(আগে যা ঘটেছে – কম খরচায় সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গিয়ে দেখা গেল সমুদ্র নেই। তার আসার সময় বেলা বারোটা। কিন্তু সমুদ্র নির্দিষ্ট সময়ে এলেন না।)

সাড়ে বারোটা বাজল। একটা, দেড়টাও বাজল। জল যে এই রকম লেটে চলতে পারে তা প্রথম জানলাম। বাধ্য হয়ে রুমেই স্নান সেরে খাওয়াদাওয়া করে নিলাম। শেষ অবধি বেলা সাড়ে তিনটে –চারটা নাগাদ তিনি এলেন। গোড়ালি ডোবানো গেল। একটা আশা ছিল অন্তত এতটা জল নির্ঘাৎ হয় যার ফলে ওই নৌকোগুলি আসা যাওয়া করতে পারে। যাইহোক আমরা ওইটুকুই দর্শন পেলাম। বিকেল হল। চা এল। একটু পরে প্রকৃতির নিয়মে সন্ধ্যা নামল। গোটা হোটেলে পাঁচটি পূর্ণবয়স্ক মানুষ এবং একটি মাত্র নাবালক। স্ন্যাক্স এল। খেতে খেতে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল। যেহেতু সমুদ্র দেখতে এবং তাতে স্নান করতেই আসা, এবং এখানে তার আর কোনও সম্ভাবনা নেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সেক্ষেত্রে পরেরদিন একবার মন্দারমনি ঘুরে আসা যেতে পারে। অতএব আবার গাড়ি এবং পরেরদিন মন্দারমনি। খারাপ লাগল না। খারাপ লাগল না বলার কারণ যে এই জায়গাটিকেও জনমানবহীন দেখার অভিজ্ঞতা আমি আগেই অর্জন করেছিলাম।

মন্দারমনি থেকে ফিরে সন্ধ্যেবেলায় সূর্য ডুবে যাওয়ার বেশ খানিক পরে আমি এমন একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম যাতে সাময়িক হলেও সমুদ্র না পাওয়ার বেদনা ভুলতে পারলাম। সূর্য পুরোপুরি ডুবে যেতেই নিষেধের সব বেড়া ভেঙে আমি সোজা হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। ঘোর অন্ধকার, পাশের মানুষটাকেও প্রায় চোখে পড়ে না। আমার চোখ গেল আকাশের দিকে। এ কি! এ তো মনে হচ্ছে তারার ভারে ভেঙে পরার উপক্রম। সবাইকে বাইরে ডেকে নিয়ে এলাম। বললাম – পুরো টাকাটা জলে যায়নি। বাইরে এসে একবার দেখো। সেই অন্ধকার (এর আগে আমি এর চেয়েও বেশি অন্ধকার দেখেছি, সে গল্প পরে কোনোদিন হবে) কিন্তু রাতের প্রকৃতির এই রূপ আমি আগে কখনও দেখিনি। আওয়াজ পাচ্ছি দূরে সমুদ্রে পার্ক করা নৌকাগুলি এক এক করে ছেড়ে যাচ্ছে, অবিশ্রান্ত ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, সাথে এই অন্ধকার। এই বিষয়টা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সামনে মাথা কাটা যাওয়ার অবস্থা থেকে একেবারে শেষ মুহূর্তে কিছুটা হলেও আমার মান রক্ষা করল।

কিন্তু খুঁতখুঁতানি রয়েই গেল। বাঁকিপুটের আশেপাশে কিছু দেখার জায়গা আছে এটা ঘটনা, কিন্তু মেন কোর্সের যদি এই হাল হয় তবে সাইড ডিসের ওপর থেকে ভরসা এমনিই কমে যায়। তবু তৃতীয় দিনে আমরা সেইসব দর্শনীয় স্থান দেখতে বের হলাম। প্রথম গন্তব্য কপালকুণ্ডলার মন্দির। হতাশ। পরের গন্তব্য একটি লাইটহাউস। ওপরে উঠে যে কিছু দেখা যাবে না জানাই ছিল, এবং তাই। শেষ গন্তব্য ফিস হার্বার। এই জায়গাটা নিরাশ করল না। ভাল লাগল। কিন্তু এসবের পেছনে যতই কম খরচ করা হোক না কেন সেটাই বেশি বলে মনে হয়।

এই হতাশা আসতে পারে ধরে নিয়েই আমি নিজেকে একটু চাঙ্গা করার উদ্দেশ্য নিয়ে সকালে বেরিয়ে পড়েছিলাম সি বিচ ধরে হাঁটব এই উদ্দেশ্যে। দেখলাম জায়গায় জায়গায় সি বিচ লাল হয়ে রয়েছে। প্রথমটা বুঝতে পারলাম না। এগিয়ে যেতেই দেখলাম লাল রং গুলো কাছে গেলেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। অগুন্তি লাল কাঁকড়াতে ভরে আছে জায়গাটা। কম্পন টের পেলেই গর্তে গিয়ে ঢুকছে, আর কমে এলেই আবার বেরিয়ে আসছে। এর আগে এইগুলো চোখে পড়েনি কারণ এদের রোদ পোহাবার সময়ে আমাদের এই জায়গাটায় আসার দরকার হয়নি। দেখলাম বালির ওপরেই মাঝে মাঝে পড়ে রয়েছে মানুষের শেষ যাত্রার আয়োজনের অবশেষ। আরও এগিয়ে গেলাম। আবার জ্ঞানলাভ। এবারে যা নজরে এল তাতে আমাকে বাকরুদ্ধ হতেই হল। সমুদ্র জুড়ে গরু চরছে। মোষকে দেখেছি গলা জলে গা ডুবিয়ে বসে থাকতে। সময় সময় কুকুরকেও দেখেছি সাগরে নামতে কিন্তু গরু!!!! নাহ ব্যাপারটা সরেজমিনে দেখার জন্যে গরুমুখী হলাম। আসতে আসতে চোখের সামনে দেখতে পেলাম পরিচিত নীল রঙের বদলে পায়ের তলায় সবুজের সমারোহ। বিস্তীর্ণ বালিয়ারি জুড়ে ঘাস উঠেছে। আবার সোজা এগোতে এগোতে এতক্ষণে একটা কাজের জিনিস চোখে পড়ল। যে জিনিসটা আমি খুঁজে পেলাম সেটা হল শুঁটকি মাছের আড়ত। এই সব জায়গায় আড়তদারের সাথে ঠিকঠাক কথা বলতে পারলে তুলনাহীন সস্তা দামে মাছ কেনা যায়। আমি কিনলাম। পঞ্চাশ টাকা কিলো। তাও পাল্লায় মাপা নয়, হাতের আন্দাজে। এই বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা বলে কোনওভাবেই কোনও শখের খুচরো ক্রেতা ঠকবে না বরং লাভবান হবে। দামের দিক থেকে শুধু নয়, ওজনেও। সোজা নিয়ে গিয়ে হোটেলের কিচেনে গিয়ে বললাম ভাল করে প্যাক করে দিতে যাতে ট্রেনে যেন গন্ধ টের না পাওয়া যায়। সব ক্ষেত্রেই আমার এই অনুরোধ রক্ষিত হয়েছে, এখানেও হল। সন্ধ্যেবেলা আবার কাটল সেই অগুন্তি তারা দেখে।

সব কিছুরই ভাল-মন্দ দুই দিক থাকে। এখানেও ছিল। কিছু বলেছি। তবু যেটা না বললে অবিচার হয় তা হল খাওয়া দাওয়ার বন্দোবস্ত। অসাধারণ। ব্রেকফাস্টে লুচি তরকারি মিষ্টি দিয়ে শুরু হত, লাঞ্চে ভাতের সাথে স্যালাড, ভাজা মুগ কিংবা মুসুর ডাল, নিরামিশ তরকারি, মাছ অথবা ডিমের তরকারি, সন্ধ্যে বেলায় বিভিন্ন পকোড়া সঙ্গে মুড়ি আর ডিনারে মাংসের ঝোল সাথে রুটি বা ভাত যা পছন্দ। আর চা? যতবার ভাল লাগে। সারাদিনটাই চলত মিল সিস্টেমে। সচরাচর বেড়াতে বেরিয়ে আমি ঘরোয়া খাবারের খোঁজে হন্যে হয়ে উঠি না কিন্তু পেলে বেশ ভালই লাগে।

যাই হোক, শুরুতে ফিরি একবার। সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে আকাশ দেখে এবং সস্তায় শুঁটকি মাছ কিনে মোহিত হতে হওয়ার পরেও যদি এই ভ্রমণ চমৎকার না হয় তাহলে ওই শব্দটাকেই অভিধান থেকেই তুলে দেওয়া উচিৎ
 

একটি চমৎকার ভ্রমণ কাহিনী – বিরতির পরে
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments