(ত্রৈলোক্যনাথ একজায়গায় লিখেছিলেন, 'মানুষ মরে গেলে ভুত হয়, আর ভুত মরে মার্বেল হয়', তেমনি আমাদের অনেক মুখচোরা, ভয় পাওয়া ইচ্ছেরা মরে তৈরী হয় এক-একটা মন-কেমন করা বিকেল, আর বিকেলগুলো মরে কী তৈরী হয় জানো? 
             বাজারের থলে দেখেছো? উল্টোলেই একটা দুটো পেয়াঁজের খোসা কোত্থেকে ঠিক বেরিয়ে পড়বে, সেইরকম কতগুলো জিনিষ কেমন করে যেন আলগা হয়ে লেগে থাকে আমাদের সাথে, কবে এসেছিলো জানিনা, আবার কোনদিন ঝাড়তে গিয়ে বেরিয়েও যাবে, তাই গল্পগুলো এইবেলা লিখে ফেলা ভালো।)

আমরা যে স্কুলটায় পড়তাম, তার নাম বরাহনগর মিশন, এবং তার নামকরণ যে সার্থক একথা কেউ কোনোদিন অস্বীকার করবে বলে মনে হয় না, যদিও সরকারী বানানে 'হ'টা বেমালুম উড়ে গেছে কাউকে না বলে – আমাদেরও তাই আর কিছুই হয়ে ওঠা হয় নি শেষমেশ। তা এই বরানগর স্কুলে ওয়ান থেকে টেন অব্দি ক্লাস, প্রথম পাঁচটা ক্লাস ভেতরে প্রাইমারি, শেষের পাঁচটা সামনের খেলার মাঠের পাশেই, বি-আই কোম্পানির সঙ্গে পাচিঁল ভাগাভাগি করে। দিব্যি ছিলো স্কুলটা, পাড়াতেই রাজকুমারী স্কুল, আর রোজ সকালে ঠিক দশটা বাজতে দশে সামনে দিয়ে এক এক করে বাসগুলো যায়, একটা মাল্টিপারপাস, একটা নিবেদিতা, আর ফেরে বিকেলে ছুটির পর … ছেলেদেরও ওই দুবার শারুখখানী পোজ দিয়ে গেটের সামনে দাঁড়ানো ছাড়া খুব একটা জীবনে খুব যে আর বেশী উদ্দেশ্য-বিধেয় ছিলো এমন ভাব্বার সত্যিকারের কোনো কারণ নেই, তো মোট কথা দিব্যি ব্যাপারটা চলতো আস্তে আস্তে, ফিসফিস করে, যেমন সব ছোট্ট শহরতলিতে হতো সেই নব্বুইতে। সেই সাইকেল করে টবিন রোডের কাছে কোচিং, তার পাশেই জেরক্সের আর একটু এগোলে চপ-ফিশফ্রাই-এগরোলের দোকান — আর দোকানের পাশে মাঠ, "ছুটির বৈঠক"। ঠিক এই সন্ধ্যে ছটার সময় যদি যান, দেখবেন আলোগুলো আজকেও কেউ জ্বালতে ভুলে গেছে, এদিক ওদিক দূরে দূরে, ঠিক যতটা দূরে বসলে আর কথা বোঝা যায় না তেমনি দূরে কয়েকটা জমাট বাঁধা অন্ধকার। আমরাও আসুন একটা সাইড দেখে একটা সান্ধ্য আজকাল পেতে বসে পড়ি, সিগারেটও আছে, ঘটিগরমের লোকটাও আসবে এক্ষুনি, আমরা বরং হাঁটতে হাঁটতে ফিরে যাই সেই অবুঝ, অস্পষ্ট, অন্ধকার রাস্তাটায়, যার নামটা সবাই ভুলে গেছে, ল্যাম্পপোস্টের আলোয় খালি নম্বরটা পড়তে পারছিঃ  ১৯৯৯।

সেই সময় স্কুলে একসাথে দু-দুটো ঘটনা ঘটলো। এক নম্বর, বলা-নেই-কওয়া-নেই দুম করে স্কুলে একটা ওয়ার্ল্ড রেকর্ড হয়ে গেলো, বোর্নভিটা অ্যাকাডেমির কাছে স্কুলের টিম গিয়ে শুন্য রানে অল আউট হয়ে ফিরে এলো – আর তাকে সামাল দিতেই হবে হয়তো, একটা গোবেচারা-পানা ছেলে গাঁতিয়ে পড়ে মাইধ্যমিকে ফার্স্ট হয়ে গেলো (আমার ধারণা ছায়া প্রকাশনীর আদি-অকৃত্রিম পোস্টার বয় সেই, যদিও আমার গেঁজেল মেমোরি যা চায়, ইতিহাস তাই নয়)। তা এসব মহাজাগতিক ঘটনা চাক্ষুষ-টাক্ষুষ করে কয়েকটা জেনারেশন বাপ-মার মাথাটা গ্যালো বিগড়ে। হঠাৎ সবাই বুঝলো যে সাফল্যের চাবিকাঠি খুজঁতে আর টর্চ লাগবে না, এক্কেবারে হোলসেলে কিলো-দরে পাওয়া যাচ্ছে যোগেশদা-দিব্যদা-সুদীপ্তদার আখড়ায়। আমার বাপ-মা, অর্থাৎ আমি, যে এই রেনেঁশায় এক্কেবারে দুম করে গিলোটিন হয়ে গেছিলাম তা নয়, তবে অচিরেই দেখলাম স্কুলের পরে বাড়ি গিয়ে আর সাতটা পয়ঁতাল্লিশের চিত্রহার নেই, আছে হুড়ুদ্দুম করে 'অভাগীর স্বর্গে'র নোট টোকা। এমনকি রোববার সকালেও যে জম্পেশ করে চন্দ্রকান্তা কি কাহানি দেখবো আর ক্রূর সিং কে খিস্তাবো, সে গুড়ে বালি, চুন ও সুড়কি। পি আচার্যের ভাষায় আমার দুর্যোগে তখন ঘনঘটার ভাগ্যাকাশ, কিন্তু ঠিক এই সময় একজন দারুণ লোকের সাথে আলাপ হয়ে গেলো, তার কোচিং-এ পড়তে গিয়েই – ভদ্রলোকের নাম সুভাষদা, সুভাষ মুখোপাধ্যায় – নাঃ সেই কবি সুভাষ নন, যিনি ফুল খেলবার দিন নয় বলে অদ্য মেট্রো স্টেশন হয়ে গেলেন, তবে এই গল্পটা ইনি না হলে হতোই না হয়তো …

সুভাষদা ঠিক কেমন ছিলেন বলে বোঝানো অসম্ভব, একটা গোলগাল পরিতৃপ্ত চেহারা, মাথায় একঝাঁক কোঁকড়া চুল, আর সত্যিকারের উদাত্ত গলা … সবথেকে বড়ো ব্যাপার, প্রথম দিন-ই ক্লাসের পর ডেকে বললেন বইয়ের ওসব বাজে কবিতা না পড়ে এসো আমরা টি এস এলিয়ট পড়ি, আর রিলকের দুইনো এলেজি … আর শুধু ওই 'যদু হে, মাছ কিবা'র ভাব সম্প্রসারণ না করে, চলো বইটাই পড়ে ফেলি … এখন যখন পিছনে তাকাই, মাঝে মাঝে সেই বিকেলটার কথা মনে পড়ে, জয়েন্টের রেজাল্ট বেরোনোর পরের দিনই, সুভাষদার বাড়ির ছাদে আমরা বসে চা খাচ্ছি, খুব চুপচাপ, সেই মধ্যবর্তী নৈঃশব্দ – খানিকক্ষণ পরে সুভাষদাই ভাংলেন, "তা তুমি যাদবপুরেই যাবে, সেই একটা টি কাঁধে ঘুরে বেড়াতে, আর গাছতলায় বসে গাঁজা খেতে?" … উত্তর দিতে পারিনি।

যাহোক, আমি আসল গল্পটার থেকে এদিক-ওদিক বাইলেনে ঢুকে পড়ছি, সেই ছোটোবেলার অভ্যেস তো, চট করে যেতে চায় না, না? তা এই গোটা টাইমটায় আমার একমাত্র অ্যাচিভমেন্ট বলতে গেলে ওই মাঠে দু-একবার সিগারেট খেয়ে দেখা, আর একবার ক্লাস মনিটর হয়েও স্কুল পালানো বন্ধুদের নাম হেডুকে না বলে দেওয়া — মোটামুটি ঐ বইতে আর নোটসে মুখ গুঁজেই কেটে যাচ্ছিল নাব্য নব্বুই, কোত্থেকে যে দখিন বাতাস ঢুকে একে একে সবকটা বন্ধুরই উইকেট ফেলে দিয়েছে সেটা বুঝতে একটু বেশ দেরি-ই হয়ে গেলো, একদিন দেখলাম কোচিং থেকে বাসস্ট্যান্ড অব্দি সঙ্গে হাঁটার আর কেউ নেই, সিগারেট টাও একাই কিনতে হচ্ছে স্কুলব্যাজ টা পকেটে লুকিয়ে।

নিয়তি দেখেছেন তো, নিয়তি? মাতালকে যা নিয়ে যায় বাংলার বোতলের দিকে, আর ডিপ্রেশানের রুগীকে রেললাইনের ধারে, এই সেই নিয়তি, তা প্রেমে আমিও ধপ করে পরেই গেলাম, সঙ্গে পড়ার মতন লোকের আর অপেক্ষা না করেই। সে এক দারুণ সময় বটে, যাই দেখি, বয়ঃসন্ধির ব্রণর মতন থেকে থেকেই অল্প বসন্ত জেগে ওঠে, সে কুমার শানুর নাকিগলায় গান শুনে-ই হোক, কিংবা টিভিতে ক্যাডবেরির অ্যাড দেখে। কিন্তু বিধি বাম, 'শুধাইলো না কেহ' … হঠাৎ এই সময় একদিন দেখি কোচিং-এর পরই একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে গলির মোড়ে, হাত একটা সদ্য কেনা – রাংতাটাও না ছাড়ানো উইলস ফ্লেকের প্যাকেট …

ছেলেটির আসল নামটা চেপে যাচ্ছি, ধরা যাক ওর নাম সন্দীপ আর ও সেদিন ওই সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে যার কথা বলবে বলে দাঁড়িয়ে ছিলো, তার নাম ধরে নেওয়া যাক অমৃতা … সন্দীপ ভালো ছেলে, বাপে-মায়ে পড়িয়ে-পিটিয়ে মানুষ করছেন, ছেলেও কেসিনাগ-কেপিবোস আর মাইতি-সাঁতরা করে ফি বছর ক্লাসে জ্বলজ্বল করে ওঠে। যদিও বাংলাটা একটু ইয়ে, মানে জয়েন্টে লাগবে না কাজেই পড়ে খুব একটা লাভ নেই যাকে বলে — তো সন্দীপ এসে বললো যে একটা চিঠি খুব দরকার, যার মূল বক্তব্য হচ্ছে যে ও অমৃতাকে খুবই ইয়ে করে, কিন্তু একটু কবিতা-টবিতা না থাকলে ঠিক ব্যাপারটা জমছে না। আমি তো হাতে স্বর্গ পেলাম (এবং একটা গোটা প্যাকেট ফ্লেক!) … জানা গেলো, আমি-ই পত্রলেখক ও বাহক, খালি তলায় নামটা আমার নয়। যেমন ফেলুদার গল্পে হয়, সেরকম পারিশ্রমিক, শুরুতে ফ্লেক, মাঝে একটা দুটো এগরোল, আর উঠে গেলে নেভি কাট …

আমার দৌড় তখন শেষের কবিতা অব্দি, তাও আবার দিদির দৌলতে, যে নিবেদিতায় পড়ার সৌভাগ্যে বোধহয় পুরো বইটাই এপাশ-ওপাশ গাঁতিয়ে ফেলেছে ততোদিনে … তা শুরতে ভাবলাম অমিত রায়কে টুকলি করে জন ডান ঝেড়ে দিই, (যাকে বলে টুকলি-অব-অর্ডার-টু) …

"For God's sake, hold your tongue and let me love" … 

একটা পায়োনিয়ার কোম্পানির ফুলস্ক্যাপ পাতা ছিঁড়ে উপরেই সেটা লিখেও ফেললাম … কিন্তু কেমন একটা বুকটা ছ্যাঁতছ্যাঁত করতে লাগলো, হাজার হোক – ব্যাঙ্কের কেরাণী মধ্যবিত্ত বাঙালি বাপ, Tongue দেখে পানু ভেবে কেলিয়ে দিলে হয়ে গেলো আর কি … আবার তন্নতন্ন করে খুঁজলাম শ্যাষের কবতে, এইবার এলো সংস্কৃত -

 'স্মরগরল খন্ডনং মমশিরসি মন্ডনম, দেহি পদপল্লবমুদারম' … 

লিখেই কেমন একটা সাত্ত্বিক শাহরুখ ভাব এলো, কিন্তু সন্দীপ টিফিনের সময় বললো অমৃতাদের ইস্কুলে হিন্দি অ্যাডিশনাল, সংস্কৃত নাই … ওসব চলবে না …

দিন যায়, রাত যায় – এদিকে আমি তো আর যুতসই কবিতা পাই না, প্রথমে গিয়ে ধরলাম পাড়ার একটা পাতাখোর কবিকে, সে আবার সকালে প্রাইমারী স্কুলে পড়ায়, দুপুরে পার্টি অফিসে ম্যানিফেস্টো বিলোয় আর রাত্রে অল্প তন্ত্র-মন্ত্র করবে বলে গাঁজা টেনে 'মা-মাগো' করে আর্তনাদ করে। সে বললে, "প্রেম মানে নীরা, নীরা মানে যে রানীর উল্টোস্রোত, যেমন ধারার বীপ্রতীপ রাধা" … তখনো 'গুগুল তোমার দারুণ দীপ্তি ফেলেছে জগৎ ঢাকিয়া' টাইপের টাইম নয়, আর পাড়ার নবজাতক লাইব্রেরীতে হেমেন রায় আর সত্যজিৎ ছাড়া কিছু ঢোকে নি কোনোদিন … অনেক কষ্টে এক বন্ধুর বাড়ি থেকে চুরি করিয়ে আনলাম সুনীলের একটা বই, মলাটে আবার বাড়ির লোককে ধোঁকা দেওয়ার জন্য লেখা 'প্রশ্ন বিচিত্রা' … সে কবিতাগুলি যে কি ভালো ছিলো কি আর বলবো, সেই যে সুনীল লিখছেন যে তিনি সাবান হয়ে যেতে চান, নীরা তাকে নিয়ে কি কি সব তারপর করবেন …

নাঃ, নীরা সেই চিঠিতে জায়গা পেলোনা, আমার সাহস-ও যে হয়েছিলো তা নয় … তবে একদিন 'বুকে বল, হাতে পেশী, কথা কম, কাজ বেশী' করে সুভাষদাকেই ধরলাম ক্লাসের পরে …

"স্যার, দু মিনিট সময় হবে? একটা সাজেশান চাইবার ছিলো … "

জীবনে সাজেশান শব্দটাকে সুভাষদা কেনো, আমার ধারণা সব মাস্টাররাই হেব্বি ঘেন্না করে, তবে এই একবার ভদ্রলোক দেখলাম একেবারে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলেন, বললেন, "আমার যে গুরু বাংলায়  লিখে আরেকটা পৃথিবী বানিয়ে ফেলেছেন, তাঁরই দু-লাইন বরং তোমাকে বলি, কনিষ্ক …

"তুমি তো জানো না কিছু – না জানিলে,
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে" 


আমার বুকের ‘পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল,
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই;
শুধু তার স্বাদ
তোমারে কি শান্তি দেবে?"

পুরোটা বলে অনেকক্ষণ বাইরে চেয়ে থাকলেন সুভাষদা, বললেন ধার-দেনা করে বাজারে আলু-পটল কেনা যায়, প্রেমের চিঠি লেখা যায় না। 


            সেদিন রাত্রে আর ঘুম হলো না ঠিক করে, জেগে থাকলাম – বাবা-মা শুয়ে পড়ার পর বাগানের জবা গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে একটা ফ্লেক খেয়ে ফেললাম সাহস করে, অনেক অনেক ভাবলাম – তাকে কি লেখা যায়, যাকে আমি হয়তো এই একবারই কিছু বলবো? অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে যেন নিজেরই ভিতরে নামছি মনে হলো, কিন্তু কই টর্চ নিয়ে পাশে দাঁড়ালেন না তো রবি ঠাকুর ! — অনেক ভেবে ভেবে সেই রাত্রে দুটো লাইন লিখলাম আমার বেনামী প্রেমপত্রের জন্যঃ  

"বৃষ্টি, কি নামে ডাকলে তোমায়,
ঝরে পড়বে আমার ঘরে, 
এই এখানে, এই এখন-ই?"

নাঃ, সন্দীপ আর অমৃতার বিয়ে হয়নি, ওরা একে অন্যজনকে নিশ্চয়ই অ্যাদ্দিনে ভুলেও গেছে, আমার-ই বা কি মনে আছে আর? সেই চিঠিটা গন্তব্যে যে পৌঁছেছিলো তা জানি, আর আমি সেই নেভিকাটের প্যাকেট-টাও একবিকেলে ছুটির বৈঠকের মাঠে দেদার উড়িয়ে দিয়েছি দখিনা হাওয়ায়, যে বিকেলে ওরা ঘুরতে গেছিলো ময়দানে … তারপর কত গল্প আসে, কত বিকেল যায়, ছুটির বৈঠক থেকে সিগারেটদের ঠিকানা হয় প্রথমে হোস্টেলের ঘর, তারপর আর্ধেক পৃথিবী দূরে একটা বরফ-ঢাকা শহর,  তারপর তারাও হারিয়ে যায় … এখন কেউ জানে না কে কোথায়, সত্যি বলতে কি, সেই সুভাষদা কি বেঁচে আছেন এখনো? তাও জানার সুসময় আসেনি … তবে যে কৈফিয়ত দিয়ে শুরু করেছিলাম সেটাই আবার দিই, ওই শুকনো পেঁয়াজের খোসার মতন এই একটা-দুটো লাইন কোথায় যেন লেগে ছিলো, আজ ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিলাম এক্কেরে … 


 

ইস্কুলের গল্প – ১
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments