এক
—-

মাঠ ভর্তি দর্শকের প্রবল উল্লাস আর চিৎকারের মধ্যেই কিক-অফ সার্কেলের একটু আগে দাঁড়ানো মেসির দিকে ভেসে এলো বলটা। মাথায় রিসিভ করা বলটা বুক কোমর থাই বেয়ে বাঁ পায়ের চেটোয় পড়তেই দু’দিক থেকে জোড়া স্লাইডিং ট্যাকল। দু’পায়ের চেটোয় বলটা চেপে ধরে হিলহিলে শরীরটাকে তুলে সামনের দিকে একটু এগিয়ে দিতেই দুই ডিফেন্সিভ মিড ফিল্ডার প্রিন্সিপ্যাল ম্যাম আর ম্যাথসের সঞ্জীব স্যারের পুরো শরীর ধুলো কাদায় মাখামাখি। ম্যাম ধুলো ঝেড়ে শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুঁজে নাকের নিচে নেমে আসা গোলগোল বড় ফ্রেমের চশমাটা হাতের আঙুল দিয়ে একটু তুলে মেসির দিকে কটমট চোখে তাকাতে তাকাতেই মেসি ততক্ষণে সপ্তাহে তিন দিন সন্ধেয় বাড়িতে পড়াতে আসা নন্দন স্যারকে বাঁপায়ের আউট সাইড ডজে ছিটকে ফেলে সাপের মত এঁকে বেঁকে এগিয়ে চলেছে বিপক্ষের গোলের দিকে। বিপক্ষের টেন ইয়ার্ডস বক্সের মাথায় মেসিকে অভ্যর্থনা করতে দল বেঁধে হাজির সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার আমেরিকা প্রবাসী ছোটমামা মনি পিসি পাপার অফিসের বস নরেন আঙ্কল আর বাড়ির ফিজিক্স স্যার। মেসির দিকেই সকলের দৃষ্টি আবদ্ধ। সবার অলক্ষ্যে মেসিকে ডান দিকে রেখে লেফট উইং দিয়ে কখন যে তাতাইও উঠতে শুরু করেছে কেউ খেয়ালই করে নি। মেসির বাঁপায়ের চেটোর আউট সাইডের আলতো টোকায় উইং দিয়ে উঠে আসা তাতাইয়ের পায়ে বল পড়তেই মাঠ একদম নিশ্চুপ। তাতাইকে থামাতে হিস্ট্রি মিস পা বাড়াতেই বাঁপায়ে ইনসাইড কাট করে গোলমুখ খুলে গেল। মুখ তুলতেই তাতাই দেখল প্রথম পোস্টের সংকীর্ণ পরিসরটুকু আগলে যাকে ও সব থেকে ভয় পায় সেই তিনি, গিয়ানলুইগি বুঁফো, মানে তাতাইয়ের মম। তাতাই বাঁপায়ে শরীরের সমস্ত ভারটুকু সঁপে দিয়ে শরীরটাকে বাঁদিকে ঈষৎ হেলিয়ে ডান পায়ের ইনসাইড দিয়ে বলটাকে আলতো করে ভাসিয়ে দিলো। ঠিকানা লেখা বলটা ইনস্যুইং সোয়ার্ভ করে সেকেন্ড পোস্টকে চুমু খেয়ে জালে জড়িয়ে যেতেই নিস্তব্ধ মাঠের প্রতিটি দর্শক চিৎকার করে উঠল, গো ও ও ও ল…..

মেসি ছুটে এসে তাতাইকে বুকে জড়িয়ে ধরার আগেই সৌমির ধাক্কা,

- “তাতাই ওঠ… ছ’টা বেজে গেছে…সাতটায় স্কুলের বাস….

- “উফ্ মম! ইউ আর জাস্ট ইমপসিবল। আর পাঁচ মিনিট পরে ডাকলেই…”

তাতাইয়ের ঘুম জড়ানো গলার কথা শেষ করতে না দিয়েই খিঁচিয়ে উঠল সৌমি,

- “তাতে কী কী রাজা উজির মারতি শুনি? ফার্স্ট টার্মের ম্যাথসের সিক্সটি ফাইভ নাইন্টি ফাইভ হয়ে যেত নাকি হিস্ট্রিতে পাশ করতি…”

- “না মানে মেসি…..”

তাতাইয়ের মুখের কথা হাওয়াতেই লুফে নিয়ে ফের ধমক,

- “কে মেসি? তাতাই ডোন্ট ফরগেট ইওর টার্গেট। তোমার পাপার বস নরেন আঙ্কলের ছেলে ঝজুদা এবছরই আইআইটি খরগপুরে অ্যাডমিশন নিলো। নরেন আঙ্কল সেদিন কি বলেছিল মনে আছে তো?”

“হুমমম..” বলে বিছানা ছাড়ল তাতাই। ও জানে এই সব বিষয়ে মমের সঙ্গে তর্ক করে কোনই লাভ নেই। তাতাই এ’বছরই ক্লাস এইটে উঠল। নামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ছে ছোট থেকেই। ও মোটামুটি নম্বর পেয়ে পাশও করে যায় প্রত্যেক বছর। ওর রেজাল্ট নিয়ে অনিমেষও বিশেষ অনুযোগ করে না। কিন্তু তাতাইকে নিয়ে সৌমির অনেক স্বপ্ন। সৌমির স্বপ্নে আইআইটি আইআইএম, ওর স্বপ্নে ছোড়দার মত সিলিকন ভ্যালির মায়াবী জগত। কিন্তু তাতাইয়ের ধ্যানে জ্ঞানে শুধুই সবুজ ঘাস আর সেই সবুজ ঘাসে ফুটবলের আলপনা।

বিভিন্ন স্কুলের রকমারি ড্রেস পরা বিভিন্ন বয়েসের বেশ কিছু বাচ্চার গন্তব্য এই মুহুর্তে পাটুলি থানা বাস স্ট্যান্ড। সব স্কুল বাসই এসে থামবে পাটুলি থানা স্টপেজে। বেশিরভাগ বাচ্চার সঙ্গেই তাদের মা। শুধু তাতাইয়ের মত দু’একজনের সঙ্গে বাবা। সকলের পিঠেই বই ভর্তি ঢাউস ব্যাগ। পিঠের ভারি ব্যাগটাকে ব্যালেন্স করতে সব বাচ্চাই যেন সামনের দিকে ইষৎ ঝুঁকে রাস্তায় হাটছে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতেই তাতাইয়ের নজরে পড়ল বৈষ্ণবঘাটা ইয়ং স্টারসের মাঠটা। গুলেদার কোচিং-এ ওয়ার্ম-আপ করছে সন্দীপ সুমন পল্টু অর্ঘ্য কুন্তলরা। বাঁশি মুখে ওদের মাঠে চক্কর দেওয়াচ্ছে গুলেদা। তাতাই জানে আর আধ ঘণ্টা পরেই দু’দলে ভাগ করে শুরু হবে প্র্যাকটিস ম্যাচ। গত বছর পর্যন্ত তাতাইও শণি রবিবার করে সকালের প্র্যাকটিসেও আসতো। কিন্তু সেভেনের অ্যানুয়ালে ম্যাথস আর হিস্ট্রি একজামে কী যে হল! মাথসে ফর্টি এইট আর হিস্ট্রির কথা না বলাই ভাল। এইটে উঠতেই সৌমি যেন আরও কড়া হয়ে উঠল। স্কুলের ছুটির দিনের সকালের প্র্যাকটিসও বন্ধ হল তাতাইয়ের। শুধু বিকেলের দু’আড়াই ঘণ্টা। শুনে গুলেদা ওরফে অমিত সেন ভীষণ রেগে গেছিল। একদিন বাজারের মধ্যে অনিমেষকে দেখতে পেয়ে খুব উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল,

- “কী ব্যাপার বলুন তো দাদা? তাতাইয়ের ছুটির সকালের প্র্যাকটিসটাও বন্ধ করে দিলেন? ছেলেটার মধ্যে কিন্তু স্পার্ক ছিল।”

- “ইয়ে, না মানে, ওর মা’র ইচ্ছে পড়াশুনাটা…. তাছাড়া সেভেন থেকে এইটে উঠতে রেজাল্টটাও….”

অনিমেষের আমতা আমতা করে বলা কথার মঝেই অমিত বলে উঠল,

- “তার মানে দাদা আপনারও ইচ্ছে তাতাই ছুটির দিনে সকালেও প্র্যাকটিসে আসুক? প্লিজ আপনি বৌদিকে একটু বোঝান দাদা। তাতাই একটা আনকাট হিরে। একটু ঘষামাজা করতে পারলে…. ওর বাঁ’পা কথা বলে। বিশ্বাস করুন দাদা, কৃশানুদার পরে এই রকম বাঁ’পা আমি আর দেখিনি। ওকে আপনি আমায় দিন দাদা। ওর ওপর আমার অনেক স্বপ্ন….”

- “দেখো ভাই, ওর বয়েসে আমিও ফুটবল পাগল ছিলাম। ইন ফ্যাক্ট আমিও কৃশানু না হলেও অন্তত পক্ষে বিকাশ পাঁজি হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভাই, বাই এন্ড অফ দ্য ডে পড়াশুনাটাই আঁকড়ে ধরতে হয়েছিল। এখন জীবনে কম্পিটিশনটা আরও টাফ। এই টাফ কম্পিটিশনের যুগে সময় নষ্ট করে ফুটবল খেলার বিলাসিতাটা…..”

অনিমেষের কথা শুনে অদ্ভুত মুচকি হেসে “বিলাসিতা নয় প্যাশন, অনিমেষদা, প্যাশন..” বলেই বাজারের ভিড়ে মিশে গেছিল অমিত। অমিতের মুখ থেকে বেরনো প্রতিটা শব্দ যেন ছুঁচের মত বিঁধেছিল অনিমেষের গায়ে। এক লহমায় অনিমেষ ফিরে গেছিল ত্রিশ বছর পেছনে। সামনেই ওর ক্লাস নাইনের অ্যানুয়াল পরীক্ষা। অনিমেষের মিলিটারি মেজাজের হেড মাস্টার বাবার নির্দেশে আপাতত ফুটবল মাঠের দাপাদাপি নিষিদ্ধ। ওদিকে পাড়ার টিমের ফুটবল কোচের জেদাজেদিতেই বাবাকে লুকিয়ে নাইলনের জালের ব্যাগে জার্সি শর্টস বুট হোস আর সিনগার্ড নিয়ে অনিমেষ হাজির হয়েছিল ভবানীপুর টেন্টে। সাব জুনিয়ার বেঙ্গল টিমের সিলেকশন। সেই প্রথমবার আরও দু’জন সহকারির সঙ্গে অনিমেষ চাক্ষুষ করেছিল পাড়ার ফুটবল কোচ সুবীরদার মুখে হাজারবার শোনা গল্পের সেই মানুষটাকে। অচ্যুৎস্যার ওরফে অচ্যুৎ ব্যানার্জীকে। নিজেদের বেড়ে ওঠার দিনে ওঁর জাদু স্পর্শ নাকি যারাই পেয়েছেন তারাই ময়দান কাঁপিয়েছে। সুবীরদা বলে ওঁর নাকি জহুরির চোখ। ওই চোখেই ধরা পড়েছে ময়দানের অসংখ্য রথীমহারথী।

প্রথম দিনের ট্রায়ালের পর অচ্যুৎস্যরের সহকারী বিপুলদার মুখে বাছাই পঞ্চাশ জনের মধ্যে নিজের নামও শুনে নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারেনি অনিমেষ। বাড়ি ফিরে বাবার ভয়ে সন্ধেতে পড়তেও বসেছিল। কিন্তু পড়তে বসাই সার। ওর মগজে বারবার উঁকি দিচ্ছে সেই তরুন নামের লম্বা ছিপছিপে স্টপারটা। আজকের ট্রয়াল ম্যাচে দু’একবার ওকে টপকাতে পারলেও বেশিরভাগ সময়েই ধরা পড়েছে ওর পায়ে। কী অসম্ভব ভাল কভারিং আর নিখুঁত ট্যাকল। যদিও অনিমেষের একটা ক্রশ থেকে পার্ফেক্ট হেডে তরুণকে টপকে গোল মেরে গেছে রিষড়ার শিশির বলে একটা ছেলে। তবুও অনিমেষ নিজের খেলায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি। মনে মনে ঠিক করেছে কালকের ট্রায়ালে তরুণ যদি ওর বিপক্ষে থাকে কিছুতেই ওকে ওর শরীরের মধ্যে ঢুকে ট্যাকল করতে দেবে না। অনিমেষ জানে নিজের প্লাস পয়েন্ট। ও জানে তাৎক্ষণিক চোরা গতিই ওর প্রধান অস্ত্র। সেই অস্ত্রেই কাল মারবে তরুণকে।

অনিমেষের আজও মনে পড়ে সেই দিনটা যেটা ছিল তাতাই জন্মানোর আগে পর্যন্ত ওর জীবনের সব থেকে স্মরণীয় দিন। দ্বিতীয় দিনের ট্রায়ালের শেষে স্বয়ং অচ্যুৎস্যার ওর মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন -”লেগে থাক! তোর হবে…”। অনিমেষ আজও আফশোস করে লেগে থাকতে না পারার জন্যে। তিন দিন পরে সুবীরদাই দিয়েছিল খবরটা। বাংলাদেশ সফরের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত অনুর্ধ ষোল বেঙ্গল টিমের চব্বিশ জনে অনিমেষের নামও আছে। অচ্যুৎস্যারের কোচিং-এ তিন মাস পরে এদের থেকেই আঠারো জনের নির্বাচিত টিম যাবে বাংলাদেশ। এক মাসের সফরে মোট সাতটা প্রীতি ম্যাচ খেলবে দল। দু’চোখের উপচে পড়া স্বপ্নের তাড়নায় দুরুদুরু বুকে স্কুলের হেডমাস্টার বাবার সামনে হাজির হয়েছিল অনিমেষ। ওর মুখে সব শুনে হিটলারি মেজাজের মনীন্দ্র সেনগুপ্তর আদেশ,

- “অনিমেশ, আমি গরীব শিক্ষক। তাই চাইনা তুমিও আমার মতোই জীবন যাপন কর। আর পড়াশুনা করে জীবনে দাঁড়ানো সব চেয়ে সহজ। চুনি পিকে কয়েক কোটিতে দু’এক ‘জন হয় কিন্ত কয়েক হাজারেই একজন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার অথবা উকিল। তোমাকে জীবনে সহজ টার্গেট দিয়েছি। ট্রাই টু অ্যাচিভ ইট। খেলাধুলো করে সময় নষ্ট আমাদের মতো ঘরে বিলাসিতা…….”

তাতাইয়ের কোচ অমিতকে বলা নিজে মুখের “ফুটবল খেলার বিলাসিতা…” শব্দগুলোতে অনেক বছর পরে নিজের মধ্যে বাবাকে খুঁজে পেল অনিমেষ। অমিতকে পাশ কাটাতে পারলেও নিজের কাছে ধরা পড়েই গেল। বাবার কথাই শুনেছিল অনিমেষ। প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত টিমের ক্যাম্পে যোগ না দিয়ে নাইনের অ্যানুয়াল পরীক্ষায় বসেছিল। বাবার ইচ্ছে মত ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার অথবা উকিল হতে না পারলেও বাবার রিটায়ারমেন্টের আগেই পেয়ে গেছিল ব্যাঙ্ক ক্লার্কের চাকরিটা।

দুই

সৌমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না তাতাই আজ ওই আন্ডার হাইট ওয়ান ডে টুর্নামেন্ট খেলতে যাক। তাতাইয়ের ক্লাস এইট চলছে। ফার্স্ট টার্মে সৌমির ভাষায় তাতাই ঝুলিয়েছে। সারা সপ্তাহ স্কুল কোচিং সামলে শনি রবিবারটাই হাতে থাকে সেল্ফ স্টাডির জন্যে। সেই রবিবারের সারাটা দিন ফুটবল মাঠে নষ্ট করাটা সৌমি মেনে নিতে পারছে না কছুতেই। রোজ বিকেলে ঘণ্টা দুয়েক পাড়ার ক্লাবে ফুটবল খেলাটা শরীর ঠিক রাখার জন্যে ঠিক আছে। কিন্তু তা’বলে সারাদিন টুর্নামেন্ট খেলা! আর খেলতে গিয়ে হাত পা ভাঙলে তো স্কুল কামাই পড়ার ক্ষতি। তাতাই যখন সৌমির জেদের কাছে প্রায় হারতে বসেছে ঠিক সেই সময়েই তাতাইয়ের ডুবন্ত নৌকার হাল ধরল অনিমেষ। শান্ত গলায় বলল,

- “সৌমি, ছেড়ে দাও ওকে এই একটা দিন। তাতাই কাল আমার কাছে প্রমিস করেছে এই আজকের দিনটার পরে ও ভীষণ মন দিয়ে পড়াশুনো করবে। প্লিজ গিভ হিম জাস্ট ওয়ান ডে…. প্লিজ….”

তাতাই অবাক হয়ে পাপার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কী অবলীলায় মমকে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলছে। পাপার সঙ্গে এই রকম কোনো কথাই হয়নি তাতাইয়ের। অথচ কী অসম্ভব দৃঢ়তা পাপার বলা মিথ্যে কথাতে। তাতাইয়ের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস যেন ঝরে পড়ছে পাপার প্রতিটা শব্দে। এক গ্লাস দুধ কোনমতে শেষ করে মমের প্রচণ্ড আপত্তি সত্বেও সাত সকালেই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেল তাতাই। পাপা ম্যানেজ না দিলে মম রাজিই হত না। আজকের এই রবিবারটা তাতাইয়ের কাছে ভীষণ ইমপর্ট্যান্ট। বালক সংঘের এই আন্ডার হাইট টুর্নামেন্টটা আর পাঁচটা সাধারণ টুর্নামেন্টের মত মোটেও না। ময়দানের নামি ক্লাবগুলোর জুনিয়ার টিমের মোটামুটি সব প্লেয়ারই এই টুর্নামেন্টে বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলে। বড় দলগুলোর জুনিয়ার টিমের স্পটারদের তীক্ষ্ণ নজর থাকে এই রকম টুর্নামেন্টের ওপর। তাতাইদের বৈষ্ণবঘাটা ইয়ং স্টারসেই তো দু’জন মোহনবাগান আর একজন ইস্টবেঙ্গল জুনিয়ার টিমের প্লেয়ার খেলবে। তাতাই জানে ওই তিন জন বড় দলের জুনিয়ার টিমের প্লেয়ারের থেকেও সেন্টার ফরোয়ার্ড তাতাইয়ের ওপর অনেক বেশি ভরসা করে কোচ গুলেদা। গত বছর ওদের টিম কোয়ার্টার ফাইনালেই ট্রাই ব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়। টাইব্রেকারে পেনাল্টি শট বারপোস্টে মেরে খুব কেঁদেছিল তাতাই। তাতাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে গুলেদা সান্ত্বনা দিয়েছিল,

- “আরে তোর মেসিও পেনাল্টি মিস করে কোপা আমেরিকা ফাইনালে চিলির কাছে হারে… ফরগেট অল দিজ… ডোন্ট লুক বিহাইন্ড। সামনের বছর ম্যাচ টাই ব্রেকার পর্যন্ত গড়াতে দিস না…”

তাতাই নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে এবছর গুলেদার মুখে হাসি ফোটাবে। সংক্ষিপ্ত হলেও অমিত সেন ওরফে গুলেদার ফুটবল কেরিয়ার উজ্জ্বল। এক বছর ইস্টবেঙ্গল খেলে পুনে এফসিতে দু’বছর। পুনে এফসিতে দ্বিতীয় মরসুমের শেষের দিকে ঘটে গেল সেই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনাটা। পুনে এফসি লিগ টেবিলের শীর্ষে। দুই পয়েন্ট পেছনে থেকে মোহনবাগান দ্বিতীয় স্থানে আর তিনে যুগ্মভাবে ইস্টবেঙ্গল আর চার্চিল ব্রাদার্স। মোহনবাগানের বিরুদ্ধে অ্যাওয়ে ম্যাচটাই প্রকৃতপক্ষে লিগ চ্যাম্পিয়ানশিপ ম্যাচ ছিল। হাফ টাইমের পরে মিনিট দশেক গড়িয়েছে। এক লুজ বল পেয়ে লেফট উইং ধরে সোলো রান শুরু করতেই বিপক্ষের রাইট ব্যাক স্লাইডিং ট্যাকেল করল। রাইট ব্যাকের ডান পায়ের বুটের স্পাইক সজোরে আঘাত করল অমিতের বাঁ’পায়ের হাঁটুতে। মালাইচাকিই শুধু সরল না লিগামেন্টও ছিঁড়ল। মেজর অপারেশনের মাস ছয়েক পরে ক্রাচ নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেও মাঠে ফিরতে আরও প্রায় বছর দেড়েক। প্রায় দু মরশুম ঘরে বসে থেকে সই করল ভবানীপুর এসিতে। কিন্তু খেলায় সেই পুরনো ছন্দ আর ফিরল না। ওপরে আরও ওপরে ওঠার স্বপ্নটা মনের মধ্যে চেপে রেখেই একদা ভারত সেরা মিডফিল্ডার অমিত সেন নিজের মনের উড়ানটা ধরে রাখতে চাইল উদীয়মান বাচ্চাদের মধ্যে। সবুজ ঘাসে ফুল ফোটানোর যে ইচ্ছেটা একদিন অমিতকে দৌড় করাতো সেই ইচ্ছেটাই বাস্তবের রূপ ধারণ করতে শুরু করল সন্দীপ সুমন অথবা তাতাইদের পায়ে ভর করে।

বালক সংঘের সবুজ মাঠে স্বপ্ন বুনতে দৌড়ে বেড়াচ্ছে আরও একুশ জন ক্ষুদে ফুটবলারের সঙ্গে তাতাইও। গড়ফা স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে ফাইনাল ম্যাচে প্রথমার্ধের এক গোলে পিছিয়ে বৈষ্ণবঘাটা ইয়ং স্টারস। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা চলছে। মিনিট দশেক খেলা বাকী। দিনের আলোও কমতে শুরু করছে। কমতে থাকা সূর্যের আলোর সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই যেন গুলেদার মুখটাও ঢেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। হঠাতই মাঝ মাঠে একটা লুজ বল পেয়ে বিপক্ষের দুই মিড ফিল্ডারের মাঝখান দিয়ে ছিটকে বেরতেই তাতাইয়ের সামনে বিপক্ষের স্টপার ঠিক ডি বক্সের সামনে। দুই পাশে শরীর হেলিয়ে ডান পায়ে ইনসাইড আউট সাইড ডজ করতে করতে বাঁপায়ের আউট সাইড দিয়ে বলটা আলতো টোকা দিতেই রংফুটে বিপক্ষের স্টপার। প্রতিপক্ষ লেফ্ট ব্যাক এগিয়ে এসে বাঁধা দেওয়ার মাঝে মাত্রই কিছু মুহূর্ত। গোলপোস্টের নিচে অসহায় গোলকীপার আর তাতাইয়ের মনে গত বছর ও পেনাল্টি মিস করার পর গুলেদার হতাশ দৃষ্টি। দেহের সমস্ত ভার ডান পায়ে দিয়ে বাঁপায়ের চেটো দিয়ে সজোরে শট মেরে বলটা জালে জড়িয়ে দিতেই ডুবন্ত সূর্যের মৃদু আলোতেও অমিত সেনের মুখে যেন অকাল দেওয়ালি।

খেলা শেষ হতে আর মাত্র এক মিনিট বাকী। টানটান উত্তেজনার ম্যাচ। দু’পক্ষের মুহুর্মুহু আক্রমণ প্রতি আক্রমণে উত্তেজিত দর্শক যখন ধরেই নিয়েছে খেলা গড়াবে টাইব্রেকারে ঠিক সেই মুহূর্তেই বৈষ্ণবঘাটা ইয়ং স্টারের রাইট উইঙ্গার সন্দীপকে নিজেদের পেনাল্টি বক্সের ভেতর জার্সি ধরে ফেলে দিল গড়ফা স্পোর্টিং-এর এক ডিফেন্ডার। তৎক্ষণাৎ রেফারি বাঁশি বাজিয়ে জানিয়ে দিল পেনাল্টি। টিমের ক্যাপ্টেন ইস্টবেঙ্গল জুনিয়ার টিমের সন্দীপ বলটা হাতে নিয়ে পেনাল্টি স্পটের দিকে এগোতেই ওর দিকে দৌড়ে গেল তাতাই। সন্দীপের হাত থেকে বলটা নিয়ে পেনাল্টি স্পটে বসাল। দশ স্টেপ পিছিয়ে এসে দাঁড়াল। কোমরে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে কয়েক মুহূর্ত যেন কী ভাবল। গত বছরে এই মাঠেই ওর পেনাল্টি মিসের কথাটা মনে পড়তেই যেন চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে গেল তাতাইয়ের। গোলকীপারের পজিশন দেখতে চোখ তুলতেই বিস্মিত হয়ে দেখল গোল পোস্টের পিছনে বেশ কিছু মানুষের মধ্যে ওর পাপাও দাঁড়িয়ে। ওর দিকে হাত তুলে পাপা দু আঙুলে ভি দেখাতেই দৌড় শুরু করল তাতাই। ওর মগজে তখন কিলবিল করছে মাকে বলা পাপার মিথ্যে কথাগুলো। ওর প্রতি পাপার বিশ্বাসের দৃঢ়তায় ওর দু চোয়াল আরও শক্ত। বলের কাছে পৌঁছে ডান দিকে শট মারার জন্যে বডি ফেন্ট করতেই ডান দিকে ঝাঁপাল বিপক্ষের গোলকীপার। বাঁপায়ের ইনসাইড দিয়ে বাঁদিকের পোস্ট ঘেঁষে বলকে আলতো পুশ করতেই অসহায় গোলকীপার উল্টো দিকে শুয়ে শুয়েই দেখল বল জড়িয়ে গেল জালে। গোলকীপার উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই রেফারি বাজিয়ে দিল খেলা শেষের বাঁশি।

দু’হাতে বেস্ট প্লেয়ার আর হায়েস্ট স্কোরারের কাপ দুটো ধরে পাপার বাইকের পিছনে বসে বাড়ির দিকে চলেছে তাতাই। উইনিং টিমের প্লেয়ারের মেডেলটা পড়িয়ে দিয়েছে পাপার গলায়। অনর্গল বকবক করতে করতেই তাতাই লক্ষ্য করল পাপার বাইক বাড়ির দিকের রাস্তায় না গিয়ে সোজা ঝিলের রাস্তা ধরল। ঝিলের ধারে রাস্তায় বাইকটা স্ট্যান্ড করে বাপ বেটায় গিয়ে বসল ঝিলের ধারে। ঝিলের উল্টো দিকের লেক ভিউ আ্যাপার্টমেন্টের সুউচ্চ অট্টালিকার ঝকঝকে আলোগুলো তিরতির করে কাঁপতে থাকা ঝিলের জলে পড়তেই ভেঙে চুড়ে খানখান হচ্ছে। সেই ভাঙতে থাকা আলোয় চোখ দুজনেরই। মাঝে মাঝে ট্রেন যাওয়ার শব্দ ছাড়া অসীম নিস্তব্ধতায় ঢাকা চরাচর। সেই নিস্তব্ধতাকে সঙ্গত করতেই যেন বাপ বেটার একান্ত আলাপচারিতা,

- “তাতাই সত্যি করে বল তো ওই জয়েন্ট আইআইটি আইআইএম…. তোর ভাল লাগে?”

- “আমি সত্যিই জানিনা পাপা। মম হয়ত ঠিকই বলে। আমি আর একটু বেশি সময় পড়লে…..”

- “আর আমি যদি বলি খেলার মাঠে আরেকটু বেশি সময় দিলে তুই….”

- “কি? মেসি নাকি সিআর সেভেন?”

- “অতোটা না হলেও অন্ততপক্ষে একটা কৃশানু কিম্বা বাইচুং….. “

- “হবে না! জানো, সন্দীপরা রোজ সকালেও দুঘণ্টা প্র্যাকটিস করে। আমার তো স্কুল আছে।”

- “আর যদি তোর স্কুলটা চেঞ্জ করে তোকে ডে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিই?”

- “আর ইউ ক্রেজি পাপা? আমার সঙ্গে তোমাকেও মম বাড়ি থেকে বের করে দেবে।”

- “ইটস নট আ জোক তাতাই। আই অ্যাম সিরিয়াস। তোর গুলেদার কাছে শুনলাম মোহনবাগান জুনিয়ার টিমের এক স্পটার তোর খোঁজ নিচ্ছিল। ওরা তোকে চায়।”

- “কিন্তু পাপা, আমাকে নিয়ে মমের ড্রিমসগুলোর কী হবে?”

- “তাতাই ইটস ইওর লাইফ। সো ইউ হ্যাভ এভরি রাইট টু টেক দ্য ডিসিশন অ্যান্ড দিস ইজ দ্য হাই টাইম…. আমিও চেয়েছিলাম ফুটবলটা খেলতে। ক্লাস নাইনের এনুয়াল পরীক্ষা চলাকালীন ডাক পেলাম সাব জুনিয়ার বেঙ্গলের ক্যাম্পে। তোর দাদু ছিল স্কুলের হেড মাস্টার। পড়াশুনো ছাড়া কিছুই বুঝত না। তোর মত পাপা আমিও পেলে হয়ত ব্যাঙ্কের ক্লার্ক না হয়ে ময়দানে……”

বাপ বেটার আলোচনার মাঝেই সৌমির ফোন এলো অনিমেষের মোবাইলে। “হ্যাঁ রাস্তায় আছি, পাঁচ মিনিটেই বাড়ি পৌঁছচ্ছি” বলেই বাইকে স্টার্ট দিল অনিমেষ।

তিন
—-

প্রত্যেক দিনের মতোই সৌমি চা বানিয়ে ড্রইংরুমে বসে অনিমেষের জন্যে অপেক্ষা করছে। অনিমেষের ছুটির দিন ছাড়া সৌমির এটা বহুদিনের রুটিন। শ্বশুরকে বেড-টি দিয়ে এসে ড্রয়িংরুমে ওদের দু’জনের চা টেবিলে রেখে সোফায় বসে অনিমেষের জন্যে অপেক্ষা করছে। গত রাত থেকেই অনিমেষকে যেন ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছে। গত রাতে ও প্রায় ঘুমতেই পারেনি। বিষয়টা সৌমির নজরে এলেও রাতে আর সেই নিয়ে কথা বলেনি। ঠিক করেছে তাতাইকে স্কুল বাসে উঠিয়ে অনিমেষ বাড়ি ফিরলে ওকে জিজ্ঞেস করবে।

তাতাইকে স্কুল বাসে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরল অনিমেষ। এসেই দেখল চা নিয়ে ওর জন্যেই অপেক্ষা করছে সৌমি। সামনের দেওয়ালে ঝুলন্ত এলইডি টিভিটা যেন অভ্যাস বসতই চলছে। সৌমিরও যেন সেদিকে মন নেই। কাল সন্ধে থেকেই অনিমেষের মনের ভেতর চলতে থাকা ঝড়ের আভাস কি সৌমিও টের পেয়েছে? কিছুই বুঝতে পারেনা অনিমেষ। অনিমেষ জানে মনের ভেতরে অবিরাম চলতে থাকা এই ঝড়টা আজই থামাতে না পারলে তার ক্ষয় ক্ষতি সামলাতে ভবিষ্যতে অনেক মূল্য চোকাতে হবে। নিজের ছেলের জীবনের নৌকার পালে অনুকূল হাওয়া লাগাতে একটা অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে আজ। হ্যাঁ, আজই নিতে হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার এটাই সঠিক সময়। নিজের জীবনে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটা নিতে না পারার যে আফসোসটা আজও ওকে কুঁড়েকুঁড়ে খায় সেটা তাতাইয়ের জীবনে কিছুতেই আসতে দেবে না অনিমেষ। ও জানে বিষয়টা ভীষণ স্পর্শকাতর। সিদ্ধান্তটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সৌমির মনের ভেতর বহুদিন ধরে তিলেতিলে গড়ে ওঠা স্বপ্নসৌধ অথবা তাতাইয়ের ভবিষ্যৎ। একটা ভুল সিদ্ধান্তে নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে ওদের সংসারের শক্ত ভিত। তাই সৌমির সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনাটা যতটা শীঘ্র সম্ভব সেরে নিতে চায়। চায়ে চুমুক দিয়ে অনিমেষ বলল,

- “আজ অফিস যাচ্ছি না। ছুটি নেবো।”

- “কেন গো হঠাত? শরীর ঠিক আছে তো?”

অনিমেষের কপালে হাত ছুঁয়ে দেখল সৌমি। নাহ্! জ্বর নেই। উদ্বিগ্ন স্বরে সৌমি জিজ্ঞেস করল,

- “পেট ঠিক আছে তো?”

- “আরে বাবা শরীর ঠিক আছে। শুধু একটু ক্লান্ত লাগছে। তাছাড়া তোমার সঙ্গে কথা বলে একটা ভীষণ ইম্পরট্যান্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে……”

অনিমেষের কথাগুলো শুনে সৌমি যেন নড়েচড়ে বসল। আসলে এই রকম শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে কথা অনিমেষ বিশেষ বলেনা। তাই ওর কথাগুলো শুনে সৌমি একটু অবাকই হল। অনিমেষের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল,

- “কী ব্যাপার বল তো? এনি থিং রং? তোমাকে কাল রাত থেকেই খুব টেনসড লাগছে? অফিসে কোনো গণ্ডগোল?

- “না না! নাথিং অ্যাবাউট মাইসেল্ফ। অল অ্যাবাউট তাতাই…..”

“হোয়াট! তাতাই?” বলেই সৌমি চমকে তাকালো অনিমেষের দিকে। সৌমির বিস্মিত মুখে একবার চোখ বুলিয়ে শান্ত স্বরে অনিমেষ বলে উঠল,

- “বুঝলে সৌমি, তাতাই ইজ মেড ফর ফুটবল অনলি। সেটাতেই যদি ও পুরো কনসেন্ট্রেট করে তাহলে হি ক্যান টাচ দ্য স্কাই। আমি জানি ওকে নিয়ে তোমার অনেক স্বপ্ন। ওকে তুমি ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চাও। তুমি চাও তোমার ছোড়দার মতো ও স্টেটসে যাক। কিন্তু ভেবে দেখেছো ও কি চায়?”

অনিমেষের কথাগুলোতে যেন গরম তেলে নুন হলুদ মাখানো বেগুন ভাজার জন্যে ছাড়া হল। উত্তেজিত গলায় চেঁচিয়ে উঠল সৌমি,

- “তাতাই এখনো যথেষ্ট ইমম্যাচিওর। তুমি সত্যিই মনে কর যে নিজের ভবিষ্যতের জন্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ম্যাচুরিটি ওর এসেছে? আর ইউ ক্রেজি? পড়াশুনো ছেড়ে ও ফুটবল খেলবে?”

অনিমেষ বরাবরই একটু রগচটা। অল্পেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। কিন্তু বুঝতে পারছে আজ ওকে শান্ত থাকতে হবে। সৌমির মনে বেড়ে ওঠা অনেক দিনের বিশ্বাসটাকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে। কারণ আজ ও সৌমির মধ্যে ত্রিশ বছর আগের নিজের একগুঁয়ে হেডমাস্টার বাবার ছায়া খুঁজে পাচ্ছে। অনিমেষ খুব ধীরস্থির ভঙ্গিতে শান্ত গলায় উত্তর দিলো,

- “ওর পড়াশুনো ছাড়ার কথা তো বলছি না। শুধু ওর নিজের ইচ্ছাটাকে আরেকটু বেশি গুরুত্ব দিতে বলছি। জানো সৌমি, ত্রিশ বছর আগে আমার বাবাও আমাকে ঠিক তোমার কথাগুলোই বলেছিল। সেদিন যদি আমিও তাতাইয়ের মত একজন বাবা পেতাম তাহলে হয়তো এই ব্যাঙ্কের কেরানী হয়ে জীবনটা……”

অনিমেষকে মাঝ পথেই থামিয়ে দিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠল সৌমি,

- “রহস্য না করে ঝেড়ে কাশো তো! পরিষ্কার করে বল যা বলতে চাও।”

- “দেখো সৌমি, তোমার প্রেশারে ও হয়তো ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্সও পেলো। কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি ও একজন বি-গ্রেড ইঞ্জিনিয়ার হবে। কারণ ইঞ্জিনিয়ারিং ওর প্যাশন নয়, ওর প্যাশন ফুটবল। আমি জানি ফুটবলে ওর ট্যালেন্টও আছে। ওর কোচও সেটাই বলে। তুমি জানো, সেদিন ওই টুর্নামেন্টের পরে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের জুনিয়ার টিমের কোচেরা ওকে নিয়ে আলোচনা করছিল। সৌমি, তোমার ছেলে একটা আনকাট হিরে। একটু ঘষামাজা করতে পারলেই একদিন মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল পেরিয়ে ইন্ডিয়া….. জানো, এখন আই.লিগের হায়েস্ট পেইড ফুটবলারের সঙ্গে বছরে দেড় দু’কোটি টাকার চুক্তি করে ক্লাবগুলো……”

একটানা কথাগুলো বলে একটু থামলো অনিমেষ। সৌমির মুখের দিকে তাকালো। মনে হচ্ছে উত্তেজনায় লাল হয়ে যাওয়া সৌমির মুখটা যেন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। অনিমেষ যেন হঠাতই আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। মনে জোর এনে সৌমিকে জিজ্ঞেস করল,

- “কী হল? কিছু বলছো না যে? তোমার মতামতটাও জানাও।”

- “আমার মতামতের আবার কী আছে। তোমরা বাপ ব্যাটায় তো সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছো।”

সৌমির গলায় যেন অভিমান ঝরে পড়ছে। অনিমেষ বুঝতে পারছে সৌমি দ্বিধাগ্রস্ত। অনিমেষ নিজেও কি দ্বিধাগ্রস্ত নয়? কিন্তু আজ আর উপায় নেই। একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। কিন্তু কিভাবে শুরু করবে ভেবে পাচ্ছে না। সামনে দেওয়ালে ঝোলানো এলইডি টিভিতে শাম্মি কাপুর আর শর্মিলা ঠাকুর অকারণ লম্ফঝম্প করছে। টিভির ভলিউমটা বন্ধ করে রাখলে শাম্মি কাপুর আর শাখামৃগের সঙ্গে গাছের ডালে দু’পা আঁকড়ে ঝোলা ছাড়া আর কিছুই তফাত খুঁজে পাওয়া যায় না। এই রকম গম্ভীর পরিবেশেও অনিমেষের মুখে হাসি ফুটে উঠল। আধ খাওয়া চা’টাও ঠাণ্ডা হয়ে পড়ে আছে। সৌমি তো একটা চুমুক দিয়ে ভুলেই গেছে সামনের টেবিলে রাখা চায়ের কাপটার কথা। দুটো কাপ হাতে নিয়ে অনিমেষ মাইক্রোওয়েভ আভেনে চা’টা একটু গরম করে সৌমির কাপ ওর হাতে দিলো। নিজের কাপে একটা হালকা চুমুক লাগিয়ে ফিরে গেল পুরনো আলোচনায়,

- “আচ্ছা সৌমি, তাতাইকে একটা ডে স্কুলে ভর্তি করলে হয় না?”

- “তাতে লাভ?”

- “তাহলে ও সকালের প্র্যাকটিসটাও করতে পারে। তাছাড়া বড় দলের সব জুনিয়ার টিমগুলোর প্র্যাকটিসও সকালেই হয়।”

- “ওহোঃ! তুমি ধরেই নিয়েছো তোমার ছেলে বড় দলে……”

- “ধরে নিইনি সৌমি, তাতাইয়ের কোচ অমিতকে ওরা বলেছে……”

- “তাহলে দেখো খোঁজ খবর করে। তবে আমার আমার মনে হয় প্রফেশনালি খেলাটাকে নিলেও মিনিমাম বেসিক এডুকেশনটাও দরকার। অন্ততপক্ষে গ্র্যাজুয়েশনটাও……”

- “কিন্তু সৌমি, শচিন তেন্ডুলকর টেন্থের পর আর পড়াশুনোটা এগোতে পারেনি। অথচ ক্রিকেটে ওর মাস্টার্স নিয়ে পুরো দুনিয়ায় কারো কোনো সন্দেহই নেই। প্যাশনকে প্রফেশন করতে যারা পারে তাদের মতো সুখী মানুষ বোধ হয় পৃথিবীতে আর কেউ হয় না। আর আমি আমার তাতাইকেও পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষ হিসেবই দেখতে চাই……”

অনিমেষ একটানে কথাগুলো বলে চলেছে। ওর মুখের দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সৌমি। মানুষ হিসেবে অনিমেষ বরাবরই ইন্ট্রোভার্ট। বিয়ের পনেরো বছর পরেও সৌমি বুঝতে পারেনি অনিমেষ কী খেতে ভালবাসে। ক্লাস সিক্সে পড়তে পড়তেই মাতৃহারা অনিমেষ নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছেগুলোকে লুকিয়ে ফেলেছিল নিজের ভেতর। এতোগুলো বছর পরে আজ প্রথমবার ওকে নিজের মতামত এই রকম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করতে দেখে বেশ অবাকই হলো সৌমি। তাতাইয়ের ভবিষ্যতের ব্যাপারে সৌমি নিজেও বোধহয় এতোটা আত্মবিশ্বাসী নয়। ছেলের প্রতিভার ওপর অনিমেষের এই রকম দৃঢ় আত্মবিশ্বাস দেখেই সম্ভবত: ভেতরে ভেতরে নরম হতে শুরু করল সৌমি। বেশ শান্ত গলায় প্রশ্ন করল,

- “ডে স্কুলের খোঁজ খবর আছে তোমার কাছে? তবে একটা কথা, বাবার সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করে নিও একবার।”

- “না সৌমি, এবার আর বাবার মতামত নয় আমাদের সিদ্ধান্ত ওঁকে জানাবো…..”

দৃঢ় স্বরে উত্তর দিয়ে চায়ের কাপে শেষ চুমুক মেরে টয়লেটের দিকে পা বাড়ালো অনিমেষ।

চার

অনেক দিন পরে তাতাই আজ ভীষণ খুশি। মমকে অনেক বুঝিয়ে পাপা ওকে অন্য স্কুলে ভর্তি করিয়েছে। কাল সকাল থেকেই মোহনবাগান মাঠে যাবে প্র্যাকটিস করতে। সকাল পাঁচটা থেকে প্র্যাকটিস। পুরনো ছেলেদের কাছে তাতাই শুনেছে নতুন কোচ জয়ন্ত স্যার নাকি ভীষণ কড়া। মাঠে নামতে পাঁচটা বেজে এক মিনিট হলেই বসে থাকতে হবে সাইড লাইনের বাইরে। আটটা পর্যন্ত তিন ঘণ্টার প্র্যাকটিস সেরে ক্লাব টেন্টেই চান করে ব্রেকফাস্ট সেরে সোজা স্কুল। কাল অনেক ভোরে উঠতে হবে। তাই ন’টার মধ্যেই ডিনার সেরে নিজের ঘরে এলো তাতাই। ওর ঘরের দেওয়ালে লাগানো মেসির অসংখ্য পোস্টার। পোস্টারগুলোতে অনেক দিনের জমে থাকা ধুলো নিজের হাতে পরিষ্কার করল। কাবার্ড খুলে কিটস ব্যাগ থেকে লাল সাদা বুটটা নিয়ে একটা ন্যাকড়া দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করল। পেছনে মেসির নাম লেখা দশ নম্বর জার্সিটায় একবার হাত বুলিয়ে আবার ভাঁজ করে কিটস ব্যাগে রাখলো। ঘরের লাইট অফ করে শুয়ে পড়ল তাতাই।

তাতাইয়ের নতুন স্কুল দশটা থেকে। অনিমেষ ঠিক করেছে কাল থেকে বাইকে করে তাতাইকে মাঠে ছেড়ে ওখানেই অপেক্ষা করবে। প্র্যাকটিস সেরে ওকে পৌনে দশটায় স্কুলে ছেড়ে অফিসে যাবে। বিকেলের প্র্যাকটিসটা অবশ্য তাতাই ওর গুলেদার কোচিং-এই করবে। কাল রাতে মানসিক উদ্বেগে অনিমেষ ভাল করে ঘুমোতে পারেনি। তাই দুপুরে ঘণ্টা দুয়েক বিছানায় গড়িয়ে নিয়েছে। তার জেরেই কিনা বুঝতে পারছে না অনিমেষের দু’চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই । দেওয়াল ঘড়িটা ঢংঢং করে বারোটা ঘণ্টা বাজিয়ে আরেকটা নতুন দিনের সূচনার কথা জানিয়ে দিলো। নাইট ল্যাম্পের হালকা আলোয় অনিমেষ পাশ ফিরে দেখল সৌমি অঘোরে ঘুমোচ্ছে। মাথার বালিশের নিচে রাখা টর্চটা জ্বালিয়ে সন্তর্পণে বিছানা থেকে উঠে ডাইনিং টেবিলে রাখা বোতল থেকে বেশ কিছুটা জল গলায় ঢেলে পা বাড়ালো তাতাইয়ের ঘরের দিকে। নীলচে নাইট ল্যাম্পের মায়াবী আলোয় ঘুমন্ত তাতাইয়ের মুখের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো একটা অনাবিল প্রশান্তি যেন মুড়ে দিয়েছে ওর মুখটা। ধীর পায়ে তাতাইয়ের ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো অনিমেষ। পাশেই বাবার ঘর থেকে ভেসে আসছে উচ্চ স্বরে নাক ডাকার ঘড়ঘড়ে অথচ গম্ভীর আওয়াজ। অনিমেষ জানে তাতাইয়ের ব্যাপারে নেওয়া ওর সিদ্ধান্তটা বাবা মোটেও ভালভাবে নেয়নি। কিন্তু এই বার আর বাবার পুরনো রক্ষণশীল চিন্তা ভাবনা অথবা বিশ্বাসকে সম্মান জানাতে গিয়ে তাতাই-এর স্বপ্নকে গলা টিপে মারতে পারেনি। বাবার নাক ডাকার আওয়াজকে পেছনে ফেলে নিজের বিছানায় শরীর এলিয়ে চোখ বুজলো অনিমেষ। এবার ওকে ঘুমতে হবে। কাল সকাল সাড়ে চারটের মধ্যেই বেরতে হবে। তাতাইয়ের প্রথম দিনের প্র্যাকটিসে দেরি করা চলবে না। একজন ফুটবলারের জীবনে পাংচুয়ালিটি আর ডিসিপ্লিনের গুরুত্ব অনিমেষ ভাল মতোই বোঝে। তাই আর সময় নষ্ট না করে চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করে।

বহুদিন পরে আজ এই রকম নিশ্চিন্ত ঘুম নেমে এসেছিল তাতাইয়ের দু’চোখেও। ঘুমের দেশের মায়াবী জগতে মাইলের পর মাইল ভ্রমণ শেষে তাতাই পৌঁছল সেই নদীর পাড়ে যার অন্য কূলে দিগন্ত রেখায় অসীম আকাশ মিশেছে তরল স্নিগ্ধতায়। ঘুমের দেশের শান্ত শীতল তরলের গভীরে তলিয়ে যেতে যেতে তাতাই পৌঁছে গেল সেই স্বপ্নের জগতে। সেখানে নরম ঘাসের কার্পেট বিছানো স্টেডিয়ামে মাঠের মাঝখানে বলের ওপর একটা পা রেখে কোমরে হাত রেখে ও দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয় ভঙ্গিতে। ওকে ঘিরে ওরই বয়সী আরও কিছু আধ ফোটা গোলাপ। স্টেডিয়ামে অসংখ্য দর্শকের মাঝেই তাতাইয়ের নজরে এলো স্টেডিয়ামে দাঁড়ানো গুলেদার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মম পাপা ছোটমামা মনিপিসি নরেন আঙ্কল এমনকি তাতাইয়ের আগের স্কুলের প্রিন্সিপাল ম্যামও। রেফারি হুইসেল বাজিয়ে কিক-অফ করতেই বল তাতাইয়ের পায়ে। সর্পিল গতিতে তাতাই এগিয়ে যাচ্ছে বিপক্ষের গোলের দিকে। দিগ্বিদিক উত্তাল করা দর্শকদের “তাতাই…. তাতাই…” শব্দে বিহ্বল তাতাইয়ের দৃষ্টিতে শুধুই বিপক্ষের গোল….

- “তাতাই ওঠ! চারটে বাজে! তোকে বেরতে হবে তো নাকি……”

সৌমির মৃদু ধাক্কায় স্বপ্নের জগত থেকে বাস্তবে ফিরতেই তাতাই দেখল মাথার কাছে মম দাঁড়িয়ে আছে। অনেক দিন পরে ঘুম চোখ খুলেই মমকে হাসি হাসি মুখে দেখে তাতাইয়ের যেমন ভাল লাগলো ঠিক তেমনই এই কাক ভোরে ঘুম ভাঙানোর পরেও তাতাইয়ের মুখ ভার না দেখে সৌমিরও মনটা ভরে গেল। অন্য দিন স্কুলে যাওয়ার আগে বিছানা থেকে টেনে তুলে দাঁত মাজাই হোক অথবা টয়লেটে ঢোকানো সবটাই সৌমিকে করতে হতো ঠেলেঠুলে। আজ সৌমি অবাক হয়ে দেখতে লাগলো ওর ল্যাদা ছেলেটা রাতারাতিই কেমন যেন অ্যাক্টিভ হয়ে গেছে। বিছানা থেকে উঠে দাঁত মাজতে মাজতেই ঢুকে গেল টয়লেটে। মিনিট দশেকেই সব সেরে মুখ ধুয়ে রেডি। নিজেই কাবাড থেকে ট্র্যাক স্যুট বের করে পরল। অনিমেষও ততক্ষণে স্নান সেরে জামা প্যান্ট গলিয়ে রেডি। অনিমেষ তাতাইকে প্র্যাকটিস থেকে স্কুলে ছেড়ে অফিস যাবে। তাই একেবারেই তৈরি হয়েই ওকে বেরোতে হবে। সৌমি তাতাইকে এক গ্লাস দুধ আর অনিমেষকে চা দিলো। বাপ ব্যাটায় চা আর দুধ শেষ করে যখন বাড়ি থেকে বেরোল তখনও বাইরে অন্ধকার। সৌমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দেখতে লাগলো ল্যাম্প পোস্টের শেষ রাতের হলুদ আলো গায়ে মেখে ওদের বাইকটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল সামনের বাঁকে।

পাপার বাইকের পেছনে বসে ভোরের কলকাতাকে যেন এক নতুন দৃষ্টিতে আবিষ্কার করছে তাতাই। একদম ফাঁকা রাস্তা। মাঝেমাঝেই চোখে পড়ছে এক দঙ্গল কুকুর ফুটপাতে দল পাকিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। অনেক জায়গাতেই আবার কুকুরে মানুষে সহাবস্থান। মাঝেমাঝে মর্নিং ওয়াকে বেরোনো দু’একজন করে শরীর সচেতন মানুষও নজরে পড়ছে। বেশিরভাগই অবশ্য দাদানের মত বয়স্ক মানুষ। তাতাই দাদানের মুখেই শুনেছে বয়স্ক মানুষদের নাকি ঘুম কমে যায়। এই পৃথিবীতে তাদের সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলেই নাকি বয়স্ক মানুষরা ঘুমিয়ে সময় নষ্ট না করে ভোর ভোর উঠে পড়তে চায়। যাতে অবশিষ্ট সময়ের সুবাসটুকু যতটা বেশি সম্ভব উপভোগ করতে পারে। দাদান খুব পণ্ডিত মানুষ। এখনো সারাটা দিন পড়াশুনা নিয়েই থাকে। কী যে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা বলে। কত দেশ বিদেশের গল্প বলে যার বেশিরভাগটাই তাতাই বুঝতে পারে না। তবে সবটা বুঝতে না পারলেও দাদানের বেশিরভাগ কথাই তাতাইয়ের শুনতে ভাল লাগে, শুধু ওর নিজের পড়াশুনার ওই কথাগুলো ছাড়া। তাতাই জানে ওর এই স্কুল চেঞ্জ আর মোহনবাগান জুনিয়ার টিমে জয়েন করাটা দাদানের পছন্দ হয়নি। তবুও দাদান রেগে যায়নি। কথাটা শুনে তাতাইকে আশীর্বাদও করেছে।

মোহনবাগান ক্লাব টেন্টের মূল গেটের এক পাশে বাইকটা স্ট্যান্ড করে অনিমেষ আর তাতাই দুরুদুরু বুকে ভেতরে ঢুকলো। নতুন অচেনা পরিবেশ। দু’জনেই ভীষণ টেনশনে। টেন্ট লন থেকে শুরু করে বাগানের ফুলের গাছ পর্যন্ত চতুর্দিকের সব কিছুই বেশ পরিপাটি করে সাজানো গোছানো। সব কিছুতেই যত্নের ছাপ। এই ভোর পাঁচটা বাজার আগেই ভেতরে জনসমাগমে যেন গমগম করছে। সিনিয়ার টিমের অনেক চেনা মুখ। গাঁট্টাগোট্টা চেহারার কুচকুচে কালো মুখে রূপোলী চুলের সনি নর্ডিকে দেখেই তাতাই চিনতে পেরেছে। অনেক চেনা অচেনা মুখের মধ্যেই এক অচেনা মুখ এসে তাতাইকে জিজ্ঞেস করল,

- “হাই! তোমাকে যেন চেনা চেনা লাগছে? তোমার নাম?”

- “তাতাই…. সৌম্য সেনগুপ্ত…..”

ভীষণ নার্ভাস গলায় তাতাই উত্তর দিতেই হাসিহাসি মুখে অচেনা ভদ্রলোক বলে উঠলেন,

- “আমি জয়ন্ত রায়। তোমাদের কোচ। তোমার কথা অমিতের মুখে অনেক শুনেছি। ওই টেন্টে চেঞ্জ করে ড্রেস আপ করে মাঠে নামো। দেখি অমিতের গাল গল্প কতটা সত্যি…”

পাশের ড্রেসিং রুমের দিকে আঙুল দেখিয়ে কোচ জয়ন্ত রায় পা বাড়ালেন মাঠের দিকে। আর তাতাইয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে “আমি গ্যালারিতে আছি তুই মাঠে যা, অল দ্য বেস্ট….” বলে অনিমেষ গ্যালারিতে গিয়ে বসলো।

মাঠের একপাশে কোচ সঞ্জয় সেনের তত্ত্বাবধানে শরীর চর্চায় ব্যস্ত মোহনবাগানের সিনিয়র টিমের প্লেয়াররা। অন্য প্রান্তে জয়ন্ত রায়কে ঘিরে একদল কচিকাঁচা। ওদের মধ্যে তাতাইকেও দেখে অনিমেষের বুকটা ভরে যাচ্ছে। শুধু একটাই অসোয়াস্তি হচ্ছে তাতাইয়ের গায়ে মোহনবাগানের জার্সি দেখে। অনিমেষের কৈশোরের স্বপ্নে বারবার ফিরেফিরে এসেছে ইস্টবেঙ্গলের লাল হলুদ জার্সি। স্বপ্নে অনিমেষ যে কতবার লাল হলুদ জার্সি গায়ে মুখোমুখি হয়েছে মোহনবাগানের বটবৃক্ষ সুব্রত ভট্টাচার্যের তা শুধু ও নিজেই জানে। সেই মনে প্রাণে ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক অনিমেষের তার নিজের ছেলেকে মোহনবাগান জার্সি গায়ে মোহনবাগান মাঠের সবুজ গালিচায় দাপাদাপি করতে দেখে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। এবার থেকে ডার্বি ম্যাচে ও কার সমর্থনে খেলা দেখতে বসবে সেটা ভেবে কূলকিনারা খুঁজে পায় না। অনিমেষ মনে মনে মনে ঠিক করে এবার থেকে ও শুধুই ফুটবল ফ্যান হয়ে থাকবে, কোনো নির্দিষ্ট ক্লাবের নয়। শুধুই ওর তাতাইয়ের হয়েই গলা ফাটাবে ডাই হার্ড ইস্টবেঙ্গলি অনিমেষ সেনগুপ্ত।

পাঁচ

তাতাই যে আর মাত্র মাস ছয়েক পরেই মোহনবাগান সেইল ফুটবল অ্যাকাডেমিতে জয়েন করে দুর্গাপুর চলে যাবে সেই খবরটা অনিমেষের মুখে শুনেই বুকটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে সৌমির। এখনো খাওয়ার জলটাও ফিল্টার থেকে নিজে নিয়ে খেতেও পারে না ছেলেটা। মাঝেমাঝেই ছুটির দিনে স্ক্রাবার দিয়ে পিঠে আচ্ছা করে সাবান ঘষে না দিলে জমে থাকে ময়লার লেয়ার। অ্যাকাডেমির হোস্টেলে ওর জামা কাপড়ই বা কে কেচে দেবে। যা ল্যাদখোর ছেলে! একই ময়লা জামা প্যান্ট হয়তো দিনের পর দিন পরে পরে স্কিন ডিজিজই বাঁধিয়ে বসবে। ওদের ছেড়ে তাতাই-এর হোস্টেলে চলে যাওয়ার খবরে ওর রাতের ঘুম চলে গেলেও অনিমেষের নির্বিকার হাবভাব দেখে অবাক হচ্ছে সৌমি। অনিমেষের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে যেন হঠাতই ভীষণ চনমনে ভাব। তাতাই হোস্টেলে চলে যাবে শুনেই যেন বাপ ব্যাটার ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। চায়ে চুমুক দিতে দিতে মুখ তুলে অনিমেষের দিকে তাকাল সৌমি। খবরের চ্যানেল সার্ফ করতে করতে নিবিষ্ট চিত্তে কী যেন খুঁজে চলেছে। সৌমিও যে এই ঘরেই একই সোফায় ওর পাশেই বসে আছে সেটা যেন ভুলেই গেছে অনিমেষ। অসহ্য হয়ে বিরক্তি মেশানো স্বরে সৌমি ঝাঁঝিয়ে উঠল,

- “কোথায় মনটা তোমার বলো তো? মাসের মধ্যে তো এই চারটে রোব্বার আর দুটো শনিবারই একটু কথা বলার সময় পাও। বাকী দিনগুলো তো ভোর সাড়ে চারটে থেকে শুরু করে সন্ধে সাতটা….”

টিভিটা অফ করে রিমোটটা সামনের সেন্টার টেবিলে রেখে চায়ের কাপটা হাতে তুলে তাতে একটা চুমুক দিয়ে অনিমেষ তাকালো সৌমির দিকে। ওর ঝাঁঝালো কথার উত্তরে শান্ত গলায় বলল,

- “তাতাই হোস্টেলে চলে গেলে তোমার জগতটা কতটা খালি হয়ে যাবে সেটা আমি ভালই জানি। আর এই ব্যাপারে আমার উদাসীনতা যে তোমাকে অবাক করছে তাও আমি জানি। কিন্তু সৌমি, আমরা দু’জনেই যদি ওর সামনে আমাদের ভেতরের কষ্টটা এইভাবে প্রকাশ করে ফেলি তাহলে তাতাই কী করে মানিয়ে নেবে সেটা একবারও ভেবে দেখেছো?

- “সেটাও সত্যি। কিন্তু তাতাইটা যে নিজের কোনো কাজটা নিজের হাতে করতে পারে না। ও যে এখনো বড্ড ছোট….”

নিজের কথাগুলো শেষ না করেই অনিমেষের কাঁধে মাথা রেখে বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল সৌমি। গতকাল অফিস ফেরতা অনিমেষের মুখে তাতাইয়ের অ্যাকাডেমিতে চান্স পাওয়ার খবরটা পাওয়া মাত্রই কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছিল সৌমি। অথচ খবরটা সৌমিকে দিতে গিয়ে নিজের উচ্ছ্বাসটা কিছুতেই চাপতে পারছিল না অনিমেষ। ও কিছুতেই সৌমিকে বোঝাতে পারছিল না যে তাতাই-এর এই অ্যাকাডেমিতে চান্স পাওয়াটা সৌমির স্বপ্নে দেখা তাতাই-এর আইআইটিতে অ্যাডমিশনের মতোই স্বপ্নপূরণের সিঁড়িতে পা ফেলা। ছেলেটা নিজের বাড়ি ভালবাসার মানুষদের ছেড়ে অচেনা পরিবেশে কী করে থাকবে সেটা ভাবলেই অনিমেষেরও শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাতাই অথবা সৌমি কারো কাছেই ও নিজের দুর্বলতাটা প্রকাশ করতে পারবে না। তাই নিজের আবেগকে যতটা সম্ভব আড়াল করে সৌমির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে স্বাভাবিক গলায় অনিমেষ বলে উঠল,

- “তোমার ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেও তো বাইরেই যেত। তখনও তোমার একই রকম কষ্ট হতো। তাই প্লিজ তোমার মনের কষ্টটাকে চাপা দিতে ওর সাকসেসটাকে সেলিব্রেট করো। ভুলে যেওনা দেশে সফল ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হাজারে একজন হয় কিন্তু সফল প্লেয়ার হাতে গোনা। কয়েক লাখে একজন। ইউ শুড বি প্রাউড অফ ইওর সন। বাই দ্য ওয়ে, নবাব পুত্তুর কি এখনো ঘুমোচ্ছে?

অনিমেষের শেষ প্রশ্নটায় পরিবেশের থমথমে ভাবটা যেন কাটতে শুরু করল। ওদের দু’জনেরই মনের ভেতর জমে থাকা বরফ ধীরে ধীরে গলতে শুরু করল। ওদের স্বামী-স্ত্রীর কথোপকথনে ফিরে এলো রোজকার পরিচিত সুর।

- “আমড়া গাছে কি আর আম হয়? তোমারই তো ছেলে। নাম্বার ওয়ান ল্যাদখোর। কাল শোওয়ার আগেই বলেছে রোব্বারে সকাল দশটায় হয়।”

- “বাবার নয় মায়ের মতো বলো। আমরা রোজ সাড়ে চারটেয় বেরিয়ে গেলেই তো তুমি সাতটা পর্যন্ত….”

- “হ্যাঁ গো। বাবাকে সকাল পাঁচটায় চা’টা তো…..”

- “থামলে কেন? বাকী কথাটা মনের ভেতর না রেখে বলেই ফেলো। চা’টা আমার বাবা করে দেয় না, তাই তো?

- “বাজে কথা বোলো না। আমি মোটেও সেটা বলতে চাইনি। বাজে না বকে একটা কাজের কথা বলো তো। ওই অ্যাকাডেমিতে শুধুই খেলাধুলো হবে নাকি পড়াশুনাও?”

- “না না, ওরা স্কুলও করবে। তবে মূল ফোকাসটা ফুটবলে। জানো সৌমি, বুকে পাথর চাপিয়ে তাতাইকে যেদিন দুর্গাপুরের অ্যাকাডেমিতে ছেড়ে আসবো সেদিন আমার মতো সুখী মানুষ পৃথিবীতে আর কেউ হবে না। আমি জানি, সেদিনও তুমি কাঁদবে। কিন্তু তোমার সেদিনের চোখের জলে যে গর্বের উষ্ণতাও মিশে থাকবে আমি নিশ্চিত।”

ওদের বকবকানির আড়ালে ঘড়ির কাঁটা কখন যে আটটার ঘর ছুঁয়েছে বুঝতেই পারেনি কেউই। ঘড়িতে চোখ পড়তেই সৌমি উঠে গিয়ে বাজারের থলে অনিমেষের হাতে ধরিয়ে হুকুম জারি করল,

- “আজ মাটন’টা একটু বেশী করেই এনো। ছুটির দিনে তোমার ছেলের দু’বেলাতেই মাটন হলে ভাল হয়।”

সংক্ষেপে “হুম” বলে থলে হাতে বাজারের পথে পা বাড়ালো অনিমেষ।

অনিমেষ গতকালই তাতাইকে সারপ্রাইজটা দেবে ভেবেছিল। কিন্তু বাড়ি ফিরতেই রাত দশটা বেজে গেল। ততক্ষণে তাতাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আন্ডার সেভেন্টিন ওয়ার্লড কাপের ফাইনাল ম্যাচের টিকিট দুটো সৌমিকে দেখিয়ে তাতাইকে বলতে বারণ করেছিল। সারপ্রাইজটা অনিমেষ নিজেই দিতে চায়। এবারের আন্ডার সেভেন্টিন ওয়ার্ল্ড কাপের শুরু থেকে প্রায় সমস্ত ম্যাচই দেখছে বাপ ব্যাটায় মিলে। ইউএসএর সঙ্গে ভারতের প্রথম ম্যাচে কোমল নামের সোনালী ডাই করা ঝাঁকড়া চুলের ছোটখাটো রোগা পাতলা চেহারার স্ট্রাইকারটাকে ওয়ান ইজটু ওয়ানে বিপক্ষের দীর্ঘদেহী তাগড়াই চেহারার ডিফেন্ডারদের কাছে বারবার আটকে যেতে দেখে তাতাই বলেই ফেলেছিল,

- “জানো পাপা, ওই স্ট্রাইকারটার জায়গায় আমি থাকলে…..”

- “কী করতিস?”

টিভিতে ভারতের ম্যাচ দেখতে দেখতে তাতাইয়ের চোখে মুখে বডি ল্যাঙ্গুয়েজে অদ্ভুত উত্তেজনা অবাক হয়ে লক্ষ্য করছিল অনিমেষ। টিভিতে ভারতের ক্ষুদেগুলোর সঙ্গে ও নিজেও যেন দৌড়ে বেড়াচ্ছে সবুজ ঘাসের বুকে। তন্ময় হয়ে খেলা দেখতে দেখতে পাপার দিকে না তাকিয়েই তাতাই উত্তর দিয়েছিল,

- “ওই লং স্ট্রাইডের লম্বা লম্বা ডিফেন্ডারগুলোর এগেইনস্টে ওর মতো বারবার উইং দিয়ে দৌড়ানোর চেষ্টা না করে কাট করে ভেতরে ঢুকতাম। ঠিক যেমন করে মেসি……”

সেই দিনই অনিমেষ ঠিক করেছিল ফাইনালের দুটো টিকিট ও জোগাড় করবেই। বাপ ব্যাটায় স্টেডিয়ামে বসে দেখবে ওই ঐতিহাসিক ম্যাচটা।

বাজারের থলেটা সৌমির হাতে ধরিয়ে অনিমেষ জিজ্ঞেস করল,

- “কী গো, নবাবপুত্তুরের ঘুম ভাঙলো?

- “অনেক আগেই উঠেছি। কী বলবে বলো?”

সদ্য ঘুম ভাঙা চোখ কচলিয়ে আড়মোড়া ভেঙে তাতাই উত্তর দিতেই অনিমেষ ঘাড় ঘুড়িয়ে পেছনে তাকালো। কখন যে তাতাই পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালও করেনি। ছেলের হাত ধরে টানতে টানতে নিজের ঘরে এসে আলমারি থেকে ফাইনাল ম্যাচের টিকিট দুটো ওর হাতে ধরাতেই তাতাই-এর দু’চোখে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। অনিমেষকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে উত্তেজনায় চেঁচিয়ে ওঠে তাতাই,

- “লাভ ইউ পাপা! ইউ নো, টু থাউজেন্ড ফাইভ, আন্ডার টোয়েনটি ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল ইন নেদারল্যান্ডস। এই রকমই একটা ফাইনাল ম্যাচে নাইজেরিয়ার দৈত্যাকার চেহারার ইউথ প্লেয়ারদের ম্যাজিকাল লেফ্ট ফুটে নাস্তানাবুদ করে এক রোগা পাতলা চেহারার আর্জেনটাইন পুরো ফুটবল ওয়ার্ল্ডকে জানিয়ে দিয়েছিল ওয়ান এইট্টিন ইয়ারস ওয়ান্ডার বয় লিওনেল মেসি হ্যাজ অ্যারাইভড টু কনকার দ্য ফুটবল ওয়ার্ল্ড ….”

ছয়

পাপা আর মম তাতাইকে অ্যাকাডেমির হোস্টেলে ছেড়ে কলকাতার পথে রওনা দিয়েছে প্রায় ঘণ্টা খানেক হয়ে গেল। ওদের গাড়িটা অ্যাকাডেমির মেইন গেট পেরিয়ে সামনের রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে যেতেই প্রথম খানিকক্ষণ খুব কান্না পেলো ওর। কিন্তু যখনই মনে পড়ল ওকে ঘিরে পাপার স্বপ্ন আর সেই স্বপ্নকে সাকার করতে মমের আত্মত্যাগ, তখন আর তাতাই-এর কাঁদতে ইচ্ছে হলনা। ওর মনে হচ্ছে এই একদিনেই হঠাত করেই ও যেন অনেকটাই বড় হয়ে গেছে। নিজের স্বপ্নের উড়ানে পাপা আর মম যেন ওর দুই ডানা। ও জানে, কাক শালিকের মত নয়, পাপা চায় তাতাই-এর উড়ান ছুঁয়ে যাক মেঘের কোলে ভাসতে থাকা উদ্ধত বাজপাখির ডানা।

অ্যাকাডেমিতে তাতাইদের একদম টাইট রুটিন। শ্বাস প্রশ্বাস নেওয়াটাও যেন ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। রাত সাড়ে আটটায় ডিনার সেরে ঠিক ন’টায় শুতে যাওয়া। লম্বাটে ডর্মেটরি রুমে দুটো সারিতে মোট দশটা চৌকি। চৌকির পাশেই একটা করে আলমারি টেবিল আর চেয়ার। ডর্মেটরির দেওয়ালগুলোতে খুঁজলে পৃথিবীর সব মহাদেশেরই সমস্ত স্টার ফুটবলারের ছবি কোথাও না কোথাও পাওয়া যাবেই। সেখানে অনায়াসে সিআর সেভেনের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সহবস্থান করে সুনীল ছেত্রী। তাতাইদের আন্ডার সিক্সটিন এই ব্যাচে অধিকাংশই বাঙালি হলেও বিহার ঝাড়খণ্ড অথবা ওড়িশা থেকেও দু’চার জন আছে। তাতাইদের ডর্মেটরিতে অবশ্য সকলেই বাঙালি। তার মধ্যে প্রথম দিনেই বীরভূমের হরেন মান্ডি আর বর্ধমানের সুশোভন বসুর সঙ্গে তাতাই-এর বেশ ভালই বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।

আধ ঘণ্টার যোগা সেশন সেরে সকাল ছ’টার মধ্যে নেহেরু স্টেডিয়ামের ট্রেনিং-এ পৌঁছানোর জন্যে ভোর সাড়ে চারটেয় ঘুম থেকে উঠতে হবে। তাছাড়া কলকাতা থেকে এতটা পথ গাড়িতে এসে পরিশ্রান্তও হয়ে গেছে। নতুন জায়গা নতুন পরিবেশ তবুও তাতাই-এর ক্লান্ত চোখে ঘুম নেমে এলো সহজেই।

গতকাল বিকেলবেলায় অ্যাকাডেমিতে পৌঁছেই অ্যাডমিন্সট্রেটর তাতাই-এর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল প্রোগ্রাম চার্ট। সকাল সাড়ে চারটেয় ঘুম থেকে উঠে সবাইকে রেডি হয়ে এসে পাঁচটায় পৌঁছতে হবে যোগা সেন্টারে। ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর মহেশ যোশীর তত্ত্বাবধানে আধ ঘণ্টা যোগা সেশন সেরে টিম বাসে করে সোজা নেহরু স্টেডিয়াম। সেখানে অ্যাকাডেমির চিফ কোচে ডগলাস দ্য সিলভার আধ ঘণ্টার থিওরিটিক্যাল ক্লাসের পর আবার মহেশ স্যারের তত্ত্বাবধানে এক ঘণ্টার ফিজিক্যাল ফিটনেস ট্রেনিং-এর পর দুই সহকারী কোচ দুলাল স্যার আর মৃদুল স্যারের কড়া নজরে দু’দলে ভাগ হয়ে দেড় ঘণ্টার ম্যাচ প্র্যাকটিস। ন’টায় প্র্যাকটিস সেরে সোজা অ্যাকাডেমির হোস্টেলে ফেরা। স্নান ব্রেকফাস্ট সেরে আবার বাসে করে সোজা স্কুল। ডিএসপি স্কুলে ক্লাস শুরু সাড়ে দশটা থেকে। অ্যাকাডেমির ছেলেদের জন্যে লাঞ্চের ব্যবস্থা স্কুলেই। চারটেয় স্কুল ছুটি। আবার সাড়ে চারটে থেকে ছ’টা পর্যন্ত ফিজিক্যাল ট্রেনিং আর ম্যাচ প্র্যাকটিস। প্র্যাকটিসের পরে মাঠেই হালকা টিফিন সেরে আবার হোস্টেলে ফেরা। ডিনারের আগে পর্যন্ত সেল্ফ স্টাডি অথবা রিল্যাক্সেশন। এই সময়টুকু বাচ্চারা কী করবে সেই বিষয়ে অ্যাকাডেমি অ্যাডমিন্সট্রেশনের কোনো বাঁধাধরা নিয়মাবলী না থাকলেও সৌমি পইপই করে তাতাইকে বলে গেছে ওই সময়টুকু যেন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা না দিয়ে একটু পড়াশুনো করে। তাতাই ওর মমকে কথা দিয়েছে ক্লাস নাইনে যতটা সম্ভব ভাল রেজাল্ট করার চেষ্টা ও করবে।

প্রথম প্রথম দুর্গাপুরের অসহ্য গরমে কাহিল হয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল তাতাই। তাছাড়া গরমকালের রাতে বাড়িতে এসিতে শোওয়ার অভ্যাসটাও ওর হোস্টেলের ডর্মেটরিতে সবচেয়ে বড় সমস্যার কারণ হচ্ছিল। সারাদিনের কড়া রুটিনের পরে রাতেও ওর ঠিকঠাক ঘুম হচ্ছিল না। প্র্যাকটিসেও কেমন যেন ঢিলেঢালা ভাব। তাতাই-এর মধ্যে সেই যোশের অভাব লক্ষ্য করে একদিন ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর মহেশ স্যার বলেই ফেললেন,

- “ক্যা হুয়া সৌম্য? ইউ আর লুকিং ভেরি টায়ার্ড? হোয়াট হ্যাপেন্ড? তবিয়ৎ তো ঠিক হ্যায়?”

- “নাথিং হ্যাপেন্ড স্যার! ম্যায় ঠিক হুঁ! জাস্ট ফিলিং লিটল বিট টায়ার্ড?”

“হোয়াট? টায়ার্ড? ইস উমর মেঁ?” তাতাই-এর কথা শুনে আঁতকে উঠল ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর মহেশ যোশী। মহেশ স্যারের কথা শুনে তাতাই আমতা আমতা করে বলল,

- “ইধর বহত গরমি স্যার। অউর হামারা ডর্মেটরিমেঁ এসি ভি নহি। ইসি লিয়ে রাতোঁ পে ঠিকঠাক নিন্দ ভি….”

“ওহ মাই গড” বলে কিছুক্ষণ নিস্পলক তাতাই-এর দিকে তাকিয়ে ওকে ইশারায় নিজের কাছে ডাকলেন মহেশ যোশী। ওর মাথার চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে শান্ত স্বরে বললেন,

- “সৌম্য ইউ আর বিয়িং ট্রেন্ড টু বি আ ফুটবলার অ্যান্ড ইউ শুড নো ইটস নাথিং বাট আ ব্যাটেল ফিল্ড। ডু ইউ নো পেলে? অর রোনাল্ডো? ইভন আওয়ার বিজয়ন? অল অফ দেম ওয়্যার বর্ন অ্যান্ড ব্রটআপ ইন ডিফারেন্ট স্লামস অফ ডিফারেন্ট কান্ট্রিস। জিনেদিন জিদান কো জানতে হো? উনকা পিতা আপনা দেশ সে রিফিউজি হো কে ফ্রান্স পে আয়ে থে। জর্জ উইয়া, রজার মিল্লা….. লম্বি লিস্ট মাই সন। জাস্ট রিমেম্বার ইউ আর ইন আ ব্যাটেল ফিল্ড। হর তারিকা কা হার্ডেলস কে লিয়ে তুমে প্রিপেয়ার হোনা পড়েগা। স্কর্চিং টেম্পারেচার ইন দুর্গাপুর ইজ আ ভেরি পুওর এক্সকিউজ। ইফ অল বয়েজ ক্যান হ্যান্ডেল ইট দেন হোয়াই নট ইউ? ইফ ইউ কান্ট কোপ আপ উইথ ইট দেন আই মাস্ট সে ইউ আর নট ফিট এনাফ টু বিকাম আ ফুটবলার….”

মহেশ স্যারের কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণের জন্যে যেন থম মেরে গেল তাতাই। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল বালক সংঘের সেই টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচের শেষ লগ্নে ও যখন পেনাল্টি মারতে যাচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে বিপক্ষের গোলপোস্টের পেছনে দাঁড়ানো পাপার মুখটা। ঠিক সেদিনের মতই শক্ত হয়ে উঠল ওর চোয়াল দুটো। নিজেকে সামলে নিয়ে “সরি স্যার! কাল সে অউর অ্যায়সা নহি হোগা” বলেই নিজের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো।

মাকে কথা দিয়েছিল তাতাই। কিন্তু সারাদিনের প্র্যাকটিস আর স্কুল সেরে সন্ধেবেলার এই ঘণ্টা দুয়েক সময় ওর আজ কিছুতেই বই মুখে বসতে ইচ্ছে করছে না। বাড়িতে থাকতে পাপা মম দাদাই স্কুলের আর কোচিং-এর বন্ধুদের মধ্যেই আটকে ছিল ওর জগত। সেই জগতটার সঙ্গে এই অ্যাকাডেমির জগতের কোনই যেন মিল নেই। তাতাই-এর ইচ্ছে আজ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করবে। গল্প করবে বলার থেকেও বলা ভাল ওদের গল্প শুনবে। দু’বেলাতেই থালা ভর্তি ভাত জোটাটাও যে কারো কাছে উৎসবের কারণ হতে পারে এই অ্যাকাডেমিতে না এলে তাতাই-এর সুদূর কল্পনাতেও আসতো না। ওর রুম মেট হরেন মান্ডির পড়াশুনো করতে একদম ভাল লাগে না। ও নাকি রোজ স্কুলে যেতো শুধুই মিড ডে মিলের টানে। আর রাতে পেট ভরাতো জঙ্গল থেকে মায়ের তুলে আনা মেটে আলু সেদ্ধ খেয়ে। রবিবারের ছুটির দিনটা এলেই মন খারাপ। দুবেলাই ওই মেটে আলু সেদ্ধ দিয়ে পেট ভরানো। হরেনের ভাষাতেই বললে ওর বাপটা মরেছিল হাতির পায়ে চাপা পড়ে। বাপের মুখটা ওর মনেও পড়ে না ভাল করে। মা বছরে তিন চার মাস ইঁট ভাটায় কাজ করে সেই পয়সায় সম্বৎসরের খোরাকি। পেট খালি থাকলে ওর কিচ্ছু ভাল লাগে না। কিছুতেই মন বসে না। তখন শুধু ইচ্ছে করে বল পায়ে দৌড়তে। আর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বলে লাথি মারতে। তাতাই-এর গুলেদার মতই ওর’ও সুনীলদা আছে। সুনীলদার হাত ধরেই ও বীরভূম জেলা দলে ঢুকেছে, ডাক পেয়েছে সাব জুনিয়র বেঙ্গল টিমের ট্রায়ালে। এখন হরেন খুব খুশী। খিদে পাওয়ার আগেই জুটে যায় খাবার। আগে বোন মোরগ আর মেটে ইঁদুর ছাড়া আর কিছুর মাংস খায়নি ও। গত রবিবার লাঞ্চে অ্যাকাডেমিতে প্রথমবার মাটন খেয়ে ডাইনিং হলে ওর পাশে বসা তাতাইকে ফিসফিস করে হরেন জিজ্ঞেস করেছিল,

- “হ্যাঁরে, ইটা কিসের মাংস বটেক?”

- “মাটন, আই মিন খাসি অথবা পাঁঠা”

তাতাই-এর উত্তর শুনে হতভম্ব হরেন “সেইটা আবার কী বটেক?” বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাতেই “ছাগল রে ছাগল” বলেই মুচকি হেসে খাওয়াতে মন দিয়েছিল তাতাই। মাটন তাতাই-এর হট ফেভারিট। মায়ের মত রগরগে মশলাদার রান্না না হলেও মটন বলে কথা। কম তেল মশলায় রান্না করা পাতলা ঝোলও তাতাই-এর অমৃত মনে হয়েছিল। মন দিয়ে খেতে খেতেই তাতাই শুনলো হরেন ফিসফিস করে বলছে,

- “হেব্বি টেস মাইরি! ইশ্, মা’টাও যদি ইখানে রইত কী মজা করেই না খেতো…..”

হরেনের মায়ের কথা ভেবে সেদিন তাতাই-এর খুব খারাপ লেগেছিল। কিন্তু হরেনকে দেখে ও অবাক হয়ে গেছিল। ওর অভাব আর কষ্টগুলোকে কী অবলীলায় ও শেয়ার করে। তাতাই ওর জায়গায় থাকলে কিছুতেই এতটা অকপট হতে পারত না। হরেনের এই অদ্ভুত সারল্যই সম্ভবতঃ অর্থনৈতিক মানদন্ডে একেবারে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করা তাতাইকে ওর আরও কাছাকাছি এনে দিয়েছে। ওকে দেখেই তাতাই বুঝতে শুরু করেছে দারিদ্র শুধুই মানুষের অনিচ্ছাকৃত অর্থনৈতিক অবস্থান মাত্র কখনই তাদের লজ্জা নয়। আর এই হরেন যখন রাইট উইং ধরে দৌড়তে দৌড়তেই বক্সে দাঁড়ানো তাতাইকে লক্ষ্য করে ভাসিয়ে দেয় ক্রশ তখন আর দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতার বিলাস বহুল ফ্ল্যাটের এয়ারকন্ডিশন্ড বেডরুমের সঙ্গে কোনো ফারাকই থাকে না ঝাড়খন্ডের জঙ্গল ঘেঁষা বীরভূমের এক অখ্যাত গ্রামের চাঁদের আলোয় মাখামাখি দাওয়ার লাগোয়া কুঁড়ে ঘরের।

সাত

এই তিন মাসেই অ্যাকাডেমিতে ভালই মানিয়ে নিয়েছে তাতাই। দুপুরের স্কুল আর সকাল বিকেল প্র্যাকটিসের পর রাতে ডর্মেটরির বিছানায় পিঠ ছোঁয়ালেই আজকাল ওর চোখে ঘুম নেমে আসে। আজকাল আর এসি’র অভাবও অনুভব করে না। প্রতি মাসের দুটো করে রবিবার পাপা আর মম নিয়ম করে ওর সাথে দেখা করতে আসে। গত মাসে তো একটা শনিবারে এসেছিল। সঙ্গে দাদানকে নিয়ে। রাতে ওরা হোটেলে ছিল। পরের দিন রোব্বারে প্র্যকটিস স্কুল কিছুই থাকে না বলে হোস্টেল সুপারকে বলে পাপা ওকেও হোটেলে এনে রেখেছিল। রাতে রেস্তোরাঁয় তাতাই-এর হাতে মেনুকার্ড তুলে দিয়ে মম বলেছিল – “আজ রাতে তোর পছন্দের ডিশ..”। মেনুকার্ডে মাটন রেজালা দেখেও তাতাই অনেক কষ্টে নিজেকে কন্ট্রোল করে স্টার্টারে অর্ডার করেছিল চিকেন স্যুপ উইথ রোস্টেড পাঁপড় আর মেইন কোর্সে চাপাটি মিক্সড সবজি আর চিকেন তন্দুরী উইদাউট স্পাইস। ওর ফুড হ্যাবিটের এই রকম চেঞ্জ দেখে ভীষণ অবাক হয়েছিল মম। কিন্তু তাতাই এখন জানে ক্যালোরি মেপে খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা। অ্যাকাডেমির ডায়াটেশিয়ান ওদের মাঝে মাঝেই ক্লাস নেন। ওজন মাপেন। ফিট থাকার জন্যে কী খেতে অথবা কী কী অ্যাভয়েড করতে হবে তা আজ তাতাই জানে। শুধু তাতাই’ই নয় আজকাল মিলে মাংস থাকলে হরেনও আর এক্সাইটেড হয়ে বেশী খেয়ে ফেল না। ওদের লাঞ্চে দু’দিন চিকেন দু’দিন মাছ আর দু’দিন ডিম। শুধু রোব্বারে মাটন। মম মাটন রান্না করলে সারা বাড়িটা যেমন গন্ধে ম ম করত। এখানকার মাটনে সেই গন্ধ নেই। তাতাই তো এখানকার মাটন চিকেন মাছ ডিম এমনকি মিক্সড ভেজিটেবল কারিতেও একই স্বাদ আর গন্ধ পায়।

গত তিন মাস ধরে শুধু ফিজিক্যাল ফিটনেস ট্রেনিং আর দু’দলে ভাগ হয়ে নিজেদের মধ্যেই প্র্যাকটিস ম্যাচ চলছে। তাতাই-এর ভীষণ একঘেয়ে লাগছে। গুলেদার কোচিং সেন্টারের দিনগুলো খুব মনে পড়ছে। তখন মাঝেমাঝেই অন্যান্য কোচিং সেন্টারের সঙ্গে ফ্রেন্ডলি ম্যাচ হতো। সেই সব ম্যাচের পরে চলতো গুলেদার পোস্ট মর্টেম। গুলেদা একেবারে ছক কষে আর হাতে কলমে ওদের বুঝিয়ে দিত কোন বলটা তাতাই ডান পা থেকে বাঁ’পায়ে নিতে গিয়ে সময় নষ্ট করে গোল পায়নি অথবা সন্দীপ যদি নিজে শট না নিয়ে বলটা ডান দিক দিয়ে বক্সে উঠে আসা সুমনকে বাড়াতো তাহলে একেবারে ওপেন নেট। আর আন্ডার হাইট টুর্নামেন্টগুলো তো ছিল তাতাই সন্দীপদের সঙ্গে সঙ্গে গুলেদারও প্রেসটিজ ফাইট।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি চলছে। বর্ষাও নেমে গেছে। গরমের সেই ঝলসানিটা আর নেই। আজ বিকেলের প্র্যাকটিসের পর হঠাতই যেন এক ঝলক বৃষ্টিভেজা ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগলো তাতাই-এর মুখে। অ্যাকাডেমির চিফ কোচ ডগলাস স্যার জানালেন গোয়ায় আমন্ত্রণমূলক অল ইন্ডিয়া আন্ডার এইট্টিন ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলতে যাবে ওদের অ্যাকাডেমি। ওখানে বেঙ্গল থেকে ইস্টবেঙ্গল ফুটবল অ্যাকাডেমি ছাড়াও অংশগ্রহণ করবে চার্চিল ব্রাদার্স ভাস্কো স্পোর্টিং অথবা পুনে এফসি’র মতো ক্লাবের জুনিয়ার টিমও। তাতাইদের আন্ডার সিক্সটিন টিম থেকে সিলেক্ট হয়েছে মাত্র তিন জন। ফরোয়ার্ডে তাতাই হরেন মান্ডি আর মিডফিল্ডে সুশোভন বসু। দলের বাকী ছেলেরা আন্ডার এইট্টিন গ্রুপের। আগস্টের চার তারিখ থেকে টুর্নামেন্ট শুরু। প্রায় কুড়ি দিনের টুর্নামেন্ট। প্রথমে চারটে করে টিম নিয়ে গ্রুপ স্টেজের খেলা। প্রতিটি গ্রুপ থেকে দুটো করে টিম যাবে পরের নক-আউট স্টেজে। তাতাইদের প্রথম ম্যাচ ভাস্কো স্পোর্টস ক্লাবের সঙ্গে ছ’তারিখে। ওদের গ্রুপের আর দুটো টিমের মধ্যে একটা কেরলের আর একটা মনিপুরের। ডগলাস স্যার জানিয়ে দিলেন আগস্টের দু’তারিখের রাতে হাওড়া থেকে অমরাবতী এক্সপ্রেসে রওনা দেবে আর চার তারিখ বিকেলে পৌঁছাবে ভাস্কো দ্য গামা স্টেশনে। সামনের দশ পনেরোটা দিন সিলেক্টেড টিমের সবাই একসঙ্গে প্র্যাকটিস করবে। বিশেষ করে আন্ডার এইট্টিন ছেলেদের সঙ্গে জুনিয়র টিমের তিন জনের বোঝাপড়াটা ঝালিয়ে নেওয়াটা ভীষণ জরুরি। জুলাইয়ের তিরিশ পর্যন্ত প্র্যাকটিস করে কলকাতা অথবা আশেপাশের ছেলেরা দু’তিন দিনের জন্যে বাড়ি যেতে পারে। বাকীরা এখান থেকেই দু’তারিখ সকালে বের হবে। সন্ধে সাতটায় সবাই মিট করবে মোহনবাগান টেন্টে। সেখান থেকে একসঙ্গে পুরো টিম যাবে হাওড়া স্টেশনে।

টুর্নামেন্টের সিলেক্টেড টিমের আঠেরো জনকে নিয়ে স্পেশাল ট্রেনিং করাচ্ছেন চিফ কোচ ডগলাস দ্য সিলভা। টিমে তিন গোলকিপার ছাড়াও ছ’জন ডিফেন্ডার আর পাঁচজন মিডফিল্ডার থাকলেও ফরোয়ার্ডে তাতাইকে নিয়ে মোট চারজন। তার মধ্যে আবার কোচ তাতাইকে ফরোয়ার্ডে খেলালেও ওর গত তিনমাসের পার্টনার হরেনকে সুশোভনের সঙ্গে মিডফিল্ডে খেলাচ্ছেন। ফরোয়ার্ডে ঝাড়খন্ডের সুরেশ যাদব আর মোহনবাগানের হয়ে জুনিয়র আইলিগ খেলা মহম্মদ খালেদ’ই যে ডগলাস স্যারের প্রথম পছন্দ সেটা প্র্যাকটিসে তাতাই ভালই বুঝছে। ডগলাসস্যার গোয়ার টুর্নামেন্টে টিমকে যে ৪-৪-২ ফর্ম্যাটে খেলাবেন সেটা বলেই দিয়েছেন। আর সেক্ষেত্রে দুই ফরোয়ার্ড হিসেবে যে সুরেশ আর খালেদ’ই কোচের প্রথম পছন্দ সেটা তাতাই জানে। তবে ওর বিশ্বাস সুযোগ ওর সামনেও আসবে। আর সুযোগ এলে বাকী দু’জনের থেকে হাইট ছাড়া আর কিছুতেই ও যে পিছিয়ে নেই সেটা তাতাই প্রমান করবেই। হাইটটা ভাল বলে সুরেশ এরিয়াল বলে ভাল এফেক্টিভ কিন্ত ওয়ান ইজটু ওয়ানে তাতাই-এর মতো বলে বলে ডিফেন্ডারকে ডজ করে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ওর নেই। তবে খালেদদা বেশ ভাল। তাতাই-এর সঙ্গে বেশ বোঝাপড়াও হয়েছে। দু’পায়েই ভাল শট আছে। গতিও মন্দ নয়। তবে ওরা কেউই হরেনের মত নয়। হরেন স্বভাব লাজুক কিন্তু বল পায়ে পড়লেই বেহিসেবী উদ্দাম। অফুরন্ত দম। তাতাই-এর মাঝেমাঝেই মনে হয় স্মার্টফোনের স্পেয়ার ব্যাটারীর মতো হরেনেরও বোধহয় স্পেয়ার লাংস আছে। ম্যাচের শেষ দশ মিনিটেও যে কী করে একই উদ্দমে কেউ দৌড়ে যেতে পারে তাতাই বুঝতেই পারেনা। হরেন পাশে থাকলে তাতাই চোখ বন্ধ করে বিপক্ষের বক্সে পজিশন নিতে পারে। ও জানে হরেনের থ্রু-পাশ ঠিক খুঁজে নেবে ওর পা অথবা হরেনও জানে তাতাই-এর বাঁ’পায়ের সুক্ষ্ণ টাচে বল ওর পায়ে মানেই বিপক্ষের গোলকিপারের অসহায়তা। ওদের দু’জনের জুটিটা ভেঙে যাওয়াতে তাতাই-এর মনটা ভীষণ খারাপ।

তিরিশে জুলাই। বিকেলের দিকেই অনিমেষ আর সৌমি পৌঁছে গেছে অ্যাকাডেমিতে। তাতাইরা তখন ওদের ডগলাসস্যারের ফিনিশিং টাচ নিতে ব্যস্ত। অ্যাকাডেমিটা কেমন যেন নিস্তব্ধ আর খাঁ খাঁ করছে। সব বাচ্চাই হয় স্কুলে নয়তো ট্রেনিং-এ। শুধু অ্যাকাডেমির অ্যাডমিনস্ট্রেটিভ বিল্ডিং-এ কিছু মানুষের আনাগোনা। অফিসে কথা বলে জানা গেল তাতাইদের ফিরতে ফিরতে ছ’টা বেজে যাবে। এখন সবে পাঁচটা। এখনো ঘণ্টাখানেক কাটাতে হবে। ওদের আবার তাতাইকে নিয়ে আজই কলকাতায় ফেরা আছে। এতটা রাস্তা। তাতাই প্র্যাকটিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে দিতে মিনিমাম সাতটা তো বাজবেই। বাড়ি ফিরতে নির্ঘাৎ রাত এগারোটা। এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই অনিমেষ আর সৌমি ঢুকে গেল অ্যাডমিনস্ট্রেটিভ বিল্ডিং-এ। অ্যাডমিনস্ট্রেটিভ অফিসারের চেম্বারের দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো “কাম ইন”। অনিমেষ আর সৌমি সৌজন্যমূলক নমস্কার জানাতেই অ্যাডমিনস্ট্রেটিভ অফিসার টেবিলের উল্টোদিকের দুটো চেয়ার দেখিয়ে ওদের বসতে বলে বলে উঠলেন,

- “নমস্কার! আমি সৌরভ বসু। আমি বোধহয় আপনাদের চিনতে পারছি। পেরেন্টস অফ সৌম্য সেনগুপ্ত, রাইট?”

- “একদম সঠিক বলেছেন। আমি অনিমেষ অ্যান্ড শি ইজ সৌমি। আমরা বোধহয় আগে একবারই মিট করেছিলাম। তাও মেরেকেটে টেন টু ফিফটিন মিনিটস হবে। তবুও এক দেখাতেই আমাদের চিনে নিলেন দেখে অবাকই হলাম।”

বিস্মিত অনিমেষের কথার রেশ ধরেই সৌরভ মুচকি হেসে উত্তর দিলেন,

- “অনিমেষবাবু, ভারতবর্ষে ফুটবলটা ছোটলোকের খেলা। সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত পরিবারের ছেলেরা ফুটবল নয় টেনিস অথবা ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে যায়। টেনিস অথবা ক্রিকেট হল স্ট্যাটাস সিম্বল। সেখানে ফুটবল? ছ্যাঃ! বিলিভ মি, আপনাদের মতো সোশাইটির কোনো পেরেন্টসও যে ছেলের ফুটবলার হওয়ার ড্রিমকে ফ্রুটফুল করতেও ঝাপাতে পারেন আপনাদের না দেখলে বিশ্বাস করা ভীষণ কঠিন। তাই আপনাদের মনে রাখাটা আর আশ্চর্য কী?”

সৌরভ বসুর কথাগুলো শুনে মনেমনে খুশিই হল ওরা দু’জনেই। কিন্তু সৌমির মনে কিছু খটকা রয়েই গেছে। সেগুলোকে একটু নেড়েঘেঁটে দেখতেই বোধহয় সৌমি মুখ খুলল,

- “এনি ওয়ে মিঃ বাসু, থ্যাংস ফর কমপ্লিমেন্টিং আস। বাট আই হ্যাভ ওয়ান কনফিউসন। আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখছিলাম। এই অ্যাকাডেমিগুলো থেকে পাস আউটরা ঠিক কোথায় যায় অথবা কতটা উঁচুতে পৌঁছায় সেটা খুঁজেই পেলাম না। ইউ নো, উই ওয়ান্ট টু সি আওয়ার সন টাচিং দ্য স্কাই। এখানে থেকে কি সেটা সম্ভব? ওদের অল্টিমেট টার্গেট কি শেষমেষ সেই আইলিগ অথবা আইএসএল?”

- “ইন্ডিয়ান ফুটবল স্ট্রাকচারে সেটাই তো কাঞ্চনজঙ্ঘাই বলুন অথবা এভারেস্ট। আপনি কী ইওরোপিয়ান লিগের কথা ভাবছেন। সেগুলো তো ছেড়েই দিন এই ইনফ্রাস্ট্রাকচারে একটা জে-লিগের থেকেও আমরা কমপক্ষে বিশ বছর পিছিয়ে আছি।”

সৌরভ বসুর কথাগুলোতে একটু হতাশই হল সৌমি। তাতাইকে নিয়ে ওদের যে অনেক বড় স্বপ্ন। ওরা ফুটবলার হিসেবে তাতাইকে অনেক উঁচুতে দেখতে চায়। তাই কিছুটা মরীয়া হয়েই সৌমি জিজ্ঞেস করল,

- “তাহলে বলছেন যে ওই আইএসএল অথবা আই-লিগের বাইরে ভারতীয় ফুটবলারদের দেখার মতো কোনো স্বপ্নও আর অবশিষ্ট নেই?”

- “কেন থাকবে না? তবে অফিসিয়ালি আমার এখানে বসে কিছু বলাটা ঠিক নয়। আপনাদের একটাই সাজেশন দিতে পারি। এই অ্যাকাডেমির চিফ কোচ ডগলাস দ্য সিলভার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। উনি আপনাদের ভাল গাইড করতে পারবেন।”

অনিমেষ আর সৌমি ধন্যবাদ জানিয়ে সৌরভ বসুর চেম্বার থেকে বেরনোর কয়েক মিনিট পরেই তাতাই ফিরলো। পাপা আর মম যে ওকে নিতে আসছে আগে থেকে জানতো। মিনিট পনেরোর মধ্যেই ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে গেল। সঙ্গে বন্ধু সুশোভনকে নিয়ে এসে তাতাই বলল,

- “পাপা, সুশোভনও আমাদের সঙ্গে যাবে। আমাদের ফেরার পথেই মেমারিতে ও নেমে যাবে।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, সিওর” বলে অনিমেষ ড্রাইভারের পাশের সিটে বসলো। পেছনের সিটে একপাশে মম আর অন্যপাশে সুশোভনকে রেখে মাঝখানে বসল তাতাই। মেঘলা আকাশ আর মাঝেমাঝে বিদ্যুতের ঝলকানিকে মাথায় নিয়েই ওদের গাড়ি চলতে শুরু করল। অ্যাকাডেমির গেট পেরিয়ে কিছুটা পথ যেতেই শুরু হলো অঝোর ধারায় বৃষ্টি। বৃষ্টিভেজা দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ের প্রশস্ত রাস্তার বুক চিরে কলকাতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ওদের গাড়ি।

আট

সন্ধে সাতটায় মোহনবাগান টেন্টে সবার আসার কথা থাকলেও অনিমেষ আর সৌমি তাতাইকে নিয়ে সাড়ে ছ’টার একটু আগেই পৌঁছে গেছে। মোহনবাগানের সিনিয়ার টিমের অধিকাংশই ততক্ষণে প্র্যাকটিস সেরে চলে গেছে। দু’চার জন শুধু টেন্টে বসে গুলতানি করছে। কিছু মাঝারি সারির কর্মকর্তাও রয়েছে ওদের সঙ্গে। উপস্থিত লোকজনের মধ্যে চেনা মুখ বলতে শুধু সিনিয়ার টিমের কোচ সঞ্জয় সেন আর ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন মিত্র। ওদের ঘিরে রয়েছে কিছু পার্ষদ। একটু ইতস্তত: করে অনিমেষ নিজেদের পরিচয় দিয়ে অঞ্জন মিত্রকে জিজ্ঞেস করতেই পাশের টেন্টটা দেখিয়ে উনি জানিয়ে দিলেন দুই সহকারী কোচের সঙ্গে অ্যাকাডেমির চিফ কোচ ডগলাস দ্য সিলভা ওখানে আছেন। ওদের সঙ্গেই দুর্গাপুর থেকে আসা টিমের কিছু প্লেয়ারও আছে। তাতাইরা সেই পথে পা বাড়াতেই উঠে এলেন অঞ্জন মিত্র। তাতাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

- “তোমার নাম সৌম্য, রাইট? আন্ডার সিক্সটিন থেকে গোয়াগামী দলে জায়গা পাওয়া তিন জনের একজন, তাইতো?”

মিষ্টি হেসে “হ্যাঁ স্যার” বলে ওঁর দিকে তাতাই তাকাতেই উনি বলে উঠলেন,

- “তোমার কথা ডগলাসের কাছে শুনেছি। জীবনের প্রথম বড় টুর্নামেন্ট খেলতে যাচ্ছ। জান লড়িয়ে দেবে। বেস্ট অফ লাক! তোমায় খুব তাড়াতাড়িই আমাদের সিনিয়ার টিমে দেখতে চাই।”

“থ্যাংক ইউ স্যার! আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট” বলেই তাতাই অনিমেষ আর সৌমির সঙ্গে পা বাড়াল পাশের টেন্টের দিকে।

হাওড়া স্টেশনে ট্রেন রাইট টাইমেই ছাড়ল। এস-৭ স্লিপার কোচে তাতাইদের টিমের আঠেরো জনের সঙ্গে একজন অ্যাকাডেমি অফিসিয়াল অনিল টুডু আর ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর মহেশ যোশীরও রিজার্ভেশন হয়েছে। দুই সহকারী কোচ মৃদুল ব্যানার্জী আর দুলাল ঘোষের সঙ্গে ওই একই ট্রেনের সেকেন্ড এসি কোচে যাচ্ছেন চিফ কোচ ডগলাস দ্য সিলভা। ওদের সঙ্গে একই কোচে আছেন অ্যাকাডেমির রেসিডেন্সিয়াল ফিজিসিয়ান ডাঃ সুমন বসুও। মোহনবাগান ক্লাব থেকে তিনজন কর্মকর্তাও যাবেন গোয়ায়। তবে তারা চার তারিখে ফ্লাইটে গিয়ে সরাসরি যোগ দেবে টিমের সঙ্গে।

আদিগন্ত প্রসারিত চিলকা হ্রদের ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে মেখে ট্রেন ব্রহ্মপুরে পৌঁছতে পৌঁছতেই সকাল সাড়ে আটটা। পেট খিদেয় চাঁইচুঁই করছে তাতাই-এর। কাল রাতে সাড়ে ন’টায় সবাই মিলে হাওড়া স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে ক্লাব টেন্টেই চিকেন কষা দিয়ে গোটা চারেক রুটি খেয়েছিল। ট্রেনে সারা রাতের ঝাঁকুনিতে কখন সব হজম হয়ে গেছে। ক্লাব টেন্ট থেকে রওনা হওয়ার আগে ওর হাতে গোটা দশেক পাঁচশোর আর বেশ কয়েকটা একশোর নোট দিয়ে পাপা বলেছিল,

- “এ’গুলো সাবধানে রেখে দে। কখন কী দরকার লাগে…..”

ব্রহ্মপুর স্টেশনে ট্রেন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। তাতাই ওর জন্যে বরাদ্দ সাইড আপার বার্থ থেকে নিচের সুশোভনের বার্থে নেমে এসেছে ট্রেন ভুবনেশ্বর পেরোতেই। ততক্ষণে হরেনও সেখানে এসে জুটেছে। ট্রেনের জানলার কাছে ঝুড়ি মাথায় সিঙারাওলা এসে হাঁক পাড়তেই খিদেটা যেন নতুন করে জানান দিলো তাতাইকে। ও একবার ভাবল পাপার দেওয়া টাকাগুলো কাজে লাগাবে। পরক্ষণেই ভাবল এতে যদি টুডুস্যার আর যোশীস্যার রেগে যায়। তাই চুপ করেই থাকলো। কিন্তু টুডুস্যার যেন অন্তর্যামীর মতো হাজির হলো এক মিষ্টিওলা আর একজন সিঙারাওলাকে নিয়ে। শালপাতায় করে ওদের সবার হাতে দু’পিস করে বড় বড় সাইজের গরম সিঙারা আর দু’পিস করে রসগোল্লা আসতেই হাসি ফুটল তাতাই-এর মুখে।

ট্রেন ওড়িশা পেরিয়ে অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলাম পৌঁছতে প্রায় এগারোটা বাজলো। ট্রেনের প্যান্ট্রি কারের লোক এসে লাঞ্চের অর্ডার নিয়ে গেলো। বলে গেল বিজয়নগরম পেরোনোর পর একটা নাগাদ লাঞ্চ সার্ভ করবে। লাঞ্চে টুডুস্যার সবার জন্যে আণ্ডা কারি মিল অর্ডার করতেই হরেনের মুখভার। তাতাই-এর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,

- “এই টুডুটা না এক নম্বর হারামি বটেক। চিকেন না বলে ডিমের অর্ডার দিলো..”

- “শালা পেটুক! চল গোয়া, প্রতিটা গোল পিছু আমি তোকে আমার পয়সায় এক প্লেট করে মাংস খাওয়াবো।”

তাতাই কথাগুলো বলে ওর মাথায় আলতো চাঁটি মারতেই উদাস সুরে হরেন বলে উঠলো,

- “তুর পয়সায় মাংস সাঁটানো মোর কপালে নাই রে। ডগলাসস্যার তুর পাশে আমায় কচু খেলাবে। আমি তো মাঝমাঠে……”

- “তুই তো আমাদের জিদান রে। মাঝমাঠ থেকেও….”

- “সেইটা কে বটেক?”

তাতাই-এর কথায় হরেনের বিস্মিত প্রশ্নে তাতাই সুশোভন সমেত বাকীরাও হেসে উঠল। এমনকি অনিল টুডু তো বটেই হাসি চাপতে পারলেন না গুরুগম্ভীর মহেশ যোশীও।

সারাদিনের জার্নি আর উদ্দাম আড্ডায় ক্লান্ত হয়ে ডিনার সেরে দশটার মধ্যেই শুয়ে পড়েছিল তাতাই। সকাল সকাল ঘুম ভাঙতেই প্রথমে টয়লেট গেল। প্রায় সবাই নিজের নিজের বার্থে ঘুমোচ্ছে। তাতাই-এর নিচের বার্থে গুটিসুটি মেরে অঘোরে ঘুমোচ্ছে সুশোভনও। পরনের বারমুডার পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখল এখন সাড়ে পাঁচটাও বাজেনি। সুশোভনের পায়ের কাছে বসে জানলাটা খুলে বাইরের চলন্ত গাছপালা সবুজ জমিতে চোখ রাখল তাতাই। বাইরের পরিবেশটা সবে নতুন সূর্যের লালচে ভাবটা কাটিয়ে হলদে আভা মাখতে শুরু করেছে। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের মাঝে হঠাত করেই যেন মাঝেমাঝেই মাথা তুলছে ছোটছোট রুক্ষ পাথুরে টিলা। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে বাংলার সাথে পরিবেশগত ভাবে কত আলাদা এই জায়গাগুলো। তাতাই মনেমনে ভাবে দাদান থাকলেই এখন ‘ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি’ নিয়ে স্পিচ দিতে শুরু করতো। দাদানের কথা মনে আসতেই তাতাই-এর মনে পড়ল কাল রাতে ডিনারের পর একটা নাম না জানা স্টেশনে ট্রেন থামতই ও ফোন করেছিল পাপাকে। ও একাএকা যাচ্ছে বলে মমের যে রাতে ঘুম হবে না সেটা তাতাই ভালোই জানে। একে ট্রেন চলার ঘ্যাড়ঘ্যাড়ে আওয়াজ তার ওপর আবার মোবাইলে টাওয়ারও নেই বললেই চলে। তাই ও ঠিক করল পরের যে স্টেশনেই ট্রেন থামবে যদি মোবাইলে টাওয়ার পায় মমকে ফোন করবে।

ট্রেন থামল একটা স্টেশনে। স্টেশনটার নাম হিন্দি আর ইংরেজিতে লেখা ‘হসপেট’। কিন্তু আরেকটা ভাষায় যা লেখা আছে সেটার জিলিপির প্যাঁচের প্যাটার্নটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে ট্রেনটা অন্ধ্র প্রদেশকে পেছনে ফেলে এসেছে। স্টেশনটা বেশ বড়সড়। তাতাই দেখল মোবাইলের টাওয়ারও পুরো আছে। গুগল সার্চ করে দেখল ওরা এখন কর্ণাটকে। প্রায় সাতটা বাজে। তাতাই মনে মনে ভাবে মম আর পাপা নিশ্চয় এখন ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে চা খাচ্ছে। মমের কথা চিন্তা করতে করতেই কখন যে মমের নম্বর ডায়াল করে ফোনটা নিজের কানে ছুঁইয়েছে তাতাই বুঝতেও পারেনি। ওর সম্বিত ফিরল মায়ের আওয়াজে,

- “কী রে তাতাই তোরা এখন কোথায়?”

- “হসপেট, কর্ণাটক…”

- “উড়িব্বাবা! হসপেট যে কর্ণাটকে তুই কী রে জানলি? ভূগোলে তো তুই একেবারে গোল্লা।”

- “হুঁ হুঁ বাবা, আমি সব জানি…..”

- “চুপ কর! পাপার মতো গুলবাজ হয়েছিস আজকাল। গুগল সার্চ করে দেখে….”

- “তুমি কী করে জানলে?”

- “তাতাই ভুলে যাস না তুই আমার পেটে হয়েছিস। আমি না…..”

মা ছেলের কথা চলতে চলতেই ট্রেন ছেড়ে দিলো। মোবাইল টাওয়ারের দাগ একটা একটা করে কমার সঙ্গে সঙ্গে আবার শুরু হল চলন্ত ট্রেনের ঘ্যাড়ঘ্যাড়ে আওয়াজ। “মম, কিছুই শোনা যাচ্ছে না। এখন রাখি পরে আবার ফোন করবো।” বলে কলটা কেটে দিলো তাতাই। কলকাতার বাড়িতে বসে ছেলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া চা’টা যে মুহূর্তে এক ঢোঁকে গিলে ফেলল সৌমি ঠিক সেই মুহূর্তে অমরাবতী এক্সপ্রেস ছুটে চলেছে কর্ণাটকের পাথুরে মাটির বুক চিরে গন্তব্য গোয়ার উদ্দেশ্যে।

নয়

ইস্টবেঙ্গল আর ত্রিবান্দ্রম ফুটবল অ্যাকাডেমির সঙ্গে মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমিরও গোয়ায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছে স্পোর্টস অথরিটির হোস্টেলে। অবশ্য টিমগুলোর কোচ ট্রেনার আর অন্যান্য অফিসিয়ালদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে হোটেলে। স্পোর্টস অথরিটির কাছেই বিলাসবহুল কান্ট্রি ইন অ্যান্ড স্যুইটস-এ মোহনবাগানের তিন ক্লাব কর্তা আর তার অনতি দুরেই থ্রি স্টার দ্য হাওয়াই কমফোর্টসে থাকছেন কোচিং টিম আর অ্যাকাডেমি অফিসিয়ালিরা। তাতাইদের গ্রুপ লিগের তিনটে ম্যাচই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হবে সাই ক্যাম্পাসের দুটো গ্রাউন্ডে। টিম কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলে খেলা হবে ডালের ফুটবল স্টেডিয়ামে। দু’টো সেমিফাইনাল আর ফাইনাল ম্যাচ হবে জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়াম ওরফে ফতোরদা স্টেডিয়ামে। মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমি প্র্যাকটিসও করবে সাই ক্যাম্পাসের মাঠেই। তাই প্রথম ম্যাচের আগে নতুন মাঠের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ওদের হাতে থাকবে একটাই মাত্র দিন। তাছাড়া ওদের প্রথম ম্যাচ ছ’তারিখে হলেও টুর্নামেন্ট শুরু চার তারিখেই। তাই পাঁচ তারিখে বিকেল তিনটে থেকে দুটো মাঠেই একটা করে ম্যাচ হবে। ট্রেনে গোয়া পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেলেও ক্লাব কর্তারা চার তারিখের মর্নিং ফ্লাইটেই গোয়া পৌঁছে গেছে। ওরাই অর্গানাইজারদের কাছে ম্যাচের ভেনু আর টাইমিং জেনে নিয়ে টিমের প্র্যাকটিস সিডিউল ঠিক করে রেখেছে। হোটেলে যাওয়ার আগে চিফ কোচ ডগলাস্যার টিমের সকলকে বলে গেছেন কাল সকাল সাতটা থেকে ন’টা এক নম্বর গ্রাউন্ডে আর বিকেলে ম্যাচের পরে দু’নম্বর গ্রাউন্ডে ঘণ্টা খানেক প্রাকটিস করবে টিম। এতে করে দুটো মাঠের সঙ্গেই অল্পস্বল্প পরিচিত হওয়া যাবে। আর ছ’তারিখেই তো আছে তাতাইদের প্রথম ম্যাচ ভাস্কো স্পোর্টস ক্লাবের সঙ্গে।

প্রায় দেড় দিনের লম্বা ট্রেন জার্নি করে এমনিতেই টিমের সকলেই বেশ ক্লান্ত। ওদের আঠেরো জনের জন্যে মোট পাঁচটা ঘর বরাদ্দ করেছে সাই কর্তৃপক্ষ। দোতলায় একটা লম্বা করিডোরের লাগোয়া সারি সারি গোটা দশেক ঘর। ঘরগুলো বেশ বড় বড়। করিডোরের দুই প্রান্তে দুটো করে মোট চারটে বাথরুম। এক প্রান্তের দুটো বাথরুম মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমির জন্যে বরাদ্দ। পাশের বাকী পাঁচটা ঘর আর করিডোরের অন্য প্রান্তের দুটো বাথরুম বরাদ্দ হয়েছে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্লেয়ারদের জন্যে। তাতাইদের টিম অফিসিয়াল অনিল টুডু’ই ঠিক করে দিয়েছেন টিমের ক্যাপ্টেন সঞ্জয় আর ভাইস ক্যাপ্টেন কুণাল একটা ঘরে থাকবে। বাকী চারটে ঘরেই চারজন করে মোট ষোলোজন থাকবে। তাতাইদের ঘরে হরেন সুশোভন ছাড়াও আন্ডার এইট্টিন ব্যাচের পলাশের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। সাই হোস্টেল ছাড়ার আগে টুডুস্যার সবাইকে এক জায়গায় করে বলে গেলেন,

- “বয়েজ, কাল সকাল সাতটা থেকে প্র্যাকটিস সেশন। পৌনে সাতটার মধ্যেই রেডি হয়ে সবাই এক নম্বর গ্রাউন্ডে পৌঁছাবে। এই হোস্টেলের গ্রাউন্ড ফ্লোরেই ডাইনিং হল। সাড়ে আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত ডিনার টাইম। তার মধ্যেই ডিনার সেরে যে যার নিজের নিজের বেডে যাবে। রাতটা ভাল করে ঘুমলেই ট্রেন জার্নির হ্যাংওভারটা কেটে যাবে। সো বয়েজ, বাই….সি ইউ অল ইন টুমরো’স প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড… গুডনাইট…”

এমনিতেই লম্বা ট্রেন জার্নি জনিত ক্লান্তি তার ওপর আবার গত দু’রাত কারোরই ভাল করে ঘুম হয়নি। তাই ন’টা বাজতেই টিমের ক্যাপ্টেন সঞ্জয় সবাইকে ডেকে পৌঁছল ডাইনিং হলে। বিশাল হল ঘরে সারিসারি টেবিল আর চেয়ার। তাতাই এসে দেখল ততক্ষণে অন্য দলের প্লেয়ার’রাও এসে গেছে। ক্যান্টিনের কাউন্টারে জানা গেল বুফেতে ভাত চাপাটি ছাড়াও আছে ডাল মিক্সড সব্জি আর টক দই। টক দই তাতাই-এর দু’চক্ষের বিষ। নিজের প্লেটে চারটে রুটি এক বাটি ডাল কিছুটা মিক্সড সব্জি নিয়ে একটা ফাঁকা চেয়ারে বসতেই ওর চোখ একেবারে ছানাবড়া। তাতাই ওর নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। ওর টেবিলের থেকে দুটো টেবিল পরেই ওটা কে বসে আছে? ওটা সন্দীপ না? ইস্টবেঙ্গল জুনিয়ার টিমের সন্দীপ। গুলেদার কোচিং-এ ওর বেস্ট ফ্রেন্ড আর বৈষ্ণবঘাটা ইয়ং স্টারসে ওর পার্টনার। ওকে যে এখানে দেখবে তাতাই কল্পনাও করতে পারেনি। ও আর নিজেকে আটকে রাখতে পরল না। নিজের প্লেট টেবিলে ফেলেই চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে দাঁড়াল সন্দীপের পেছনে। ওর মাথায় একটা আলতো চাঁটি’ই মারতে গেছিল তাতাই। কিন্তু অপ্রত্যাশিত আনন্দের আতিশয্যে চাঁটিটা একটু জোরে মেরে ফেলতেই,

- “কোন হারামির বাচ্চা বে……”

- “আব্বে আমি রে! তাতাই….”

- “উড়ি শালা! তুইও এখানে? তুই তো মোহন বাগানে? গুলেদার মুখে শুনেছিলাম। তা তোরা এখানে আছিস কোন ফ্লোরে?”

- “ফার্স্ট ফ্লোরে। রুম নাম্বার ফোর…”

- “লেহ…. আর তিনটে ঘর পরেই আমার সাত নম্বর রুম..”

কথা বলতে বলতেই নিজের প্লেট হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল সন্দীপ। “চল, তোর টেবিলে বসি” বলে তাতাই-এর পিছুপিছু এসে ওর টেবিলে মুখোমুখি বসে খেতে খেতেই তুমুল আড্ডায় মেতে গেল সাপে নেউলে সম্পর্কের দুই টিমের দুই অভিন্ন হৃদয় বন্ধু।

সাই ক্যাম্পাসের এক নম্বর গ্রাউন্ডে প্র্যাকটিস শেষ হলে সহকারী কোচ মৃদুল ব্যানার্জী সবাইকে ডেকে নিলেন। মৃদুলস্যারকে মাঝখানে রেখে গোল হয়ে টিমের সকলে দাঁড়াতেই উনি পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে বলতে শুরু করলেন.

- “বয়েজ, কালকের ম্যাচের ফার্স্ট ইলেভেন হবে এইরকম। গোলে অরিন্দম, দুই স্টপারে জ্যাকসন আর সঞ্জয়। সাইড ব্যাকে সুদীপ আর পারভেজ। চার মিডফিল্ডার প্রদীপ কামাল হরেন আর কুণাল। ফরোয়ার্ডে সুরেশ আর খালেদ।”

প্রথম ম্যাচে ভাস্কোর বিরুদ্ধে ফার্স্ট ইলেভেন ঘোষণা করে কয়েক মুহূর্ত থামলেন মৃদুল ব্যানার্জী। হরেন ফার্স্ট টিমে আছে শুনে তাতাই মনেমনে খুশি হলেও ও টিমে নেই ভেবে ওর একটু খারাপই লাগছে। যদিও খালেদ আর সুরেশকে টপকে ও যে প্রথম ম্যাচেই ফার্স্ট ইলেভেনে থাকবে না সেটা ওর প্রত্যাশিতই ছিল। যারা কালকের ম্যাচে ফার্স্ট ইলেভেনে নেই তাদের হতাশ মুখগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মৃদুল ব্যানার্জী স্নেহশীল কণ্ঠে বলে উঠলেন,

- “বয়েজ, তোমরা যারা কালকের ম্যাচে ফার্স্ট ইলেভেনে নেই তাদের কোনো রকম হতাশ হওয়ার কারণ নেই। সর্ব ভারতীয় স্তরে তোমরা সবে পা ফেলছ। তোমাদের সামনেও সুযোগ আসবেই। সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। এখন যাও ফ্রেশ হয়ে খেয়েদেয়ে হোস্টেলে গিয়ে রেস্ট করো। বিকেল পাঁচটার মধ্যে দু’নম্বর গ্রাউন্ডে সবাই পৌঁছে যাবে”

একটানা কথাগুলো বলে পুরো কোচিং টিম অন্যান্য অফিসিয়ালিদের সঙ্গে হোটেলে ফিরতেই একে একে হোস্টেলের পথ ধরল মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমির প্লেয়াররাও।

আজ দুপুরের লাঞ্চে ছিল গোয়ার স্পেশাল চিকেন ভিন্ডালু। লাঞ্চে চিকেন দেখে তো হরেনের ফুর্তি আর ধরে না। হরেন তো হরেন, এমন কী ট্রেনের দু’দিনের ডিমের ঝোলে মরচে পড়ে যাওয়া জিভে মশলাদার গোয়ানিজ ডেলিকেসির ছোঁয়ায় তাতাই’ও দু’চামচ ভাত বেশি খেয়ে ফেলল। খাওয়ার পরে পেট একদম আইঢাই। হোস্টেলের রুমে কিছুক্ষণ টানটান হলো। কিন্তু দুপুরে তাতাই-এর কিছুতেই ঘুম আসে না। চোখ টিপে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকল। শুয়ে শুয়েই কানে এলো পাশের চৌকি থেকে হরেনের নাক ডাকার শব্দ। বিছানা ছেড়ে বাইরের করিডরে এলো। লম্বা করিডোরটা একেবারে শুনশান। এই রকম অসীম শূন্যতায় তাতাই-এর হঠাত ইচ্ছে হল মমের সঙ্গে কথা বলতে। মমের নম্বরটা ডায়াল করে মাত্র দু’বার রিং হতেই কলটা অ্যাক্সেপ্ট করল। মম যেন এই কলটারই অপেক্ষা করছিল। প্রায় দু’হাজার কিলোমিটারের দূরত্বকে এক লহমায় মিটিয়ে দিয়ে ভেসে এলো একটা মমতাভরা কণ্ঠ – “হ্যাঁ তাতাই বল। কেমন আছিস……”

মমের সঙ্গে কথা বলে তাতাই রুমে ঢুকে দেখল সুশোভন উঠে গেলেও পলাশ আর হরেন তখনো ঘুমোচ্ছে। মোবাইল স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে দেখল পৌনে চারটে বাজে। পাঁচটা থেকে প্র্যাকটিস। এখান থেকে দু’নম্বর গ্রাউন্ড হেঁটে গেলেও বড়জোর পাঁচ সাত মিনিট লাগবে। ওই মাঠে আজ ইস্টবেঙ্গলের খেলা আছে পুনে এফসি জুনিয়ার টিমের সঙ্গে। তাতাই মনে মনে ভাবে মাঠে চলে গেলে খেলাটার কিছুটা দেখা যেত। তাছাড়া ইস্টবেঙ্গলের টিমে সন্দীপও আছে।

পলাশের সঙ্গে এখনো সেই রকমভাবে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি তাতাই-এর। তাই ওকে আর বিরক্ত না করে হরেনকে টেনে তুলে বলল,

- “আব্বে ওঠ! অনেক ঘুমিয়েছিস। শুয়ে না থেকে চল মাঠে যাই। ইস্টবেঙ্গলের খেলা আছে…..”

তাতাই-এর জোরাজুরিতে হরেন উঠেই পড়ল। মিনিট দশেকেই ওরা তিনজনে একেবারে প্র্যাকটিসের জন্যে রেডি হয়ে পা বাড়াল সাই ক্যাম্পাসের দু’নম্বর গ্রাউন্ডের দিকে।

ওরা যখন মাঠে পৌঁছল খেলা তখন প্রায় শেষের দিকে। অস্থায়ী স্কোর বোর্ড দেখাচ্ছে ইস্টবেঙ্গল এক-শূন্য গোলে পিছিয়ে আছে। ইস্টবেঙ্গল গোল শোধের জন্যে তখন মরীয়া। গোলকিপার ছাড়া টিমের সবাই উঠে গেছে বিপক্ষের অর্ধে। এরই মাঝে ইস্টবেঙ্গল একটা কর্নার পেলো। সন্দীপ ডান পায়ে হালকা ইনসুইঙ্গার বিপক্ষের বক্সে ভাসিয়ে দিলো। ইস্টবেঙ্গলের একটা লম্বা মতো ডিফেন্ডার পেছন থেকে হঠাত উঠে এসে মাথা ছোঁয়াতেই বল জড়িয়ে গেলো জালে। তারপর আর মিনিট দুয়েক খেলা গড়াতেই রেফারি হুইসেল বাজিয়ে জানিয়ে দিলো খেলা শেষ। খেলা শেষে মাঠে ঢুকে তাতাই সন্দীপের পিঠ চাপড়ে “ওয়েল ডান” বলতেই ঘর্মাক্ত জার্সিটা খুলতে খুলতেই বিরক্তি মেশানো গলায় সন্দীপ প্রত্যুত্তর দিলো,

- “ধুর শালা! আমায় শেষ পনেরো মিনিট খেলাল। শুরু থেকে খেলালে ওই পুনের বাচ্চাগুলোকে আজ তিন গোল মারতাম….”

“বেস্ট অফ লাক ফর নেক্সট ম্যাচ” বলে সন্দীপকে সান্ত্বনা দিতেই ও বলে উঠল,

- “কাল তো তোদের ম্যাচ। আমি জানি তুই ফাটিয়ে দিবি…”

সন্দীপকে কথা শেষ করতে না দিয়েই হতাশ গলায় তাতাই বলল,

- “ধুর শালা! কাল আমি ফার্স্ট ইলেভেনেই নেই…..”

- “তাতাইদের ঝলক দেখাতে পুরো নব্বই মিনিট লাগে না বে। দশ মিনিটই কাফি….”

মুচকি হেসে তাতাই-এর কথার উত্তর দিয়ে সন্দীপ ওর টিমমেটদের ভিড়ে মিলিয়ে যেতেই প্রাকটিসের জন্যে মাঠে নেমে পড়ল মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমির বাকী প্লেয়াররাও।

দশ

আজ বিকেল তিনটে থেকে সাই ক্যাম্পাসের এক নম্বর গ্রাউন্ডে মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমি আর ভাস্কো স্পোর্টস জুনিয়ার টিমের মধ্যে ম্যাচ। টুর্নামেন্টে মোহনবাগানের আজই প্রথম ম্যাচ হলেও চার তারিখেই ভাস্কো স্পোর্টস প্রথম ম্যাচ খেলে ফেলেছে। সেই ম্যাচে ওরা তিন-এক গোলে ত্রিবান্দ্রম ফুটবল অ্যাকাডেমিকে হারিয়েছে। একেই প্রথম ম্যাচ জিতে ভাস্কোর প্লেয়ারদের যথেষ্টই আত্মবিশ্বাসী থাকার কথা তার ওপর আবার মোহনবাগান অ্যাকাডেমির টিমটা সবে গোয়ায় এসেছে। একদিন মাত্র প্র্যাকটিস করেই ওদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে গ্রুপের সব থেকে শক্তিশালী টিমের সঙ্গে। চার তারিখের মর্নিং ফ্লাইটেই গোয়া পৌঁছে যাওয়ায় ভাস্কো ত্রিবান্দ্রমের ম্যাচটা তিন ক্লাব কর্তাই দেখেছেন। ওদের মতে ভাস্কোর দলে কম সে কম চার পাঁচটা প্লেয়ার আছে যারা বয়েস ভাঁড়িয়ে খেলছে। সবকটারই বয়েস কুড়ি-বাইশ করে হবে। লোকাল টিমের সুবিধা নিয়ে অর্গানাইজারদের ম্যানেজ করে বেশি বয়েসের ছেলেদের খেলাচ্ছে। ভারতীয় ফুটবলের বয়েসভিত্তিক টুর্নামেন্টগুলোতে বয়েস ভাঁড়ানোর রোগটা যে ক্যান্সারের মতোই আগ্রাসী সেটা ওয়াকিবহাল মহলে সকলেই জানেন। সুতরাং টিম ম্যানেজমেন্টের সকলেই বুঝতে পারছেন যে বডি কন্ট্যাক্টে ওদের সঙ্গে এঁটে ওঠা মুশকিল। তাই দল গোয়া পৌঁছতেই চিফ কোচ ডগলাস ডি সিলভাকে আলাদা করে ডেকে বিষয়টা বলে দিয়েছিলেন ক্লাব কর্তারা। যাতে করে প্রথম ম্যাচের দল নির্বাচনে বিষয়টা মাথায় রাখেন।

কালকেই ডগলাসস্যার সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে আজ সকালে হাল্কা দৌড়োদৌড়ি ছাড়া আর কিছু ফিজিক্যাল ট্রেনিং হবে না। তবে সবাইকেই ঠিক সাতটায় মাঠে উপস্থিত থাকতে হবে। হাল্কা ওয়ার্ম-আপ করে সবাই ডগলাস স্যারকে ঘিরে বসলো। ফার্স্ট ইলেভেনের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে নিজের নিজের দায়িত্ব বুঝিয়ে বললেন যে আজ টিম খেলা শুরু করবে আল্ট্রা ডিফেন্সিভ সিস্টেমে। দুই স্টপারের মাঝে ডিফেন্সিভ স্ক্রিন হিসেবে থাকবে কুণাল। মিডফিল্ডে থাকলেও কুণাল আসলে থার্ড স্টপারের কাজ করবে। ওদের টিমের দশ নম্বর জার্সিধারী আলফান্সো রড্রিগেজ। ছটফটে স্টাইকার। ভয়ঙ্কর চোরা গতি আছে। দু’পায়েই ভাল শট আছে। স্থানীয় লিগে ভাস্কো স্পোর্টসের প্রায় নিয়মিত প্লেয়ার। ম্যান মার্কিং না করে ওকে জোনাল মার্কিং-এ রাখবে কুণাল। টিমের একমাত্র অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হবে হরেন। দুই সাইড ব্যাক সুদীপ আর পারভেজ প্রথম অর্ধে একেবারেই ওভার ল্যাপে যাবে না। ভাস্কোর দুটো সাইড ব্যাকই ওভারল্যাপে আসে। ওদের দৌড় মাঝমাঠেই থামিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব প্রদীপ আর কামালের। ফরোয়ার্ডে সুরেশ আর খালেদ দরকার হলেই নেমে আসবে নিজেদের অর্ধে। আর কাউন্টার অ্যাটাকে কখনোই একসঙ্গে চারজনের বেশি প্লেয়ার যাবে না।

ম্যাচের ছক বুঝিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের সকলে নিজেদের হোটেলে ফেরার আগে প্লেয়ারদের বলে গেল আজ সকলেই যেন একটার মধ্যে লাঞ্চ সেরে দুটো পর্যন্ত বিশ্রাম নিয়ে নেয়। টিম ম্যানেজমেন্টের নেতা অর্থাৎ মোহনবাগান ক্লাবের সিনিয়ার কর্তা দেবাশীষ দত্ত যাওয়ার আগে বলে গেলেন,

- “আজ জিতলে আমার তরফ থেকে পুরো টিমের বিচসাইড রেস্তোরাঁয় বুফে ডিনার। তাই সবাই যেন আজ লাঞ্চটা হালকাই করে।”

টিম ম্যানেজমেন্টের সবাই ফিরে যেতেই প্লেয়াররা ধরল হোস্টেলের পথ। পথে যতে যেতে হরেন ওর স্বভাবজাত কৌতূহলী প্রশ্নটা করেই বসলো,

- “হ্যাঁ রে সৌম্য, ওই দেবাশীষস্যার যেইটা বলল, ওই বুকে না কী যেন ডিনার। ওইটা কী বটেক?”

- “বুকের কাছে প্লেট ধরে ডিনার খাওয়া?”

ওদের পাশে পাশেই হাঁটতে থাকা সুশোভন ফুট কাটতেই আশেপাশের সকলেই হো হো করে হেসে উঠলো। সবাই একসঙ্গে হেসে উঠতেই প্রথমে কিছুটা থতমত খেয়ে চুপ করে গেল হরেন। কিন্তু ও বেটাও ছোড়নে বালা পার্টি নয়। “বুকে ডিনার”টা ও বুঝেই ছাড়বে। তাই মরীয়া হয়ে সুশোভনকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,

- “তুই থাম দিকি! লিজে যেন কত বুঝে। অ্যাই সৌম্য বল না সেইটা কী বটেক?”

- “আরে বাবা, ওটা বুকে নয় বুফে… বুফে… বুফে মানে হচ্ছে সেখানে অনেক রকম মাছ মাংস প্রন আই মিন চিংড়ি কাঁকড়া এটসেট্রা সাজানো থাকবে। তোর যেটা পছন্দ প্লেটে তুলে খেতে পারবি..”

তাতাই-এর কথা শুনে বিস্ময়ে চোখ গোলগোল করে হরেন জিজ্ঞেস করল,

- “যেইটা ইচ্ছে হবেক সেইটাই? আমি তো তবে মাংসই খাবো খালি। আর চিংড়িও। আমি কখনো চিংড়ি খাই নি, কাঁকড়াও খাইনি তবে গেঁড়ি গুগলি খেয়েছি……”

তাতাই ওর মাথায় চাঁটি না মারলে হরেন থামতোই না। আসলে ভালো ভালো খাবারের নাম শুনলেই ও আর থামতে পারে না।

- “আজ গোল মেরে টিমকে জেতা। তারপর রাতে যা খুশি খাস….”

বলতে বলতেই হোস্টেলে নিজেদের ঘরে ঢুকে গেল তাতাই। আর পিছু পিছু ওর বাকী রুমমেটরাও।

খেলে শুরুর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ভাস্কো স্পোর্টসের প্লেয়াররা বুঝিয়ে দিলো মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমির দিনটা আজ ভাল যাবে না। শুরু থেকেই ভাস্কোর ঝোড়ো আক্রমণে মোহনবাগান ব্যাকফুটে। ভাস্কোর গোলকিপার যেখানে নিজেদের ডি-বক্সের মাথায় কোমরে হাত দিয়ে হাওয়া খাচ্ছে সেখানে মোহনবাগানের দুই স্ট্রাইকার খালেদ আর সুরেশও ঘোরাফেরা করছে নিজের পেনাল্টি বক্সের আশেপাশে। ভাস্কোর দুই সাইড ব্যাকই যেন পুরোদস্তুর দুই উইঙ্গার। ওদের দুই স্টপারই শুধু নিজেদের হাফলাইনে। বাকী আটজনই মোহনবাগানে অর্ধে। মিনিট দশেকের মধ্যেই গোলকিপার অরিন্দম দু’তিনটে অসাধারণ সেভ না করলে এর মধ্যেই দু’এক গোলে পিছিয়ে পড়ত। তাতাই রিজার্ভ বেঞ্চে বসে মনে মনে ভাবছে এই সময় সুশোভনের মত একজন বল প্লেয়ারের দরকার ছিল, যে বলটা হোল্ড করে খেলার স্পিডটাকে কন্ট্রোল করতে পারবে। মোহনবাগান নিজেদের গোল বক্সে যতই ভিড় বাড়াচ্ছে ভাস্কোও যেন গোল পাওয়ার জন্যে ততটাই মরীয়া হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যেই রাফ ট্যাকেল করায় হলুদ কার্ড দেখে ফেলেছে কুণাল আর প্রদীপ।

খেলার ঠিক উনিশ মিনিটের মাথায় ভাস্কোর স্ট্রাইকার আলফান্সোকে বক্সের মাথায় ট্রিপ করে ফেলে দিলো সঞ্জয়। আলফান্সোই নিলো ডাইরেক্ট ফ্রিকিকটা। অরিন্দমকে দাঁড় করিয়ে রেখে আলফান্সোর ডান পা থেকে ছিটকে বেরোনো বলটা আউট সাইড সোয়ার্ভ করে ডান দিকের নেটে জড়িয়ে যেতেই উল্লাসে ফেটে পড়ল স্থানীয় দর্শক।

গোলটা খেয়ে একটু যেন গা ঝাড়া দিলো মোহনবাগান। সুশোভনকে ওয়ার্ম আপ শুরু করতে বললেন ডগলাসস্যার। তিরিশ মিনিটের মাথায় প্রথম চেঞ্জ হলো। প্রদীপের জায়গায় মাঠে নামলো সুশোভন। মাঠে নামার আগে চিফ কোচ সুশোভনকে বলে দিলেন যতটা বেশি সম্ভব বলটা হোল্ড করে খেলার গতিকে কমাতে। সুশোভন নামার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মাঠের চিত্রটা যেন বদলাতে শুরু করল। তাছাড়া এতক্ষণ তেড়েফুঁড়ে খেলতে গিয়ে দমেও বোধহয় টান পড়েছে ভাস্কোর প্লেয়ারদের। সুযোগ বুঝে মোহনবাগানও প্রতি আক্রমণে উঠতে শুরু করল। খেলার চল্লিশ মিনিটে রাইট ব্যাক পারভেজের বাড়ানো একটা বল ভাস্কোর অর্ধে ডান প্রান্তের টাচ লাইন বরাবর হরেনের পা খুঁজে নিতেই বিপক্ষের বক্সের দিকে দৌড় শুরু করল সুরেশ খালেদ দুজনেই। তীব্র গতিতে বিপক্ষের তিনজনকে একে একে ডজ করে হরেন গোলবক্সে ভাসিয়ে দিল ক্রস। ভাস্কোর পেনাল্টি বক্সে তখন মোহনবাগানের মোট পাঁচজন। বলে মাথা ছোঁয়াতে বিপক্ষের দুই স্টপারের সঙ্গেই লাফাল খালেদও। খালেদের মাথা ছুঁয়ে আসা বলটা আলতো ইনসাইড পুস করলেই গোল পেয়ে যায় সুরেশ। কিন্তু সেই সিওর সিটারটাও তাড়াহুড়োয় উড়িয়ে দিলো ক্রসবারের ওপর দিয়ে। মিনিট দুয়েক পরেই মোহনবাগানের সামনে আবার সুযোগ এলো। এবারও সেন্টার লাইন থেকে সুশোভনের নিখুঁত ঠিকানা লেখা থ্রু-পাস পড়ল সুরেশের পায়ে। নিজেদের গোললাইন ছেড়ে এগিয়ে আসা বিপক্ষ গোলকিপারের গায়ে বল মেরে এবারও সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করল সুরেশ। আর গোলকিপারের গায়ে লেগে ছিটকে আসা সেই বল ধরেই তীব্র গতির কাউন্টার অ্যাটাকে দ্বিতীয় গোল করে ফেলল ভাস্কো স্পোর্টস।

হাফ টাইমে প্লেয়াররা মাঠ থেকে ফিরতেই চিফ কোচ জানিয়ে দিলেন দ্বিতীয়ার্ধে সুরেশের জায়গায় মাঠে নামবে সৌম্য। খালেদ নেমে যাবে মাঝমাঠে আর ফরোয়ার্ডে সৌম্যর জুড়িদার হবে হরেন। টিম দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামার আগে তাতাইকে কাছে ডেকে ক্লাব কর্তা দেবাশীষ দত্ত বললেন,

- “অঞ্জনদা আমায় তোর কথা বলেছে। ইউ হ্যাভ টু প্রুভ ইওরসেল্ফ… মাঠেই প্রমাণ করে আয় বয়েস আর হাইট ছাড়া আর কোনো ব্যাপারেই এই মুহূর্তে ইন্ডিয়ার কোনো স্ট্রাইকার’ই তোর থেকে এগিয়ে নেই। বেস্ট অফ লাক….”

প্রথম অর্ধের রক্ষণাত্মক খোলস ছাড়তেই মোহনবাগান টিমে যেন নব যৌবন এলো। দ্বিতীয়ার্ধের দশ মিনিটেই সুশোভনের নেওয়া কর্নার কিকে মাথা ছুঁইয়ে ব্যবধান কমালো কুণাল। ব্যবধান কমতেই যেন আরও উজ্জীবিত হল মোহনবাগান। সুশোভন তাতাই আর হরেনের দীর্ঘদিনের বোঝাপড়ার ফল মিলতেই নাভিশ্বাস উঠল ভাস্কো ডিফেন্সে। দ্বিতীয়ার্ধের পঁচিশ মিনিটে বিপক্ষের বক্সের মাথায় দু’দু বার ওয়ান ইজটু ওয়ানে হরেন আটকে না গেলে অথবা পঁয়ত্রিশ মিনিটে ওভারল্যাপে উঠে আসা লেফ্ট ব্যাক সুদীপের ক্রস ফাঁকায় দাঁড়ানো তাতাই মাথা ছোঁয়াতে পারলেই গোল শোধ হয়ে যেতো। আটত্রিশ মিনিটে নিজেদের টপ বক্সে বিপক্ষের স্ট্রাইকার আলফান্সোর পা থেকে বল কেড়ে স্টপার জ্যাকসন লং বল বাড়াল লেফ্ট উইং ধরে উঠতে থাকা কামালকে লক্ষ্য করে। কামাল বলটা ধরে আচমকাই ব্যাক পাস করল তাতাইকে। টপ বক্সের কোনায় বল পড়ল তাতাই-এর পায়ে। বিপক্ষের স্টপার ট্যাকেল করার সেকেন্ডের কয়েক ভগ্নাংশ আগেই কাট করে তাতাই ঢুকে পড়ল বক্সে। একবার ভাবল হরেনকে স্কোয়ার পাস বাড়াবে। স্কোয়ার পাস করার জন্যে বডি ফেন্ট করেও বাঁ’পায়ের সোল দিয়ে বলটাকে টেনে নিলো নিজের বাঁ’দিকে। ততক্ষণে রংফুটে বিপক্ষের অন্য স্টপারটাও। তাতাই এক পলক গোলকিপারের পজিশন দেখেই বাঁ’পায়ের ইনস্টেপে শট নিলো। গোলকিপারকে দাঁড় করিয়ে রেখে বল জড়িয়ে গেল জালে।

খেলা শেষ হতে আর মিনিট দুয়েক বাকি। দু’দলেরই চিফ-কোচ সহকারী-কোচ ক্লাব-কর্তা সবাই তখন উত্তেজনায় সাইড লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে। দু’দলই এই শেষ মুহূর্তে আর গোল খাওয়ার রিস্ক নিতে রাজী নয়। সবার সেই উৎকণ্ঠার মধ্যেই মাঝ মাঠে একটা লুজ বল পেয়ে সোলো রান শুরু করে বিপক্ষের পর পর দুজনকে ডজ করে তাতাই বক্সে ঢুকতেই পা চালাল এক ডিফেন্ডার। সেই সজোরে চালানো পা বলে না লেগে লাগল তাতাই-এর থাইয়ে। তাতাই মাটিতে পড়ে যেতেই রেফারি ভাস্কো বক্সের পেনাল্টি স্পটের দিকে ইশারা করে লম্বা হুইসল বাজিয়ে জানিয়ে দিলেন মোহনবাগানের ফেভারে পেনাল্টি। প্রচণ্ড ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে উঠে দাঁড়াল তাতাই। বলটা হাতে তুলে পেনাল্টি স্পটের দিকে না গিয়ে বক্সে দাঁড়ানো হরেনের হাতে দিয়ে বলল,

- “যা, গোল মেরে আয়। আজ বুফেতে যতখুশি মাংস……”

পুরো থম মেরে যাওয়া মাঠে বল হাতে এগিয়ে যাচ্ছে হরেন মান্ডি। পুরো মাঠ এতটাই নিস্তব্ধ যেন মাঠের অনতিদূরে বট গাছটার পাতা খসে পড়ার শব্দও শোনা যাচ্ছে। পেনাল্টি স্পটে বল বসিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে এলো হরেন। গোলকিপারের পজিশন এক পলক দেখে দৌড় শুরু করল। আজ ও লাঞ্চে আধপেটা খেয়েছে। আধপেটা খেলেই হরেনের রাগ হয়। সেই খিদেপেটের সমস্ত রাগকে ডান পায়ের পাতায় একজোট করে হরেন শট নিলো। গোলকিপার চোখের পলক ফেলতেই বল জড়িয়ে গেল জালে। গোল মেরে ধীর পায়ে হরেন এগিয়ে গেল তাতাই-এর দিকে। প্রচণ্ড উল্লাসে ওকে জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল,

- “বুঝলি সৌম্য, আজ তোদের ওই বুকে সিস্টেম না কী যেন! ওখানে মাংসর সঙ্গে চিংড়ি আর কাঁকড়াও খাবো। একদম পেট পুরে……”

ততক্ষণে টিমের বাকী প্লেয়াররা ঝাঁপিয়ে পড়েছে দুই বন্ধুর ওপর।

এগারো
—–

প্রথম ম্যাচের দু’দিন পরে দ্বিতীয় ম্যাচে সহজেই ত্রিবান্দ্রম অ্যাকাডেমিকে তিন-শূন্য গোলে হারিয়েছে মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমি। ত্রিবান্দ্রমের সঙ্গে ম্যাচে তিনটে গোলের একটা তাতাই-এর। বাকী দুটোর একটা খালেদ আর অন্যটা ওভারল্যাপে উঠে আসা পারভেজের পা থেকে এসেছিল। প্রথম দুটো ম্যাচে জিতে ইতিমধ্যেই টিম কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যাওয়ায় শেষ গ্রুপ ম্যাচে রিজার্ভ বেঞ্চের অনেককেই সুযোগ দিলেন চিফ-কোচ ডগলাস ডি সিলভা। হরেনের জায়গায় দলে ফিরল সুরেশ। রাইট ব্যাকে পারভেজের জায়গায় সুমন আর মাঝমাঠে কুণাল’কে বিশ্রাম দিয়ে সমীরকে প্রথম দলে রাখলেন ডগলাসস্যার।

মনিপুরের থোকচম বীরচন্দ্র সিং ফুটবল অ্যাকাডেমি ওরফে টি.বি.এস.এফ.এ-র টিমের প্রত্যেকটা ছেলেই যেন এক একটা রোবট। ভীষণ ছটফটে আর গতিশীল। সারা মাঠ দৌড়তে পারে অবিরাম। লম্বায় খুব বেশি না হলেও সবারই বেশ শক্ত পোক্ত চেহারা। নিখুঁত পাসিং গেম খেলে দলটা। স্কিলও মন্দ নয় তবে সবকিছুই চাপা পড়ে যায় ওদের গতির কাছে।

মনিপুরের টিমটা প্রথম ম্যাচে ত্রিবান্দ্রম অ্যাকাডেমিকে দুই-এক গোলে হারিয়েছে। লোকাল ক্রেজ ভাস্কো স্পোর্টসের সঙ্গে ওদের দ্বিতীয় ম্যাচটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই দুই-দুই গোলে ড্র হয়েছে। আজকের ম্যাচে মোহনবাগান জিতলেই ভাস্কোর সামনে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার সুযোগ আসবে। আজকের ম্যাচটা ড্র হলেই গ্রুপ লিগ থেকেই বিদায় নেবে ভাস্কো স্পোর্টস ক্লাব। ভাস্কোর সাপোর্টাররা জানে এই ম্যাচে মোহনবাগানের হয়ে গলা ফাটানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ। মোহনবাগানের প্রতিটা আক্রমণে মাঠের দর্শকদের উল্লাসই বুঝিয়ে দিচ্ছে জনসমর্থন আজ মোহনবাগানের সঙ্গে।

দুটো দলই শুরু থেকেই যেন একটু অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক স্ট্র্যাটেজি নিয়েই খেলছে। বিক্ষিপ্ত অথবা অপ্রত্যাশিত ভাবে জুটে যাওয়া দু’একটা খুচরোখাচরা ছাড়া তেমন সুযোগ প্রথমার্ধে কোনো টিমের সামনেই এলো না। নিরুত্তাপ প্রথমার্ধ গোলশূন্যই থাকলো। দ্বিতীয়ার্ধে যেন একটু নড়েচড়ে বসল টি.বি.এস.এফ.এ। দ্বিতীয়ার্ধের মিনিট দশেকের মাথায় একটা সেট পিস মুভমেন্ট থেকে গোল করে দিলো তোম্বা সিং নামের একটা ছেলে। গোলটা করেই আবার যেন রক্ষণের খোলসে ঢুকে পড়ল টি.বি.এস.এফ.এ। ওদের লক্ষ্য নিজেদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ডি-গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ব্যাঙ্গালুরু এফ.সি-র অ্যাকাডেমি’কে কোয়ার্টার ফাইনালে এড়ানো।

দ্বিতীয়ার্ধের পঁয়ত্রিশ মিনিট খেলা গড়িয়ে গেল। এক গোলের লিড ধরে রাখতে পুরো টিমটাকেই নিজেদের অর্ধে নামিয়ে এনেছে টি.বি.এস.এফ.এ। খেলায় সমতা ফেরাতে মরীয়া মোহনবাগানও। উপর্যুপরি তিনটে কর্নার কিকও কাজে এলো না। দ্বিতীয়ার্ধের মিনিট চল্লিশের মাথায় বিপক্ষের হাফ লাইন থেকে একটা বল ধরে পরপর দুজনকে ডজ করে সুশোভন তাতাইকে লক্ষ্য করে বাড়াল ওর ট্রেড মার্ক একটা ডিফেন্স চেরা থ্রু-পাস। বলটা ডান পায়ে ধরে বাঁপায়ে নেওয়ার চেষ্টা না করে ওর অনভ্যস্ত ডান পায়েই গোল লক্ষ্য করে শট নিলো তাতাই। বলটা বিপক্ষের এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে ডিফ্লেক্ট করে জালে জড়াতেই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল পুরো মোহনবাগান শিবির। অবশেষে এক-এক গোলে অমীমাংসিত ভাবে শেষ হল মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমি আর টি.বি.এস.এফ.এ-র ম্যাচ। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমি কোয়ার্টার ফাইনাল উঠল। ডালের ফুটবল স্টেডিয়ামে নক আউট পর্যায়ের প্রথম ম্যাচে ওরা মুখোমুখি হবে মুম্বাই এফ.সি-র জুনিয়ার টিমের।

কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের আগে তিন দিনের গ্যাপ। টিমের পারফর্মেন্সে টিম ম্যানেজমেন্টের সবাই ভীষণ খুশি। গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচের পর মাঠেই ক্লাব কর্তা দেবাশীষ স্যার ঘোষণা করলেন,

- “ওয়েল ডান বয়েজ! আশা করি পরের নক-আউট ম্যাচ থেকে ফাইনাল পর্যন্ত তোমরা এই রকমই পারফর্মেন্স ধরে রাখবে। মনে রেখো জুনিয়ার আই-লিগের আগে এগুলোই তোমাদের প্রস্তুতি ম্যাচ। এনি ওয়ে, দেয়ার ইজ আ গুড নিউজ ফর অল অফ ইউ। তোমাদের চিফ কোচ কাল সবাইকে ছুটি দিতে রাজী হয়েছেন। তাই আমরা কাল সবাই মিলে গোয়া ঘুরতে যাবো। সো, তোমরা এখন হোস্টেলে ফেরো। কাল সকাল আট’টায় বাস আসবে। তৈরি থেকো সবাই। সারাদিন ঘুরে একেবারে ডিনার সেরে আমরা ফিরবো।”

দেবাশীষ স্যারের ঘোষণা শুনে হৈহৈ করে উঠল সবাই। টিম ম্যানেজমেন্টের সবাই নিজের নিজের হোটেল আর প্লেয়াররা হোস্টেলের পথ ধরল।

মোবাইলে পাঁচটার অ্যালার্ম বাজার আগেই আজ ঘুম ভেঙেছে তাতাই-এর। এটা খুব একটা আশ্চর্যের নয় যদিও। তাতাই-এর মাঝেমাঝেই এই রকম হয়। কিন্তু সব থেকে অবাক করার মতো ঘটনা হচ্ছে আজ ধাক্কা মারার আগে নিজে থেকেই উঠে পড়েছে ল্যাদ সম্রাট সুশোভনও। তাতাই ঘুমচোখ খুলে বিছানায় শুয়ে শুয়েই দেখছে হরেনের বেডে ও আর সুশোভন গুলতানি করছে। পলাশ তখনো ঘুমোচ্ছে। মাথার বালিশের তলা থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে তাতাই দেখল পৌনে পাঁচটা বাজে। সুশোভনের মুখে তাতাই শুনেছে খুব ছোটবেলায়, মানে ওর বাবা যখন বেঁচেছিল তখন ও নাকি একবার দীঘা গেছিল। তবে সমুদ্র ঠিক কী রকম দেখতে আজ আর ওর মনে নেই। আর হরেনের কাছে বীরভূমের ওই পাহাড় জঙ্গল ঘেরা গ্রামের বাইরে পৃথিবী বলতে জেলা সদর সিউড়ির ফুটবল মাঠ অথবা কোলকাতা ময়দানের সাব-জুনিয়ার বেঙ্গলের ট্রায়াল ক্যাম্প কিম্বা হালের দূর্গাপুরের অ্যাকাডেমি। পাহাড় জঙ্গল ঝর্ণার মাটিতে দাঁড়িয়ে নদী আর সমুদ্রের ফারাক খুঁজে পাওয়া সম্ভবই নয় হরেনের কাছে। প্রথম ম্যাচ জিতে বিচ সাইড রেস্তরাঁয় বসে দুর থেকে সর্বাঙ্গে অন্ধকার মাখা সমুদ্রকে দেখে হতাশ হয়েছিল হরেন। তাই ও ঠিক করেছে আজ সমুদ্রের নোনা জলে পা ডোবাবেই। হাতের মুঠোয় চেপে ধরবে সৌম্যর মুখে শোনা ঢেউয়ের মাথায় জমে থাকা সাদা লবণাক্ত ফেনা।

আঠেরোটা ছেলের জন্যে মাত্র দু’টো বাথরুম। তাই সবার রেডি হয়ে বেরোতে বেরোতেই সাড়ে আট’টা বেজে গেল। এর মধ্যেই অনিল টুডু এসে দু’বার তাড়া দিয়ে গেছে। সবাই বাসে উঠতেই রওনা দিলো মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমির পুরো টিম। বাসে প্লেয়ারদের সঙ্গে শুধু অনিল টুডু। বাকী দুটো গাড়িতে বাসের সামনে সামনে চলেছে তিন ক্লাব কর্তা আর তিন কোচ। ওদের প্রথম গন্তব্য দুধসাগর জলপ্রপাত।

রোড সাইড ধাবাতে পুরি সবজি সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে দুধসাগর জলপ্রপাত পৌঁছতেই পৌনে এগারোটা। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার এক পাহাড়ের বুক চিরে তিনশো দশ মিটার উঁচু থেকে চারটে ধাপে নেমে আসা ভারতের সর্বোচ্চ জলপ্রপাত দুধসাগর আসলে মান্ডভি নদীরই একটা স্রোত। যেটা কর্ণাটকে উনত্রিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পশ্চিমঘাট পর্বতমালাকে পেছনে ফেলে মান্ডভির মূল স্রোতে ভাসতে ভাসতে মিশে গেছে আরব সাগরের লবণাক্ত নীলে।

দুধসাগরের দুধ সাদা ফেনিল জলের উচ্ছ্বাসকে পেছনে ফেলে তাতাইদের টিম বাস ধরল মারগাঁওয়ের পথ। টুডু স্যার ওদের জানালো ওরা এখান থেকে সোজা যাবে কোলভা বিচে।

কোলভা বিচ গোয়ার সব থেকে বিখ্যাত বিচ। গোয়ার এই বিচ জগদ্বিখ্যাত দিনের বেলায় প্যারাগ্লাইডিং অথবা ব্যানানা বোট রাইডিং-এর মতো অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস আর সূর্য ডুবলেই এর নাইট লাইফ এঞ্জয়মেন্টের বৈচিত্র্যের জন্যে। কোলভা বিচে পৌঁছতে পৌঁছতেই ঘড়ির কাঁটা প্রায় দুটো ছুঁই ছুঁই। সবারই খিদেয় পেটে ছুঁচোয় ডন বৈঠক মারছে। এই বিচ যেন চির কার্নিভালের দেশ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অসংখ্য মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে চতুর্দিকে। দু’চারজন অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ প্যারাগ্লাইডিং-এ গাংচিলকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে তো কেউ কেউ ব্যানানা বোটে আরব সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কোলভা বিচঘেঁষা একটা ওপেন রেস্তোরাঁয় বসে হাওয়ায় ভাসতে থাকা এক প্যারাগ্লাইডারের দিকে তাকিয়ে চিকেন টিক্কায় কামড় বসিয়ে হরেন তাতাইকে জিজ্ঞেস করল,

- “হ্যাঁরে সৌম্য, আমরাও ওরোম করে ভাসতে পারবো?”

- “কেন রে? তোর ইচ্ছে করছে?”

তাতাই-এর মুখের কথা পড়তে না পড়তেই উচ্ছ্বসিত গলায় হরেন বলে উঠল,

- “করছে তো বটে। কিন্তু পকেটে পয়সাই নাই….”

- “চল আমি তোকে চড়াবো। এখন মন দিয়ে খা।”

তাতাই-এর কথায় আশ্বস্ত হয়েই বোধহয় হরেন মন দিলো খাওয়ায়।

কোলভা বিচে সারাদিন দাপিয়ে সকলেই ক্লান্ত। গোয়াতে এমনিতেই সন্ধে নামতে দেরী হয়। আর এই কোলভা বিচ রাতচরা অসংখ্য মানুষের সঙ্গে সারা রাত জেগে ভোরের সূর্যের নরম আলো চোখে নিয়ে ঘুমোতেও যায় অনেক দেরীতে। সন্ধে নামতেই কোলভা বিচটা যেন বদল গেছে। ঝলমলে আলোয় সেজেছে পানশালা দোকান-পাট থেকে শুরু করে হোটেল রেস্তোরাঁ সব। অনিল স্যার একটা ওপেন এয়ার রেস্তোরাঁ দেখিয়ে সবাইকে সাড়ে আটটার মধ্যে ডিনারে আসতে বলেছে। এখন সবে সাড়ে সাতটা। টিমের অন্যান্য ছেলেরা ছোটছোট দলে ভাগ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিচঘেঁষা দোকানগুলোতে। ওখানকার ছোটছোট ট্র্যাডিশনাল আর ট্রাইবাল হ্যান্ডিক্রাফ্টের দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। সুশোভন আর হরেনকে সঙ্গে নিয়ে তাতাইও ঢুকল একটা দোকানে। ওর খুব ইচ্ছে করছে পাপা মম আর দাদানের জন্যে কিছু কিনবে। কিন্তু পাপা আর দাদানের জন্যে কিছু খুঁজে না পেলেও মমের জন্যে নেওয়ার মতো অনেক কিছু আছে। ব্যাগ জুয়েলারি ড্রেস। সুশোভন ওর বোনের জন্যে চুড়ি আর কানের দুল কিনে ফেললেও অনেক কিছু ঘাটাঘাটি করেও তাতাই যখন মমের জন্যে কী নেবে কিছুতেই স্থির করতে পারছে না তখন দোকানদার একটা শাড়ি দেখিয়ে বলল এটা হল গোয়ান ট্র্যাডিশনাল হ্যান্ডলুম মেড কুনবি শাড়ি। বেশ কালারফুল ডোরাকাটা শাড়িগুলো। একটা লাল শাড়ি পছন্দ করে হরেনকে দেখাবে বলে ঘাড় ঘোরালো। কিন্তু হরেন তো নেই। গেল কোথায়? দোকান থেকে বেরিয়ে তাতাই দেখল রাস্তার ধারে চওড়া ফেন্সিং-এ বসে অন্ধকার সমুদ্রে আপন মনে কী যেন খুঁজে চলেছে হরেন। পেছন থেকে ওর কাঁধে হাত দিতেই চমকে পিছনে তাকাল। তাতাই ওকে “এখানে কী করছিস?” জিজ্ঞেস করতেই হরেন নির্বিকার চিত্তে উত্তর দিলো,

- “কিছুই না। তোরা কেনাকাটা করগে। আমার কেনার কিছু নাই”

হরেনকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তাতাই ওর হাত ধরে টানতে টানতে পৌঁছল সেই দোকানে। দোকানদারকে বলল সেই লাল ডোরা দুটো শাড়ি আলাদা আলাদা প্যাক করতে। শাড়ির প্যাকেট দুটো নিয়ে ওরা হাঁটা লাগাল টুডু স্যারের দেখানো সেই রেস্তোরাঁর দিকে। রাস্তায় চলতে চলতেই একটা শাড়ির প্যাকেট হরেনের হাতে দিয়ে তাতাই বলল,

- “এটা রাখ। তোর মা’কে দিবি….”

বারো

কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটা তাতাই-এর একদম ভাল যায়নি। শুধু তাতাই’ই বা কেন। মুম্বাই এফসি-র টাফ ফুটবলের সামনে মোহনবাগান অ্যাকাডেমির পুরো টিমটাই প্রথমার্ধে কেমন যেন গুটিয়ে গেছিল। তারই মধ্যে বিপক্ষের বক্সে একা গোলকিপারকে সামনে পেয়েও তাতাই একটা বল ক্রশবারে মেরেছে। চিফ কোচের বকুনি খেয়ে দ্বিতীয়ার্ধে সবাই যেন একটু নড়েচড়ে বসেছিল। আর মুম্বাই এফসি দলটাও খেলছিল আল্ট্রা ডিফেন্সিভ গেম। লক্ষ্য ছিল যেনতেন প্রকারেণ ম্যাচটা টাই ব্রেকারে নিয়ে যাওয়া। তারই মধ্যে দ্বিতীয়ার্ধের তিরিশ মিনিটের মাথায় একটা কর্নারে মাথা ছুঁইয়ে দলকে এগিয়ে দিয়েছিল খালেদ। খালেদের ওই একমাত্র গোলেই শেষমেশ মুখরক্ষা হলেও চিফ কোচ ডগলাস দ্য সিলভা কোয়ার্টার ফাইনালে দলের খেলায় ভীষণ অখুশি হয়েছিলেন। ছেলেদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন এই রকম খেললে সেমি ফাইনালে চার্চিল ব্রাদার্স অ্যাকাডেমি ছিঁড়ে খাবে। গোলকিপারকে একা পেয়েও ওপেন গোলে বল রাখতে না পারার জন্যে তাতাইকেও বকাঝকা করেছেন চিফ কোচ। তাতাই বুঝতেই পারছে না ওইদিন ম্যাচে কেন ওই রকম হলো। চিফ কোচ পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন ছেলেরা সেদিন মুম্বাই এফসি-কে হালকাভাবে নিয়ে ফেলেছিল। কনফিডেন্স থাকা ভাল কিন্তু বিপক্ষকে কমা ভেবে ওভার কনফিডেন্ট হওয়াটা যে কতটা মারাত্মক হতে পারে সেটা তাতাই সেদিন হাড়েহাড়ে টের পেয়েছে। ও কোচদের কথা দিয়েছে সেমি ফাইনাল ম্যাচে আর ওই রকম ভুল আর করবে না।

ফতোরদা ওরফে নেহরু স্টেডিয়ামে মোহনবাগান অ্যাকাডেমি সেমি ফাইনালে মুখোমুখি হবে লোকাল জায়েন্ট চার্চিল ব্রাদার্সের। সকালেই তাতাইকে ফোনে পাপা বলেছে আজ যদি ম্যাচটা জিতে ওরা ফাইনালে উঠতে পারে তাহলে মমকে নিয়ে গোয়া আসবে। জীবনে প্রথমবার স্টেডিয়ামে বসে মোহনবাগানের হয়ে গলা ফাটাবে আপাদমস্তক ইস্টবেঙ্গলী অনিমেষ সেনগুপ্ত। ওর খেলার জন্যে পাপা যে নিজের চরিত্র বিরোধী যে কোনো কাজ করতে পারে সেটা এতদিনে তাতাই জেনে গেছে। কিন্তু ওর খেলা দেখতে মম’ও যে স্টেডিয়ামে বসতে পারে তা ওর কাছে অকল্পনীয় ছিল। আজ ওকে জিততেই হবে। আজ ওর নিজের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার দিন। ওর প্রফেশনাল ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নকে সফল করতে মম ওকে ঘিরে নিজের মনে তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নকে ত্যাগ করে যে ভুল করেনি সেটা তাতাইকে প্রমাণ করতেই হবে। ওকে নিয়ে মমকে গর্বিত হতে দেখলে ওর থেকে বেশি খুশি দুনিয়ায় আর কেউ হবে না।

চার্চিল ব্রাদার্স বেশ তৈরি টিম। তার ওপর স্টেডিয়ামে উপস্থিত সব দর্শকই গলা ফাটাচ্ছে লোকাল টিমের হয়ে। চিফ কোচ প্র্যাকটিসের সময়ই তাতাইদের বলেছিলেন চার্চিলের এই টিমটা আন্ডার ফর্টিন থেকে এক সঙ্গে চার বছর খেলছে। ছুটছাট দু’একটা ছাড়া সব প্লেয়ারই দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলছে। তাই প্লেয়ারদের মধ্যে বোঝাপড়াটা ভীষণ ভাল। গত বছর জুনিয়ার আই-লিগে এরাই তিন গোল মেরেছিল মোহনবাগানকে। গত বছরের সেই দলের সাত আটটা প্লেয়ার এই টিমেও আছে। মোহনবাগান টিমের প্লেয়ারদের সম্বন্ধে ওদের কোচ যে ভালোই হোম ওয়ার্ক করেছে সেটা খেলার শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছে। তাতাই-এর পেছনে শুরু থেকেই কড়া ম্যান মার্কিং রেখেছে বিপক্ষের কোচ। একজন তাগড়াই চেহারার ডিফেন্ডার বলই ধরতে দিচ্ছে না তাতাইকে। ওর শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়ছে বারবার। হরেন বল পায়ে ওর স্বভাবসিদ্ধ ডান প্রান্তিক দৌড়ও দিয়েছে কয়েকটা। ক্রশও ভাসিয়েছে বিপক্ষের বক্সে। কিন্তু তাতাই তো বটেই চার্চিলের দুই লম্বা লম্বা স্টপারকে এড়িয়ে তাতে মাথা ছোঁয়াতে পারেনি খালেদ অথবা বারবার বিপক্ষের বক্সে উঠে আসা কুণালও। ঘরের মাঠে উজ্জীবিত চার্চিল ব্রাদার্সই বরং প্রথমার্ধে দু’তিনটে সহজ সুযোগ তৈরি করে ফেলেছিল। কিন্তু অরিন্দমের দুটো অসাধারণ সেভ আর একটা ক্ষেত্রে জ্যাকসনের তৎপরতায় প্রথমার্ধটা গোলশূন্যই থেকে গেল।

হাফ টাইমে চিফ কোচ ডগলাস দ্য সিলভা প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে বুঝিয়ে দিলেন কার কোথায় কোথায় ভুল হয়েছে অথবা দ্বিতীয়ার্ধে কাকে কী করতে হবে। তাতাইকে একটু পেছন থেকে খেলতে বললেন চিফ কোচ। প্রয়োজনে মাঝ মাঠে নেমে আসুক। তাতে করে বিপক্ষের কোচ যে ছেলেটাকে ওর পেছনে ম্যান মার্কিং-এ রেখেছে সে’ও একটু ঘাবড়ে যাবে। আজকের ম্যাচটা জিতে ফাইনালে পৌঁছনো যে টিমের প্রত্যেকটা প্লেয়ারের জন্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা বুঝিয়ে দিতেই ক্লাবকর্তা দেবাশীষস্যার জানিয়ে দিলেন এই টুর্নামেন্টের নক-আউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচ ক্লোজ মনিটরিং করছে ইণ্ডিয়া আন্ডার সিক্সটিন টিমের দু’জন স্পটার। ওঁর কথার খেই ধরেই সহকারী কোচ মৃদুলস্যার প্লেয়ারদের শোনালেন ওঁর প্রিয় কোচ অমল দত্ত’র গল্প। শোনালেন ইন্ডিয়া ক্যাম্পে ওঁদের প্রথম দলের পাঁচজন প্লেয়ার চলে গেলেও ভাঙাচোরা টিম নিয়ে ফেডারেশন কাপ ফাইনালে ওঁরা কিভাবে হারিয়েছিল পূর্ণ শক্তির সালগাঁওকার স্পোর্টস ক্লাবকে। মৃদুলস্যারের গল্প শুনতে শুনতে ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত এক উত্তেজনা অনুভব করছে তাতাই। টিমের বাকি ছেলেদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে হঠাতই যেন প্রথমার্ধের ন্যাতানো ভাবটা উধাও। দ্বিতীয়ার্ধে চার্চিল ব্রাদার্সকে ওদের নিজেদের মাঠেই উড়িয়ে দেবে প্রতিজ্ঞা করে মাঠে নামলো মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমির প্রতিটি প্লেয়ার।

দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হলো। খেলা পাঁচ সাত মিনিট গড়াতেই বোঝা যাচ্ছে প্রথমার্ধের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে বিপক্ষের থেকে পিছিয়ে পড়া মোহনবাগানের সঙ্গে দ্বিতীয়ার্ধের মোহনবাগানের ফারাকটা। স্টেডিয়ামের দর্শকদের প্রবল বিরোধিতা এমনকি রেফারির স্থানীয় দলকে টেনে খেলানোর প্রবণতাকে উপেক্ষা করে সারা মাঠে দাপিয়ে বেড়াতে লাগল মোহনবাগানের টগবগে এগারো জন। চিফ কোচের কথামত তাতাই নেমে এসেছে মাঝমাঠ বরাবর। দ্বিতীয়ার্ধের মিনিট পনেরোর মাথায় সুশোভনের বাড়ানো বল নিজেদের দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের একটু সামনে বিপক্ষের গোলের দিকে পিছন করে দাঁড়ানো তাতাই-এর পায়ে পড়ল। ও একটা হাফ টার্ন নিতেই দেখল সামনে বেশ কিছুটা উন্মুক্ত জমি। অনেকটা নিচে নেমে আসায় ওর ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে না বিপক্ষের সেই মার্কারটা। তীব্র গতিতে বল পায়ে এগোতে এগোতে বিপক্ষের ডি-বক্সের পাঁচ’ছ গজ আগেই তাতাইয়ের শরীরের ভেতর ঢুকে ওকে আটকাতে চাইল সেই মার্কারটা। কিন্তু ওকে যে কিছুতেই ওর কাছাকাছি এসে ট্যাকল করতে দেবেনা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল তাতাই। মার্কারটা ওর দিকে এগোতেই ওই তীব্র গতিতেই তাতাই-এর হালকা বডিফেন্ট আর বাঁপায়ের ম্যাজিক্যাল টাচে ও স্লাইডিং ট্যাকল করে বসলো। আর ঠিক এটাই যেন চাইছিল তাতাই। বাঁ’পায়ের বুটের ডগা দিয়ে আলতো চিপ করে মার্কারের বাড়ানো পায়ের ওপর দিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাওয়া বলটা ধরে একটু এগোতেই তাতাই-এর নজরে পড়ল ওর সমান্তরালে ডানদিক দিয়ে উঠে আসছে হরেন। ইতিমধ্যে একই সঙ্গে বিপক্ষের রাইট ব্যাক আর রাইট স্টপার এসে পড়েছে তাতাই-এর ফুট খানেকের মধ্যে। আর সময় নষ্ট না করে তাতাই ওর সমান্তরালে উঠে আসা হরেনের সঙ্গে ওয়াল পাস খেলতেই খুলে গেল বিপক্ষের গোলমুখ। হরেনের বাড়ানো ওয়াল পাস বিপক্ষের স্টপার আর সাইড ব্যাকের মাঝখান দিয়ে ছিটকে বেরনো তাতাই-এর পায়ে পড়লেও ততক্ষণে এগিয়ে এসে গোলমুখ ছোট করে দিয়েছে বিপক্ষের গোলকিপার। এক মুহূর্ত বলটা হোল্ড করতেই তীব্র গতিতে দৌড়ে এলো গোলকিপার। তাতাই’ যেন এটাই চাইছিল। বাঁ’পায়ের আউট সাইডের আলতো টোকায় গোলকিপারকে ডজ করে বাঁপায়ের ইনসাইড দিয়ে পুশ করতেই বল জড়িয়ে গেল জালে। হঠাত নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া স্টেডিয়ামের মাথায় ইলেকট্রনিক স্কোর বোর্ড জানিয়ে দিলো মোহনবাগান এগিয়ে গেছে এক-শূন্য গোলে।

তাতাই-এর গোলটাই যেন ছিন্নভিন্ন করে দিলো চার্চিল ব্রাদার্সের সমস্ত মনোবল। এর পরের মিনিট কুড়ি সারা মাঠ যেন শুধুই মোহনবাগান। সুশোভন-হরেন-তাতাই-এর যুগলবন্দীতে যেন মুহুর্মুহু ফুল ফুটছে নেহরু স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায়। হরেনের একটা আর তাতাই-এর দ্বিতীয় গোলের কল্যাণে মোহনবাগান এগিয়ে গেছে তিন-শূন্য গোলে। মাঠের কিছু নিখাদ ফুটবল প্রিয় দর্শক ততক্ষণে হাততালি দিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করেছে মোহনবাগানকে। খেলার শেষ মিনিটে চার্চিল ব্রাদার্সের একটা সান্ত্বনা গোলের মাধ্যমে খেলা শেষ হল মোহনবাগানের অনুকূলে তিন-এক গোলে।

খেলা শেষে ম্যান অফ দ্য ম্যাচের কাপটা হাতে ধরেই ভীষণ উত্তেজিত গলায় তাতাই ফোন করলো,

- “হ্যালো পাপা, উই আর ইন ফাইনাল। আমি আজ দু’গোল মেরেছি। আমিই আজ ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। তোমরা কবে আসছো…”

আনন্দে যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে অনিমেষ। কয়েক দিন আগেই ডিম ফুটে বেরোনো ওর স্বপ্নে দেখা বাজপাখিটা যেন ডানা মেলতে শুরু করেছে। প্রথমবার ওর তাতাই খেলবে কোনো সর্বভারতীয় টুর্নামেন্টের ফাইনালে। গলায় দলা পাকানো আনন্দাশ্রুকে কোনোমতে ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় উত্তর দিলো অনিমেষ,

- “আমি এখুনি ফ্লাইট টিকিট করতে বসছি। টিকিট যদি ঠিকঠাক দামে পেয়ে যাই তাহলে কাল অথবা পরশুই আসছি। তোদের ফাইনাল ম্যাচ তো তিন দিন পরে, তাই না?”

- “হ্যাঁ, তিনদিন পরে। কিন্তু পাপা এই আনন্দের মাঝেও তোমার জন্যে একটা ব্যাড নিউজ আছে। কাল তোমার টেনশন বেড়ে যাবে বলে তোমাকে বলিনি।”

তাতাই-এর হেঁয়ালি করে বলা কথাগুলোর মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না অনিমেষ। বিস্মিত গলায় ওকে জিজ্ঞেস করল,

- “তোরা ফাইনালে খেলবি এরপর আমার আর কী ব্যাড নিউজ থাকতে পারে?”

- “ওই সন্দীপরাও, ইয়ে মানে ইস্টবেঙ্গলও ফাইনালে উঠেছে। তোমার ছেলের গোলে তোমার সাধের ক্লাব ইস্টবেঙ্গলের হার স্টেডিয়ামে বসে দেখতে কষ্ট পাবে না তো?”

তাতাই-এর কথা শুনে মুচকি হেসে “এই নে, তোর মায়ের সঙ্গে কথা বল” বলেই সোফায় পাশে বসা সৌমির হাতে মোবাইলটা দিয়ে মায়ে ছেলের কথা শুনতে শুনতে কল্পনায় প্রিয় দল ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে ছেলের হয়ে গলা ফাটাতে নেহরু স্টেডিয়ামে পৌঁছে গেল পাঁড় ইস্টবেঙ্গলী অনিমেষ সেনগুপ্ত।

তেরো
—-

আজ ফাইনাল ম্যাচে মাঠে দর্শক সংখ্যা স্বাভাবিক ভাবেই সেমি ফাইনাল ম্যাচের থেকে কম। লোকাল সব টিম বিদায় নিয়েছে। ফাইনালে মুখোমুখি কোলকাতার দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গলের ক্ষুদেরা। হোক না ক্ষুদে তবুও তো গায়ে প্রিয় দলের জার্সি। মাঠে উপস্থিত হাজার তিনেক দর্শকের মধ্যে কয়েকজনের হাতে ইতিউতি ভাবে নজরে পড়া প্রিয় দলের লাল-হলুদ অথবা সবুজ-মেরুন পতাকা অথবা ব্যানার দেখে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে ফারাকটা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। সুদূর গোয়াতেও প্রিয় দলের তাও আবার জুনিয়ার টিমের খেলা দেখতেও হাজির হওয়া এত সমর্থক দেখে অবাকই হচ্ছে তাতাই। কিক-অফ স্পটে বলের ওপর পা রেখে একবার স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্সের দিকে তাকাল তাতাই। ও জানে আজ জীবনে প্রথমবার দর্শকের আসনে ওর মমও বসে আছে। অতদূর থেকে অনেক চেষ্টা করেও তাতাই ওর মমকে দেখতে পেলো না। রেফারি হুইসল বাজাতেই বুটের ডগা দিয়ে তাতাই বলটাকে সামনে দাঁড়ানো হরেনের দিকে এগিয়ে দিতেই শুরু হল ম্যাচ।

এই টুর্নামেন্টের অন্যান্য ম্যাচের মতোই এই ম্যাচেও শুরু থেকেই কী রকম যেন গা ছাড়া ভাব মোহনবাগানের। আসলে ইস্টবেঙ্গলের এই প্রায় পুরো টিমটাই গত বছর জুনিয়র আই লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সন্দীপের মতো দু’একজন ছাড়া প্রায় সব প্লেয়ারই ছিল গত বছরের স্কোয়াডে। অন্য দিকে মোহনবাগান টিমের গোলে অরিন্দম ডিফেন্সে সঞ্জয় জ্যাকসন আর মিডফিল্ডে কুণাল ছাড়া সেইভাবে সর্ব ভারতীয় টুর্নামেন্ট খেলার অভিজ্ঞতা আর কারোরই নেই। খেলার আগে টিম মিটিং-এ এই কথাটা প্লেয়ারদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ফলস্বরূপই বোধহয় মোহনবাগানের পুরো টিমটাই যেন হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করেছে। কেমন যেন খেলার আগেই হেরে বসেছে। প্রথম দশ পনেরো মিনিটেই ইস্টবেঙ্গলের প্রেসিং ফুটবলে টলোমলো হয়ে গেল মোহনবাগানের পুরো ডিফেন্স। মোহনবাগানের মাঝমাঠ বলে এখন কিছু আর নেই। মাঝমাঠে একা সুশোভন ছাড়া বাকি সবাই ঘুরঘুর করছে নিজেদের গোল বক্সের আশেপাশে। ইস্টবেঙ্গলের গোলকিপার আর দুই স্টপার ছাড়া সবাই প্রায় মোহনবাগানের অর্ধ উঠে গেছে। এরই মধ্যে অরিন্দম অসাধারণ দক্ষতায় দু’তিনটে অসাধারণ সেভ না করলে পিছিয়ে পড়ত মোহনবাগান। খেলার ঠিক বাইশ মিনিটের মাথায় ইস্টবেঙ্গলের লেফ্ট হাফের একটা কর্নার কিক ভেসে এলো মোহনবাগান বক্সে। জটলার মধ্যে জ্যাকসন লাফিয়ে উঠে বলটা ক্লিয়ার করতেই বল গিয়ে পড়ল নিজেদের ডি-বক্সের একটু আগে নিজেদের গোলের দিকে মুখ করে দাঁড়ানো সুশোভনের পায়ে। ওর ঘাড়ের কাছে তখন নিশ্বাস ফেলছে ইস্টবেঙ্গলের দুজন প্লেয়ার। পায়ে বল পড়তেই একটা হাফটার্ন নিয়ে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভেবে দৌড় শুরু করল সুশোভন। সামনে ফাঁকা জমি আর বল নিজের পায়ে থাকলে সুশোভনকে রোখা কতটা কঠিন তাতাই এই ক’মাসে ভাল করেই জেনে গেছে। ও কয়েক ফুট এগোতেই ততক্ষণে ওভার ল্যাপে উঠে আসা ডিফেন্ডারও প্রায় ধরে ফেলেছে ওকে। সুশোভনের পায়ে বল পড়তেই হরেন ওর পরিচিত ডান প্রান্তিক দৌড় শুরু করল। ওভার ল্যাপে উঠে আসা ইস্টবেঙ্গলের দুই উইং ব্যাকও দ্রুত পজিশন নিতে দৌড়চ্ছে। সবাই যখন ধরেই নিয়েছে সুশোভন রাইট উইং বরাবর বল বাড়াবে হরেনকে ঠিক তখনই আনপ্রেডিক্টেবল সুশোভনের পা থেকে বেড়িয়ে আসা ফরোয়ার্ড পাশ এগিয়ে এলো তাতাইয়ের দিকে। ওই বলটা বাড়িয়েই লেফ্ট উইং দিয়ে দৌড়তে শুরু করল সুশোভন। তাতাই-এর দু’দিকে তখন ইস্টবেঙ্গলের স্টপার আর রাইটব্যাক যেন ওকে গিলে খেতে উদ্যত। ওদের সঙ্গে বডি কন্টাক্টে পেরে উঠবে না বুঝেই বলটা রিসিভ না করে ডান পায়ের আউট স্টেপ দিয়ে আলতো টাচ দিয়ে টার্ন করে বিপক্ষের বক্সে ঢুকতেই সুশোভনের ফিরতি বল আবার তাতাই-এর পায়ে। এতক্ষণ ধরে ঝিমিয়ে থাকা মোহনবাগান সমর্থকদের মধ্যে যেন হঠাত সুনামি উঠল। সমর্থকদের তুমুল উল্লাসের মধ্যেই বল পায়ে এগোতে এগোতেই তাতাই-এর মনে পড়ল ওকে অ্যাকাডেমিতে ছেড়ে আসার দিন মমের সজল চোখ দুটো। ওর দিকে দ্রুত এগিয়ে আসা ইস্টবেঙ্গলের গোলকিপারকে ডান পায়ে আউট সাইড ডজ করে বলটা গোলে ঠেলে দিয়ে মনেমনে “মম! ইট’স ফর ইউ” আওড়াতে আওড়াতে গোললাইন টপকে দু’হাত ছড়িয়ে চোখ বুজল তাতাই। সমর্থকদের প্রবল চিৎকার আর তাতাইকে জড়িয়ে ধরে সতীর্থদের আদরের অত্যাচারের মাঝেই জায়ান্ট স্কোরবোর্ডে ফুটে উঠল মোহনবাগান-১ ইস্টবেঙ্গল-০।

একটা গোল পেয়ে যেতেই সমস্ত রকম হীনমন্যতা ঝেড়ে ফেলে যেন গা ঝাড়া দিয়ে উঠল মোহনবাগানের পুরো টিমটা। তাতাই-এর চোখ ধাঁধানো গোলটার পরে টিমের প্রতিটা প্লেয়ার যেন অনুভব করতে শুরু করেছে অতীত গৌরবের কাছে মাথা নত না করে নিজের সেরাটা দিতে পারলে জয় আসবেই। গোলটা পেয়ে হঠাতই যেন আত্ম বিশ্বাসে ফুটতে শুরু করেছে মোহনবাগানের প্রতিটা প্লেয়ার। মাঝমাঠে কুণাল আর সুশোভন খেলাটা ধরতেই আবার স্বাভাবিক ছন্দে মোহনবাগান। দু’দলের আক্রমণ প্রতি-আক্রমণে খেলাটা জমলেও কোনো দলই আর গোল করতে পারল না। হাফটাইমে ডাগ আউটে চিফ কোচকে ঘিরে দাঁড়াল তাতাইরা। তাতাই-এর পিঠ চাপড়ে “ওয়েল ডান সৌম্য” বলে প্লেয়ারদের ভুলভ্রান্তিগুলো বিশ্লেষণ করতে শুরু করলেন কোচ। ডগলাস দ্য সিলভা বলে চলেছেন দ্বিতীয়ার্ধে টিমের কে কোন দায়িত্ব পালন করবে। তাতাই চিফ কোচের দিকে তাকিয়ে থাকলেও শুধু ওঁর ঠোঁট নাড়ানোই দেখছে। ওঁর মুখ থেকে বেরোনো একটা শব্দও কানে ঢুকছে না তাতাই-এর। ওর মনটা পৌঁছে গেছে ভিআইপি বক্সে বসা মম আর পাপার কাছে। চিফ কোচের কথা শেষ হতেই ওর ঘামে ভেজা জার্সির তলাটা দিয়ে মুখ মুছে সসংকোচে কোচকে জিজ্ঞেস করল,

- “স্যার ক্যান আই মিট মাই মম অ্যান্ড ড্যাড ইন ভিআইপি বক্স?”

- “ইয়েস মাই ডিয়ার। গো অ্যান্ড কাম সুনেস্ট….”

কোচের অনুমতি মিলতেই তাতাই দৌড় দিলো স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্সের দিকে।

ওর ওই ঘামে ভেজা শরীরটাকে বুকে চেপে ধরে কিছুক্ষণের জন্যে যেন পাথর হয়ে গেল সৌমি। ওদের পাশেই দাঁড়ানো অনিমেষ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠল,

- “সবে হাফ টাইম হয়েছে। এখনো খেলা পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাকি আছে। এই সব আদর সোহাগ ন্যাকামিগুলো খেলার শেষে করলে হয় না?”

অনিমেষের টিপ্পনীতে সম্বিত ফিরে পেয়ে মমকে ছেড়ে তাতাই পাপার উদ্দেশ্যে বলল,

- “প্রথম গোলটা মমের জন্যে করেছি বলে মমকে জড়ালাম। পরের গোলটা তোমার জন্যে করে তোমাকেও জড়াবো….”

কথাগুলো বলতে বলতেই আবার মাঠের দিকে দৌড় লাগাল তাতাই। মাঠে ফিরেই দেখল ডাগ আউটের কাছে সবাই জড়ো হয়ে যেন ওর জন্যেই অপেক্ষা করছে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামবে বলে।

দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামার আগে চিফ কোচ পইপই করে সবাইকে বলে দিয়েছেন পিছিয়ে থাকা ইস্টবেঙ্গল কিন্তু কেউটে সাপের মতোই ভয়ঙ্কর। যখন তখন ছোবল মারতে পারে। এক গোলের লিডে আত্মতুষ্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই প্রথম অর্ধের শেষ কুড়ি মিনিট দল যেরকম খেলেছে সেই পেস ধরে রাখতে হবে। মাঝমাঠে কুণাল আর সুশোভনকে বল হোল্ড করে খেলার গতিকে কন্ট্রোল করতে নির্দেশ দিয়ে দলে কোনো পরিবর্তন না করেই ছেলেদের মাঠে পাঠালেন চিফ কোচ ডগলাস দ্য সিলভা।

ইস্টবেঙ্গল টিম দুটো প্লেয়ার পরিবর্তন করে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমেছে। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে সন্দীপকে মাঠে নামতে দেখে তাতাই নিজে থেকেই এগিয়ে গিয়ে ওকে “অল দ্য বেস্ট” উইশ করে এসেছে। প্রত্যুত্তরে স্বভাব ফচকে সন্দীপ “বচনা এ হাসিনোঁ, লো ম্যাঁয় আ গয়া…” গুনগুন করতে করতে ওয়ার্ম আপ শুরু করল ওর টিম মেটদের সঙ্গে।

দ্বিতীয়ার্ধে খেলা শুরু হল ভীষণ গতিতে। মিনিট দশেক যেতে না যেতেই আক্রমণ প্রতি আক্রমণে জমে উঠল ম্যাচ। এক গোলে পিছিয়ে থাকা ইস্টবেঙ্গলও যেমন খেলায় সমতা ফেরাতে মরীয়া ঠিক তেমনই মাত্র এক গোলের লিডে আত্মতুষ্ট না হয়ে লিড বাড়িয়ে জয়কে নিশ্চিত করতে চাইছে মোহনবাগান। সন্দীপের পাশে অনেক ম্যাচ খেলার সুবাদে কনভেনশনাল স্ট্রাইকার মতো বিপক্ষের বক্সেই ঘুরঘুর না করে ওর একটু পিছন থেকে হঠাত উঠে আসার প্রবণতা অথবা ওর ডান পায়ের নিখুঁত শট কিম্বা চোরা গতির কথা তাতাই ডিফেন্ডারদের বলে আসা সত্ত্বেও ওকে বক্সের মাথায় ফাঁকা ছেড়ে রাখার ভুলটা ওরা করেই বসল। মিনিট পঁচিশের মাথায় ইস্টবেঙ্গলের এক মিডফিল্ডারের বাড়ানো থ্রু-পাস ধরে সন্দীপ চকিতে জ্যাকসনকে ডজ করে অরিন্দমকে গোললাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেই ডান পায়ের জোরালো শটে ফলাফলের ব্যবধান মুছে দিলো।

কিক-অফ স্পটে বল বসিয়ে স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদের উপর চোখ বোলাতেই তাতাই-এর নজরে পড়ল ওর পাপা আর মম ভিআইপি বক্স থেকে নেমে এসেছে একেবারে স্টেডিয়ামের লোয়ার স্ট্যান্ডে। তাতাই পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে ওর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে ওরা দুজনেই।

দ্বিতীয়ার্ধের পঁয়ত্রিশ মিনিটের মাথায় মোহনবাগানের একটা কাউন্টার অ্যাটাকে বিপক্ষের বক্সের মাথায় বল পেল হরেন। বলটা রিসিভ করে বিপক্ষের গোলের দিকে ওর ট্রেডমার্ক দৌড় শুরু করতেই ইস্টবেঙ্গলের স্টপার বল ছেড়ে সজোরে লাথি মারল ওর হাঁটুতে। বিপক্ষের বক্সের মধ্যেই যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে হরেন লুটিয়ে পড়তেই রেফারি লম্বা হুইসল বাজিয়ে জানিয়ে দিলেন মোহনবাগানের অনুকূলে পেনাল্টি।

হরেনকে স্ট্রেচারে করে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় ডাগ আউট থেকে চিফ কোচ ইশারায় তাতাইকে ডাকলেন। সহকারী কোচ মৃদুলস্যার ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

- “সৌম্য, পেনাল্টিটা তুই মার…”

আবার গোল খেয়ে যেন আরও তেড়েফুঁড়ে উঠল ইস্টবেঙ্গল। গোলকিপার আর দুই স্টপারকে নিজেদের অর্ধে রেখে প্রায় পুরো টিমকে মোহনবাগান অর্ধে তুলে দিয়ে শেষ কামড় দিতে চাইছেন ইস্টবেঙ্গল কোচ। ইস্টবেঙ্গল গোল শোধে মরীয়া হয়ে প্রথমার্ধের প্রথম পনেরো মিনিটের মতো প্রেসিং ফুটবল খেলতে শুরু করতেই নাভিশ্বাস উঠে গেল মোহনবাগান ডিফেন্সে। গোলে অরিন্দম আর সঞ্জয় জ্যাকসন সমেত বাকি ডিফেন্ডারদের দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের মধ্যেই খেলা শেষ হওয়ার দু’এক মিনিট আগে ইস্টবেঙ্গলের একটা কর্নার-কিক থেকে ভেসে আসা বল হেডে ক্লিয়ার করতে গিয়ে সেমসাইড গোল করে বসল লেফট ব্যাক পারভেজ।

নির্ধারিত নব্বই মিনিট শেষ হল ২-২ গোলে অমীমাংসিত ভাবে। এই টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী নক আউট পর্যায়ে খেলা অমীমাংসিত থাকলে ফলাফল নির্ধারিত হবে টাই ব্রেকারে। দু’দুবার এগিয়ে গিয়েও লিড ধরে রাখতে না পারার জন্যে ভীষণ খারাপ লাগছে তাতাই-এর। কিন্তু খারাপ লেগে তো আর লাভ নেই। তাতাই জানে খেলার অপর নাম লড়াই। হতাশ হয়ে লড়াই থেকে পালানোর ছেলে তাতাই নয়। তাতাই মনে মনে পেনাল্টি শট নেওয়ার জন্যে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। ডাগ আউটে চিফ কোচ ডগলাস দ্য সিলভাকে ঘিরে মোহনবাগানের সব প্লেয়ার। চিফ কোচ একে একে বলে গেলেন কুণাল সঞ্জয় সুশোভন খালেদ আর তাতাই-র নাম। প্রথম পেনাল্টি শট নেবে কুণাল তারপর একে একে সঞ্জয় সুশোভন আর খালেদ। শেষ শট নেবে তাতাই।

টসে জিতে মোহনবাগান ক্যাপ্টেন প্রথমে পেনাল্টি সেভের অপশন নিতেই অরিন্দম দাঁড়ালো গোলের নিচে। ইস্টবেঙ্গলের হয়ে সন্দীপ প্রথম শটে অরিন্দমকে নড়তে না দিয়ে ইস্টবেঙ্গলকে ১-০ গোলে এগিয়ে দিলো। তারপর একে একে কুণাল সঞ্জয়ের মতোই ইস্টবেঙ্গলের দু’জনও গোল করে গেল। ফলাফল ইস্টবেঙ্গলের অনুকূলে ৩-২। মোহনবাগানের হয়ে তৃতীয় শটে টেনশনের চাপ নিতে পারল না সুশোভন। দুর্বল শটে বল তুলে দিলো ইস্টবেঙ্গলের গোলকিপারের হাতে। ইস্টবেঙ্গলের চতুর্থ শট ডান দিকে ঝাঁপিয়ে অনবদ্য সেভ করল অরিন্দম। আবার আশার আলোয় জ্বলে উঠল মোহনবাগান শিবির। সেই আলোকে আরও উজ্জ্বল করে তুলল খালেদের কপিবুক শট। ইস্টবেঙ্গলের পঞ্চম শুটার গোল করে ফলাফল ৪-৩ করে দিতেই তাতাই-এর পায়ের দিকে তাকিয়ে গোটা মোহনবাগান শিবির আর মাঠের এক দেড় হাজার সমর্থক। পঞ্চম শট নেটে জড়িয়ে দলকে সমতায় ফেরাতেই হবে ওকে। তারপর সাডেন ডেথে যা হওয়ার হবে। বলটা দু’হাতে ধরে পেনাল্টি স্পটে বসিয়ে তাতাই চোখ তুলে দেখল গোলকিপার দু’হাত ছড়িয়ে পজিশন নিয়েছে। কয়েক স্টেপ পিছিয়ে তাতাই স্টেডিয়ামের দিকে তাকাল। এতদূর থেকেও ও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে পাপা দু আঙুল দিয়ে ওকে ভিকট্রি সাইন দেখাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে দৌড়ে বাঁপায়ের ইনস্টেপ দিয়ে শরীরের সব শক্তি পায়ে এনে সজোরে শট নিলো তাতাই। গোলকিপারকে নড়ার সুযোগ না দিয়ে বল ক্রসবারে লেগে ছিটকে যেতেই উল্লাসে ফেটে পড়ল ইস্টবেঙ্গল শিবির। বিপক্ষের প্লেয়ার আর সমর্থকদের উল্লাস আর কান ফাটানো চিৎকারে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ফেলতেই যেন এক চরম শূন্যতা গ্রাস করে নিচ্ছে তাতাই-এর অবসন্ন শরীরটাকে। ইচ্ছে করছে মমকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে। কিন্তু ওর পা দুটো যেন আর শরীরের ভার নিতে পারছে না। হাঁটু গেড়ে বসে ঘাসে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠতেই একটা হাতের স্পর্শে মুখ তুলল তাতাই। দেখল ওর দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে সন্দীপ। সন্দীপের হাত আঁকড়ে উঠে দাঁড়ালো তাতাই। ওর কাঁধে হাত রেখে সন্দীপ বলে উঠল,

- “পেনাল্টিটা মিস করলেও আজ তুই’ই মাঠের সের। প্রাউড অফ ইউ ইয়ার…..”

সন্দীপের সান্ত্বনাবাক্যে যেন কিছুটা ধাতস্থ হলো তাতাই। চিফ কোচ সহকারী কোচ সমেত দলের সবার হতাশ বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে তাতাই-এর’ও ভীষণ হতাশ লাগছে। ধীর পায়ে ও এগিয়ে গেল চিফ কোচ ডগলাস দ্য সিলভার কাছে। ভীষণ সংকোচ মেশানো গলায় বলল,

- “সরি স্যার… আই কুড’নট বি আপ টু ইয়োর এক্সপেক্টেশন……”

- “মাই ডিয়ার আ গেম ইজ অল এবাউট প্লেইং ইট ফেয়ারলি নট অ্যাবাউট উইনিং অর লুজিং। ট্রাই টু লার্ন ফ্রম এভরি ডিফিট। মে গড ব্লেস ইউ…..”

ডগলাস স্যারের কথাগুলো শুনে আর সতীর্থদের দিকে তাকাতে আগের মতো লজ্জা করছে না তাতাই-এর। এরই মাঝে স্টেডিয়ামের সাউন্ড সিস্টেমে ভেসে এলো – “টপ স্কোরার অ্যান্ড বেস্ট প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট.. দ্য ওয়ান্ডার বয় ফ্রম মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমি সৌম্য সেনগুপ্তা….”

ইস্টবেঙ্গলের সব প্লেয়ার যখন ট্রফি হাতে মাঠে ভিকট্রি ল্যাপ দিতে ব্যস্ত তখন সবার অলক্ষ্যে তাতাই উঠে গেছে স্টেডিয়ামে। পাপার হাতে একটা ট্রফি ধরিয়ে বেস্ট প্লেয়ারের ট্রফিটা মমের হাতে দিয়ে তাতাই বলে উঠল,

- “ইট’স অনলি ফর ইউ মম…..”

- “আজ আমার ডবল খুশি। তোর বেস্ট প্লেয়ার আর টপ স্কোরারের ট্রফি হাতে ইস্টবেঙ্গলের ভিকট্রি ল্যাপ দেখছি…..”

অনিমেষের সহাস্যে বলা কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ওর হাত থেকে টপ স্কোরারের ট্রফিটা ছিনিয়ে নিয়ে মমের হাতে দিয়ে কপট রাগ দেখিয়ে তাতাই বলে উঠল,

- “যাও, দুটো ট্রফিই মমের…..”

“স্টিল আই প্রাউড অফ ইউ” বলে অনিমেষ ওকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই অস্ফুট স্বরে “লাভ ইউ পাপা” বলে ডুকরে কেঁদে উঠল তাতাই।

চোদ্দ
—-

গোয়ার টুর্নামেন্ট থেকে ফিরে কলকাতায় নিজের বাড়িতে বসেই তাতাই খবরটা পেলো মোহনবাগান সেইল অ্যাকাডেমির অ্যাডমিনস্ট্রেটিভ অফিসার সৌরভ বসুর ফোন থেকে। পরবর্তী আন্ডার সেভেন্টিন ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ অনুষ্ঠিত হবে পেরুতে। আন্ডার সেভেন্টিন ওয়ার্ল্ডকাপের এশিয়া আঞ্চলিক কোয়ালিফাইং টুর্নামেন্ট হবে মালয়েশিয়ায়। ওই টুর্নামেন্টের মূল পর্বের ষোলটা টিমের অন্যতম ভারতও। টুর্নামেন্টের প্রস্তুতিতে সম্ভাব্য আঠাশ জনকে নিয়ে ছ’মাস ধরে ক্যাম্প চলছে পাতিয়ালার সাই ক্যাম্পাসে। গোয়ার টুর্নামেন্টে স্পটারদের নজরে পড়েছে তাতাই। ওকে অবিলম্বে যোগ দিতে হবে পাতিয়ালার ক্যাম্পে। তার আগে তাতাইকে যেতে হবে দুর্গাপুরের অ্যাকাডেমিতে। ওখান থেকে এআইএফএফের অফিসিয়াল চিঠি নিয়ে কাটতে হবে পাতিয়ালার টিকিট। তাই আর দেরি না করে পরের দিন সকালেই তাতাইকে নিয়ে গাড়িতে দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল অনিমেষ আর সৌমি।

দুর্গাপুরে অ্যাকাডেমিতে পৌঁছে অ্যাডমিনস্ট্রেটিভ অফিসারের সঙ্গে কথা বলে অনিমেষের একেবারে কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থা। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে মালয়েশিয়ায় কোয়ালিফাইং টুর্নামেন্ট। তাতাই-এর হাতে মাত্রই মাস খানেক সময়। দু’দিন পরেই তাতাইকে নিয়ে পাতিয়ালার ফ্লাইটে চড়ে বসল অনিমেষ আর সৌমি।

পাতিয়ালা সাই ক্যাম্পাস দেখে তাতাই-এর মতোই ভীষণ খুশি সৌমি আর অনিমেষও। পাতিয়ালার সাই ক্যাম্পাসটা মোটেও গোয়ার মত নয়। প্লেয়ারদের থাকার ব্যবস্থা বেশ ভাল। এক একটা ঘরে দুজনের থাকার ব্যবস্থা। ঘরগুলো এয়ার কন্ডিশনডও। সৌমি আর অনিমেষ একটা রাত ছিল ক্যাম্পাসের গেস্ট হাউসে। ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে খাবারের মানও বেশ ভাল। যাওয়ার সময় প্রত্যাশা মতোই কলকাতায় ফেরার জন্যে বিদায় নেওয়ার সময় সৌমি ছলছলে চোখে তাতাইকে শুধুই জড়িয়ে ধরেছিল। কিছুই বলতে পারেনি। তাতাই-এর কাঁধে হাত দিয়ে অনিমেষ শুধু বলেছিল,

- “গোল্ডেন অপরচুনিটি জীবনে দু’একবারই আসে। সুযোগের প্রপার ইউটিলাইজেশনই ফারাক করে দেয় চ্যাম্পিয়ন আর লুজারের মধ্যে। তুই উনত্রিশ জনের মধ্যে আছিস কিন্তু আমি তোকে বাইশ জনে তো বটেই এমনকি ফার্স্ট ইলেভেনেই দেখতে চাই। অল দ্য বেস্ট…..”

দিন সাতেক হয়ে গেল তাতাই ক্যাম্পে আছে। ক্যাম্পে ও আস্তে আস্তে মানিয়ে নিতেও শুরু করেছে। এই ক’দিনেই ও যে চিফ কোচ বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজের নজর কেড়েছে সেটাও বুঝতে পারছে। ক্যাম্পে মোট আট জন ফরোয়ার্ড আছে। তার মধ্যে পাঁচজন আসবে প্রথম বাইশে। ক্যাম্পে তাতাই ছাড়া আর একজনই বাঙালি আছে। মিডফিল্ডার অয়ন দাস। ক্যাম্পে মণিপুরের ছেলেদেরই প্রাধান্য। মোট চারজন মণিপুরের। এছাড়া মিজোরামের দু’জন ছাড়াও পাঞ্জাব গোয়া মহারাষ্ট্র থেকেও কয়েক জন আছে। তবে প্র্যাকটিসে কেরালার বিজয়ন নামের একটা প্লেয়ারকে তাতাই-এর ভীষণ ভাল লেগেছে। ঠিক যেন হরেনের কার্বন কপি। খেলার স্টাইল থেকে শুরু করে ওর গ্রাম্য সরলতা দেখে তাতাই-এর মনে হয় যেন আরেকটা হরেন মান্ডি। তাতাই ছাড়া ক্যাম্পের বাকি আঠাশ জনেরই ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা আছে। একমাত্র তাতাই’ই আছে যার দেশের হয়ে ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ তো দুরের কথা নিজের রাজ্য দলের হয়ে খেলারও অভিজ্ঞতা নেই।

দিন পনেরো প্র্যাকটিসের পর সদ্য আই-লিগ জয়ী মিনার্ভা পাঞ্জাবের সঙ্গে একটা ফ্রেন্ডলি ম্যাচে ৩-১ গোলে হারলেও দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে দলের হয়ে একমাত্র গোলটা করতে পেরে তাতাই ভীষণ খুশি। রাতে ফোন করে মম আর পাপার সঙ্গে ভাগও করে নিয়েছে মনের ভেতর চেপে রাখা আনন্দটা। তিন দিন পরেই হবে ফাইনাল ট্রায়াল। একটা প্র্যাকটিস ম্যাচে ক্যাম্পের উনত্রিশ জনকে দুটো দলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলিয়ে বেছে নেওয়া হবে বাইশ জনের স্কোয়াড। দলের বাকিদের ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচের অভিজ্ঞতার কথা শুনে প্রথম প্রথম একটু হীনমন্যতায় ভুগছিল তাতাই। এই দলের অনেকেই ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলতে দুবাই ঢাকা এমনকি পর্তুগালও গেছে। পর্তুগালে নাকি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পায়ের ছোঁয়া লাগা মাঠে ফুটবলও খেলেছে। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় মম আর পাপার সঙ্গে তাতাই একবার ব্যাঙ্কক পাটায়া ঘুরতে গেছিল। তাতাই-এর একমাত্র বিদেশ ভ্রমণ সেটাই। তবে মিনার্ভা পাঞ্জাবের সিনিয়র টিমের বিরুদ্ধে ওই গোলটা পেয়ে তাতাই-এর আত্মবিশ্বাসটাও বেড়েছে। ম্যাচের পরে চিফ কোচের পিঠ চাপড়ানির স্পর্শটা অনুভব করলেই বাইশ জনের দলে ওর সিলেকশনের ব্যাপারে আশাটা আরও বেড়ে যায়। তবুও নিশ্চিত হতে পারে না। ক্যাম্পের সব প্লেয়ারই বেশ দক্ষ। বিশেষ করে কেরালার বিজয়নের বল কন্ট্রোল অথবা মণিপুরের তোম্বার উইথ দ্য বল স্পিড কিম্বা পাঞ্জাবের গুরমিতের চেহারা হাইট আর দু’পায়ের শট দেখে তাতাই-এর টেনশন বেড়ে গেছে। তবুও তাতাই হাল ছাড়তে রাজি নয়। পরের দুদিন ভীষণ মন লাগিয়ে ট্রেনিং-এর ফাঁকেই এসে গেল সেই রাতটা, যে রাতটা পেরলেই ঘোষণা করা হবে মালয়েশিয়াগামী বাইশ জনের স্কোয়াড।

মম আর পাপার সঙ্গে অনেকক্ষণ ফোনে কথা বলে সাময়িক একটু হালকা লাগলেও মনের ভেতর যে চাপা টেনশনটা রয়েই গেছে সেটা বুঝতে পারল শুয়ে পড়ার পর। এমনিতে অন্য দিন হলে ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় ছোঁয়াতেই দুচোখ বুজে আসে। কিন্তু আজ কিছুতেই ঘুম আসছে না। টিমের ক্যাপ্টেন হিসেবে গোয়ার মিডফিল্ডার হেনরি মেঞ্জেসের নাম আগেই ঘোষণা করেছে এআইএফএফ। বাকি একুশ জনের ভাগ্য ঝুলে আছে ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের হাতে। চিফ কোচের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে তাতাই বুঝতে পারছে পাঁচ ফরোয়ার্ডের মধ্যে বিজয়ন তোম্বা আর গুরমিত প্রথম বাইশে আসবেই। বাকি দু’জনের একজনও কি তাতাই হতে পারবে না? প্রচণ্ড টেনশনের মধ্যেই পাশ ফিরে দেখল ওর রুম পার্টনার বিজয়ন নাক ডাকিয়ে নিশ্চিত ঘুম দিচ্ছে। মাথার বালিশের নিচে রাখা মোবাইলে দেখল বারোটা বেজে গেছে। কাল সকালে প্র্যাকটিস নেই। কিন্তু ঠিক দশটায় চিফ কোচের থিওরিটিক্যাল ক্লাসে যেতেই হবে। মালয়েশিয়াগামী বাইশ জনের নামের তালিকা সম্বলিত অফিসিয়াল নোটিশ ফেডারেশনের ওয়েব সাইটে আপলোড করাও হবে সকাল দশটায়। টেনশনের মধ্যেই তাতাই-এর ক্লান্ত চোখে কখন ঘুম নেমে এসেছে ও নিজেও জানতে পারেনি।

আজ ঘুম ভাঙতেই সকাল সাড়ে আটটা। বাথরুম মুখধোয়া সেরে ট্র্যাক স্যুট আর স্পোর্টস শু গলিয়ে ব্রেকফাস্ট টেবিলে পৌঁছতে পৌঁছতেই প্রায় সাড়ে ন’টা। এই সময়টাতে ক্যান্টিনের কাউন্টারে লাইন পড়ে যায়। সবারই ভীষণ তাড়া। মিনিট দশেক পরে কোনো মতে একটা ট্রে’তে দু’পিস পাউরুটি একটা কলা এক গ্লাস মিক্সড ফ্রুট জুস আর দুটো ডিমসেদ্ধ নিয়ে টেবিলে বসল তাতাই। মিনিট পাঁচেকেই সবকিছু গলাধঃকরণ করে এক চুমুকে ফ্রুট জুসটা শেষ করে ক্লাসরুমের দিকে দৌড় দিল তাতাই। দশটা বাজতে আর মিনিট দুয়েক বাকি আছে। এক দৌড়ে রুমে ঢুকে প্রচণ্ড হাঁপাতে হাঁপাতেই তাতাই-এর নজরে পড়ল মোটামুটি সকলেই এসে গেছে। মহারাষ্ট্রের একটা ছেলের দিকে তাকিয়ে “হাই” বলে পেছনের সিটে ওর পাশেই বসে পড়ল তাতাই। ও বসতে না বসতে ক্লাসের সামনের দিকের অনুচ্চ কাঠের ডায়াসের ওপর রাখা টেবিলে নিজের ল্যাপটপটা রেখে কথা বলতে শুরু করলেন চিফ কোচ বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজ। উনি কথা বলতে বলতেই টেকনিশিয়ান ল্যাপটপ আর প্রজেক্টার সেট করে ফেলতেই পিছনের বড় স্ক্রিনে ফুটে উঠল এআইএফএফের ওয়েব সাইটের হোমপেজ। চিফ কোচের কথার মধ্যেই তাতাই লক্ষ্য করে চলেছে সাইটের বিভিন্ন অপশন ঘেঁটে ততক্ষণে বেরিয়ে পড়েছে সেই বহুপ্রতীক্ষিত এআইএফএফের নোটিশটা। এক ঝলকেই তাতাই দেখে নিয়েছে তালিকার উনিশ নম্বরে লেখা ‘সৌম্য সেনগুপ্ত’। ততক্ষণে নিজের ট্র্যাকস্যুটের পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে নির্বাচিত প্লেয়ারদের নাম বলতে শুরু করেছেন চিফ কোচ। নির্বাচিত গোলকিপারদের দিয়ে শুরু করে একে একে ডিফেন্ডার আর মিডফিল্ড টপকে ফরোয়ার্ড লাইনে পৌঁছে গেছেন চিফ কোচ। উনি বলে চলেছেন,

- অ্যান্ড ইন ফরোয়ার্ড লাইন, গুরমিত সিং.. সৌম্য সেনগুপ্তা….”

বাইশ জনের স্কোয়াড ঘোষণা করে চিফ কোচ জানিয়ে দিলেন আজ ক্লাস এখানেই শেষ। প্রত্যেকেই যেন উশখুশ করছে ক্লাস থেকে বেরিয়ে কখন বাড়িতে ফোন করবে। কোচ ঘর ছাড়তেই ফেডারেশন কো-অর্ডিনেটর জানিয়ে দিলেন সবাই বিকেলের মধ্যে নিজের নিজের পাসপোর্ট জমা করবে অফিসে। টিম দিল্লি থেকে কুয়ালালামপুরের ফ্লাইট ধরবে পনেরোই সেপ্টেম্বর।

ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে প্রথমেই ফোন করল তাতাই। পাপা যেন এই কলটারই অপেক্ষা করছিল। দু’বার রিং হতেই কলটা রিসিভ করেই অনিমেষ “কনগ্র্যাটস…” বলতেই তাতাই বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করল,

- “কি করে জানলে?”

- “তোর মা বলল। তুই জানিস না তোর মম সব জানে?”

অনিমেষের ঠাট্টা শুনেই তাতাই পাল্টা প্রশ্ন করল,

- “তুমি অফিসে আছো, না? মমের সামনে তো তোমার এতো হিম্মত হওয়ার কথা নয়। এটা মম শুনলে তোমার মাথায় হাতুড়ি ঠুকে দিতো…”

তাতাইকে চমকে দিয়ে পাপার নয়, মমের গলা ভেসে এলো,

- “অন্য দিন হলে তাই দিতাম। আজ তোর সিলেকশনের আনন্দে অফিস কামাইয়ের অ্যাপ্লিকেশনও অ্যাপ্রুভ করেছি আর আমাকে নিয়ে ইয়ার্কি মারাও…..”

- “হ্যাঁ, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আমার সিলেকশনের খবরটা আমি বলার আগেই তোমরা কী করে পেলে?”

তাতাই-এর বিস্মিত কৌতূহলকে নিবৃত করতেই সৌমি হেসে উত্তর দিলো,

- “কাল রাতে তুই’ই তো বললি সকাল দশটায় ফেডারেশনের সাইটে সিলেক্টেড প্লেয়ারদের নাম দিয়ে নোটিশ আপলোড করবে। আর শুধু পাতিয়ালাতেই নয় কলকাতা থেকেও ফেডারেশনের সাইট অ্যাকসেস করা যায়”

- “যাহ্! সারপ্রাইজটা দিতে পারলাম না। তবে আরেকটা খবর তোমরা জানো না। ফিফটিন্থ সেপ্টেম্বার। দিল্লি থেকে আমাদের ফ্লাইট উড়ে যাবে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশ্যে…”

তাতাই-এর কথার খেই ধরে অনিমেষ আর সৌমি উড়তে শুরু করেছে তাতাই-এর কাল্পনিক ডানায় ভর করে।

পনেরো
——

ইন্ডিয়ান আন্ডার সিক্সটিন স্কোয়াডের চিফ কোচ সহকারী কোচ টিম ফিজিশিয়ান এবং তিন জন অফিসিয়াল সমেত বাইশজন প্লেয়ার চেপে বসল কুয়ালালামপুর গামী এয়ার এশিয়া এক্স-এর ফ্লাইট ডি-৭ ১৮৩-এ। প্লেন মোটামুটি শিডিউলড টাইমেই অর্থাৎ রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ টেক অফ করল। মোটামুটি সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার ফ্লাইট।

সকালে কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন কাস্টমস মিটিয়ে অপেক্ষারত টিম বাসে চেপে ইন্ডিয়ান আন্ডার সিক্সটিন স্কোয়াড রওনা দিল কুয়ালালামপুর থেকে মাত্র সাতাশ কিলোমিটার দুরে মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর শাহ আলমের উদ্দেশ্যে। মালাক্কা স্ট্রেইট বরাবর মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গর স্টেটের পেটালিং আর ক্লাং ডিসট্রিক্টের সঙ্গমস্থলে গড়ে উঠেছে অষ্টাদশ শতকের বিখ্যাত সেলাঙ্গর সুলতানির প্রখ্যাত সুলতান শাহ আলমের নামে প্রতিষ্ঠিত এই শহর। মালয়েশিয়ান পেনিনসুলার অন্যান্য জায়গার মতোই শাহ আলমও ‘ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট’ আবহাওয়া অঞ্চলের মতো। সারা বছরই মোটামুটি একই তাপমাত্রা থাকে। সর্বোচ্চ ওই ত্রিশ একত্রিশ আর সর্বনিম্ন বাইশ তেইশেই ঘোরাফেরা করে বছরভর।

সকাল ন’টার মধ্যেই শাহ আলম স্টেডিয়ামের অনতি দূরেই একাপেল্লা স্যুইট হোটেলে চেক-ইন করল ইন্ডিয়ান স্কোয়াড। হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়েই চিফ কোচ বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজ জানিয়ে দিলেন আজ সকালে ট্রেনিং হবে না। বিকেলে কখন কোথায় ট্রেনিং করবে ইন্ডিয়া টিম সেটা অর্গানাইজারদের সঙ্গে কথা বলে লাঞ্চের পরে জানিয়ে দেবেন টিম ম্যানেজার। টিমের সবাইকে নিজেদের লাগেজ রুমে রেখে হোটেলের রেস্তোরাঁয় আসতে বলে টিম ম্যানেজারও নিজের রুমের পথে পা বাড়ালেন।

হোটেলটা দুর্দান্ত। চিফ কোচ আর টিম ম্যানেজার ছাড়া সকলের জন্যেই ডবল অকুপ্যান্সির ব্যবস্থা হয়েছে। আর যথারীতি তাতাই রুম পার্টনার হিসেবে বেছে নিয়েছে বিজয়নকে। নিজের লাগেজ রেখে জুতোটা খুলেই বিশাল মোটা গদিওলা দুটো বিছানার একটাতে প্রায় ডাইভ দিয়ে বিজয়ন উল্লসিত গলায় বলে উঠল,

- “আব্বে সৌম্য, ক্যা বেড হ্যায় বে! একদম মাক্খন জ্যায়সি….”

চেয়ারে বসে জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে বিজয়নের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে তাতাই বলে উঠল,

- “তু শোতে রহেগা ইয়া ব্রেকফাস্ট ভি করেগা? উঠ যা ইয়ার, গেট রেডি। ম্যায় ফ্রেস হো কে আ রাহা হু।”

তাতাই ব্যাগ খুলে ইন্ডিয়ান টিম ট্র্যাকস্যুট হাতে নিয়ে টয়লেটে ঢুকে যেতেই বিজয়ন আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছাড়ল। নিজের ব্যাগ থেকে ট্র্যাকস্যুট বের করে পরল। ওর ছেড়ে রাখা জুতোটা আবার পায়ে গলাতে গলাতেই তাতাই ফ্রেস হয়ে বেরিয়ে এলো টয়লেট থেকে। “চল ইয়ার” বলে তাতাই রুমের দরজা খুলতেই ওর পিছু নিলো বিজয়ন।

হোটেলে ইন্ডিয়ান স্কোয়াডের জন্যে অর্গানাইজাররা ভালই বন্দোবস্ত করেছে। একজন ইন্ডিয়ান কুইজিন এক্সপার্ট সেফও রেখেছে। সেফ ইন্ডিয়ান স্কোয়াডের ফিজিশিয়ান কাম ডায়েটিসিয়ানের সঙ্গে আলোচনা করেই ব্রেকফাস্ট লাঞ্চ আর ডিনারের মেনু ঠিক করেছে। ব্রেকফাস্ট পর্ব মিটতেই টিম ম্যানেজার জানিয়ে দিলেন টিম আজই মালয়েশিয়া পৌঁছেছে বলে ট্রেনিং আর ডায়েট শিডিউল ঠিক রাখা যাচ্ছে না। আজ দু’টোয় লাঞ্চ। ঘণ্টা দেড়েক বিশ্রাম করে টিম যাবে শাহ আলম স্টেডিয়াম সংলগ্ন স্পোর্টস কমপ্লেক্সের মাঠে ট্রেনিং করতে। টিম বাস আসবে সাড়ে তিনটেয়। কাল থেকে মর্নিং ট্রেনিং সেশন সাতটা থেকে ন’টা পর্যন্ত। সাড়ে ন’টায় ব্রেকফাস্ট। দেড়টায় লাঞ্চ। আফটার নুন ট্রেনিং আজকের মতোই একই সময়ে। আর ডিনারের জন্যে সবাই ডাইনিং হলে আসবে ঠিক ন’টায়।

চমৎকার প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড। মাঠের একপাশে একটা ছোট্ট ক্লাবহাউস কাম ড্রেসিংরুম ছাড়া আর কিছুই নেই। গ্রাউন্ডের চারিদিক উঁচু পাচিল দিয়ে ঘেরা। মাঠের আশেপাশে কিছু ইন্ডিয়ান আর দু’একজন স্থানীয় সাংবাদিক আর অর্গানাইজারদের তরফ থেকে কয়েক জন স্বেচ্ছাসেবক ছাড়া আর কেউ নেই। সহকারী কোচের তত্ত্বাবধানে প্লেয়াররা শুরুতেই কিছু স্ট্রেচিং আর ফিজিক্যাল ট্রেনিং করে সেটপিস মুভমেন্ট প্র্যাকটিস শুরু করল। তিন দিন পরেই গ্রুপ লিগে ইন্ডিয়ার প্রথম ম্যাচ থাইল্যান্ডের সঙ্গে। মাঝে ঠিক দুটো করে দিন গ্যাপ দিয়ে পরের দুটো ম্যাচ যথাক্রমে গ্রুপের সব থেকে শক্তিশালী দল সৌদি আরব আর শেষ ম্যাচ ফিলিপাইন্সের সঙ্গে। ইণ্ডিয়ার তিনটে ম্যাচই হবে এই শাহ আলম স্টেডিয়ামেই। প্রতি গ্রুপ থেকে দু’টো করে টিম যাবে কোয়ার্টার ফাইনালে।

চিফ কোচ বাইরে দাঁড়িয়ে কিছু নোট নিতে নিতেই চিৎকার করে সবাইকে ডেকে নিলেন মাঠের ধারে। ডেকে বললেন,

- “বয়েজ, টুমরো উই উইল প্লে আ ফ্রেন্ডলি ম্যাচ উইথ লোকাল সুপারলিগ টিম সেলাঙ্গর এফএ। অল প্লেয়ারস উইল প্লে রোটেশনালি। রিমেম্বার, ইট উইল বি ইয়োর সিলেকশন ট্রায়াল ফর ম্যাচ এগেনস্ট থাইল্যান্ড।”

প্রথম দিনে হালকা ট্রেনিং হলেও লম্বা জার্নিতে সবাই ক্লান্ত। ডিনার সেরে রুমে ফিরে চেঞ্জ করে বিছানায় পিঠ ছোঁয়াতেই চোখ লেগে আসছে তাতাই-এর। তবুও মম আর পাপার সঙ্গে একটু কথা না বলতে পারলে মনটা ছটফট করছে। ইন্টারন্যাশনাল কল করার মতো যথেষ্ট ব্যালান্স না থাকায় হোয়াটসঅ্যাপ কল করল পাপাকে। সারাদিনের খুঁটিনাটি মমকে বলে মোবাইলটা রাখতে গিয়ে ওর নজরে পড়ল পাশের বেডে অঘোরে ঘুমোচ্ছে বিজয়ন। কাল আবার সকাল ছ’টায় উঠতে হবে। সাতটা থেকে ট্রেনিং। তাই আর সময় নষ্ট না করে মোবাইলে ছ’টায় অ্যালার্ম দিয়ে শুয়ে পড়ল তাতাই।

সেলাঙ্গর এফএ-র বিরুদ্ধে ম্যাচটাতে তাতাই মিনিট দশেক খেলার সুযোগ পেলো। ওই রকম বিশাল বিশাল চেহারার প্লেয়ারদের সামনে কিছু করতে পারা তো দুরের কথা ওই দশ মিনিটে তিন চার বারের বেশি বলে পা ছোঁয়াতেই পারেনি। তাছাড়া দ্বিতীয়ার্ধের শেষ লগ্নে যখন মাঠে নেমেছে টিম ইন্ডিয়া তখন ৪-১ গোলে পিছিয়ে। প্রথমার্ধে উনিশ মিনিটে গুরমিতের করা একমাত্র গোলের সুবাদে খেলা শেষ হল ৫-১ গোলে। খেলা শেষে গম্ভীর মুখে চিফ কোচ জানিয়ে দিলেন বড় চেহারার প্লেয়ারদের বিপক্ষে ছেলেদের খেলা দেখে উনি ভীষণ হতাশ। এই রকম খেলা চলতে থাকলে শূন্যহাতে গ্রুপ লিগ থেকেই বিদায় নিতে হবে। টিম ম্যানেজার দুই কোচের সঙ্গে আলোচনা করে ঘোষণা করলেন থাইল্যান্ড ম্যাচের প্রথম একাদশ এবং রিজার্ভ বেঞ্চের সাত জনের নাম। গোলে হরজিৎ সিং, চার ডিফেন্ডার জয়রাজ মানি মনসুর আহমেদ নোয়েল ডিসুজা আর থৈবা সিং, মিডফিল্ডে অয়ন দাস হেনরি মেঞ্জেস সমীর কারকেট্টা আর রবি বাহাদুর রানা, ফরোয়ার্ডে একটু পেছন থেকে উইড্রয়াল ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলবে তোম্বা সিং এবং টিমের একমাত্র স্ট্রাইকার গুরমিত সিং। রিজার্ভ বেঞ্চে থাকবে গোলকিপার নিরজ কুমার দুই ডিফেন্ডার লালরোকিমা জঙ্গতে আর গুলাম নবী দু’জন মিডফিল্ডার সন্দীপ মারান্ডি আর মেলভিন ডিমেলো দুই রিজার্ভ ফরোয়ার্ড কে বিজয়ন আর সৌম্য সেনগুপ্তা।

থাইল্যান্ড ম্যাচে যে প্রথম একাদশে ও থাকবে না সেটা তাতাই জানতোই। অন্ততপক্ষে রিজার্ভ প্লেয়ার লিস্টে নিজের নামটা দেখে একটু আশ্বস্ত হল। আজকের এই ফ্রেন্ডলি ম্যাচে দলের ছন্নছাড়া খেলা দেখে চিফ কোচ কালকের ট্রেনিং-এ যে ভীষণ কড়া থাকবে তাতাই নিশ্চিত। বিবিয়ানোস্যার বরং ধমক দিলে তা’ও ঠিক আছে কিন্তু ওনার এই কাউকে কিছুই না বলাটা যে ঝড়ের পূর্ব সংকেত সেটা তাতাই এই মাস খানেকেই বুঝে গেছে। আজ তাই কালকের মর্নিং সেশনের ট্রেনিং-এর মানসিক প্রস্তুতি নিতে ডিনার সেরে এসেই শুয়ে পড়ল। এমনকি পাপা-মমকে কল না করে হোয়াটসঅ্যাপে জাস্ট একটা মেসেজ দিয়ে জানিয়ে দিলো যে ও প্রথম ম্যাচে ফার্স্ট ইলেভেনে না থাকলেও রিজার্ভ প্লেয়ারের লিস্টে ওর নাম আছে।

লাঞ্চের পর ওই ঘণ্টা দুয়েকের বিশ্রাম নেওয়া ছাড়া আজ সারাদিন ট্রেনিং ফিল্ড আর হোটেলের জিমে কাটিয়ে সন্ধেবেলায় রুমে আসার আগে টিম ম্যানেজার সবাইকে নির্দেশ দিলেন সবাই যেন ফ্রেস হয়ে চলে আসে হোটেলের সুইমিং পুলের ধারে। তাতাই আর বিজয়ন ফ্রেস হয়ে পুলসাইডে পৌঁছেই দেখে কোচ টিম অফিসিয়ালস ছাড়াও ততক্ষণে অনেকেই সেখানে পৌঁছে গেছে। পুলের অনতি দূরে ঘাসের লনে চিফ কোচকে মাঝে রেখে গোল হয়ে বসল সবাই। হালকা মায়াবী আলোয় পুরো পরিবেশটাই কেমন যেন রোমাঞ্চকর লাগছে। চিফ কোচ ভীষণ মনোযোগ সহকারে কালকের ম্যাচের স্ট্র্যাটেজি নিয়ে চুল চেরা বিশ্লেষণ করছেন। সবাই যখন পুরো মনঃসংযোগ লাগিয়ে শুনছে ঠিক সেই মুহূর্তেই তাতাই-এর নজর আটকে গেল বিজয়নের দিকে। অবাক হয়ে তাতাই দেখছে বিজয়নের নজর সুইমিং পুলের ধারে দুই বিকিনি পরিহিতা সুন্দরীর দিকে। তাতাই কনুই দিয়ে বিজয়নের পাঁজরে একটা গুঁতো দিতেই সম্বিত ফিরে পেয়ে ওর কানের কাছে ঠোঁট এনে ফিসফিস করে বলে উঠল,

- “ক্যা মাল হ্যায় বে…. পুরা দীপিকা পাডুকোন হ্যায় ইয়ার….”

- “চুপ বে শালে! বিবিয়ানো স্যার শুনেগা তো তুঝে তুরন্ত ইন্ডিয়া ওয়াপস করেগা..”

তাতাই-এর ধমক খেয়ে পুলসাইড সুন্দরীর থেকে নজর সরিয়ে আবার চিফ কোচের কথায় মন দিল বিজয়ন। বিজয়নকে ধমক দিলেও তাতাই-এর মনটা এখন উশখুশ করছে দুই বিকিনি সুন্দরীকে এক ঝলক দেখার জন্যে। তাতাই সেদিকে তাকাতেই দুই সুন্দরী ঝাঁপ দিলো পুলের স্বচ্ছ নীল জলে। টিম ইন্ডিয়ার চিফ কোচের উদ্দীপ্ত ভোকাল টনিকের শব্দকে ছাপিয়ে তাতাই-এর কানে ভেসে আসছে দুই মৎসকন্যার ডানার ঝাপটায় তরঙ্গ তোলা পুলের জলের আওয়াজ।

ষোল
—-

থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়ার ম্যাচ শুরু হবে স্থানীয় সময় সন্ধে সাতটায়। পঞ্চাশ হাজার দর্শকাসনের শাহ আলম স্টেডিয়াম কানায় কানায় ভরে না গেলেও বেশ ভালই দর্শক এসেছে খেলা দেখতে। তারই মধ্যে ইতিউতি নজরে পড়ছে দু’একটা ইন্ডিয়ান ফ্ল্যাগও। স্থানীয় অয়েল রিফাইনারিতে তো বটেই মালয়েশিয়ান কন্সট্রাকশন কোম্পানিগুলোতেও প্রচুর পরিমাণে ভারতীয় কাজ করে। তারা বেশিরভাগই এসেছে কেরালা আর পাঞ্জাব থেকে। সেই ইন্ডিয়ান কমিউনিটির অনেকেই আজ মাঠে এসেছে নিজের দেশকে সমর্থন করতে। দু’দল মাঠে নেমে সারি বেঁধে দাঁড়াতেই স্টেডিয়ামের সাউন্ড সিস্টেমে একের পর এক বেজে উঠল থাইল্যান্ড আর ইন্ডিয়ার ন্যাশনাল অ্যান্থেম। দেশের ন্যাশনাল অ্যান্থেম যে বুকের ভেতর কতটা আলোড়ন তুলতে পারে সেটা তাতাই জীবনে প্রথমবার বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে অনুভব করল।

দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে টগবগে ইন্ডিয়ান টিম মাঠে নামলেও মিনিট দশেকের মধ্যেই থাইল্যান্ডের প্রবল গতিময় ফুটবলের সামনে নিস্তেজ হতে শুরু করল। থ্যাইল্যান্ড আক্রমণ করে যাচ্ছে একতরফা ভাবে আর ইন্ডিয়া তা প্রতিহত করছে কোনো মতে। প্রতি আক্রমণে বার বার সংখ্যাল্পতা জনিত কারণে আটকে যাচ্ছে তোম্বা আর গুরমিত। মিনিট পনেরোর মাথায় গোলও করে ফেলল থাইল্যান্ড। নিজেদের টপ বক্সের মাথায় থাইল্যান্ডের সাত নম্বর জার্সিধারী ছটফটে স্ট্রাইকারটাকে জার্সি ধরে ফেলে দিয়ে হলুদ কার্ড দেখল স্টপার নোয়েল ডিসুজা। বক্সের মাথা থেকে ডাইরেক্ট ফ্রিকিকে গোল করে ১-০ গোলে এগিয়ে গেল থাইল্যান্ড। গোলটা হতেই চিফ কোচ বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজ একসঙ্গে রিজার্ভ বেঞ্চের তিন জনকে ওয়ার্ম আপ করতে নির্দেশ দিলেন। দুই রিজার্ভ মিডফিল্ডার সন্দীপ মারান্ডি আর মেলভিন ডিমেলো এবং রিজার্ভ ফরোয়ার্ড বিজয়ন ওয়ার্ম আপ শুরু করতেই যেন একটু গাঝাড়া দিল টিম ইন্ডিয়া। আরও মিনিট পাঁচেক খেলা গড়াতেই দলে এক সঙ্গে দুটো পরিবর্তন করলেন চিফ কোচ। মিডফিল্ডে অয়ন দাসের বদলে সন্দীপ মারান্ডি আর ফরোয়ার্ডে তোম্বা সিং-এর বদলে মাঠে নামল বিজয়ন। টিমের ফর্ম্যাটেও কিছু পরিবর্তন আনলেন কোচ। উইথড্রয়াল ফরোয়ার্ডের বদলে বিজয়নকে গুরমিতের সমান্তরালে সামনে তুলে এনে হেনরি মেঞ্জেসকে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার করে দিতেই ঘুরে গেল খেলার মোড়। এতক্ষণ দেওয়ালে পিঠ দিয়ে রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলা টিম ইন্ডিয়ার খেলায় আমূল পরিবর্তন এলো। শারীরিকভাবে থাইল্যান্ডের ছেলেদের সঙ্গে টিম ইন্ডিয়ার বিশেষ তফাৎ না থাকলেও এতক্ষণ মাইন্ড গেমে পিছিয়ে ছিল কিন্তু রক্ষণাত্মক ফর্ম্যাটের খাঁচা ভেঙে উন্মুক্ত করে দিতেই স্বাভাবিক ছন্দে দৌড়তে শুরু করল টিম ইন্ডিয়া। ফল মিলতেও বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। খেলার পঁয়ত্রিশ মিনিটের মাথায় হেনরি মেঞ্জেসের ফ্রি কিকে মাথা ছুঁইয়ে খেলায় সমতা ফেরালো গুরমিত। প্রথমার্ধ শেষ হল ১-১ গোলে অমীমাংসিত অবস্থায়।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই একই গতিতে খেলা শুরু করল দু’দলই। আক্রমণ প্রতি আক্রমণের মধ্যে ম্যাচ চলার মধ্যেই দ্বিতীয়ার্ধে উনিশ মিনিটের মাথায় চরম ভুল করে বসল নির্ভরযোগ্য স্টপার নোয়েল ডিসুজা। নিজেদের বক্সের মধ্যে বিপজ্জনকভাবে ঢুকে আসা থাইল্যান্ডের স্ট্রাইকারকে পেছন থেকে ট্রিপ করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মার্চিং অর্ডার পেয়ে টিমকে দশ জনে পরিবর্তিত করে মাঠ ছাড়ল। তারই সঙ্গে পেনাল্টি থেকে গোল করে আবারও এগিয়ে গেল থাইল্যান্ড।

আবার টিমে পরিবর্তন করতে হল চিফ কোচ বিবিয়ানোকে। মিডফিল্ডার রবি বাহাদুর রানাকে তুলে ডিফেন্ডার গুলাম নবীকে মাঠে নামালেন কোচ। দশ জনের টিম ইন্ডিয়া আবার এক গোলে পিছিয়ে পড়ে হতোদ্যম হওয়ার বদলে যেন আরও উজ্জীবিত হয়ে খেলতে শুরু করল। গুরমিত বিজয়ন যেমন বিপক্ষের পা থেকে বল ছিনিয়ে নিতে বারবার নিজেদের মাঝমাঠে নেমে আসছে ঠিক তেমনই ক্ষমতার ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের নিংড়ে দিচ্ছে ডিফেন্স থেকে মিডফিল্ডের প্রত্যেকে। অসম্ভব স্পিরিটেড ফুটবল খেলতে খেলতে অবশেষে দ্বিতীয়ার্ধের বিয়াল্লিশ মিনিটে সমতা ফেরালো বিজয়ন। ম্যাচ ২-২ গোলে অমীমাংসিত রেখে এক পয়েন্ট ঘরে তুললেও খেলার অ্যাডেড টাইমের শেষ লগ্নে অ্যাঙ্কেলে চোট পেয়ে স্ট্রেচারে মাঠ ছাড়ল গুরমিত সিং।

কোনো ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচের পরের দিন ছেলেদের হার্ড ট্রেনিং থেকে রেহাই দেওয়ার অভ্যেসটা বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজের বরাবরের। তার ওপর আবার মাঝের একদিন গ্যাপ দিয়েই পরের ম্যাচ সৌদি আরবের মত শক্তিশালী দলের সঙ্গে। সৌদির ছেলেরা ফিজিক্যালি এমনিতেই টিম ইন্ডিয়ার থেকে অনেক এগিয়ে। তার ওপর স্কিলের দিক দিয়েও মোর দ্যান অ্যাভারেজ। মাস চারেক আগেই দুবাইয়ে একটা আমন্ত্রিত টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে টিম ইন্ডিয়া মুখোমুখি হয়েছিল সৌদির। সেই ম্যাচে ৩-১ গোলে বিধ্বস্ত হতে হয়েছিল ওদের হাতে। যদিও সেই ম্যাচে তোম্বা সিং একটা পেনাল্টি মিস করেছিল। তবুও কোচ বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজের মনে আছে সব সুযোগ ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারলে আর গোলে হরজিৎ সেদিন নিজেকে ছাপিয়ে না গেলে সৌদির কাছে সেই ম্যাচে মিনিমাম হাফ ডজন গোল খাওয়ার কথা। যদিও এই চারমাসের ট্রেনিং-এ ছেলেরা ফিজিক্যালি এবং মেন্টালি উভয় ক্ষেত্রেই নিজেদের আরও শক্তিশালী করেছে তবুও দু’দলের ফারাকটা বোঝা যাবে মাঠে মুখোমুখি হলে।

থাইল্যান্ড ম্যাচের পরের দিন সৌদি আরবের বিপক্ষে ছেলেদের ম্যাচ টেনশন কমাতে অর্গানাইজারদের অনুরোধ করে টিম ম্যানেজার টিম বাসে সারাদিনের জন্যে কুয়ালালামপুর সিটি ট্যুরের ব্যবস্থা করলেন। হোটেলেই ব্রেকফাস্ট সেরে কোচ আর অফিসিয়াল সমেত পুরো টিম ইন্ডিয়া চড়ে বসল লাক্সারি টিম বাসে। শুধু অ্যাঙ্কেলের চোটের জন্যে গুরমিত হোটেলেই থেকে গেল আর ওকে দেখভালের জন্যে টিম ফিজিশিয়ানও গেলেন না।

অর্গানাইজারদের তরফে দুজন সিকিউরিটি গার্ড আর একজন ট্যুর গাইডও দেওয়া হল। বাস চলতে চলতেই মালয়েশিয়ান গাইডের ভাঙা ভাঙা ইংরেজি থেকেই জানা গেল কুয়ালালামপুরের ইতিহাস ভূগোল সংস্কৃতি ছাড়াও আরও কত কিছু। মালয়েশিয়ার প্রধান দুই নদী ক্লাং আর গোম্বাকের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ চরভূমিই আজকের আধুনিক কুয়ালালামপুর সিটি। মালয়েশিয়ার রাজধানী এবং অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক প্রাণ কেন্দ্র কুয়ালালামপুর এক সময় সেলাঙ্গর স্টেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭৪ সালে সেলাঙ্গর থেকে আলাদা হয়ে মালয়েশিয়ান ফেডারেল গভর্নমেন্টের অধীনস্থ ফেডারেল টেরিটরির মর্যাদা পায়। মালাক্কা স্ট্রেইট থেকে উৎপত্তি হওয়া অসংখ্য ছোটছোট পর্বতমালার হাত ধরে তিতিওয়াংসা পর্বতমালাকে ছুঁয়ে যাওয়া ক্লাং ভ্যালি নিয়ন্ত্রিত প্রকৃতিই কুয়ালালামপুরের আবহাওয়ার প্রধান চালিকাশক্তি। এই শহর একই সঙ্গে পেট্রোনাস ট্যুইন টাওয়ারের মতো আধুনিক সভ্যতার নিদর্শনের সঙ্গে একই ভাবে ধরে রেখেছে কিং প্যালেসের মতো প্রাচীন মধ্যযুগীয় স্মারকও।

পেট্রোনাস টাওয়ার আর কিং প্যালেস দেখে শাহ আলমের হোটেলে ফিরতে ফিরতেই প্রায় সন্ধে সাড়ে আটটা। সারা দিনের জার্নিতে সকলের মত তাতাই-এরও ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। সম্ভবত: সেটা বুঝেই টিম ম্যানেজার বাস থেকে নেমে সকলকে সরাসরি ডাইনিং হলে যেতে বললেন। ডিনার সেরে রুমে ফিরে ট্র্যাকস্যুট ছেড়ে হাফ প্যান্ট টিশার্ট পরে বিছানায় পিঠ ছোঁয়াতেই শরীর ছেড়ে দিলো তাতাই-এর। পেট্রোনাস টাওয়ার আর কিং প্যালেসকে পিছনে রেখে নিজের কয়েকটা সেল্ফি আর বন্ধুদের সঙ্গে তোলা ফটো পাপার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে আজকের ট্যুরের কথা সংক্ষেপে লিখেই শুয়ে পড়ল তাতাই।

মর্নিং সেশনের ট্রেনিং শেষে টিম মিটিং-এ সৌদি ম্যাচের টিম ঘোষণা করলেন টিম ম্যানেজার। প্রথম ম্যাচের ফার্স্ট ইলেভেনে তিনটে পরিবর্তন হল। ফরোয়ার্ডে আহত গুরমিতের জায়গায় দলে এলো তাতাই তোম্বার জায়গায় শুরু থেকেই খেলবে বিজয়ন আর প্রথম ম্যাচে লাল কার্ড দেখে এক ম্যাচ সাসপেন্ড হওয়া নোয়েল ডিসুজার জায়গায় স্টপারে শুরু থেকেই খেলবে গুলাম নবি। রিজার্ভ বেঞ্চে নতুন সংযোজন ফরোয়ার্ডে মনোজ দুবে আর ডিফেন্সে মহম্মদ সাদিক।

প্রথম ম্যাচটা সাইড লাইনে বেঞ্চে বসেই দেখেছে তাতাই। টিম ভাল খেললেও সেই খেলায় নিজে কোনো অবদান রাখতে না পারায় ওর মনে একটা খচখচানি রয়েই গেছে। ও জানে সৌদি ম্যাচটা খুব টাফ হবে। ফিজিক্যালি ওরা অনেক শক্তিশালী। কিন্তু তাতাই এটাও জানে এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাসও করে যে বল নিজের কন্ট্রোলে রাখতে পারলে আর সময় মতো সঠিক পজিশন নিতে পারলে বিপক্ষের ফিজিক্যাল অ্যাডভান্টেজ কোনো বাধাই হতে পারে না। এই রকম অপ্রত্যাশিত সুযোগ যখন ওর সামনে এসেই গেছে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার ওকে করতেই হবে।

সৌদি ম্যাচে ফার্স্ট ইলেভেনে আসার খবরটা হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করে দিতেই পাপার উত্তর এলো,

- “আমরা জানতাম তোর সামনে সুযোগ আসবেই। আর আমরা এটাও জানি সুযোগ পেলে তুই নিজেকে প্রমাণ করবিই। আমরা ফিজিক্যালি না হলেও মনে মনে তোর সঙ্গেই আছি। প্রুভ ইয়োরসেল্ফ। অল দ্য বেস্ট।

পাপার মেসেজ পেয়ে শুতে গেল তাতাই। কিন্তু কিছুতেই ওর ঘুম আসছে না। ওকে অস্থির দেখে রুমমেট বিজয়ন জিজ্ঞেস করল,

- “ক্যা হুয়া রে সৌম্য? তবিয়ৎ তো ঠিক হ্যায় না?”

- “হাঁ ঠিক হি হ্যায়…”

তাতাই-এর দায়সারা গোছের উত্তর শুনে বিজয়ন কিছু অনুমান করেই পাল্টা বলে উঠল,

- “আরে ইয়ার পহেলা ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচকা পহলে হোতা হ্যায় অ্যায়সি। টেনশন মাৎ লে। তু জিতনা কম টেনশন লেগা সৌদিকা টেনশন উতনা হি বঢ়েগা। রিল্যাক্স ইয়ার। জাস্ট চিল…..”

এখানে পাপা মম কেউ নেই। ওদের সঙ্গে কথা বললেও টেনশন কিছুটা কমত। আর ফোনে অথবা হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলে ওদের কাছে নিজের টেনশনের কথা ওর বলতেও ইচ্ছা করছে না। নিজের বাড়ি থেকে এতদূরে বসে ভিনরাজ্যের এক নতুন বন্ধু যে ওর মনের কথা পড়তে পেরেছে এটা ভেবেও তাতাই-এর ভীষণ ভাল লাগছে। তাই নিজের মনের ভেতর বাড়তে থাকা টেনশনকে আর পাত্তা না দিয়ে চোখ বুজল তাতাই।

সতেরো
——

মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে স্টেডিয়ামের সাউন্ড সিস্টেমে বাজতে থাকা ন্যাশনাল অ্যান্থেমের সুরের সঙ্গে গলা মেলাতেই উধাও কাল থেকে তাতাই-এর মাথার মধ্যে জমে থাকা টেনশনের ভয়ঙ্কর বোঝাটা। শরীরের ভেতরে অবিরাম চলতে থাকা অদৃশ্য কাঁপুনিটা আর টের পাচ্ছে না। শাহ আলম স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার তিরিশেক দর্শকের গমগমে আওয়াজকে ছাপিয়ে রেফারির হুইসল বেজে উঠতেই শুরু হল ম্যাচ। তাতাই-এর জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। তাও আবার সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী টিমের বিরুদ্ধে। এই সৌদির বিরুদ্ধেই মাস কয়েক আগে নাস্তানাবুদ হওয়ার দগদগে স্মৃতির দাগ এখনো রয়ে গেছে টিম ইন্ডিয়ার অনেকের মনেই। সেই ম্যাচে ইন্ডিয়ার হয়ে একমাত্র গোলকারী গুরমিত আজকের ম্যাচে অ্যাঙ্কেলে চোটের জন্যে আঠেরো জনে না থাকলেও মাঠে এসেছে নিজের টিমকে চিয়ার-আপ করতে। টিম মাঠে নামার আগে গুরমিত আদর্শ সিনিয়র প্লেয়ারের মতোই তাতাই-এর পিঠ চাপড়ে বলেছিল,

- “সৌম্য, বেস্ট উইশেস ফর ইয়োর ফার্স্ট ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ। সাইড লাইন সে সির্ফ তেরা গোল দেখনে কে লিয়ে হি ম্যায় ইয়ে ইঞ্জিওর্ড প্যার লে কর আজ স্টেডিয়াম পে আয়া। ফাঁড় ডালনা সৌদি কো। আই নো ইউ ক্যান ডু ইট…”

বিবিয়ানো স্যারের ভোকাল টনিক তো ছিলই, মাঠে নামার আগে গুরমিতের স্পিরিটেড উইশ তাতাই-এর আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। তার ওপর সৌদির বিপক্ষে লাস্ট ম্যাচে বিধ্বস্ত হওয়ার লজ্জাটাকে জেদ বানিয়ে শুরু থেকেই তেড়েফুঁড়ে খেলতে শুরু করল টিম ইন্ডিয়া। টিম ইন্ডিয়ার এই রকম স্পিরিটেড ফুটবল দেখে মাঠে উপস্থিত প্রবাসী ভারতীয় দর্শকদের মধ্যেও উদ্দীপনা বাড়ছে। আক্রমণ প্রতি-আক্রমণের প্রচণ্ড হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচে মিনিট দশেকের মাথাতেই একটা নিখুঁত সেটপিস মুভমেন্ট থেকে গোল করে দিল সৌদি আরব। গোলটা খেয়ে হতোদ্যম হওয়ার বদলে টিম ইন্ডিয়া যেন আরও উজ্জীবিত ফুটবল খেলতে শুরু করল। কিন্তু ইন্ডিয়ার প্রতিটা আক্রমণই যেন খেই হারিয়ে ফেলছে সৌদির বক্সের মাথায়। সৌদির জমাট ডিফেন্সে দাঁত ফোটাতে পারছে না বিজয়ন অথবা তাতাই কেউই। খেলার মিনিট তিরিশের মাথায় চিফ কোচের নির্দেশে ওয়ার্ম আপ করতে শুরু করল তোম্বা সিং। সাইড লাইনের ধারে তোম্বাকে ওয়ার্ম আপ করতে দেখে বুকের মধ্যে কেমন যেন ধুকপুকুনি শুরু হল তাতাই-এর। ওর এখনো পর্যন্ত পারফরমেন্সে যেখানে ও নিজেই বিরক্ত হচ্ছে সেখানে চিফ কোচও যে অসন্তুষ্ট হবেন সেটা আর বেশি কথা কী। এক্সপেরিয়েন্সড তোম্বার পরিবর্তে চিফ কোচ ওর উপর যে আস্থা রেখেছেন তার প্রতি এখনো পর্যন্ত কোনো রকম সুবিচারই করতে পারেনি তাতাই। হঠাত ওর গুলেদার কথা মনে পড়ল। বিপক্ষের বক্সের মাথায় অলসভাবে ঘোরাফেরা করলেই গুলেদা ধমকে বলতো,

- “শুধু উইথ দ্য বলই না উইদআউট বল খেলতে না পারলে তার ফরোয়ার্ডে খেলার যোগ্যতাই নেই”

গুলেদার কথা ভাবতে ভাবতেই তাতাই-এর নজরে পড়ল নিজেদের ডিফেন্স লাইনে দু’তিনটে স্কোয়ার পাস খেলতে খেলতেই স্টপার গুলাম নবী ফরোয়ার্ড পাস বাড়াল মাঝমাঠে নিজেদের অর্ধে ফাঁকায় দাঁড়ানো হেনরি মেঞ্জেসকে। হেনরির থেকে সন্দীপ মারান্ডির পা ঘুরে বিপক্ষের মাঝমাঠ বরাবর সমীর কারকেট্টার পায়ে বল পড়তেই গুলেদার কথাগুলো মাথায় ধাক্কা মারল তাতাই-এর। দৌড়তে শুরু করল লেফ্ট উইং বরাবর। তাতাইকে দৌড়তে দেখে সমীর বুটের ডগা দিয়ে বলটা ওর উদ্দেশ্যে আলতো করে চিপ করে দিল। তাতাই বলটা বাঁ’পায়ে রিসিভ করতেই এগিয়ে এলো সৌদির রাইট ব্যাক। মুহূর্তের মধ্যে তাতাই সামনে ঠেলে দেওয়ার অঙ্গভঙ্গি করে ফলস দিয়ে ডান পায়ের সোল দিয়ে বলটাকে টেনে ডান দিকে ঘুরে যেতেই কেটে গেল সৌদির রাইট ব্যাক। ততক্ষণে সৌদি বক্সে উঠে এসেছে বিজয়ন সমীর হেনরি আর সন্দীপ। বক্সের কোনায় বল পায়ে এক মুহূর্ত চোখ তুলে তাতাই দেখল বক্সে তখন বিপক্ষের গোলকিপার ছাড়া মাত্র তিনজন ডিফেন্ডার। টপ বক্সের ঠিক মাথায় সুবিধাজনক পজিশনে দাঁড়ানো হেনরির সঙ্গে ওয়াল খেলে ফিরতি বল তাতাই-এর পায়ে পড়তেই পা চালাল সৌদি স্টপার। স্টপারটা যে পা চালাবে সেটা অনুমান করেই বলটা হোল্ড না করে ওয়ান টাচে পাশে দাঁড়ানো বিজয়নকে দিতেই চলতি বলে বিজয়নের ডান পায়ের শট গোলকিপারকে নড়ার সুযোগ না দিয়ে ক্রশবারে লেগে ফিরে আসতেই ফিরতি বলে মাথা ছুঁইয়ে খেলায় সমতা ফেরাল সন্দীপ মারান্ডি।

প্রথমার্ধে ১-১ গোলে অমীমাংসিত অবস্থায় খেলা শেষ হল। প্রথমার্ধে কার কোথায় ভুল হচ্ছে বিশ্লেষণ করে আর মিডফিল্ডারদের একটু বল ধরে খেলতে বলে দ্বিতীয়ার্ধে টিম অপরিবর্তিত রেখেই ছেলেদের মাঠে নামালেন চিফ কোচ। ইন্ডিয়ার কাছে গোল খেয়ে দ্বিতীয়ার্ধে সৌদি যে অনেক বেশি প্রেশিং ফুটবল খেলবে চিফ কোচ জানেন। আর প্রয়োজনে ফিজিক্যাল অ্যাডভ্যান্টেজকে কাজে লাগিয়ে রাফ ফুটবলও খেলতে পারে অনুমান করেই মঠে নামার আগে সকলের উদ্দেশ্যে বলে দিয়েছেন যতটা সম্ভব পজেশনাল ফুটবল আর বল গ্রাউন্ডে রেখে কাউন্টার অ্যাটাক নির্ভর ফুটবল খেলত। দীর্ঘকায় সৌদি ছেলেদের বিরুদ্ধে এরিয়াল বল খেলতে গেলে যে বলের পজেশন হারাতে হবে সেটা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম দিকে দু’দলই অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে খেলতে খেলতে মিনিট কুড়ির মাথায় হঠাতই খেলার গতি বাড়িয়ে নিজেদের মধ্যে একটানা আট দশটা পাস খেলে আড়াআড়ি আরও দুজনের সঙ্গে ইন্ডিয়ার বক্সে ঢুকে পড়ল সৌদির দশ নম্বর জার্সিধারী স্ট্রাইকার। টিম ইন্ডিয়ার ডিফেন্সের প্রত্যেকেই জানে বক্সের ভেতর কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে ছেলেটা। লাস্ট ম্যাচে ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে করা সৌদির তিনটে গোলের দুটোই ওর পা থেকে এসেছিল। ওর পা থেকে বল কাড়তে স্টপার নবী আর রাইট ব্যাক থৈবা এক সঙ্গে ঝাঁপাল। থৈবাকে বডি দিয়ে গার্ড করে নবীকে ডান পায়ের আউট সাইড দিয়ে ডজ করে বেরিয়ে গিয়ে তীব্র শটে বল জড়িয়ে দিলো জালে। দ্বিতীয়ার্ধে শেষ দশ মিনিটের জন্যে বিজয়নের বদলে তোম্বা মাঠে নেমেও ফলাফলে ইতর বিশেষ কিছুই হল না। দ্বিতীয় ম্যাচে টিম ইন্ডিয়াকে শূন্য হাতেই ফিরতে হল।

সৌদি আরবের কাছে টিম ইন্ডিয়া ২-১ গোলে হেরে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়াটা অনিশ্চিত হলেও অসম্ভব হয়ে যায়নি। থাইল্যান্ড ম্যাচে এক পয়েন্ট পেয়েছে। সৌদি আরবের কাছে থাইল্যান্ড হারলে আর ইন্ডিয়া ফিলিপাইন্সকে বড় ব্যবধানে হারাতে পারলেই গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যাবে। পরের দিনের থাইল্যান্ড ফিলিপাইন্স ম্যাচের ফলাফল টিম ইন্ডিয়ার টাস্কটা আরেকটু সহজ করে দিলো। ম্যাচটা ১-১ গোলে ড্র তো হলই এমনকি তারও দু’দিন পরে থাইল্যান্ড ০-৩ গোলে হারল সৌদি আরবের কাছে। সৌদি তিন ম্যাচে ন’পয়েন্ট পেয়ে আগেই কোয়ার্টার ফাইনালে চলে গেছে। শেষ ম্যাচে ফিলিপাইন্সের সঙ্গে ড্র করলেও টিম ইন্ডিয়া পৌঁছে যাবে কোয়ার্টার ফাইনালে।

ফিলিপাইন্স ম্যাচটা যে ইন্ডিয়া ড্র-এর লক্ষ্যে খেলতে নামেনি সেটা টিম দেখেই বোঝা যাচ্ছে। গুরমিত মোটামুটি মাঠে নামার মতো কন্ডিশনে থাকলেও কোয়ার্টার ফাইনালের কথা মাথায় রেখেই সম্ভবতঃ চিফ কোচ ওকে ফিলিপাইন্স ম্যাচে দলে রাখেননি। গুরমিত ছাড়া মোটামুটি প্রথম দলই মাঠে নেমেছে। সৌদি ম্যাচের প্রথম দলে প্রত্যাশা মতোই দুটো পরিবর্তন হয়েছে। এক ম্যাচের সাসপেনশন কাটিয়ে দলে ফিরেছে স্টপার নোয়েল ডিসুজা আর ফরোয়ার্ডে বিজয়নের বদলে তোম্বা। শুরু থেকেই অ্যাটাকিং ফুটবল খেলে প্রথমার্ধে তাতাই আর দ্বিতীয়ার্ধে তাতাই-এর পরিবর্তে মাঠে নামা বিজয়ন আর পেনাল্টি থেকে করা হেনরি মেঞ্জেসের গোলে ফিলিপাইন্সকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে টিম ইন্ডিয়া পৌঁছে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে। তিনদিন পরে কুয়ালালামপুরের বুকিত জলিল ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে গ্রুপ ডি-র চ্যাম্পিয়ন এবং এই টুর্নামেন্টের আয়োজক দেশ মালয়েশিয়ার।

কোয়ার্টার ফাইনালে জিতলেই শেষ চারে। অর্থাৎ ভারতীয় ফুটবলে নতুন ইতিহাস গড়বে এই টিমটা। আন্ডার সেভেন্টিন ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ টু থাউজেন্ট সেভেন্টিনে ইন্ডিয়া আয়োজক দেশ হিসেবে খেলার সুযোগ পেলেও যোগ্যতা অর্জনকারী টুর্নামেন্টের বাধা টপকে কোনো ভারতীয় টিমই আজ পর্যন্ত কোনো রকম বয়েস ভিত্তিক বিশ্বকাপের মূলপর্বে পৌঁছতে পারেনি। তার উপর এই টিমটা গ্রুপ লিগে বেশ নজর কাড়া ফুটবল খেলেই নক আউট পর্যায়ে উঠেছে। সৌদি আরবের মতো এশিয়ার অন্যতম সেরা টিমের বিরুদ্ধেও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেলে নামমাত্র গোলে হেরেছে। জেতার মতো খেলেও ২-২ গোলে ড্র করেছে থাইল্যান্ডের সঙ্গে। নিরঙ্কুশ আধিপত্য নিয়ে খেলে ফিলিপাইন্সকে উড়িয়ে দিয়েছে। টিম ম্যানেজার টিম মিটিং-এ জানালেন মালয়েশিয়ার লোকাল লিডিং নিউজ পেপারগুলো নাকি খুব গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে টিম ইন্ডিয়ার খেলার খবর। লিডিং ইংলিশ ডেইলি ‘দ্য স্ট্রেইট টাইমস’ “ইন্ডিয়া- দ্য ডার্ক হর্স” শিরোনামের খবরে ভূয়সী প্রশংসা করেছে টিম ইন্ডিয়ার খেলার। রিপোর্টে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে গোলকিপার হরজিৎ সিং মিড ফিল্ডার হেনরি মেঞ্জেস আর সন্দীপ মারান্ডির। মালয়েশিয়ান মিডিয়া সব থেকে বেশি উচ্ছ্বসিত টিম ইন্ডিয়ার পনেরো নম্বর জার্সিধারী “ইন্ডিয়ান মেসি- সৌম্য”-কে নিয়ে। মালয়েশিয়ান টিমের সেমি ফাইনালে ওঠার পথে সব থেকে বড় বাধা যে এই চারজনই সেটা সব নিউজ রিপোর্টেই বলা হয়েছে। অন্য একটা ডেইলি নিউজ পেপার ‘দ্য বোর্নিও পোস্ট’ রিপোর্টে লিখেছে মালয়েশিয়াকে ম্যাচ জিততে হলে সন্দীপ হেনরি আর সৌম্যর ত্রিভুজ ভাঙতেই হবে।

তাতাই পাপার মুখে শুনেছে ওর আন্ডার সেভেন্টিন প্রি-ওয়ার্ল্ড কাপ ইন্ডিয়া টিমে সিলেকশনের খবরটা নাকি কলকাতার দু’তিনটে কাগজে ছেপেছে। আজকালে খেলার পাতায় তাতাই-এর ছবি সহ ওকে নাকি “চলতি প্রজন্মের কৃশানু দে” সম্বোধন করে বিশেষ প্রতিবেদনও লিখেছে। তাতাই যদিও কৃশানু দে-র খেলা দেখেনি তবে পাপার মুখে শুনেছে উনি নাকি মেসির মতোই বাঁ’পায়ের জাদুকর ছিলেন। তাই কোলকাতার কাগজে পাপার “ইন্ডিয়ান মেসি”-র সঙ্গে ওর তুলনা হয়েছে শুনে তাতাই ভীষণ খুশি। কিন্তু বিদেশের নিউজ পেপারেও যে ওকে নিয়ে আলোচনা হবে তাতাই ভাবতেও পারেনি। তাতাই হোটেলের লবিতে রাখা নিউজ পেপার স্ট্যান্ড থেকে ‘দ্য স্ট্রেইট টাইমস’ আর ‘দ্য বোর্নিও পোস্ট’ নিউজ পেপার দুটো হাতে নিলো। স্পোর্টস পেজে টিম ইন্ডিয়াকে নিয়ে যে রিপোর্ট দুটো ছেপেছে মোবাইলে তার ছবি তুলে পাঠিয়ে দিলো পাপার হোয়াটসঅ্যাপে। নিচে লিখে দিলো,

- “ইয়োর তাতাই ইজ নাউ রাইজিং ইন্টারন্যাশনাল স্টার। নাউ হি ইজ নট “চলতি প্রজন্মের কৃশানু দে”, হি ইজ “ইন্ডিয়ান মেসি- সৌম্য”……”

প্রত্যাশা মতোই তাতাই-এর হোয়াটঅ্যাপ নটিফিকেশন সশব্দে জানান দিলো পাপার মেসেজের,

- “কনগ্র্যাটস! তবে এটা সবে শুরু। কনফিডেন্স ভাল তবে ওভার কনফিডেন্ট হয়ে গেলেই পা পিছলে যাবে। বি স্টেডি অ্যান্ড ফোকাসড। এই সব প্রশংসার যোগ্য হয়ে ওঠ। কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে টিম ইন্ডিয়ার জেতার খবরের ছবি দেখার অপেক্ষায় আছি। অল দ্য বেস্ট…

আঠেরো
——-

শাহ আলমের পাট চুকিয়ে পরের দিনই টিম ইন্ডিয়া ডেরা বাঁধল কুয়ালালামপুরে। কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ ভেনু বুকিত জলিল ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের অনতি দুরেই থ্রি স্টার হোটেল শ্রী পেটালিং-এ অস্থায়ী আস্তানা হল টিম ইন্ডিয়ার। শাহ আলমের একাপেল্লা স্যুইট হোটেলের থেকে শ্রী পেটালিং-এর জাঁকজমক অথবা সুযোগ সুবিধা অনেক কম হলেও আয়োজক এবং হোটেল কর্মচারীদের উষ্ণ আন্তরিকতায় সমস্ত ব্যবধান মুছে গেল এক মুহূর্তেই। এই হোটেলের রেস্তোরাঁতেও যে শাহ আলমের মতোই একজন ইন্ডিয়ান কুইজিন এক্সপার্ট সেফের বন্দোবস্ত করা হয়েছে সেটা জেনে টিম ম্যানেজার আরও নিশ্চিন্ত হয়েছেন। এই হোটেলে একটাই সমস্যা, জিম আর স্যুইমিং পুল নেই। অবশ্য টিম ইন্ডিয়ার ট্রেনিং-এর জন্যে নির্দিষ্ট বুকিত জলিল ন্যাশনাল স্টেডিয়াম সংলগ্ন স্পোর্টস কমপ্লেক্সে সব বন্দোবস্তই আছে।

চিফ কোচ থেকে শুরু করে টিম ম্যানেজমেন্টের সকলেই জানেন অথবা বোঝেন যে টিম ইন্ডিয়া এই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ান হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মালয়েশিয়ায় আসেনি। তবে গ্রুপ লিগে ওই রকম স্পিরিটেড ফুটবল খেলার পরে হালকা আশার আলো ফুটতে শুরু করেছে টিম ইন্ডিয়ার সকলের মনের কোনেই। টিম মিটিং-এ চিফ কোচ ছেলেদের পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন সেমিফাইনালে ওঠার যে সুবর্ণ সুযোগ সামনে এসেছে সেটাকে কাজে লাগানোর জন্যে টিম ইন্ডিয়ার প্রত্যেকের নিজেদের ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিৎ। কোয়ার্টার ফাইনালে জাপান সাউথ কোরিয়া ইরান অথবা ইরাকের মতো অভিজ্ঞ এশিয়ান জায়ান্টদের মুখে পড়লে সেমিফাইনালে যাওয়াটা যে কতটা কষ্টকল্পিত হতো তা স্কোয়াডের সকলেই জানে। সেখানে মালয়েশিয়া তুলনামূলক ভাবে অনেক সহজ প্রতিপক্ষ। তবে এটা ভুলে গেলেও চলবে না যে গ্রুপ ডি-তে নর্থ কোরিয়ার মতো টিমকে দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে গোল পার্থক্যে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ান হয়েছে মালয়েশিয়া। তাছাড়া সেদিন যে স্টেডিয়াম কানায় কানায় ভরে থাকবে এবং সেই আশি হাজার দর্শকের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে গুটিকতক প্রবাসী ভারতীয় ছাড়া সকলেই যে মালয়েশিয়ার হয়ে গলা ফাটাবে ভালমতোই জানে টিম ইন্ডিয়া।

কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের একদিন আগেই ফার্স্ট ইলেভেন ঘোষণা করলেন টিম ম্যানেজার। গোলে আর ডিফেন্সে লাস্ট ম্যাচের লাইন আপ ধরে রেখে দলে কিছু পরিবর্তন করছেন চিফ কোচ বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজ। মাঝমাঠে রবি বাহাদুর রানার বদলে এই টুর্নামেন্টে প্রথমবার খেলতে নামবে শক্তপোক্ত চেহারার মেলভিন ডিমেলো আর ফরোয়ার্ডে শুরু করবে গুরমিত আর বিজয়ন। ফার্স্ট ইলেভেনে নিজেকে প্রথম দলে না দেখে একটু অবাকই হল তাতাই। গ্রুপ লিগে ওর খেলার প্রশংসা করেছে স্থানীয় নিউজ পেপারগুলোও। রিপোর্টে বিশেষ করে হেনরি সন্দীপ আর তাতাই-এর বোঝাপড়ার ভূয়সী প্রশংসা করেছে। অথচ চিফ কোচ সেই কম্বিনেশনটা ভেঙে দিচ্ছেন কেন তাতাই বুঝতেই পারছে না। টিম মিটিং সেরে তাতাই হোটেল রুমে যেতেই ইন্টারকমটা বেজে উঠল। বিজয়ন প্রথমে “হ্যালো” বলে চুপচাপ কিছুক্ষণ অন্য প্রান্তের কথা শুনে “ওকে স্যার” বলে ইন্টারকমটা ক্রেডেলে রেখে তাতাইকে বলল,

- “যা বে সৌম্য, হেডু তুঝে বুলা রাহা হ্যায়।”

- “ইউ মিন চিফ কোচ? বিবিয়ানো স্যার?”

তাতাই-এর বিস্মিত প্রশ্নে বিজয়ন সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়াতেই তাতাই পা বাড়াল চিফ কোচের রুমের দিকে।

চিফ কোচের রুমের দরজাটা আনলকই ছিল। হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দরজাটা একটু ফাঁক করে তাতাই জিজ্ঞেস করল,

- “মে আই কাম ইন স্যার?”

“ইয়েস, কাম ইন” বলে নিজে যে চেয়ারটাতে বসেছিলেন তার উল্টো দিকের চেয়ারে তাতাইকে বসতে বললেন বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজ। তাতাই চেয়ারে বসতেই বিবিয়ানো বলে উঠলেন,

- “আই নো, মাই ডিসিশন মেড ইউ সারপ্রাইজড। বাট ইউ নো সৌম্য, ইউ আর মাই ট্রাম্প কার্ড। নো বডি শুড শো হিজ ট্রাম কার্ড অলওয়েজ। মালয়েশিয়ান কোচ তুঝে লে কর প্ল্যান বানায়া, বাট আই উড লাইক টু মেক দেম ফুল। গুরমিত ইজ আন নোন টু দেম। ইসি লিয়ে আই আম স্টার্টিং উইথ বিজয়ন অ্যান্ড গুরমিত। ডোন্ট গেট আপসেট। আই উইল ইউজ ইউ অ্যাজ ট্রাম্প কার্ড….”

চিফ কোচের কথাটা কিছুটা বুঝলেও পুরোপুরি পরিষ্কার নয় তাতাই-এর কাছে। কিছুটা হতভম্ব হয়ে তাতাই কোচের দিকে তাকিয়ে থাকতেই হো হো করে হেসে উঠে তাতাই-এর ঝাঁকড়া চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজ বলে উঠলেন,

- “ইতনা ডিপ্রেসড মাত হোনা বেটা। কাল তু ভি খেলেগা। আই হ্যাভ স্পেশাল প্ল্যান ফর ইউ। আভি যা, টেক রেস্ট….”

কোচকে গুড নাইট জানিয়ে নিজের রুমে ফিরল তাতাই। ওর ফেরার অপেক্ষাতেই যেন ওঁত পেতে অপেক্ষা করছিল বিজয়ন। ওকে দেখেই ভীষণ কৌতূহলী সুরে জিজ্ঞেস করল,

- “তুঝে হেডু ক্যা বোলা বে?”

মুচকি হেসে তাতাই উত্তর দিলো,

- “কুছ নেহি! মুঝে বোলা কাল ফার্স্ট ইলেভেন মে বিজয়ন কা জাগা পে তু রহেগা। আজ টিম মিটিং মে টিম ম্যানেজার গলতি সে বিজয়নকা নাম লে লিয়া…

“শালে! হারামি…” বলে শুয়ে পড়ল বিজয়ন। ঘরের লাইট অফ করে তাতাইও শুয়ে পড়ল।

কোচের নির্দেশে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেও ঘুম আসতে অনেক রাত হল তাতাই-এর। আকাশকুসুম চিন্তার মায়াজালে জড়াতে জড়াতে ঘুমের দেশের শীতল গভীরতায় কখন তলিয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি। তাতাই-এর ঘুম ভাঙল মাথার বালিশের নিচে রাখা মোবাইলে হ্যোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশন বেজে উঠতেই। তাতাই মোবাইলে দেখল স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ছ’টা। হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে দেখল পাপার মেসেজ। মালয়েশিয়ায় পৌঁছেই তাতাই জেনে গেছিল ইণ্ডিয়ার থেকে মালয়েশিয়ান লোকাল টাইম আড়াই ঘণ্টা এগিয়ে আছে। তাতাই মনে মনে হিসেব করে দেখল এখন কলকাতায় ভোর চারটে বাজে। এই কাক ভোরেই পাপা ঘুম থেকে উঠে পড়েছে দেখে ভীষণ অবাক হল তাতাই। আজ তো মঙ্গলবার। তাতাই অ্যাকাডেমিতে যাওয়ার পর অফিস ডেটে পাপা সাতটা নাগাদ ঘুম থেকে ওঠে। তাতাই মনে মনে ভাবে ওর মতোই পাপারও হয়তো কাল রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। হয়তো পুরো রাতটাই বিছানায় এপাশ ওপাশ করে কাটিয়েছে। তাতাই-এর জীবনে আজ সবথেকে বড় ম্যাচ। ওকে ঘিরে পাপার স্বপ্ন যে আকাশ ছুঁতে চায় সেটা তাতাই ভালোই জানে। সেই স্বপ্নের তাড়নাতেই হয়তো জেগেই কাটিয়েছে কালকের রাতটা। এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই পড়তে শুরু করল পাপার মেসেজটা,

- “তাতাই, আমি জানি না আজ তুই শুরু থেকে খেলছিস কিনা। তবে এটা জানি যে ইণ্ডিয়াকে জিততে হলে আজ তোকে খেলতেই হবে এবং তোকেও তোর সেরা খেলাটা খেলতে হবে। সো, বেস্ট অফ লাক……”

মেসেজটা পড়ে তাতাই কিছুক্ষণের জন্যে গুম মেরে গেল। ঠিক করল ও যে ফার্স্ট ইলেভেনে নেই সেটা পাপাকে এখনই বলবে না। তাতাই-এর ওপর যে চিফ কোচের ভরসা আছে সেটা ও জানে। ওকে নিয়ে বিবিয়ানোস্যারের যে স্পেশাল প্ল্যান আছে সেটা জেনে ও একটু সোয়াস্তিও পেয়েছে। পাপাকে এত কথা না বলে তাতাই মেসেজের উত্তর দিলো,

- “আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট পাপা….”

- “নো ট্রাই তাতাই। তোকে সেরা খেলাটা আজ খেলতেই হবে। মনে রাখিস, তোর ওপরই আজ দেশের সম্মান নির্ভর করছে। তোকে প্রমাণ করতেই হবে বাঙালিও ফুটবলটা খেলতে জানে। অল দ্য বেস্ট….”

পাপার মেসেজটা দু’তিনবার পড়ল তাতাই। মেসেজের প্রতিটা শব্দে যেন তাতাই-এর ওপর পাপার বিশ্বাস ঝরে পড়ছে। তাতাই-এর শরীরে মনে যেন উত্তাল সামুদ্রিক প্লাবন বহে গেল এক মুহূর্তে। কোন মতে মেসেজের উত্তর দিলো,

- “পাপা এখুনি রেডি হয়ে ট্রেনিং-এ যেতে হবে। খেলার শেষে আবার কথা হবে। বাই….”

মোবাইলটা রেখে তাতাই দেখল বিজয়ন তখনো ঘুমচ্ছে। বিজয়নকে ঝাঁকিয়ে “আব্বে উঠ। সাত বাজ গয়ে।” বলে টয়লেটে ঢুকে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে কলকাতায় অফিস কামাই করে বাড়িতে বসে ঘড়ির কাঁটার স্থান বদল দেখতে দেখতে সময় গুনে চলেছে অনিমেষ। ভারতীয় সময় বিকেল সাড়ে চারটে থেকে ইণ্ডিয়া মালয়েশিয়ার আণ্ডার সিক্সটিন কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের লাইভ টেলিকাস্ট দেখাবে টেন স্পোর্টস চ্যানেলে।

উনিশ
—–

- “সৌমি আরেক কাপ চা হবে?

- “সকাল থেকে দু’বার তো হয়ে গেছে। আবার?”

কিচেন থেকেই অনিমেষের কথার উত্তর দিলো সৌমি। আজ মঙ্গলবারটাও কেমন যেন রবিবার রবিবার লাগছে সৌমির। কারো যেন কোনো কাজেই তাড়া নেই। শুধু মনের ভেতরে যেন এক অদৃশ্য ঝড় বহে যাচ্ছে সৌমির। একমাত্র ওই গোলপোস্টের ভেতর বল ঢুকে গেলে গোল হয় এটা ছাড়া ফুটবল খেলার কোনো নিয়ম কানুনই ও জানে না। অনিমেষের কাছেই জেনেছে এই ম্যাচটা তাতাই-এর কেরিয়ারের জন্যে কতটা ইম্পরট্যান্ট। এই ম্যাচটা জিততে পারলে শুধু তাতাই-এর’ই নয় ইন্ডিয়ান ফুটবলেও একটা অভূতপূর্ব নজির সৃষ্টি হবে। সৌমি অতশত বুঝতে পারে না। আসলে বোধহয় বুঝতে চায়ও না। ও শুধু জানে তাতাইরা এই ম্যাচটা জিতলেই পেরুতে আন্ডার সেভেন্টিন ওয়ার্ল্ডকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। সৌমি মনে মনে মানত করেছে। তাতাইরা জিতলে কালীঘাটের মা’কে শাড়ি-শাঁখা-পলা দিয়ে পুজো দিয়ে আসবে।

সৌমি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ড্রইংরুমে এসে দেখল অনিমেষ ঘরে নেই। টিভিটা নিজের মনেই চলছে। চায়ের কাপটা সেন্টার টেবিলে রেখে পাশেই অগোছালো ভাবে রাখা খবরের কাগজের শেষ পাতায় তাতাইদের খেলার খবরে চোখ আটকে গেল ওর। কোনোদিন খবরের কাগজের শেষ পাতা ছুঁয়েও না দেখা সৌমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে লাগল খবরটা। ওর অগোচরেই কখন অনিমেষ পাশে এসে বসেছে বুঝতেও পারেনি সৌমি। অনিমেষ গলা খাঁকারি দিতেই ওর দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত স্বভাব বিরুদ্ধ উচ্ছ্বসিত গলায় সৌমি বলে উঠল,

- “রিপোর্টে মোট চার জায়গায় তাতাই-এর নাম লিখেছে….”

- “তোমার ছেলে এখন স্টার। তাও মাত্র চারবার?”

অনিমেষের ফাজলামির উত্তরে চোখ পাকিয়ে সৌমি বলে উঠল,

- “বাই দ্য ওয়ে, এতক্ষণ তুমি কোথায় ছিলে? তোমার গায়ে সিগারেটের গন্ধ কেন? তুমি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছ বলেছিলে না?”

- “প্রচণ্ড টেনশনে আছি। প্লিজ, আজকের দিনটা……”

হাতেনাতে ধরা পড়ে যাওয়া অনিমেষের কাঁচুমাচু মুখে বলা কথাগুলো শেষ করতে না দিয়েই “ওক্কে যাও! আজকের দিনটা ছেড়ে দিলাম” বলেই কিচেনের দিকে পা বাড়াল সৌমি।

দুপুরে লাঞ্চের পরে একটু শুলেও ঘুম হয়নি সৌমি বা অনিমেষ কারোরই। বিকেল চারটের আগেই টিভি খুলে বসেছে অনিমেষ। উয়েফা ক্লাব চ্যাম্পিয়ানশিপের ম্যাচের হাইলাইট দেখতে দেখতেই চায়ের কাপ হাতে হাজির হল সৌমি। অনিমেষের পাশে বসে দেওয়াল ঘড়িতে দেখল চারটে পনেরো। আজ সকাল থেকে ঘড়ির কাঁটা যেন এগোচ্ছেই না। ওদের স্বামী স্ত্রী-র মধ্যে টুকটাক উদ্দেশ্যহীন কথা বার্তার মধ্যেই ওদের দু’জনকেই চমকে দিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন তাতাই-এর দাদান। খেলাধুলোয় একে বারেই আগ্রহহীন মনীন্দ্র সেনগুপ্ত ওদের দিকে তাকিয় হেসে বললেন,

- “তোমাদের সঙ্গে বসে আমিও ভাবছি খেলাটা দেখবো?”

- “বাবা তুমি? ফুটবল খেলা…”

অনিমেষের বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই অনিমেষের পাশে বসে উনি বলে উঠলেন,

- “দাদুভাই বিদেশের মাঠে দেশের হয়ে খেলবে আর আমি সেটা দেখবো না?”

অনিমেষের বিস্ময়ের যেন আরও বাকী ছিল। ওর রাগী হেডমাস্টার বাবা ওর পিঠে হাত রেখে বলে উঠলেন,

- “সেদিন নিজের জেদে না চলে তোর কোচ সুবীরের কথা আমি যদি শুনতাম তাহলে হয়তো তুইও…..”

বাবার অনুশোচনায় ভরা আক্ষেপের কথাগুলো শুনে দু’চোখ ঝাপসা হয়ে এলো অনিমেষের। ঝাপসা চোখেই নজরে পড়ল টিভির পর্দায় ইন্ডিয়ান টিমের প্লেয়ারদের নাম। রিজার্ভ প্লেয়ার লিস্টে তাতাই-এর নাম দেখে প্রথমে একটু হতাশ লাগলেও অনিমেষের দৃঢ় বিশ্বাস সুযোগ তাতাই পাবেই। আর সুযোগ পেলে ও যে নিজের জাত চেনাবেই অনিমেষ নিশ্চিত।

প্রথম তিরিশ মিনিটেই প্রবল জন সমর্থনে উজ্জীবিত মালয়েশিয়া ভয়ঙ্কর প্রেসিং ফুটবল খেলে ২-০ গোলে এগিয়ে গেল। হতাশায় সৌমির মুখ যখন শুখিয়ে গেছে ঠিক সেই মুহূর্তেই টিভির পর্দায় দেখা গেল আর একজন প্লেয়ারের সঙ্গে মাঠের ধারে ওয়ার্ম আপ করছে তাতাই। ঘরের তিনজনই যেন নড়েচড়ে বসল। মিনিট পাঁচেক পরেই দলে এক সঙ্গে দুটো পরিবর্তন হল। একজন পরিবর্তিত মিডফিল্ডারের সঙ্গে ওরই রুমমেট বিজয়নের বদলে মাঠে নামলো তাতাই। বিজয়ন ছেলেটাকে আজই প্রথমবার চাক্ষুষ দেখলেও ওর কথা তাতাই-এর মুখে অনেক শুনেছে অনিমেষ। তাতাই মাঠে নামতেই নিজেদের অজান্তেই বাচ্চাদের মতো একই সঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠল শ্বশুর আর বৌমা।

মম আর পাপার সঙ্গে ওর পণ্ডিত বই পাগল দাদানও যে ওর খেলা দেখতে বসতে পারে তাতাই কল্পনাও করতে পারেনা। মাঠে নামার আগে ওর মগজে পাপার হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের শব্দগুলোই শুধু নড়াচড়া করছিল। ওর প্রতি পাপার অগাধ বিশ্বাসের মর্যাদা ওকে আজ দিতেই হবে। পাপার বিশ্বাসটা কখন যে তাতাই-এর আত্মবিশ্বাস হয়ে ছড়িয়ে গেছে ওর প্রতিটা শিরা উপশিরায় বুঝতেও পারেনি। দুর পাল্লার শটে গোল করার চেষ্টা তাতাই বিশেষ করে না। কিন্তু প্রথমার্ধের একেবারে শেষ লগ্নে দু’দুবার বিপক্ষ ডিফেন্ডারকে ডজ করে বেরতে গিয়ে আটকে যাওয়া তাতাইয়ের বিপক্ষের টপ বক্সের মাথা থেকে নেওয়া শট ক্রশবারে লেগে ফিরে আসতেই গুরমিত ওর পিঠ চাপড়ে বলে উঠেছিল,

- “ওয়েল ডান সৌম্য। ইটস ইয়োর ডে। বেটার লাক নেক্সট টাইম….”

হাফ টাইমে চিফ কোচ বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজ টিমের ফর্মেশনে কিছু পরিবর্তন আনলেন। প্রথমার্ধের ৪-৪-২ ফর্মেশন ভেঙে সন্দীপ মারান্ডিকে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে এনে হেনরি মেঞ্জেসকে উইথড্রয়াল ফরোয়ার্ড করে দিলেন। দ্বিতীয়ার্ধে টিম খেলবে ৪-৩-১-২ ফর্মেশনে। চিফ কোচের বডি ল্যাঙ্গুয়েজই বলে দিচ্ছে উনি চাইছেন টিম ইন্ডিয়া দ্বিতীয়ার্ধে অল আউট আক্রমণাত্মক খেলুক। ডিফেন্ডার আর মিডফিল্ডারদের প্রয়োজনীয় টিপস দিয়ে তাতাই-এর উদ্দেশ্যে চিফ কোচ বলে উঠলেন,

- “সৌম্য, এভরিবডি নোজ ইউ আর দ্য ইয়ংগেস্ট স্ট্রাইকার অফ দ্য টুর্নামেন্ট। বাট আই বিলিভ ইউ আর নট অনলি ইয়ংগেস্ট বাট অলসো দ্য বেস্ট স্ট্রাইকার অফ এশিয়া ইন দিস এজগ্রুপ। ইউ হ্যাভ টু প্রুভ ইয়োরসেল্ফ অ্যান্ড মাই বিলিফ অ্যাজ ওয়েল। ইউ হ্যাভ অনলি ফরটি ফাইভ মিনিটস টাইম রিমেইনিং ইন ইয়োর হ্যান্ড। গো টু ফিল্ড অ্যান্ড ডু সামথিং ফর ইয়োর কান্ট্রি….”

বিবিয়ানো স্যারের কথাগুলো শুনে যেন একটা বিদ্যুৎ তরঙ্গ বহে গেল তাতাই-এর শরীর জুড়ে। দ্বিতীয়ার্ধে দেশের সম্মান পুনরুদ্ধার করার শপথ নিয়ে মাঠে নামলো টিম ইন্ডিয়া।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই ব্যবধান কমাতে টিম ইন্ডিয়া যেমন মরীয়া ঠিক তেমনই দু’গোলের সেফ লিড ধরে রাখতে মরীয়া মালয়েশিয়াও। প্রথম পনেরো মিনিটে টিম ইন্ডিয়ার সমস্ত প্রয়াস মালয়েশিয়ার জমাট ডিফেন্সে বারবার প্রতিহত হয়ে ফিরতে ফিরতেই সুযোগ এসে গেল ব্যবধান কমানোর। লেফট উইং বরাবর ওভার ল্যাপে উঠে আসা লেফট ব্যাক জয়রাজ মানির ব্যাকহিল সন্দীপ আর সমীরের পা ঘুরে বক্সে গোল পোস্টের সঙ্গে আড়াআড়িভাবে দাঁড়ানো তাতাইয়ের বাঁ পায়ে যখন পড়ল তখন দু’পাশ থেকে ওর ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে দুই দীর্ঘদেহী মালয়েশিয়ান ডিফেন্ডার। আগের অভিজ্ঞতা থেকে তাতাই বুঝতে পারছে ওর থেকে অনেক বেশি লম্বা স্ট্রাইডের এই ডিফেন্ডারদের বিরুদ্ধে গতিকে সম্বল করে ডজ করে বেরতে পারবে না। সামনে এগোনোর জন্যে বডি ফেইন্ট করে তাতাই ওর ট্রেডমার্ক সোল দিয়ে বলটা টেনে পুরো একশো আশি ডিগ্রি টার্ন নিতে একজন ডিফেন্ডার রংফুটে আর অন্য ডিফেন্ডারটা দিশাহারাভাবে পা চালাতেই ওর দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে বলটা গলিয়ে দিয়ে ওর পাশ দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে ডানপায়ে বল ধরে তাকাতেই নজরে পড়ল গোল লাইন ছেড়ে ওর প্রায় কাছাকাছি এগিয়ে এসেছে গোলকিপার। ওর দিকে দ্রুতবেগে ধাবমান গোলকিপারের ডানদিক দিয়ে কাট করেই ডান পায়ের ইনস্টেপ দিয়ে বলটা ঠেলে দিতেই অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো গোটা স্টেডিয়াম জুড়ে। জায়ান্ট স্কোর বোর্ডে ফুটে উঠল মালয়েশিয়া-২ ইন্ডিয়া-১।

এর পরের মিনিট পনেরো গোটা মাঠ জুড়ে শুধুই টিম ইন্ডিয়া। দ্বিতীয়ার্ধের পঁচিশ মিনিটের মাথায় নিজেদের বক্সের মধ্যেই হেনরি মেঞ্জেসের হাত ধরে ফেলে দিলো এক মালয়েশিয়ান ডিফেন্ডার। পেনাল্টি থেকে খেলায় সমতা ফেরালো গুরমিত।

শেষ মিনিট পনেরো দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করছে দু’পক্ষই। এক দিকে নিজের দেশের মাটিতে ফিফা আন্ডার সেভেন্টিন ওয়ার্ল্ডকাপের যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ হাতছাড়া করতে মালয়েশিয়া যেমন একেবারেই নারাজ ঠিক তেমনই একবার রক্তের স্বাদ পেয়ে যাওয়া ইন্ডিয়াও শিকার হাতছাড়া করতে রাজি নয়। এরই মধ্যে ইন্ডিয়ার টপ বক্সের মাথা থেকে নেওয়া মালয়েশিয়ার ডাইরেক্ট ফ্রিকিক ডান দিকে ঝাঁপিয়ে অসাধারণ দক্ষতায় সেভ করে নিশ্চিত পতন থেকে টিম ইন্ডিয়াকে রক্ষা করেছে গোলকিপার হরজিৎ।

ইনজুরি টাইমের শেষ লগ্নে মাঠে উপস্থিত সকলেই যখন ধরে নিয়েছে ম্যাচ টাই ব্রেকারে গড়াচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তেই বিপক্ষের মাঝমাঠে যেখানে লেফট হাফ দাঁড়ায় একটা লুজ বল পেল তাতাই। বল পায়ে সোলো রান শুরু করে বিপক্ষের মিডফিল্ডের দুজনকে পেরিয়ে বক্সে ঢুকে কয়েক মুহূর্ত বলটা হোল্ড করে সতীর্থদের পজিশন দেখতে চোখ তুলতেই তাতাই দেখল ওর সামনেই সেই মালয়েশিয়ান ডিফেন্ডারটা, যাকে বোকা বানিয়ে পায়ের তলা দিয়ে বল গলিয়ে গোল করেছিল। এবার কিন্তু ডিফেন্ডারটা আর ভুল করেনি। সময় নষ্ট না করে ট্যাকলের জন্যে পা বাড়ানোর মুহূর্তেই তাতাই সোলে করে বলটা বাঁদিকে টেনে নিয়েছে। মালয়েশিয়ান ডিফেন্ডারের সজোরে বাড়ানো পা বলে না লেগে আছড়ে পড়ল তাতাই-এর ডান পায়ের অ্যাঙ্কেলে। অসম্ভব যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠে তাতাই মাঠে শুয়ে ছটফট করতে করতেই রেফারির হুইসল জানিয়ে দিলো পেনাল্টি। মাঠের বাইরে স্ট্রেচারে শুয়ে শুয়েই তাতাই দেখল হেনরির নেওয়া পেনাল্টি থেকে টিম ইন্ডিয়ার উইনিং গোল। আলোকোজ্জ্বল বুকিত জলিল ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের অকল্পনীয় নিস্তব্ধতার মাঝেই জায়ান্ট স্ক্রিনে ফুটে উঠল ম্যাচের ফাইনাল রেজাল্ট। ইন্ডিয়া – ৩ মালয়েশিয়া – ২।

কুড়ি

তাতাইকে ওইভাবে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে স্ট্রেচারে শুয়ে মাঠ ছাড়তে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল সৌমি। ছেলের যন্ত্রণা নিজের বুকে অনুভব করলেও খুব শান্ত গলায় সৌমির মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়েছিল অনিমেষ,

- “সৌমি, ফুটবল বডি কন্টাক্ট গেম। এই রকম ছোটখাটো চোট আঘাতগুলোও পার্ট অফ দ্য গেম। আর পৃথিবীর সব বল প্লেয়াররাই ডিফেন্ডারদের টার্গেট হয়। কেঁদো না। দেখে মনে হল চোটটা খুব বড় কিছু না। সুতরাং নো টেনশন বরং তোমার ছেলের জয়টা সেলিব্রেট কর….”

অনিমেষের কথা শেষ হওয়ার আগেই মনীন্দ্র সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন,

- “নাহ্! যাই, নবীনের দোকান থেকে রসগোল্লা নিয়ে আসি। এই কমপ্লেক্সে সবাইকে মিষ্টিমুখ করাতে হবে! বৌমা, দু’শো পিস রসগোল্লায় হয়ে যাবে না?”

সৌমি সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়াতেই বেরিয়ে গেলেন নাতির গর্বে গর্বিত দাদান। অনিমেষ তাতাই-এর হোয়াটসঅ্যাপে “কনগ্র্যাটস, প্রাউড অফ ইউ” মেসেজ পাঠানোর মিনিট দশেকের মধ্যেই তাতাই-এর মেসেজ নয়, অনিমেষের হোয়াটসঅ্যাপে তাতাই-এর কল এলো,

- “পাপা, আই অ্যাম অ্যাবসলিউটলি ফাইন। অ্যাঙ্কেলে একটু লেগেছে বাট নাথিং সিরিয়াস। টিম ডক্টর বলেছে দু’তিন দিনের রেস্টেই ঠিক হয়ে যাবে। ফ্র্যাকচার হয়নি…..”

- “আসলে আমি না তোর মমই নাকের জলে চোখের জলে একাকার করছে। বাই দ্য ওয়ে, তার মানে সেমিফাইনাল ম্যাচটা মিস করবি…”

- “হুম! আই থিঙ্ক সো। ঠিকাছে, ফোনটা দ্য ক্রাইং ক্যুইনকে দাও…..

অনিমেষ ফোনটা সৌমিকে দিতেই ও বলে উঠল,

- “তোর পাপা না উঠতে বসতে মিথ্যে কথা বলে। আমি জাস্ট একটু ভয় পেয়েছিলাম। কাঁদবো কেন? বাই দ্য ওয়ে, তুই কি জানিস তোর দাদান আজ কী করেছে?”

- “দাদান? দাদান আবার কী করলো?”

- “ফার্স্ট অফ অল আমাদের সঙ্গে বসে টিভিতে পুরো ম্যাচ দেখেছে?”

- “দাদান? তাও আবার পুরো ফুটবল ম্যাচ? আর ইউ ক্রেজি?”

- “আরে শুধু তাই’ই নয়। এখন নবীনের দোকানে গেছে মিষ্টি আনতে। কমপ্লেক্সের সবাইকে মিষ্টিমুখ করাবে।”

- “আনবিলিভেবল! জাস্ট আনবিলিভেবল! আজ আমার ম্যাচ জেতা সার্থক হলো। দাদানকে বোলো আজকের ম্যান অফ দ্য ম্যাচের অ্যাওয়ার্ডটা দাদানকেই ডেডিকেট করলাম। আই লাভ ইউ অল মম। এবার রাখি। টিম হোটেলে ফিরতে হবে….”

কলটা কেটে বিজয়নের কাঁধে ভর করে তাতাই চড়ে বসল টিম বাসে। খেলার শেষে চিফ কোচের দীর্ঘ সময় ধরে উষ্ণ আলিঙ্গনটা তাতাই এখনো পুরো শরীর জুড়ে অনুভব করছে।

সেমি ফাইনালে জাপানের কাছে ৪-১ গোলে হারার ম্যাচটা তাতাই প্লেয়ারস এনক্লেভে বসেই দেখল। অ্যাঙ্কেলের ফোলাটা আগের থেকে কমে গেলেও টিম ডক্টর জানালেন ও এখনো ম্যাচ ফিট হয়নি।

দু’দিন পরেই টিম ইন্ডিয়া কুয়ালালামপুর-দিল্লী ফ্লাইট ধরল। তাতাই ভেবেছিল দিল্লী এয়ারপোর্টে ওদের নিয়ে ভীষণ হইচই হবে। ইন্ডিয়ার ক্রিকেট টিম বিদেশ থেকে সিরিজ জিতে ফিরলে যেমন মালা নিয়ে বোর্ডের তরফ থেকে প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেন তেমনই হয়তো এআইএফএফের তরফ থেকেও কেউ এয়ারপোর্টে থাকবে। কিন্তু এই কাকভোরে দু’চারজন নিউজ পেপার রিপোর্টার ফটোগ্রাফার ছাড়া আর কেউই নেই এয়ারপোর্টে, যাদের কাছে আন্ডার সিক্সটিন ইন্ডিয়ান ফুটবল টিমের কোনো গুরুত্ব আছে। দিল্লী থেকেই কোলকাতাগামী ফ্লাইট ধরবে অয়ন তাতাই আর নর্থ ইস্টের ছেলেরা। বাকীরাও ফিরবে নিজের নিজের জায়গায়। বড় টুর্নামেন্টের পরে এখন পনেরো দিনের ব্রেক। পনেরো দিন পরে আবার ছেলেরা যোগ দেবে পাতিয়ালার ক্যাম্পে। তার এক মাস পরেই টিম ইন্ডিয়া যাবে কলম্বিয়ায় আমন্ত্রণী টুর্নামেন্ট খেলতে। ওখানে পেরুর আন্ডার সেভেন্টিন ওয়ার্ল্ড কাপে যোগ্যতা অর্জনকারী বেশকিছু টিমও খেলবে। ওই টুর্নামেন্ট খেলেই টিম ইন্ডিয়া ধরবে পেরুর ফ্লাইট।

অনেক দিন পর তাতাই বাড়ি ফিরেছে। সৌমির কিচেন ডিউটিও আগের থেকে অনেক বেড়ে গেছে। তাতাই-এর খাওয়া দাওয়াও অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছে। ছেলে এখন ক্যালোরি মেপে খেতে শিখেছে। তবুও সৌমির ইচ্ছে এই ক’টা দিন ওকে মনভরে রেঁধে খাওয়াবে। অনিমেষও প্রায়ই অফিস না যাওয়ার ছুতো খুঁজছে ইদানীং। এমনকি দাদানও মাঝেমাঝেই তাতাইকে নিজের ঘরে ডেকে জিজ্ঞেস করছে মালয়েশিয়া দেশটার কথা। শুনতে চাইছে ওখানকার মানুষের গল্প। অনেক দিন পরে বাড়ি ফিরে তাতাই লক্ষ্য করছে বাড়ির পরিবেশটা যেন আমূল বদলে গেছে। আগের কড়া ডিসিপ্লিনের রাশটা যেন অনেকটাই আলগা। মালয়েশিয়া থেকে ফেরার পরে প্রথম দু’তিনটে দিন বিভিন্ন কাগজ আর টিভি চ্যানেলের রিপোর্টারের কাছে ইন্টারভিউ দিতে দিতেই কেটে গেছে। তাতাই বুঝতে পারছে রাতারাতিই ও বিখ্যাত হয়ে গেছে। তিনদিন পরে ডিনার টেবিলে খেতে খেতেই অনিমেষ বলেই ফেলল কথাগুলো,

- “তাতাই, এটা সবে শুরু। আজ তোর উড়ান ঊর্ধ্বগামী বলে মিডিয়া পেছনে ঘুরঘুর করছে। কাল মুখ থুবড়ে পড়লেই ওদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই যে কমপ্লেক্সের সবাই ডেকে ডেকে কথা বলছে, সাফল্যের চূড়া থেকে নেমে এলেই দেখবি আশেপাশে কেউ নেই। একটা কথা আছে “প্র্যাকটিস মেকস আ ম্যান পারফেন্ট”। প্র্যাকটিসের একমাত্র বিকল্প প্র্যাকটিসই। স্পোর্টসম্যানদের শরীরটাই মন্দির। সেটাকে সব সময় ফিট রাখতে হবে। তুই কাল থেকে বরং গুলেদার কোচিং-এ দু’বেলা করে প্র্যাকটিসে যা।”

পাপার কথাগুলো যে কতটা সত্যি তা তাতাইও হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে। ওদের পাশের ফ্ল্যাটের সঞ্জীবকাকু, যার ছেলে দিল্লী আইআইটিতে বিটেক করছে তিনিও কাল রাস্তায় ডেকে অনেকক্ষণ জেরা করলেন। এমনকি ডি-ব্লকের ওই ঘ্যামবাজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ক্লাস এইটে পড়া ফার্স্ট গার্ল সৃঞ্জিনী রে, এতদিন যে তাতাইদের মতো মিডিওকার স্টুডেন্টদের মানুষ বলেই মনে করত না, আজ বিকেলে সেই অপ্সরাও মাঝ রাস্তায় “হাই সৌম্য” বলে ডেকে তাতাই-এর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল। এমনকি কালকেও এই সময় ও স্কুল থেকে ফিরবে সেটাও তাতাইকে জানিয়ে দিয়েছে। তাতাই বুঝতে পারছে না পাপা কি ওকে সৃঞ্জিনীর সঙ্গে কথা বলতে দেখেছে? ওই জন্যেই কি পাপা ওই কথাগুলো বলল? তাতাই মনে মনে ঠিক করল কাল থেকে ও গুলেদার কোচিং-এ প্র্যাকটিসে যাবে। শুধু কালকে বিকেলে যাবে না। প্র্যাকটিসের নাম করে ও যাবে সৃঞ্জিনীর সঙ্গে দেখা করতে। ওকে নিয়ে যে পাড়ার সব ছেলেদের মধ্যে একটা চাপা প্রতিযোগিতা ছিল সেটা মনে পড়তেই তাতাই-এর ঠোটের কোনে একটা আত্মতৃপ্তির হাসি চলকে পড়ল। তাতাই-এর আপন মনে হাসিটা সৌমির নজর এড়ালো না। “কী রে আপন মনেই হাসছিস যে” বলে সৌমি চেপে ধরতেই অপ্রতিভ গলায় তাতাই বলে উঠল,

- “আরে কিছুই না। বিজয়নের বলা একটা জোকস মনে পড়তেই হেসে ফেললাম। এনিওয়ে, আমার ডিনার কমপ্লিট। আমি উঠলাম। গুডনাইট…..”

বেসিনে হাত ধুয়ে তাতাই পা বাড়াল নিজের ঘরের দিক। ওর যাওয়ার পথে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সৌমি মনে মনে ভাবতে লাগল এই ক’মাসেই ছেলেটা কত ম্যাচিওরড হয়ে গেছে।

পরের দিন সকালেই কিটস ব্যাগ হাতে তাতাই হাজির হল গুলেদার কোচিং-এ। ওকে দেখেই গুলেদা জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত গলায় জিজ্ঞেস করল,

- “আমাদের হবু বিশ্বকাপার কি আজ পাড়ার মাঠে প্র্যাকটিস করবে?”

- “এই রকম লেগ পুলিং করলে কিন্তু কাল থেকে আর আসবো না।”

গুলেদার রসিকতায় কপট রাগ দেখাতেই ওর দু’কাঁধে হাত রেখে হাসতে হাসতে গুলেদা বলে উঠল,

- “না এলে বাড়ি গিয়ে ঠ্যাং ভেঙে দোবো। তুই বিশ্বকাপারই হ কিম্বা আর কিছু তোর লেগ পুলিং করা আমার বার্থ রাইট। তবে একটা কথা, আমার কথা রাখার জন্যে আমার হয়ে তুই অনিমেষদাকে থ্যাংস জানিয়ে দিস। এখন চল প্র্যাকটিসে নাম….”

সকালে প্র্যাকটিস সেরে দুপুরে একটু রেস্ট নিয়ে কিটস ব্যাগ হাতে প্র্যাকটিসে যাওয়ার নাম করে সাড়ে চারটেতেই তাতাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। সৃঞ্জিনীর স্কুল থেকে ফিরতে যদিও সাড়ে পাঁচটা বাজবে। কিন্তু তখন প্র্যাকটিসের নাম করে বেরোলে মমের সন্দেহ হবে। কিটস ব্যাগ হাতেই তাতাই গিয়ে বসল লেকের ধারে একটা গাছের তলায়। সৃঞ্জিনীর আসতে এখনো ঘণ্টাখানেক দেরী। এই দিকটাতে বিশেষ লোকজনের যাতায়াত নেই। ইতিউতি ভাবে কিছু গাছের নিচে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে শুধু কয়েক জোড়া কাপল। তাতাই ঘনঘন সময় দেখছে। সময় যেন এগোতেই চাইছে না আজ। অক্টোবর মাস চলছে। দিন আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে। পাঁচটা বাজতে না বাজতেই রোদ হালকা হয়ে লেকের জলে গাছের লম্বালম্বা ছায়া পড়তে শুরু করেছে। ঠিক পাঁচটা পনেরোতে উঠে পড়ল তাতাই। এখান থেকে পাটুলি মোড় হেঁটে যেতে ম্যাক্সিমাম মিনিট দশেক লাগার কথা।

পাটুলির মোড়ে এসে দাঁড়ালো সৃঞ্জিনীর স্কুল বাস। বাস থেকে নেমেই তাতাইকে দেখে প্রজাপতির মতো পাখা মেলে যেন উড়ে এসে দাঁড়াল তাতাই-এর সামনে। ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি ঝুলিয়ে জিজ্ঞেস করল,

- “কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছো?”

- “এই তো বেশিক্ষণ না। সাড়ে চারটে থেকে।”

তাতাই-এর উত্তর শুনে অবাক হয়ে সৃঞ্জিনী জিজ্ঞেস করল,

- “ওহ মাই গস! এত আর্লি কেন? আমি তো বললামই আমার আসতে ফাইভ থার্টি হবে।”

- “সে তো জানিই। কিন্তু প্র্যাকটিসে যাওয়ার নাম করে বেরিয়েছি যে। মমকে তো আর তোমার কথা বলে বেরতে পারতাম না।”

তাতাই-এর সারল্য মাখানো উত্তর শুনে মুচকি হেসে সৃঞ্জিনী ঠাট্টার সুরে বলে উঠল,

- “তুমি কি ডেটিং-এ এসেছ যে মমের কাছে হাইড করতে হবে?”

- “না তা নয়, আসলে……”

সৃঞ্জিনীর অকপট ঠাট্টায় অপ্রস্তুত হয়ে তাতাই কথার খেই হারিয়ে ফেলতেই “ইউ আর সো কিউট” বলে তাতাই-এর হাতে একটা খাম ধরিয়ে নিজেদের কমপ্লেক্সের দিকে হাঁটা লাগাল সৃঞ্জিনী। তাতাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সৃঞ্জিনীর দিকে। রাস্তার বাঁকে সৃঞ্জিনী হারিয়ে যেতেই তাতাই হাতের খামটা খুলে দেখল একটা গ্রিটিংস কার্ড। যার ওপরে আঁকা একটা টকটকে লাল হার্ট। তার ওপর গোল্ডেন কালারে লেখা “আই উইল অলওয়েজ ফাইন্ড মাই ওয়ে টু ইউ”। খুব যত্ন করে কার্ডের কভারটা ওলটাতেই তাতাই দেখল ভেতরে অসংখ্য রঙবেরঙের ছোট ছোট হার্টের ওপর লেখা “লাভ ইজ লাইক দ্য উইন্ড, ইউ কান’ট সি ইট বাট ইউ ক্যান ফিল ইট” – সৃঞ্জিনী।

কার্ডের লেখাগুলো বেশ কয়েকবার পড়ে কিটস ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল তাতাই। হঠাতই রাস্তার একপাশ ধরে দৌড়তে শুরু করল। মমকে ও প্র্যাকটিসের কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। এই রকম ফ্রেস চেহারা নিয়ে বাড়ি ফিরলেই ও ধরা পড়ে যাবে। ভীষণ দ্রুত বেগে দৌড়তে দৌড়তে লেকের ধারে যখন পৌঁছল ততক্ষণে অস্তগামী সূর্যের লালিমায় লালচে হতে শুরু করেছে লেকের নিস্তরঙ্গ জল। তাতাই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেলো লেকের ধারে বসে থাকা কাপলরা অন্ধকারের অজুহাতে আগের থেকেও যেন বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে। ওদের দেখতে দেখতেই দৌড়নোর স্পিড যেন আরও বেড়ে গেল তাতাই-এর। ঘামে ভেজা টি-শার্টের তলাটা দিয়ে কপালের দু’পাশ দিয়ে গড়িয়ে আসা ঘাম মুছতে মুছতে পা বাড়াল ওদের কমপ্লেক্সের দিকে।

একুশ
—-

খবরটা এক সাংবাদিকের ফোন মারফত অনিমেষ অফিসেই পেয়েছিল। ওই রকম খবর পেয়ে ও আর অফিসে বসে থাকতে পারেনি। বাড়ি ফিরে এলো ভর দুপুরেই। সৌমি দরজা খুলেই বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করল,

- “কী গো, এই অসময়ে বাড়ি চলে এলে? শরীর ঠিক আছে তো?”

সৌমির প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়েই অনিমেষ পাশ কাটিয়ে ঢুকে গেল ড্রইং রুমে। উদ্ভ্রান্তের মতো দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরে সোফায় বসল। অনিমেষকে এই রকম অদ্ভুত আচরণ করতে দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গেল সৌমি। সসংকোচে জিজ্ঞেস করল,

- “তোমায় ভীষণ টেনসড আর ডিপ্রেসড দেখাচ্ছে? এনি ব্যাড নিউজ?”

সৌমির প্রশ্নে ধীরে ধীরে মুখ তুলল অনিমেষ। একেবারে বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়তে পড়তে অস্ফুটে বলে উঠল,

- “আমাদের তাতাই-এর সঙ্গেই কেন এমন হয় বলতে পারো?”

- “তাতাই-এর সঙ্গে মানে? কী হয়েছে সেটা বলবে তো?”

চরম উষ্মা মেশানো গলায় সৌমি চিৎকার করে উঠতেই নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করে অনিমেষ উত্তর দিল,

- “ওরা তাতাইকে ওয়ার্ল্ডকাপ স্কোয়াড থেকে বাদ দিয়েছে। ওর নাকি বয়েস কম আর অ্যাঙ্কেলে চোট। ওর বদলে যে ছেলেটা টিমে এসেছে সে নাকি এআইএফএফের এক জয়েন্ট সেক্রেটারির ভাইপো…”

- “হোয়াট! কী বলছ তুমি? তুমি কী করে জানলে?”

সৌমির বিস্মিত প্রশ্নে ভীষণ ঠাণ্ডা গলায় অনিমেষ উত্তর দিলো,

- “এক পরিচিত সাংবাদিক আমায় ফোন করেছিল। ওর এক সাংবাদিক বন্ধু দিল্লি থেকে ওকে খবরটা দিয়েছে। আজ টিম সিলেকশন মিটিং-এ এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চিফ কোচ বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজ রিজাইন করেছেন….”

ওদের স্বামী স্ত্রী’র আলোচনার মাঝেই তাতাই কখন যে ওদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অনিমেষ বা সৌমি কেউই বুঝতে পারেনি। তাতাইকে দেখে অনিমেষের বুকে জমে থাকা কান্নার হিমশৈল যেন গলতে শুরু করল। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল অনিমেষ। অনিমেষকে সান্ত্বনা দিতে তাতাই অস্ফুটে বলে উঠল,

- “পাপা, ইট’স দ্য রিয়েলিটি অফ ইন্ডিয়ান ফুটবল। ওই জন্যেই জাপান কোরিয়া আমাদের বলে বলে চার পাঁচ গোল দেয়। তবে দেখে নিও, ওরা আমায় আটকাতে পারবে না…….”

তাতাই-এর ম্যাচুরিটি আর সেল্ফ কনফিডেন্স দেখে সৌমি আর অনিমেষ বিস্মিত হয়ে গেল। এইটুকু বয়েসেই জগতটাকে চিনতে আর বুঝতে শুরু করেছে ছেলেটা, এমনকি ফুটবল মাঠের রাজনীতি অথবা স্বজনপোষণটাও।

ওদের কথার মাঝেই অনিমেষের মোবাইলের রিং বেজে উঠল। “ফালতু কল, আননোন নাম্বার” বলে কলটা কেটে ফোনটা টেবিলে রেখে দিলো। মোবাইলটা রাখতেই আবার বেজে উঠল। অনিমেষ দেখল সেই আগের আননোন নাম্বার থেকেই আবার কল। অনিমেষ মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হয়ে বেশ রুক্ষ গলায় “হ্যালো” বলতেই ওপর প্রান্ত থেকে ভেসে এলো,

- “অ্যাম আই স্পিকিং টু মিঃ সেনগুপ্তা?

- “ইয়েস! অনিমেষ সেনগুপ্তা হিয়ার….”

অনিমেষের ভীষণ নির্লিপ্ত উত্তরে ওকে চমকে দিয়ে ভেসে এলো,

- “আই অ্যাম বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজ। আই হোপ আপ মুঝে পহেচানোগে….”

“ইয়েস স্যার! হোয়াট আ প্লেজেন্ড সারপ্রাইজ” বলে তাতাই-এর মুখে একবার চোখ বুলিয়ে অনিমেষ খুব মন দিয়ে অন্য প্রান্তের কারো কথা খুব মন দিয়ে শুনে চলেছে। তাতাই আর সৌমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অনিমেষের মুখের দিকে। মুখে “হুঁ” “হাঁ” উত্তর দিয়ে শুধু শুনে চলেছে অপর প্রান্তের কথা। কথা শুনতে শুনতে অদ্ভুতভাবে প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তন হচ্ছে মুখের অভিব্যক্তি। তাতাই আর সৌমি লক্ষ্য করছে এতক্ষণ ধরে অনিমেষের মুখে জড়িয়ে থাকা হতাশা আর রাগের কালো মেঘের ফাঁক গলে হঠাত যেন উঁকি মারছে উজ্জ্বল সূর্যরশ্মি। অনিমেষ কলটা কাটতেই মা-বেটায় প্রায় সমস্বরে একই প্রশ্ন করল,

- “কলটা কার ছিল?”

“জাস্ট গেস” বলেই অনিমেষ ওদের দু’জনকে হতচকিত করে একটা সিগারেট ধরিয়ে এক বুক ধোঁয়া ছেড়ে সোফায় গিয়ে বসল। অনিমেষ বাড়িতে বিশেষ সিগারেট খায় না। আর খেলেও ব্যালকনিতে গিয়ে খায়। তাই ওর এই রকম অদ্ভুত আচরণে বিরক্ত হয়ে তাতাই চিৎকার করে উঠল,

- “ডোন্ট বি ক্রেজি পাপা। প্লিজ বলো কলটা কে করেছিল?”

একটা লম্বা টান দিয়ে সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে সোফা থেকে উঠে এলো অনিমেষ। তাতাইয়ের ঝাঁকড়া চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বলে উঠল,

- “তোর বিবিয়ানো স্যার ফোন করেছিল……”

- “হোয়াট! বিবিয়ানো স্যার? কেন?”

তাতাই-এর বিস্মিত প্রশ্নের খেই ধরেই অনিমেষ বলে চলল,

- “তোকে স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়ায় উনি ভীষণ ডিপ্রেসড। তবে তোকে নিয়ে ওঁর বিরাট আশা। উনি বললেন সৌম্য ইজ নট ফিট ফর ইন্ডিয়ান ফুটবল, হি হ্যাজ বর্ন টু প্লে ইন ইয়োরোপিয়ান সার্কিট। মালয়েশিয়ায় তোর খেলা দেখে দুটো ইয়োরোপিয়ান অ্যাকাদেমির স্কাউটরা নাকি তোকে স্পট করেছে। আমার কন্ট্যাক্ট নম্বর ওদের উনিই দিয়েছেন……”

- “ইয়োরোপিয়ান অ্যাকাদেমি আমায় স্পট করেছে? আর ইউ ক্রেজি”

তাতাই-এর বিস্ময় কাটতে না কাটতেই অনিমেষ উত্তর দিলো,

- “হ্যাঁ, নেদারল্যান্ডসের অ্যাজাক্স ইউথ অ্যাকাডেমি আর ইংল্যান্ডের ফুলহ্যাম ফুটবল অ্যাকাডেমি। তবে তোর বিবিয়ানো স্যারের মতে অ্যাজাক্সটাই ভাল…”

- “অ্যাজাক্স…. ইউ মিন অ্যাজাক্স আমস্টারডাম? ওহ মাই গস! অ্যাজাক্স আমস্টারডাম ইজ আ ইয়োরোপিয়ান জায়ান্ট…..”

তাতাই-এর গোলগোল চোখে চোখ রেখে অনিমেষ উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠল,

- “ইয়েস মাই ডিয়ার! ওদেরই ইউথ অ্যাকাডেমি….. সেই জন ক্রুয়েফ থেকে শুরু করে ভ্যান বাস্তেন…… ফ্রান্ক রাইকার্ড….. সিডর্ফ….কত যে মণিমূক্ত বেরিয়েছে ওই অ্যাকাডেমি থেকে….”

দু’দিন পরেই অনিমেষের মোবাইলে কল এলো সেই সুদূর আমস্টারডাম থেকে। ওরা জানালো মালয়েশিয়ার আন্ডার সেভেন্টিন ওয়ার্ল্ডকাপ কোয়ালিফায়ার থেকে দু’জন প্লেয়ারকে অ্যাজাক্স ইউথ অ্যাকাডেমির আন্ডার সিক্সটিন টিমের জন্যে স্পট করেছে। একজন জাপানিজ মিডফিল্ডার আকিরা ওসাকা আর দ্বিতীয়জন ইন্ডিয়ান সৌম্য সেনগুপ্তা। সৌম্য ইন্ডিয়ান স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েছে শুনে অ্যাজাক্সের কো-অর্ডিনেটর ভীষণ অবাক হয়েও জানিয়েছিল সৌম্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভিসা করিয়ে যেন তৈরি থাকে। ওরা ক্যুরিয়ারে কন্ট্যাক্ট পেপার পাঠাবে। সেটা সই করে ওদের কাছে পাঠালেই ওরা সিলেকশন লেটার পাঠাবে। সৌম্যর ভিসা রেডি হলেই ওরা এয়ার টিকিট পাঠিয়ে দেবে।

সমস্ত ফর্মালিটিস কমপ্লিট হতে হতেই নভেম্বরের শেষ। ততদিনে বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজ মারফৎ সবকিছুই মিডিয়া জেনে গেছে। কোলকাতার তো বটেই সর্বভারতীয় কাগজেও খেলার পেজে হেডলাইন হয়েছে প্রথম কোনো ভারতীয় ফুটবলারের সদর্পে ইয়োরোপিয়ান সার্কিটে পদার্পণের খবর।

অ্যাকাডেমি তাতাইকে বছরে একবারই কুড়ি দিনের হলিডেতে ইন্ডিয়া আসার সুযোগ দেবে। এয়ার ফেয়ারও ওরাই স্পন্সর করবে। প্রথম বছর ফুড অ্যান্ড লজিং ছাড়াও মাসে ৫০০ ইয়োরো করে স্টাইপেন্ডও দেবে। নেদারল্যান্ডসের মতো ফুটবল ঐতিহ্যশালী দেশে এই রকম অকল্পনীয় সুযোগ পেয়েও কেন কে জানে তাতাই-এর মনটা ভাল নেই। এয়ার টিকিট হাতে পেতেই মম কেমন যেন গুমরে আছে। আড়াল থেকে তাতাই মমকে কাঁদতেও দেখেছে। যদিও তাতাই-এর সামনে সেটা বুঝতে দিতে চায় না। তার ওপর আবার তাতাই আমস্টারডাম চলে যাবে শুনে সৃঞ্জিনীও সেদিন খুব কেঁদেছিল। খবরটা তাতাই-এর মুখে না শুনে খবরের কাগজ থেকে জানতে হয়েছিল বলে ওর ভীষণ অভিমানও হয়েছিল। আসলে ইন্ডিয়ান স্কোয়াড থেকে তাতাই-এর আনএক্সপেক্টেড বাদ পড়ার পর ও নিশ্চিত না হয়ে আর বলতে চায়নি। তাতাই-এর যুক্তি শুনে সৃঞ্জিনীর অভিমান কিছুটা কমলেও পাটুলির লেকের ধারে তাতাই-এর হাত ধরে “কোনো ইয়োরোপিয়ান মেয়ের দিকে তাকালেই তোমার মমকে বলে দোবো” বলেই দৌড় লাগিয়েছিল নিজেদের কমপ্লেক্সের দিকে।

তাতাই-এর ইয়োরোপ যাত্রার খবর শোনার পর থেকেই ওর পাপা যেন টগবগ করে ফুটছে। পাপাকে দেখে জীবনে সাফল্যের প্রথম সিঁড়িতে পা দেওয়ার আনন্দটা যখনই সেলিব্রেট করতে ইচ্ছা হচ্ছে ঠিক তখনই মম আর সৃঞ্জিনীর চোখের জল দেখে তাতাই-এর’ও ভীষণ কান্নাও পাচ্ছে। যাওয়ার দিনটা যত এগিয়ে আসছে ও নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত টানাপড়েন অনুভব করছে। কিন্তু তাতাই জানে এটাই জীবন, কিছু পেতে গেলে কিছু ছাড়তেই হবে।

অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটা এসেই গেল। টিম ইন্ডিয়ার যেদিন ওয়ার্ল্ডকাপ প্রস্তুতি টুর্নামেন্ট খেলতে কলম্বিয়া উড়ে যাওয়ার কথা তার ঠিক দু’দিন আগেই আমস্টারডামগামী প্লেনে চড়ে বসল তাতাই আর অনিমেষ। হঠাত মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে আবার আকাশে ডানা মেলে দিলো বাজপাখিটা। ফের শুরু হল অনিমেষ সৌমি আর তাতাই-এর স্বপ্নের উড়ান।

- সমাপ্ত –

উড়ান
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments