তারিখ – ১৯শে সেপ্টেম্বর, স্থান – কলকাতা গড়িয়াহাট আই টি আই, উপলক্ষ – নবীনবরণ, উদ্যোক্তা – তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। একটি নাচ-গানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নাচ-গান আবার যে সে নাচ-গান নয়। দুই স্বল্পবসনার ‘মোহরা’ ছবির ‘টিপ টিপ বরসা পানি’ গান সহযোগে নাচ।

গত দুই দিন ধরে এই নাচের ক্লিপিংস ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। সৌজন্য – কলকাতার দু’টি প্রথম সারির বৈদ্যুতিন গণমাধ্যম। বক্তব্য –পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবির সামনে এই নাচ অশালীনতার চূড়ান্ত এবং অবশ্যই সেই সঙ্গে রাজ্যের শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের মুন্ডুপাত।

তারপরেই চোখে পড়ল আজ সকালে অগ্রজপ্রতিম ফেসবুকীয় বন্ধু শ্রীযুক্ত অঞ্জন ঘোষের প্রশ্ন। উনি তিনটি প্রশ্ন করেছিলেন, তার দুটি হল -

১. কেন আজকাল সিনেমাতে,যেখানে অশালীন এত দৃশ্য allowed, সেখানে কেন সিগারেট খাওয়ার দৃশ্যে কাঁচি চালানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে?

২. পাবলিক প্লেসে কেন পোষাক-আষাক বা কথাবার্তাতে কোনো নির্দিষ্ট বিধি-নিষেধ না থাকলেও ধূমপান strongly নিষিদ্ধ হয়েছে?

সিগারেট খাওয়ার অংশটিকে সরিয়ে রেখে যদি জিজ্ঞেস করি কেন আজকাল সিনেমাতে, যেখানে অশালীন এত দৃশ্য অ্যালাওড সেখানে কেন কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক, হলেনই না হয় তাঁরা ছাত্র, তাঁদের কেন এত সমালোচনা হবে? পাবলিক প্লেসে কেন পোশাক–আশাক বা কথাবার্তাতে কোনও নির্দিষ্ট বিধি-নিষেধ নেই সেখানে সেটা নাচের সময় দেখলে কেন দোষ হবে? সবার ওপরে একটা প্রশ্ন – যে সব গণমাধ্যম এই ‘গেল গেল’ রব তুলেছেন তাঁরা ইন্টার্নেটে পুরো নাচের ভিডিও-টি ছড়িয়ে দিয়ে কোন সংস্কৃতির ধ্বজা ওড়ালেন?

উত্তর নেই। থাকবার কথাও নয়। কারণ ওই ব্যবসা। ব্যবসা নিয়ে কিছু বলার নেই। কিন্তু পদ্ধতিটি কি সঠিক হল? যে নাচ দেখেছিলেন মুষ্টিমেয় কয়েকজন, গণ-মাধ্যম দু’টির সৌজন্যে তো ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ল এই তথাকথিত ‘অপসংস্কৃতি’। একের পর এক হিট খেয়ে গেল মুচমুচে নাচের দৃশ্য। আমার মত হয়ত কেউ আঙুল কামড়ালেন অকুস্থলে অনুপস্থিত থেকে রক্তমাংসের চোখে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করে।

তবে কি জানেন এর চেয়ে ঢের বেশি অশ্লীল জিনিস তো রোজই চোখে পড়ছে যত্রতত্র। আই টি আই। সচরাচর পরীক্ষার ইঁদুর দৌড়ে একটু পিছিয়ে পরা ছাত্র-ছাত্রীদের গন্তব্য হয়। আবার অনেক সময় আরও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও স্রেফ অর্থের অভাবে টেকনিক্যাল একটা কিছু শিখে তড়িঘড়ি অর্থোপার্জনের তাগিদেও অনেকেই এই কলেজগুলিতে নাম লিখিয়ে থাকেন। এই পর্যন্ত একেবারেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। এই পুরো বিষয়টি অশালীন নয়? এই ইঁদুর দৌড়, এই তড়িঘড়ি অর্থোপার্জনের তাগিদ? অশালীন নয়, বিভিন্ন রিয়েলিটি শো-তে ট্যালেন্ট হান্টের নাম করে ছোট ছোট শিশুদের যৌন উত্তেজক ভঙ্গিমা দেখে হাততালি দেওয়া? কিংবা ওই রিয়েলিটি শো-তেই ‘সোজা কথা সোজা বলতে ভালবাসি’ অজুহাতকে খাড়া করে পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে বিচারের নামে কোনও প্রতিযোগীকে অপমান করা? অশালীন নয় নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহার না করলে একজন প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হতে পারে অথবা এমনকি শিশুদেরও সবাই ‘ধুর’ বলে দেগে দিতে পারে এই জাতীয় ধারণা সমাজে আন্ডার-কারেন্টের মত ছড়িয়ে দেওয়া? খবরের কাগজের অতিরিক্ত পাতাগুলিতে বিভিন্ন পার্টিতে উপস্থিত সেলিব্রিটিদের  ছবি ছাপা হয় তাঁদের পোশাক-আশাক যে ছবি তোলার আগে পাল্টে নিতে বলতে পারেন না এটা অশালীন নয়?

আমি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই জাতীয় কর্মকান্ডের সমর্থনে লিখতে বসিনি। কিন্তু আমার বক্তব্য হল একটি শিশু ভাল-মন্দ, শালীন-অশালীন, শ্লীলতা-অশ্লীলতা-র ধ্যান ধারণা নিয়ে ভুমিষ্ট হয় না। সেটা তৈরি হয় সমাজের মধ্য থেকেই। আর যে সমাজের মধ্যে এত দ্বিচারিতা তার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয় এই ব্যাপারে সৎ থাকা। বিষাক্ত সাপ ছেড়ে দেব আর তারপর কাউকে কামড়ালে কেন সে কামড় খেল তা নিয়ে আসর সরগরম করতে নামব এই বিলাসিতা ত্যাগ করার সময় এসেছে ।

একটি অশালীন নাচের পরবর্তী ঘটনা
  • 3.00 / 5 5
1 vote, 3.00 avg. rating (71% score)

Comments

comments