প্রকৃতি এবং ভোট উভয়ের গরমে খোদ আইপিএল-ই যখন ফাঁকা ইডেনে হাওয়া খেতে শুরু করেছে তখন বেশ বোঝা যাচ্ছিল এই খবরটি অনেকেরই নজরের বাইরে থেকে গেছে। বেশ কয়েকবছর আগে একবার পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়া দপ্তরের এক অধিকর্তা সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বিরক্ত হয়ে পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলেছিলেন গরম যেরকম পড়ার কথা সেইরকমই পড়েছে, মিডিয়ার জন্যেই জনগণের গরম আরও বেশি লাগছে। সঙ্গে এ-ও জুড়ে দিয়েছিলেন হাতে জুতসই ইস্যু যেমন, ক্রিকেট খেলা, ভোট এইসবের অনুপস্থিতিই তাবৎ সাংবাদিককূলকে অসহিষ্ণু করে তুলেছে। তো যাই হোক, জুতসই ইস্যুর উপস্থিতি যে এই ২০১৬ সালে একটি বা একাধিক অত্যন্ত উর্বর মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনাকে অনাদরে, অবহেলায় পথের পাশে পরে থাকতে সাহায্য করল সে বিষয়ে আমি অন্তত নিঃসংশয়।

এবারে কথা হল – এই চিন্তাটা কি। চিন্তাটি হল কলকাতা শহরে মেট্রো রেলের পণ্যপরিবহণের ভাবনা। এমনিতেই দেশের প্রথম মেট্রোধারী হিসেবে কলকাতার মেট্রো এক বিশেষ সম্মানের অধিকারী। সারা দেশে যা কোথাও ঘটেনি এখানে তাই ঘটেছে। মেট্রো রেল যে শুধুমাত্র খোদ রেল মন্ত্রকের অধীন তাই নয় একটি পৃথক গর্বিত জোন। তা অন্যান্য জোন যখন ইতিমধ্যেই প্রমাণ করে ছেড়েছে যে রেলে পণ্যপরিবহণ বসতে লক্ষ্মী, তখন মেট্রোই বা এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকে কেন! তবে আবার এইটা ভেবে বসবেন না যে মেট্রো আর পাঁচটা পুঁজিপতির মত শুধু মুনাফা করতে চাইছে। আসলে কলকাতা শহরে দিনের বেশ কিছূটা সময় পণ্যবাহী যানবাহনের প্রবেশ নিষেধ, সেই সময়ে মেট্রো এই মহান দায়িত্ব পালন করতে পারে। লাভকে লাভও হল আবার জনহিতার্থে কাজও হল। এবারে অনিবার্য প্রশ্ন – যে মেট্রো যাত্রীপরিবহণ করতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে সে পণ্য নিয়ে কখন যাওয়া আসা করবে? তারও উত্তর মজুত – অব্যস্ত সময়ে। ঘাঘু সাংবাদিকেরা সব ভোট কভার করতে ব্যস্ত ছিলেন অথবা অকুস্থলে উপস্থিত মিডিয়া উচ্চপদস্থ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীকে বিড়ম্বনায় ফেলা অনুচিত মনে করেছিলেন অথবা রাষ্ট্রের গুপ্ততথ্য প্রকাশ করার মহা অপবিত্র কর্ম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার তাগিদে যে সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর গোপ্য থেকে গেল সেটা হল – পরিকাঠামোটা কোথায় এবং কিভাবে তৈরি হবে।

আপাতত নাহয় ধরে নেওয়া গেল অচিরেই জমিজট কাটিয়ে আমার বাড়ির উঠোন, ওর বাড়ির কুয়োতলা সবই মেট্রোজালের ভেতরে চলে আসবে। এতদূর এসে মনে আবার প্রশ্নের উদয় হল, তবে এটার একটা মীমাংসা আমি খুঁজে পেয়েছি। পণ্যপরিবহণ করতে হলে একটা ভদ্রসভ্য গুদোমঘর যাকে ভাল ভাষায় স্টকইয়ার্ড বলে, সেটা তো লাগে, সেটা কোথায় তৈরি হবে? দমদম থেকে টালিগঞ্জ পর্যন্ত মাটির তলায় অবশ্য প্রচুর জায়গা আছে, পাতাল রেলের গুদোমঘর যে পাতালেই তৈরি হবে এটা বোঝার জন্যে আমার মত মূর্খ হলেও চলে। শুধুমাত্র সেন্ট্রাল এবং মহাত্মা গান্ধী রোড স্টেশন সংলগ্ন অঞ্চলেই যা একটু বেশি পাতাল খরচ হবে, অন্যত্র সামান্য পাতালেই কাজ চলে যাবে।

তাহলে গুদোমঘরের একটা হিল্লে হল। পরে উই ধরলে গরু কাঁদবে কিনা সেসব পরেই ভাবা যাবে। এরপরের প্রশ্ন – অব্যস্ত সময় কাকে বলে। এখানে এসেই আমি হোঁচট খেয়েছি, আমার বুদ্ধির গতি রুদ্ধ। সাধারণভাবে কলকাতা শহরে পণ্যবাহী যানবাহনের প্রবেশের সময়সীমা হল সকাল আটটা পর্যন্ত। এরপরে বেলা বারোটা থেকে বিকেল চারটে। তারপরে আবার রাত আটটার পরবর্তী সময়। এই যে সময়সীমা সেটা শুধুমাত্র লাইটওয়েট গাড়ি অর্থাৎ সাত টন পর্যন্ত বহন করে তাদের জন্যে। অন্যদের জন্যে সকাল আটটা থেকে রাত দশটা পুরো সময়টাই নিষিদ্ধ। এই পর্যন্ত পৌঁছে বোঝা গেল যে ফাঁকা সময় বলতে যা বোঝানো হতে পারে সেই সময় আইনানুগ পথেই শহরে পণ্যবাহী গাড়ি অবাধে ঘুরে বেড়াতে পারে। মেট্রো কি তবে এইসময়ে আরও বেশি পণ্য পরিবহণ করবে ? সেক্ষেত্রে মেট্রোর এই মহৎ উদ্যোগ কাদের কাজে আসতে পারে ? বিশেষত মর্ত্যের মতই পাতালের মালগাড়িও যখন ডোর টু ডোর সার্ভিস দিতে অক্ষম। তবে ওই আগে যেমন বললাম আমার বাড়ির উঠোন যদি মেট্রোজালে জড়িয়ে যায় তবে আলাদা কথা। তখন ডাকপিওনের মত বাড়িতে এসে মেট্রোপিওনও বাড়িতে ‘জিনিসপত্র বুঝিয়া পাইলাম’ এই মর্মে রশিদে সই করিয়ে জিনিসপত্র নামিয়ে দিয়ে যাবেন। একইভাবে খালি শিশিবোতল-টিনভাঙা খরিদনেওয়ালাদের মত আমার থেকে নিয়েও যেতে পারবেন।

কেন এই প্রস্তাব উঠে এল সেটা মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেলেও ঘরপোড়া গরু হিসেবে অন্য ট্যারা চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। মনে আছে নিশ্চয় বিটি রোডে মেট্রো চালানো নিয়ে বেশ কয়েকবছর আগে হইচই শুরু হয়। অথচ এই রাস্তাটির দু’পাশের প্রত্যেক সদ্যোজাত বাসিন্দাও জানত যে এটা অসম্ভব। কারণ পলতা-টালা জলের পাইপ। তবুও ঘটা করে সমীক্ষার জন্যে অর্থ বরাদ্দ হল, সমীক্ষা হল, এবং ফলাফল একই রয়ে গেল। অবশ্য এই পুরো বিষয়টির পেছনে একটি রাজনৈতিক অংকও কাজ করেছিল। সেই অংশটিকে সরিয়ে রাখলে যেটি পড়ে থাকে তা হল জনগণের দেয় কর বাবদ প্রাপ্ত অর্থ বরাদ্দ এবং খরচ। এইবারে যদি কারও শুভবুদ্ধির উদয় হয় ভাল নাহলে আবার একবার অর্থবরাদ্দ, খরচ এবং সমীক্ষার ফলাফল দেখে প্রকল্প বাতিল।

এই পর্যন্ত লিখে হঠাৎ মনে পড়ল কলকাতার মোট ঊনত্রিশটি মেট্রো ষ্টেশনের একটিতেও যাত্রীদের জন্যে কোনও শৌচালয় নেই। শুধু রাজনৈতিক নেতাদের দোষ দিয়ে কি লাভ যখন আমলারাও গিমিকবাজিতে যথেষ্ট এগিয়ে

আয়, তোর মুন্ডুটা দেখি ফুটোস্কোপ দিয়ে
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments