শেষপর্যন্ত একপ্রকার মুক্তিই পেয়ে গেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার দৌড়বিদ অস্কার পিস্টোরিয়াস। কয়েক মাস যাবৎ বিচার চলার পর কোর্ট রায় দিল যে তিনি খুন করেননি, নেহাতই দুর্ঘটনাবশত মেরে ফেলেছেন তাঁর বান্ধবী রিভাকে। শুধু তাই নয়, শাস্তি যদ্দিন না ঘোষণা হচ্ছে তদ্দিন জামিনও পেয়ে গেছেন অস্কার!
 

এই নিয়ে গতকাল থেকে শোরগোল পড়ে গেছে মিডিয়ায়। কেউ বলছেন এরকমভাবে দুমদাম অনিচ্ছাকৃত হত্যার তকমা দেওয়া একেবারেই অনুচিত, বিচারক মাসিপা এক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছেন। রিভার বাবা মা স্বভাবতই ক্ষুব্ধ, সেই সঙ্গে ক্ষুব্ধ নারীবাদী মহলও। আবার অনেকে বলছেন অস্কারের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত হত্যার সত্যিই তো কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।


 

 

অথচ বছর দুয়েক আগে অসাধারণ কীর্তিকলাপের মাধ্যমে সারা বিশ্বের ইন্সপিরেশন হয়ে উঠেছিলেন এই অস্কার। মাত্র ১১ বছর বয়েসে তাঁর দুটি পা-ই অ্যাম্পিউট করে বাদ দিতে হয়। তার পরও তিনি নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন স্প্রিন্ট, অর্থাৎ দৌড় কে। দু পায়ে ব্লেড লাগিয়ে নিজের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে শুরু করেন অ্যাথলেটিক ট্র্যাকের জীবন। কি সাহস! ভেবে দেখুন একবার! নানান ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। ব্যর্থতা, সাফল্য, বারবার নানাভাবে দুর্ঘটনার সম্মুখীন হওয়া, ১৬ বছর বয়েসে মায়ের মৃত্যু, সমস্ত কিছুর সঙ্গে তাল রেখে প্যারালিম্পিক্স (শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধীদের ওলিম্পিক্স) এ সোনা জিতে দেখান ২০০৪ এবং ২০০৮ সালে। এরপর তিনি চেষ্টা শুরু করেন এবল-বডিড দৌড়বিদদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামার। এই সময় এসে হঠাৎই বাধার সম্মুখীন হতে হয় অস্কারকে। সাধারণভাবে যদিও মনে হয় দু-পা কাটা একজন প্রতিযোগী হিসেবে অন্যদের তুলনায় দুর্বল, কিন্তু আসলে সে কথা সবক্ষেত্রে সত্যি নাও হতে পারে। বরং যান্ত্রিক পা থাকার জন্য তিনি সুবধেই পান এই দাবি ওঠে কোনো কোনো মহল থেকে। ফলতঃ নানারকম বিতর্কের সূত্রপাত হয় তাঁকে ঘিরে। হাই ডেফিনিশন ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে তাঁর দৌড় রেকর্ড করে দেখা হয় তিনি সত্যিই কোনো আনফেয়ার অ্যাডভান্টেজ পাচ্ছেন কিনা সাধারণ দৌড়বিদদের তুলনায়। শেষ পর্যন্ত অনেক পর্যালোচনার পর তাঁকে ছাড়পত্র দেয় আই এ এ এফ(ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন) । ২০১২ সালের লন্ডন ওলিম্পিক্সে কোয়ালিফাই করে তিনি শোরগোল ফেলে দেন। শেষপর্যন্ত কোনো পদক জিততে না পারলেও দুই পা না থাকা একজন অ্যাথলিট সমানতালে পাল্লা দিয়ে লড়ছেন এবল-বডিড অ্যাথলিটদের সাথে, এ এক অনন্য ব্যাপার, ওলিম্পিকের ইতিহাসে এই প্রথম! দেখতে দেখতে অস্কার হয়ে ওঠেন সারা পৃথিবীর কাছে এক ইন্সপিরেশন। আমরা যারা সারাক্ষণ ছোটোখাটো জিনিস নিয়ে নিজেদের দুর্ভাগ্যের কথা বলে অজুহাত খুঁজি, তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে অস্কার পিস্টোরিয়াস দেখিয়ে দিলেন কিভাবে হাজারো প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে নিজের সাফল্য নিজেকে খুঁজে নিতে হয়, গড়ে নিতে হয় নিজের ভাগ্য।
 

 

এই অস্কারই কিনা গত বছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে'র দিন নিজের হাতে খুন করলেন নিজের বান্ধবীকে! রিভা বাথরুমে থাকা অবস্থায় বাইরে থেকে বন্দুকের গুলি চালান অস্কার। বিচার শুরু হবার পর তাঁর দাবি ছিল তিনি জানতেননা বাথরুমে রয়েছেন রিভা। অন্ধকার বাড়িতে ঢুকে বাথরুমের ভিতর আওয়াজ শুনে নাকি তিনি ভয় পেয়ে যান, ভাবেন কোনো দুষ্কৃতি সেখানে ঢুকেছে। সঙ্গে সঙ্গে চালিয়ে দেন গুলি! একটা আধটা নয়, চার চারটে গুলি খরচ করেন অস্কার! দীর্ঘ কয়েক মাসের বিচারের পর বিচারক মাসিপা পিস্টোরিয়াসের কথাই বিশ্বাস করলেন। ইতিমধ্যে কোর্টের মধ্যেই হয়েছে অনেক নাটক। রিভার মৃতদেহের বর্ণনা ইত্যাদির মুহূর্তে বারবার ভেঙে পড়েছেন অস্কার। এমনকি কোর্টের মধ্যে বমিও করেছেন। সবই কি নাটক? হয়তো নয়। অন্তত পথের কাঁটাকে সরিয়ে দেবার মত পরিকল্পিত হত্যা হয়তো নয়। কিন্তু রাগের মাথায় জেনে বুঝেই বান্ধবীকে গুলি করা এবং পরে সেই নিয়ে অনুশোচনায় ভোগা খুবই সম্ভব। বাথরুমের ভিতর অজ্ঞাত আততায়ীকে কল্পনা করে বিনা প্ররোচনায় একের পর এক গুলি চালানো কতটা যুক্তিগ্রাহ্য সে নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। বিচারক মাসিপা, যিনি ইতিপূর্বে বেশ কিছু কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে, তিনি কিকরে এত নরম হলেন? আসামীর প্রতিবন্ধকতা, ওঠাপড়ায় ভরা জীবন, সব সমস্যা জয় করে আন্তর্জাতিক মানের সাফল্য, এই সমস্ত কি তাঁকে পক্ষপাতদুষ্ট করে দিয়েছিল? এমনিতেই আধুনিক পৃথিবীর "সভ্য" দেশগুলোয় বিনা প্ররোচনায় দুমদাম গুলি চালিয়ে হত্যা করা প্রায় ছেলেখেলার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তার ওপর পুরুষ-শাসিত সমাজে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে তাঁকে খুন করার নিদর্শনও বড় কম নয়। অস্কারের প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ডও বলেছেন অস্কারের পক্ষে সেরকম মাথা গরম করে খুন করা একেবারেই অসম্ভব নয়। সেই রকমের অভিযোগ প্রমাণ হলে ১৫ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারত! এখন কি হবে সেটা পরের শুনানির আগে জানা যাবেনা, কিন্তু জামিন ইত্যাদি দিয়ে তাঁর অপরাধ যে লঘু করে ফেলা হল অনেকটা,সে নিয়ে সন্দেহ নেই।
 

খেলাধুলোর জগত আমাদের অনেক অনুপ্রেরণা জোগায়। খেলার জগতে প্রতিকূল পরিস্থিতিকে অতিক্রম করে জয় পাওয়া আমাদের শেখায় জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে। তার ওপর যদি সেই খেলোয়াড় নিজের জীবনে অসম্ভব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সফল হন, তবে তো কথাই নেই। তবু এই সব হিরোরা কেন এমনভাবে কলুষিত হয়ে যান? ল্যান্স আর্মস্ট্রং কিম্বা অস্কার পিস্টোরিয়াসরা কেন পারেননা তাঁদের ওই অতিমানবতাকে ধরে রাখতে? তাঁরাও দোষেগুণে ভরা সাধারণ মানুষের মত, এটাই বুঝি প্রমাণ হয়ে যায় বারবার যখন আমাদের এই হিরোরা আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসেন রাতারাতি। আর আমরা, নিতান্ত সাধারণ মানুষেরা, নিজেদের ব্যর্থতাকে বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে ভুলে থাকার চেষ্টা করা মানুষেরা, বারবার খুঁজে ফিরি আরও একজন এমন হিরো-কে, আরও অনুপ্রেরণাকে…  

 


 

একটি অনুপ্রেরণার অপমৃত্যু
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments