারেই উঠিয়া গেল।

© শ্রুতিসৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়

আশ্চর্য স্বপ্ন
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments