শীত বসন্তের সন্ধিক্ষণে ভাইরাস ভর্তি হাওয়ার মাঝে কোকিলের ডাক হাওয়া। তাই এফএম শুনতে শুনতে কাঁথা আঁকড়ে দিব্বি ঘুমচ্ছিলুম …কে যেন খবরে বলল, মুখ্যমন্ত্রী কাল বলেছেন তেলেভাজা বেচে ১০ তলা বাড়ি করতে !
সকাল সকাল চপ কাটলেট আমার মোটেও পোষায় না , তাই রেডিও অফ করে আবার ঘুমিয়ে পড়লুম !! যারা সারা রাত টেনসন করে, তারা সকাল হলেই অন্যদের জ্বালায় ! চোখ বুজতে না বুজতেই প্যাঁও প্যাঁও করে ফোন বাজলো “হ্যালো..”
“কোথায়, বিছানায় না মর্নিং ওয়াক ….”
“মাঝামাঝি , বল কি বলবি?”
“বুঝেছি, ঠিক আছে ঘুমো , পরে ফোন করবো’খন…”
আবার দশ মিনিট পর ,” বলছি তুই কি বাড়িতে না বাইরে ?”
“পটি করছি .. বল না। ”
“না বেরো , তার পর বলছি…”
“আচ্ছা করছি না, এবার বল। ”
“শোন না , দিদি বলেছে ট্যাক্সি রিফিউস করলে আর সেই ৩০০০ টাকার ফাইন দিতে হবে না। প্রথমবার করলে ১০০ টাকা, দ্বিতীয় বার করলে ২০০ টাকা…এরকম করে বাড়বে! ”
“হুম , তো আমি কি করব? আমি আজকাল ট্রেন,ট্রাম ,বাস,অটো,মেট্রো যা পাই তাতে করেই যাতায়াত করি। যারা ট্যাক্সি চাপে তাদের নিয়ে নবান্ন ঘেরাও কর। ”
“আরে বাবা রাতে পার্ক স্ট্রিট থেকে ফেরার পথে কেউ শালা নর্থের দিকে আসতে চায় না, তখন কি তুই টলে টলে বাস ধরবি?”
“কেন, ১০টার মধ্যে মোচ্ছব মিটে গেলে শ্যামবাজার অব্দি মেট্রো, তারপর হাঁটা লাগাবো । আর না হলে নর্থের দিকে সেদিন গেলামই না, সাউথে কোনো বন্ধুর বাড়ি থেকে যাব !”
“তুই আর সিরিয়াস হলি না !” খ’চে ফোনটা রেখে দিলো , যাক বাঁচা গেলো।

আসলে এই ধরনের এবরিজিনাল নর্থ কলকাতার পাবলিক সুযোগ পেলেই অফিস ফেরৎ পার্ক স্ট্রীটে দাঁত কেলিয়ে অন্যের ঘাড় ভেঙ্গে মাল খাওয়ার জন্য ওঁত পেতে থাকে। খেতে বসে দু পেগের পয়সা দিয়ে সাড়ে সাত পেগ গিলেও বলে , “আজ সেরকম ধরছে না কেন বলত, মালটা জালি নয়তো?” আর কারো রেস্ত না খসাতে পারলে এরাই নিজের পয়সায় অনেকক্ষণ ধরে একটা বিয়ার টেনে বাইরে এসে একটা হাফ চাউমিন খেয়ে ভরপুর নেশা করে বাড়ি ফেরে। অরিজিনাল বনেদী উত্তর কলকাতার জনগণ কোনদিন চাকরি করেনা , সন্ধে নামলেই কাপ্তেনি করতে বের হওয়াটা তাদের জন্মাভ্যাস ! তারা রেলা নিয়ে পাড়ার ঠেকে বসে মাংসের চপ আর শাকালু দিয়ে দশ মিনিটে একটা পাইন্ট উড়িয়ে দিয়ে পটাপট দেশের রাজনীতি থেকে আন্তর্জাতিক বানিজ্যের অমোঘ ভবিষ্যত নির্ধারণ করে ফেলেন। তবে উত্তর বা দক্ষিন যে কলকাতাই হোক না কেন , একটা চাপা বাজারী মন্দা যেন সব ব্যবসার ওপর থাবা বসিয়েছে। রাজ্যে অর্থনৈতিক অবস্থা যে কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে তা সারদা বা রোজ ভ্যালিতে বিনিয়োগ বাদ দিলেও আপামর বাংলা রন্ধ্রে রন্ধ্রে টের পাচ্ছে । এবার মজার ব্যাপার হলো , বইমেলার ভেতরে বিক্রি বাট্টা সেরকম না হলেও বাইরে বাইপাসের ধারে গীতবিতান থেকে ডিকশেনারী মুড়ি মুড়কির মতন ১০০ টাকার এক দরেই দিব্য বিকিয়েছে। ‘আবে, একটা হোমস আর চাঁদের পাহাড় দেখা না দাদাকে’ কিম্বা ‘দেবদাসটা লিয়ে লিন, দুপুর থেকে আট কপি ঝেরেছি। এই এক কপি পরে আছে ‘ মার্কা বার্তা বিনিময়ের সাথে সাথে বিশ্ববাংলার বইশিল্প আজ যে সাবঅল্টার্ন স্টেটাস অর্জন করলো সেটা কিন্ত শাসক দলের একটা বড় রকম কৃতিত্ব। ১০০ টাকায় বাংলায় শেক্সপিয়ার থেকে ইংরিজিতে ফেলুদা আবার ১০০ টাকার ফাইন সে ট্যাক্সি রিফিউসল কিম্বা গর্হিত ভাবে ধুমপান যাই হোক না কেন – ব্যাপারটা বেশ চিত্তাকর্ষক!

বাংলার মানুষ আদপে অলস নয়, এখানকার আবহাওয়াটাই গন্ডগোলের। রাজস্থান , গুজরাতে শুষ্ক জায়গায় একে জল কম আবার দশ দিন রুটি রেখে দিলে তা পচে না। তাই তারা এক বারে যোগার যন্ত্র করে পাশবালিশের খোলের ভেতর দিস্তা দিস্তা রুটি বা পরোটা ভরে তীর্থ দর্শনে বেরিয়ে পরে। নিজেদের খাওয়ার পর যা রুটি বাচলো সেটা আবার তারা আচার গাঠিয়া দিয়ে সহযাত্রীকে খাইয়ে দিল কিম্বা কাগজে মুড়ে বিক্রি করে টু পাইস কমিয়ে নিলো। সেবা, ধর্ম , বানিজ্য এ সবই কিন্ত একসাথে সম্ভব শুষ্ক জীবানুবিহীন আবহাওয়ার জন্যে। উল্টোদিকে বাংলায় তীর্থ করতে বইমেলা কিম্বা মাটিকাটা উত্সব দেখতে গিয়ে হাভাইত্যা বাঙালি কাঁড়ি কাঁড়ি পচা বিরিয়ানি আর গোবিন্দ ভোগের খিচুরী খেয়ে ঘেউ ঘেউ করে ঢেকুর তুলতে তুলতে বাড়ি ফিরলে আপনি কাকে কাঠগড়ায় দাড় করাবেন? এবার পীঠেপুলি উত্সব শিল্পের মর্যাদা পেয়েছে! বাড়ির বউ মেয়েরা ভারী উত্সাহ নিয়ে ঢালাও রসবড়া আর দুধপুলি বানিয়ে ষ্টল দিয়েছে। সরা পিঠে ,পাটিসাপ্টা, মালপোয়া , রাঙ্গা আলুর পুলি সবই আছে কিন্ত মুশকিল হলো তিনটে পুলি দশ টাকা হলে পাঁচটা পুলির দাম কত তা হিসেব লাগাতে লাগাতে আরো ৪ জন খদ্দের পাশের ষ্টলে চলে যাচ্ছে। পাশের ষ্টলে ইলাদী আরো জব্বর ,দুধপুলি বেচতে গিয়ে দেখল ফয়েল আনা হয়নি ! খদ্দেরকে দাড়াতে বলে তাড়াতাড়ি ছুটে পাশের ষ্টলে ফয়েল আনতে গিয়ে সেখানে দিব্য মালাদির সাথে পলিদির ননদের কেচ্ছা নিয়ে খোশ গল্প জুড়ে দিলো। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী চপ ভাজতে বলেছেন , আমি কিন্তু এতে কিছু দোষের দেখিনা। পিঠে পুলি মরশুমী খাবার , সেটা শিল্প হতে পারলে বাঙালির নিত্য সন্ধের সাথী চপ-তেলেভাজা তো এক প্রকান্ড বানিজ্যিক কর্মকান্ডের সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। মুড়ি দিয়ে চপ ফুলুরি যেরকম মধ্যবিত্ত থেকে সাবঅল্টার্ন সবাই ভালবাসে, আবার কবিরাজি কাটলেট কিম্বা বেকটি ফ্রাই সাহেব সুবোরা তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেত। কি বিশাল বাজার চিন্তা করুন তো, ৩ থেকে ৩০০ টাকার হরেক মাল এর মধ্যে ধরা দিচ্ছে। মনে রাখতে হবে যে তেলে ভাজলেই কিন্ত সেটা তেলেভাজার গোত্রে পরে গেল, তার জাতপাত বিচার করে ব্যবসা করতে যাওয়া উচিত নয়।

আমার একটা ফাঁকা পরে থাকা গ্যারেজ আছে। আমি তো ঠিক করেছি সেটাতে আমি এবার একটা তেলেভাজার অভিনব আউটলেট খুলবো। নাম দেব ‘বিশ্ব বাংলা স্ন্যাকস কর্নার ‘। মেনু গুলোর নামও হবে একটু অন্যরকম – মোদিজির ‘মিত্রো’ ফ্রাই , আম আদমী পেয়াঁজি , ব্ল্যাক মানি ফুলুরি , প্রাচীন বুদ্ধ বেগুনি, তৃনমুকুল ভাজা ,মদন কবিরাজি, চুলবুলে বাবুলের বড়া , জামাতের ডেভিল , বিমান ব্যাটার ফ্রাই, অর্বাচীন মাও চপ ইত্যাদি ।
নবর্ষের আগে অব্দি ব্যাপক প্রচার চালাবো। প্রচার প্যামফ্লেটে লেখা থাকবে , “এটা বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য কে আরো গৌরবমন্ডিত করতে এক নতুন প্রয়াস। আমাদের রাজ্য রাজস্থান কিম্বা গুজরাট নয় তাই দশ দিনের চপ একসাথে ভাজা হয় না , এখানে হাতে গরম তেলেভাজা পরম যত্ন সহকারে খাওয়ানো হয়। আমার বিশুদ্ধ তেল ও ঘি ব্যবহার করি। আমাদের সুদক্ষ কারিগররা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘামমুক্ত পরিবেশে গ্লাভস পরিহিত অবস্থায় এই সব তেলেভাজা প্রস্তত করে থাকেন। আমাদের ব্যবহৃত আলু, বেগুন, পেয়াজ, আদা , রসুন ইত্যাদি সবই অর্গানিক ফার্ম থেকে অন্য হয় ও সেগুলো ধোবার জন্য আমরা মিনারেল ওয়াটার ব্যবহার করে থাকি। আমাদের কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসাররা নিজেরা প্রত্যেকটা তেলেভাজা স্বজিহ্বায় চেখে দেখেন যে খাওয়ার আধ ঘন্টার মধ্যে অম্বল বা গ্যাস জাতীয় কোনো সমস্যা দেখা দিচ্ছে কিনা। পরিসংখ্যান বলছে ৯০% ক্ষেত্রে আমাদের উত্পাদিত ভাজাভুজি পাদ ও ঢেকুর ছাড়াই পাস করে থাকে আর একান্তই তা না করতে পারলে প্রত্যেকটা চপের সাথে আমরা বিনামূল্যে এন্টাসিড বড়ি বিতরণ করে থাকি। আমরা নিশ্চিত যে অদূর ভবিষ্যতে আমরা আমাদের এই প্রয়াস ক্রমশ বাংলার থেকে উদ্ভাবিত তেলেভাজার ‘মন কেমন’ করা ঘ্রাণ বিশ্বের আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হব। এ ছাড়া আমরা বাংলা নববর্ষের শুভক্ষণে মিলনমেলা প্রাঙ্গনে ‘তেলেভাজা উত্সব ‘ নাম এক আন্তর্জাতিক কর্মকান্ডের পরিকল্পনা করেছি যাতে ১৮ টি দেশ অংশগ্রহন করতে ইচ্ছুক হয়েছে। এই উত্সবে একটা শততল অট্টালিকার প্রতিকী উদ্বোধন করা হবে, যেটা ভবিষ্যতে ‘তেলেভাজা ভবন’ হিসেবে গড়ে উঠবে রাজারহাট সিটি সেন্টারের সংলগ্ন কোনো এক অনামী ভূখন্ডে। অতয়েব আসুন এই বাংলার বুকে শিল্পের মরুঝড় তুলতে আমরা একটু বেশি বেশি করে তেলেভাজা খাওয়ার পবিত্র অঙ্গীকারে নিজেদেরকে আবদ্ধ করি। জয় চপ ফুলুরির জয় , জয় তেলেভাজা সহযোগে বাংলার জয় !”
সময় কম, তিলোত্তমা এবার তেলোত্তমা নগরী হতে চলেছে , ‘তেলেভাজা উত্সবের ‘ পাস পেতে গেলে নবান্নে শিল্পদপ্তর কিম্বা WBIDC তে সরাসরি ও সত্তর যোগাযোগ করুন।

উদ্ভটাং
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments