এক
—-

মাঠ ভর্তি দর্শকের প্রবল উল্লাস আর চিৎকারের মধ্যেই কিক-অফ সার্কেলের একটু আগে দাঁড়ানো মেসির দিকে ভেসে এলো বলটা। মাথায় রিসিভ করা বলটা বুক কোমর থাই বেয়ে বাঁ পায়ের চেটোয় পড়তেই দু’দিক থেকে জোড়া স্লাইডিং ট্যাকল। দু’পায়ের চেটোয় বলটা চেপে ধরে হিলহিলে শরীরটাকে তুলে সামনের দিকে একটু এগিয়ে দিতেই দুই ডিফেন্সিভ মিড ফিল্ডার প্রিন্সিপ্যাল ম্যাম আর ম্যাথসের সঞ্জীব স্যারের পুরো শরীর ধুলো কাদায় মাখামাখি। ম্যাম ধুলো ঝেড়ে শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুঁজে নাকের নিচে নেমে আসা গোলগোল বড় ফ্রেমের চশমাটা হাতের আঙুল দিয়ে একটু তুলে মেসির দিকে কটমট চোখে তাকাতে তাকাতেই মেসি ততক্ষণে সপ্তাহে তিন দিন সন্ধেয় বাড়িতে পড়াতে আসা নন্দন স্যারকে বাঁপায়ের আউট সাইড ডজে ছিটকে ফেলে সাপের মত এঁকে বেঁকে এগিয়ে চলেছে বিপক্ষের গোলের দিকে। বিপক্ষের টেন ইয়ার্ডস বক্সের মাথায় মেসিকে অভ্যর্থনা করতে দল বেঁধে হাজির সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার আমেরিকা প্রবাসী ছোটমামা মনি পিসি পাপার অফিসের বস নরেন আঙ্কল আর বাড়ির ফিজিক্স স্যার। মেসির দিকেই সকলের দৃষ্টি আবদ্ধ। সবার অলক্ষ্যে মেসিকে ডান দিকে রেখে লেফট উইং দিয়ে কখন যে তাতাইও উঠতে শুরু করেছে কেউ খেয়ালই করে নি। মেসির বাঁপায়ের চেটোর আউট সাইডের আলতো টোকায় উইং দিয়ে উঠে আসা তাতাইয়ের পায়ে বল পড়তেই মাঠ একদম নিশ্চুপ। তাতাইকে থামাতে হিস্ট্রি মিস পা বাড়াতেই বাঁপায়ে ইনসাইড কাট করে গোলমুখ খুলে গেল। মুখ তুলতেই তাতাই দেখল প্রথম পোস্টের সংকীর্ণ পরিসরটুকু আগলে যাকে ও সব থেকে ভয় পায় সেই তিনি, গিয়ানলুইগি বুঁফো, মানে তাতাইয়ের মম। তাতাই বাঁপায়ে শরীরের সমস্ত ভারটুকু সঁপে দিয়ে শরীরটাকে বাঁদিকে ঈষৎ হেলিয়ে ডান পায়ের ইনসাইড দিয়ে বলটাকে আলতো করে ভাসিয়ে দিলো। ঠিকানা লেখা বলটা ইনস্যুইং সোয়ার্ভ করে সেকেন্ড পোস্টকে চুমু খেয়ে জালে জড়িয়ে যেতেই নিস্তব্ধ মাঠের প্রতিটি দর্শক চিৎকার করে উঠল, গো ও ও ও ল…..

মেসি ছুটে এসে তাতাইকে বুকে জড়িয়ে ধরার আগেই সৌমির ধাক্কা,

- “তাতাই ওঠ… ছ’টা বেজে গেছে…সাতটায় স্কুলের বাস….

- “উফ্ মম! ইউ আর জাস্ট ইমপসিবল। আর পাঁচ মিনিট পরে ডাকলেই…”

তাতাইয়ের ঘুম জড়ানো গলার কথা শেষ করতে না দিয়েই খিঁচিয়ে উঠল সৌমি,

- “তাতে কী কী রাজা উজির মারতি শুনি? ফার্স্ট টার্মের ম্যাথসের সিক্সটি ফাইভ নাইন্টি ফাইভ হয়ে যেত নাকি হিস্ট্রিতে পাশ করতি…”

- “না মানে মেসি…..”

তাতাইয়ের মুখের কথা হাওয়াতেই লুফে নিয়ে ফের ধমক,

- “কে মেসি? তাতাই ডোন্ট ফরগেট ইওর টার্গেট। তোমার পাপার বস নরেন আঙ্কলের ছেলে ঝজুদা এবছরই আইআইটি খরগপুরে অ্যাডমিশন নিলো। নরেন আঙ্কল সেদিন কি বলেছিল মনে আছে তো?”

“হুমমম..” বলে বিছানা ছাড়ল তাতাই। ও জানে এই সব বিষয়ে মমের সঙ্গে তর্ক করে কোনই লাভ নেই। তাতাই এ’বছরই ক্লাস এইটে উঠল। নামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ছে ছোট থেকেই। ও মোটামুটি নম্বর পেয়ে পাশও করে যায় প্রত্যেক বছর। ওর রেজাল্ট নিয়ে অনিমেষও বিশেষ অনুযোগ করে না। কিন্তু তাতাইকে নিয়ে সৌমির অনেক স্বপ্ন। সৌমির স্বপ্নে আইআইটি আইআইএম, ওর স্বপ্নে ছোড়দার মত সিলিকন ভ্যালির মায়াবী জগত। কিন্তু তাতাইয়ের ধ্যানে জ্ঞানে শুধুই সবুজ ঘাস আর সেই সবুজ ঘাসে ফুটবলের আলপনা।

বিভিন্ন স্কুলের রকমারি ড্রেস পরা বিভিন্ন বয়েসের বেশ কিছু বাচ্চার গন্তব্য এই মুহুর্তে পাটুলি থানা বাস স্ট্যান্ড। সব স্কুল বাসই এসে থামবে পাটুলি থানা স্টপেজে। বেশিরভাগ বাচ্চার সঙ্গেই তাদের মা। শুধু তাতাইয়ের মত দু’একজনের সঙ্গে বাবা। সকলের পিঠেই বই ভর্তি ঢাউস ব্যাগ। পিঠের ভারি ব্যাগটাকে ব্যালেন্স করতে সব বাচ্চাই যেন সামনের দিকে ইষৎ ঝুঁকে রাস্তায় হাটছে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতেই তাতাইয়ের নজরে পড়ল বৈষ্ণবঘাটা ইয়ং স্টারসের মাঠটা। গুলেদার কোচিং-এ ওয়ার্ম-আপ করছে সন্দীপ সুমন পল্টু অর্ঘ্য কুন্তলরা। বাঁশি মুখে ওদের মাঠে চক্কর দেওয়াচ্ছে গুলেদা। তাতাই জানে আর আধ ঘণ্টা পরেই দু’দলে ভাগ করে শুরু হবে প্র্যাকটিস ম্যাচ। গত বছর পর্যন্ত তাতাইও শণি রবিবার করে সকালের প্র্যাকটিসেও আসতো। কিন্তু সেভেনের অ্যানুয়ালে ম্যাথস আর হিস্ট্রি একজামে কী যে হল! মাথসে ফর্টি এইট আর হিস্ট্রির কথা না বলাই ভাল। এইটে উঠতেই সৌমি যেন আরও কড়া হয়ে উঠল। স্কুলের ছুটির দিনের সকালের প্র্যাকটিসও বন্ধ হল তাতাইয়ের। শুধু বিকেলের দু’আড়াই ঘণ্টা। শুনে গুলেদা ওরফে অমিত সেন ভীষণ রেগে গেছিল। একদিন বাজারের মধ্যে অনিমেষকে দেখতে পেয়ে খুব উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল,

- “কী ব্যাপার বলুন তো দাদা? তাতাইয়ের ছুটির সকালের প্র্যাকটিসটাও বন্ধ করে দিলেন? ছেলেটার মধ্যে কিন্তু স্পার্ক ছিল।”

- “ইয়ে, না মানে, ওর মা’র ইচ্ছে পড়াশুনাটা…. তাছাড়া সেভেন থেকে এইটে উঠতে রেজাল্টটাও….”

অনিমেষের আমতা আমতা করে বলা কথার মঝেই অমিত বলে উঠল,

- “তার মানে দাদা আপনারও ইচ্ছে তাতাই ছুটির দিনে সকালেও প্র্যাকটিসে আসুক? প্লিজ আপনি বৌদিকে একটু বোঝান দাদা। তাতাই একটা আনকাট হিরে। একটু ঘষামাজা করতে পারলে…. ওর বাঁ’পা কথা বলে। বিশ্বাস করুন দাদা, কৃশানুদার পরে এই রকম বাঁ’পা আমি আর দেখিনি। ওকে আপনি আমায় দিন দাদা। ওর ওপর আমার অনেক স্বপ্ন….”

- “দেখো ভাই, ওর বয়েসে আমিও ফুটবল পাগল ছিলাম। ইন ফ্যাক্ট আমিও কৃশানু না হলেও অন্তত পক্ষে বিকাশ পাঁজি হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভাই, বাই এন্ড অফ দ্য ডে পড়াশুনাটাই আঁকড়ে ধরতে হয়েছিল। এখন জীবনে কম্পিটিশনটা আরও টাফ। এই টাফ কম্পিটিশনের যুগে সময় নষ্ট করে ফুটবল খেলার বিলাসিতাটা…..”

অনিমেষের কথা শুনে অদ্ভুত মুচকি হেসে “বিলাসিতা নয় প্যাশন, অনিমেষদা, প্যাশন..” বলেই বাজারের ভিড়ে মিশে গেছিল অমিত। অমিতের মুখ থেকে বেরনো প্রতিটা শব্দ যেন ছুঁচের মত বিঁধেছিল অনিমেষের গায়ে। এক লহমায় অনিমেষ ফিরে গেছিল ত্রিশ বছর পেছনে। সামনেই ওর ক্লাস নাইনের অ্যানুয়াল পরীক্ষা। অনিমেষের মিলিটারি মেজাজের হেড মাস্টার বাবার নির্দেশে আপাতত ফুটবল মাঠের দাপাদাপি নিষিদ্ধ। ওদিকে পাড়ার টিমের ফুটবল কোচের জেদাজেদিতেই বাবাকে লুকিয়ে নাইলনের জালের ব্যাগে জার্সি শর্টস বুট হোস আর সিনগার্ড নিয়ে অনিমেষ হাজির হয়েছিল ভবানীপুর টেন্টে। সাব জুনিয়ার বেঙ্গল টিমের সিলেকশন। সেই প্রথমবার আরও দু’জন সহকারির সঙ্গে অনিমেষ চাক্ষুষ করেছিল পাড়ার ফুটবল কোচ সুবীরদার মুখে হাজারবার শোনা গল্পের সেই মানুষটাকে। অচ্যুৎস্যার ওরফে অচ্যুৎ ব্যানার্জীকে। নিজেদের বেড়ে ওঠার দিনে ওঁর জাদু স্পর্শ নাকি যারাই পেয়েছেন তারাই ময়দান কাঁপিয়েছে। সুবীরদা বলে ওঁর নাকি জহুরির চোখ। ওই চোখেই ধরা পড়েছে ময়দানের অসংখ্য রথীমহারথী।

প্রথম দিনের ট্রায়ালের পর অচ্যুৎস্যরের সহকারী বিপুলদার মুখে বাছাই পঞ্চাশ জনের মধ্যে নিজের নামও শুনে নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারেনি অনিমেষ। বাড়ি ফিরে বাবার ভয়ে সন্ধেতে পড়তেও বসেছিল। কিন্তু পড়তে বসাই সার। ওর মগজে বারবার উঁকি দিচ্ছে সেই তরুন নামের লম্বা ছিপছিপে স্টপারটা। আজকের ট্রয়াল ম্যাচে দু’একবার ওকে টপকাতে পারলেও বেশিরভাগ সময়েই ধরা পড়েছে ওর পায়ে। কী অসম্ভব ভাল কভারিং আর নিখুঁত ট্যাকল। যদিও অনিমেষের একটা ক্রশ থেকে পার্ফেক্ট হেডে তরুণকে টপকে গোল মেরে গেছে রিষড়ার শিশির বলে একটা ছেলে। তবুও অনিমেষ নিজের খেলায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি। মনে মনে ঠিক করেছে কালকের ট্রায়ালে তরুণ যদি ওর বিপক্ষে থাকে কিছুতেই ওকে ওর শরীরের মধ্যে ঢুকে ট্যাকল করতে দেবে না। অনিমেষ জানে নিজের প্লাস পয়েন্ট। ও জানে তাৎক্ষণিক চোরা গতিই ওর প্রধান অস্ত্র। সেই অস্ত্রেই কাল মারবে তরুণকে।

অনিমেষের আজও মনে পড়ে সেই দিনটা যেটা ছিল তাতাই জন্মানোর আগে পর্যন্ত ওর জীবনের সব থেকে স্মরণীয় দিন। দ্বিতীয় দিনের ট্রায়ালের শেষে স্বয়ং অচ্যুৎস্যার ওর মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন -”লেগে থাক! তোর হবে…”। অনিমেষ আজও আফশোস করে লেগে থাকতে না পারার জন্যে। তিন দিন পরে সুবীরদাই দিয়েছিল খবরটা। বাংলাদেশ সফরের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত অনুর্ধ ষোল বেঙ্গল টিমের চব্বিশ জনে অনিমেষের নামও আছে। অচ্যুৎস্যারের কোচিং-এ তিন মাস পরে এদের থেকেই আঠারো জনের নির্বাচিত টিম যাবে বাংলাদেশ। এক মাসের সফরে মোট সাতটা প্রীতি ম্যাচ খেলবে দল। দু’চোখের উপচে পড়া স্বপ্নের তাড়নায় দুরুদুরু বুকে স্কুলের হেডমাস্টার বাবার সামনে হাজির হয়েছিল অনিমেষ। ওর মুখে সব শুনে হিটলারি মেজাজের মনীন্দ্র সেনগুপ্তর আদেশ,

- “অনিমেশ, আমি গরীব শিক্ষক। তাই চাইনা তুমিও আমার মতোই জীবন যাপন কর। আর পড়াশুনা করে জীবনে দাঁড়ানো সব চেয়ে সহজ। চুনি পিকে কয়েক কোটিতে দু’এক ‘জন হয় কিন্ত কয়েক হাজারেই একজন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার অথবা উকিল। তোমাকে জীবনে সহজ টার্গেট দিয়েছি। ট্রাই টু অ্যাচিভ ইট। খেলাধুলো করে সময় নষ্ট আমাদের মতো ঘরে বিলাসিতা…….”

তাতাইয়ের কোচ অমিতকে বলা নিজে মুখের “ফুটবল খেলার বিলাসিতা…” শব্দগুলোতে অনেক বছর পরে নিজের মধ্যে বাবাকে খুঁজে পেল অনিমেষ। অমিতকে পাশ কাটাতে পারলেও নিজের কাছে ধরা পড়েই গেল। বাবার কথাই শুনেছিল অনিমেষ। প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত টিমের ক্যাম্পে যোগ না দিয়ে নাইনের অ্যানুয়াল পরীক্ষায় বসেছিল। বাবার ইচ্ছে মত ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার অথবা উকিল হতে না পারলেও বাবার রিটায়ারমেন্টের আগেই পেয়ে গেছিল ব্যাঙ্ক ক্লার্কের চাকরিটা।

উড়ান
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments