যে ভূমিতে আজ আমরা বাস করছি , তার নলকুপের জল পরিস্রুত ও সরকারীভাবে নাকি বীজানুমুক্ত! এই সরকারী আবহাওয়ার বায়ু পাগলা নদীর ন্যায় খরস্রোতা ,যার উল্লসিত ধারা না চাইতেই রোজ নিশ্বাসরূপে নাক দিয়ে ঢুকে মনে করিয়ে দেয় যে এ বাংলা সুধু বিশ্বের নয়! এ ভূমিখণ্ড NASAর চোখ ফাঁকি দিয়ে মঙ্গলের টকটকে লাল বালুকাবেলার মাঝে ধুসর বার্তা নিয়ে যাওয়া আগামীর মরুদ্যান। সে ভূমির ইতিকথা আজ তামাম বেদ বিজ্ঞান ছাড়িয়ে অন্য এক মাত্রাকে ছুঁয়ে ফেলেছে , ইতিহাসের ইতিহাস তৈরী হচ্ছে আজ আমাদেরই দোরগোড়ায়। এ অঞ্চলে কোনো চাহিদা নেই, কোনো দাবি নেই। মিছিল, মিটিং , প্রতিবাদ এমনকি কোনো বাওয়াল কিম্বা বাট্টাও নেই। মিডিয়ার লাইন হটাত থমকে গেছে কেননা গুঁজে দেওয়ার মতন কোনো খবরও নেই। অগত্যা ভূমিকম্প হলেও ‘টাই পড়া’ চাকরি বাঁচাতে, এক পার্থর দিদির প্রিয় কুকুরের কঙ্কাল ও অন্য পার্থের দিদির চেনা কুকুরের ডায়ালিসিস দিয়ে শিরোনাম তৈরী করতে গিয়ে সুমন দে কে যারপরনাই হিমশিম খেতে হচ্ছে। ওপারে মিরপুরে বাংলাদেশ ভারতকে ফেলে বেটে দিল তো এপারে মোহনবাগান আইলিগ হাতালো। না বললেও হয়, তবু না বললেই নয় , দিদি কিন্ত মোদীকে সাইডলাইন করে, ওপেন মঞ্চে হাসিনা আপু কে জড়িয়ে ধরে ‘কানে কানে-ফিস ফিস’ করতেই, পূব বাংলার ইলিশ আপামর বিশ্ব বাংলার বাজারে ঝুপ ঝুপ করে পড়তে লাগলো। এই মরুদ্যানের ভালো খবরগুলো তো আর নগরখাসিদের চোখে পরে না। তারা জানেনা যে , একটু সবুর করলেই গোদা প্যাটার্নের নাগরিকও কিরকম মেওয়া ফলার মতন ইতিহাসের পাতায় জড়িয়ে যায়।

একটু পিছিয়ে যাই, পরে আবার এগোনো যাবেখন। এই আজকের দিনে লাল দরিয়া মোট ছটি মুলুকের মাঝে ভাগাভাগি করা আছে, পুবদিকে দুটি আর পশ্চিমে চারটি । প্রাচীনকালে পারস্য সম্রাট দরাযুস অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে একটা খাল কেটে এই আটকে থাকা সমুদ্দুরের উত্তর প্রান্তটা নীলনদের সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন। খালটাকে আজও আমরা সুয়েজ প্রণালী বলে চিনি। পরবর্তীকালে দরাযুস কে কৌশলে কোতল করার পরে স্বয়ং আলেক্জান্ডার এই খাল বেয়ে লোহিত সাগর পেরিয়ে ভারত মহাসাগর অব্দি গেছিলেন বলে শোনা যায়। ইহুদি ধর্মগ্রন্থেও এই লোনা জলাশয়ের উল্লেখ আছে যেরকম আছে আদি মিশরীয় কিছু উপাখ্যানে। ভাস্কো দা গামা আসার প্রায় হাজার দেড়েক বছর আগে খুব সম্ভবত হিপালাস নাম এক গ্রিক বেনিয়া কাম পর্যটক প্রথম এই লাল সাগরের থেকে ভারত মহাসাগর আসার পথ খুঁজে পান। ব্যাস মাঝি মল্লা নিয়ে জলপথ টহল দিতে দিতে দক্ষিন ভারতে হয়ত তিনি পৌছিয়েও গিয়ে থাকবেন। হিপালাস ছিলেন পাঁড় ব্যবসায়ী, এতদূর নিশ্চই সে মাগনায় আসেন নি। ভাষা ছাড়াও যে সুধু মাত্র অভিব্যক্তি দিয়ে মত বিনিময় করা যায় বা পাতি বাংলায় বেচা কেনা করা যায় সেটা তিনি আলবাত বুঝতেন। এ দেশের রেশম, মশলা ও নানাবিধ ধাতু দেখে যে তার একেবারে লোভ লাগেনি সে তো নয় কিন্ত বিনিময়ে দেওয়ার মত কিছু থাকলে পরে তো হবে বিক্রি বাট্টা ! তারা তো আর বিজনেস করবে ভেবে বেরোয়নি, উল্টে যা রসদ ছিল তা এই ম্যারাথন যাত্রার সময় খোরাকি জোটাতেই উবে গেছে ।

উপমহাদেশে কেরল প্রদেশে বরাবরই বর্ষা প্রথমে হানা দেয়। সেইবার হিপালাসরাও আটকে পড়লেন ওই মনসুনের চক্করে। হটাত একরাতে জেলে বস্তিতে রাত কাটানোর সময় মাছের দুর্গন্ধ নাকে যেতেই তার মনে পড়ল সেই আজব মাছেদের কথা। সেই রুপোলি মাছগুলো, যারা নিল নদ থেকে অদ্ভূত ভাবে সমুদ্র থেকে উল্টো পথে নদীতে ঢুকছিল ডিম পাড়তে। চকচকে চেহারা আর তীরের ফলার মতন গঠন তাদের। প্রচুর কাঁটা থাকা সত্তেও খেতে বেজায় সুস্বাদু। সেই মাছ কি এখানেও পাওয়া যায়? উনি ভেবেছিলেন পাওয়া গেলে নয় সেই রত্ন ধরে এনে কিছুটা বানিজ্যি করা যাবে এই সুদুর নাম না জানা দেশে। তত্কালীন মালাবারিও জেলেভাইরা তো শুনেই অবাক,আকার ইঙ্গিতে মাল্লু মালোরা জানালো , নাহ, এরকম কিছু তারা কোনদিন দেখেইনি। লুঙ্গি তুলে মাথা ঝাঁকিয়ে অনেক কষ্টে তারা হিপালাস কে বোঝালো যে সাগর থেকে নদীতে উল্টোপথে মাছ এলে কি আর তাদের এত কষ্ট থাকত? বৃষ্টি ঝড় পেরিয়ে হাজারও ঝুঁকি নিয়ে তাদের কি আর সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে হত? শোনা যায় সেই মাছের খোঁজে বাকি বর্ষাটা তট ধরে ধরে হিপালাস ও তার দলের লোক অন্ধ্রকুল ও উত্কল ছুঁয়ে বাংলা অব্দি এসেছিলেন। এবং গঙ্গা ও পদ্মার মোহনাতে সেই রুপোলি মাছ দেখতে পেয়ে নিজের নাম সেই মাছের নামকরন করেন ‘হিপাল-ইচ্থিস’ (গ্রিক ভাষায় মাছের সিম্বলিক শব্দ হচ্ছে ইচ্থিস ), মানে হিপালাসের নাম এক মাছ। পরবর্তীকালে মতান্তরে অপভ্রংশস্বরূপ এটাই হিলসা বা ইলিশ হয়ে যায়।

যারা ধৈর্য্য মেপে এখনও পড়ে যাচ্ছেন তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ যে তারা যেন আমার লেখাটা ঠিক ইলিশ ভাপে খাওয়ার মতো আহ্লাদভরা ইতিবাচক স্পিরিটেই নেন। খামকা এই অব্যর্থ ব্যাখানের পেছনে ঐতিহাসিক কিম্বা পৌরাণিক দলিল দস্তাবেজ খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট করলে কিন্ত হিপালাসের আত্মা ভয়ানক ক্ষেপে যেতে পারে ! শুনেছি গ্রিকরা ক্যালাকেলি ও জলকেলি বেজায় ভালবাসত। বাঙালি অবশ্যি খোঁচা খুঁচি আর টেপাটেপিটা বেশি ভালবাসে, যেরকম তারা সচরাচর মাছের বাজারে গিয়ে করে থাকে । দু ফোঁটা বারিদবিন্দু মাটিতে পড়ল কি পড়লনা, বক্রেশ্বর কুন্ডু থলি হাতে তার পেল্লায় ছাতা বাগিয়ে ছুটলেন মরশুমের প্রথম ইলিশের খোঁজে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওই হিপালাস নামের গ্রিক বেনের ডিএনএ কুন্ডুবাবুর মুন্ডু থেকে পায়ের চেটো অবধি একটু বেশি বেশি করে ঠাসা আছে। হিপালাস ফিরে গেছিলেন, এরকম তথ্য তো কেউ দেয়নি। তাই হতেই পারে যে সে এখানে রয়ে গিয়ে তার ‘ইলিশ বংশ’ স্থাপন করেছিলেন ও তারই লতায় পাতায় আটকে আছেন বক্রেশ্বরের পূর্বপুরুষেরা। সকাল বেলার বিহারী অধ্যুষিত বাজার এলাকায় একটা প্রবাদ প্রচলিত ছিলো ‘বাজারে যায়েগা বক্রেশ্বর তো কোকিলে বনেগা কাকেশ্বর !’ এমনি এমনি তো আর এনি মেনি পিঙ্গলা দাসকে নিয়ে প্রবাদ তৈরী হয়না ! কুন্ডুবাবুর নাতি আমার বন্ধু ছিল বলে আমি জানি কেন ওরকমটি হয়েছিল।

তখন দেশ স্বাধীন হয়নি, বাংলা অবিভক্ত। সেবার সময়টা বর্ষাকালই ছিল , আষাড় যায় যায় তবু বৃষ্টি নামার নাম নেই। চাষী মরে তবু দাম পায়না আর জেলে ধরা মাছ লোকে খায়না ! চারিদিকে বুভুক্ষু বাঙালির মনে ত্রাস, বেগুন নেই! ইলিশ কই ? খাই খাই করে গোটা অঞ্চল হেদিয়ে গেল। বাংলা তখন রাজ্য না রাষ্ট্র সেই আলোচনা না হয় পরের জন্যই তোলা থাক তবে সেই সময়ে ওই গঞ্জের সবাই এসে ধরল কুন্ডুবাবুকে। বঙ্গদেশে ইলিশ বিনে একটা বর্ষা কাবার হয়ে যাবে ,তাও কি হয় ? কুন্ডুবাবু বেজায় বিচক্ষণ মানুষ , নিজেই রোজ ভোর রাতে ডাইনোসর সাইজের ইলিশের স্বপ্নে তার ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে, কিন্ত না পাওয়া গেলে উনিও বা কি করবেন? অনেক ভেবে চিন্তে উনি একটা উপায় বাতলালেন। আসে পাশের এলাকায়, গ্রামে বা শহরের মাঝিদের যেন জানিয়ে দেওয়া হয় যে এই গঞ্জের বাজারে এক হপ্তার মধ্যে যে প্রথম ইলিশ নিয়ে আসতে পারবে, তাকে একশতএক টাকা বখশিশ দেওয়া হবে। যেমনি বলা অমনি কাজ ! মাইক, পোস্টার ও লোক মুখে খবর ছড়াতে বেশি সময় লাগলো না। গোয়ালন্দ ঘাট পেরিয়ে ছড়াতে ছড়াতে তা পৌছালো পূব বাংলার চাঁদপুরের মালোদের কাছেও। তাদেরই মধ্যে একজন এক সহিস সাথে করে সাহস দেখিয়ে নৌকো ভর্তি প্রচুর ইলিশ নিয়ে এসেছিল কুন্ডুবাবুর গঞ্জে। বখশিশ হিসেবে একশএক টাকা সবাই মিলে চাঁদা তুলেই দিয়েছিল। আর কুন্ডুবাবু তার বুদ্ধিখরচের দক্ষিনা বাবদ বিনি পয়শায় বড় দেখে জোড়া ইলিশ বাগিয়েছিলেন। বক্রেশ্বর কুন্ডুর স্ত্রী অতি সযত্নে যখন মাছ গুলো কে টুকরো টুকরো করে কেটে রাখছিলেন তখন কুন্ডুবাবু তেল মেখে নাইতে যাওয়ার কথা। কানাঘুসো শোনা যায়, লোভ সামলাতে না পেরে উত্তেজনার বসে উনি সর্ষের তেল মাখতে মাখতে তর না সইতে পেরে বগলে কিছুটা রান্নার জন্য রাখা সর্ষে বাটাও মেখে ফেলেন। ও সেই অবস্থায় যখন সে গিন্নির নজর এড়িয়ে একটা বড় টুকরো বগল দাবা করে চান করার জন্যে যাচ্ছিলেন, হুট্ করেই ধরা পরে যান আমার বন্ধু মানে ওনার নাতির কাছে। সরল মনে সে বেচারা তার দাদুর এই হ্যানো এবনরমাল কীর্তি সম্বন্ধে জিগ্গেস করে বসতেই কুন্ডুমশাই খেঁকিয়ে ওঠেন , “হই, এদিকপানে আয় রে ছাওয়াল ! দেখস না, যা ভ্যাপসা গরম তাতে আর ভাপানোর জইন্য আগুন লাগে না। তেল ও সর্ষে মাখি বগলে চাইপ্যা ধরলেই ট্যাস্ট ছাড়ে চাঁদপুরের ইলিশে ! তবে হুন , তুই ছাড়া যদি আর এই খবর কেউ ট্যার পায় তাহলে তর পিঠের চামড়া আমি ইলিশ মাছের আঁশের মতন ছাড়ায়ে নিমু নে, কইয়া দিলাম ! ”

ইলিশ পুরাণ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments