রুনা চাকরিটা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল রূপু হওয়ার সময়। বিয়ের পরে রুনার প্রথম কয়েকটা বছর গেছিল শুধু ধৈর্য ধরে অরিত্রর ব্যাচেলার সুলভ বাউন্ডুলেপনাগুলো ঘোচাতে। অরিত্র বরাবরই একটু সব ব্যাপারে গা-ছাড়া, তা নিয়ে রুনার সে ভাবে কোনোদিন ক্ষোভ ছিলোনা যদিও। বরঞ্চ তাতে করে প্রথম থেকেই নিজের মতো করে সংসারটা গোছাতে পারাটা তার মন্দ লাগেনি । আয় দুজনের হলেও , তা দিয়ে গাড়ি ও ফ্ল্যাটের মাসিক কিস্তি মেটানো, এল আই সি, মিউচুয়াল ফান্ড, মোটামুটি সবই একাধারে রুনাই সামলাতো । উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও জীবন সুরক্ষার এই ছকগুলো কষতে কষতেই সে টের পেল যে সে সন্তানসম্ভবা। এদিকে একজনের আয় বন্ধ হবে, ওদিকে সামনে ডাক্তার, ওষুধ, ডেলিভারি সব মিলিয়ে একটা এককালীন বড় রকমের ধাক্কা! তারপর তো আয়া ও রান্নার লোকের জন্য আলাদা করে মাসিক খরচ আছেই। সুতরাং অরিত্রর আরেকটা পার্সোনাল লোন নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিলোনা। আবার লোন মানে কিস্তি বাড়লো আরো ! বাইরে খাওয়া বা উইকেন্ডে এদিক সেদিক যাওয়া বন্ধ হলো। গাড়ির বদলে অটো-মেট্রো করে অফিস যেতে লাগলো অরিত্র। রুনাও পার্লারের বদলে বাড়িতে বসে নিজেই নিজের ত্বকচর্চা করতে শুরু করল। এই সময়টায় অরিত্র কান্ডজ্ঞানহীনের মত হুট করে কিছু খরচ করে ফেললে রুনা বিশেষ রাগ করতোনা, শুধু একটু মৃদু ধমকের সুরে বলত, "এই মাসে কিন্তু আর একটাও বাজে খরচ করবে না তুমি, কেমন?" অরিত্রও বাধ্য ছেলের মতো ইতিবাচক সম্মতি জানাতো। তারপর দেখতে দেখতে প্রায় দশ বছর কেটে গেছে। অরিত্র এখন জোনাল হেড, রূপু এবারে ক্লাস ফাইভে উঠবে আর রুনাও আবার চাকরি জয়েন করেছে। ছোট গাড়ি পাল্টে গিয়ে বড় সেডান এসেছে। এখন মাসে একবার অন্তত মন্দারমণি কিম্বা গড়পঞ্চকোটের মতো জায়গা বেড়াতে যাওয়া হয়। এবার রূপুর জন্মদিনের পার্টিটাও এক নামী রেঁস্তোরাতে আয়োজন করা হয়েছিল। সবই বেড়েছে হিসেব মেনে শুধু বেহিসাবী ভাবে যেটা কমেছে সেটা হচ্ছে রুনার ধৈর্য। কেন জানি আজকাল তার কারণে অকারণে খুব রাগ হয়। সে প্রায়শই স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে চিত্কার চ্যাঁচামেচি করে ফেলে বাড়িতে, এমনকি কখনো কখনো অফিসেও। রূপুও আজকাল বেশ ভয় পেতে শুরু করেছে তার মাকে। বিশেষ করে সেদিন থেকে যেদিন একটা চেক কুরিয়ার করতে ভুলে যাওয়ায় রুনা অরিত্রের ওপর চিত্কার করে উঠেছিল, "একটা সামান্য কাজ তুমি করবে না আমি মনে না করালে। জাস্ট টু মাচ, আমি আর পারছিনা।" অরিত্র থতমত খেয়ে রুনার মাথায় হাত বুলিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তাতে রুনা তার হাত সরিয়ে দিয়ে আরো জোরে চিত্কার করে বলেছিল, "লিভ মি অ্যালোন!"

রূপু প্রত্যেকবার ক্লাসে স্ট্যান্ড করে। ওর ক্লাসে কৌস্তভ নামের শান্ত স্বভাবের একটি ছেলে পড়ে। কৌস্তভের ডিসলেক্সিয়া থাকার দরুন ক্লাস টিচার ওকে রূপুর পাশে বসিয়েছিল যাতে রূপু তাড়াতাড়ি নিজের কাজ সেরে ফেললে ওকে সাহায্য করতে পারে। রূপু বরাবরই বেশ উপভোগ করত এই দিদিমনিগিরি। কিন্তু সেদিন কৌস্তভ রূপুকে কি একটা জিজ্ঞেস করাতে সে আচমকা চিত্কার করে উঠলো, "আমি না দেখালে কি তুই কিছুই লিখতে পারিস না। জাস্ট টু মাচ,আমি আর পারছিনা।" কৌস্তভ থতমত খেয়ে রূপু কে সরি গোছের কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তাতে রূপু আরো জোরে চিত্কার করে বলল ,"লিভ মি অ্যালোন!"

উত্তরণ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments