রাজামশাই একদিন নাসীরুদ্দিনকে ডেকে বললেন, ‘বনে গিয়ে ভাল্লুক মেরে আনো।’
ভাল্লুক শিকার চাট্টিখানি কথা নয়, নাসীরুদ্দিন ভয়ে তটস্থ, তবু রাজার আদেশ অমান্য করে কী করে? অগত্যা তাকে যেতেই হল।
বন থেকে ফেরার পর একজন তাকে জিগ্যেস করল, ‘কেমন হল শিকার, মোল্লা সাহেব?’
‘চমৎকার’, বললে নাসীরুদ্দিন।
‘ক’টা ভাল্লুক মারলেন?’
‘একটিও না।’
‘বটে? ক’টাকে ধাওয়া করলেন?’
‘একটিও না।’
‘সে কী! ক’টা দেখলেন?’
‘একটিও না।’
‘তাহলে চমৎকারটা হল কী করে?’
‘ভাল্লুক শিকার করতে গিয়ে সে-জানোয়ারের দেখা না পাওয়ার চেয়ে চমৎকার আর কী হতে পারে?’

মোল্লা নাসীরুদ্দিনের গল্প – সত্যজিৎ রায়, সত্যজিৎ রায় সম্পাদিত সেরা সন্দেশ ১৩৬৮-১৩৮৭, প্রথম সংস্করণ পৌষ ১৩৮৮, চতুর্থ মুদ্রণ আষাঢ় ১৩৯৪, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেডের পক্ষে ফণিভূষণ দেব কর্তৃক ৪৫ বেনিয়াটোলা লেন কলিকাতা ৭০০০০৯ থেকে প্রকাশিত


তীর্থস্থানে মানুষ আর প্রকৃতির কোলে নৈঃশব্দ্য এই কাম্য। ফলে মাঝে মধ্যে পান্ডব বর্জিত এলাকায় উইকএন্ড কাটানো আমার কাছে কোনও নতুন কিছু নয়। এমনকি আমার এইরকম বেশ কিছু গন্তব্য পরবর্তী সময়ে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এমন ঘটনাও ঘটেছে। আর এই সব জায়গা খুঁজে বের করার পেছনে আমার অনুপ্রেরণা মুলত দুটি। এক – ওই সেই ‘বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ ঘুরে’ ইত্যাদি আর দ্বিতীয় – যথাসম্ভব কম রেস্ত খসিয়ে ঘুরে বেড়ানো। নানা ধরনের ম্যাগাজিনে এই জাতীয় কস্ট সেভিং বেড়ানোর জায়গার সুলুক সন্ধান করে সাফল্য পাওয়ার পরে এই ব্যাপারে রীতিমত কনফিডেন্ট আমি আবার একটা নতুন জায়গা খুঁজে পেলাম। নাম – বাঁকিপুট। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সমুদ্র উপকূলে নিরিবিলি নিশ্চিন্তে এবং অবশ্যই নির্জনে কয়েকটা দিন কাটানোর জন্যে প্রাথমিক ভাবে সময় ঠিক করা হল গত ২০১৩ সালের দুর্গাপুজার একাদশীর সকাল থেকে লক্ষ্মীপূজার আগের দিন বিকেল পর্যন্ত।

এই ভ্রমণটা অন্য একদিক থেকেও আমার কাছে অভিনব ছিল। বাবা-মা’র সাথে, বন্ধুদের সাথে, বউয়ের সাথে, প্যাকেজ ট্যুরে অনেক রকম সঙ্গী এবং সঙ্গিনীর সাথে মায় বিলকুল একা একা ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা থাকলেও শ্বশুরবাড়ির কারও সাথে কখনও বেড়াতে যাইনি। এবারে সেই অভাব মেটানোর তাগিদে আমার শ্বশুরমশাই, শ্বশ্রূমাতা, শ্যালিকা এবং ভায়রা ভাইকে আমাদের তিনজনের দলে অন্তর্ভুক্ত করা হল। প্রথমেই থাকার একটা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হল কারণ একটা বৈ দুটো হোটেল নেই এবং আমার মতো মানসিকতার লোকজনও নেহাত বাড়ন্ত নয়। কাঙ্ক্ষিত সময়ে বুকিং পাওয়া গেল। এরপর অকুস্থলে পৌঁছনোর বন্দোবস্ত করার পর্ব। সঙ্গে শিশুপুত্র রয়েছে অতএব যাত্রাকাল যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত রাখা দরকার। অতএব ট্রেন নির্বাচিত হল। দিঘাগামী যে কোনও ট্রেনে কাঁথি পৌঁছতে পারলেই হোটেল থেকে বাহন পাঠিয়ে আমাদের নিয়ে যাবে অবশ্য তার জন্য কড়ি গুণে দিতে হবে। আমার দুইদিন টিকিট কাটতে যাওয়ার কোনও বাসনা ছিল না, ফলে ফেরার দিনের  টিকিট দেওয়া যেদিন শুরু হল সেদিন টিকিট কাটতে গিয়ে আমার চক্ষু চড়কগাছ। যাওয়ার টিকিট ওয়েটিং দু’শোর ওপরে, তবে ফেরার টিকিট কনফার্ম। দু’দিকের টিকিটই কেটে নিলাম। বেরিয়ে এসে প্রথমে ফোন করলাম আমার এক বন্ধুকে যে সরকারি বাসের টিকিট ব্যবস্থা করে দিতে পারে। পরের দিন বাসের টিকিট হাতে পেলাম।

যেতে দিন কয়েক দেরি। দেখতে দেখতে ট্রেনে যাওয়ার টিকিট কনফার্ম হল। আমি কিছু গুনাগার দিয়ে বাসের টিকিটটা ক্যান্সেল করে দিলাম। পুজো এল। সপ্তমীর দিন আমার শ্যালিকা এবং ভায়রা ভাই দু’জনেই অফিস ম্যানেজ না করতে পেরে রণে ভঙ্গ দিল। হোটেলের রুম এক্সট্রা। হাত কামড়ানো ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না, কারণ ওটার টাকা ফেরত হবে না। কিন্তু পিকচার যে আভি ভি বাকি হ্যায় তা বুঝলাম দশমীর দিন সকালে। বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণাবর্ত এবং নিম্নচাপ সঙ্গে আরও কি কি কে জানে, মুষলধারে বৃষ্টি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, গুরুজনদের সতর্কবাণী সব মিলিয়ে আমাকে টলিয়ে দিল। বাঁকিপুটে ফোন করলাম। জানা গেল সফর বাতিল করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কফিনে শেষ পেরেক। তড়িঘড়ি ট্রেনের টিকিট ক্যান্সেল, যথারীতি পুনরায় গুণাগার। হোটেল জানালো বুকিং রিশিডিউল করা যাবে, অসংখ্য ধন্যবাদের সঙ্গে এও জানিয়ে দিলাম যে কিছুদিনের ভেতরেই পরিবর্তিত সূচি জানাচ্ছি।

এবার ঠিক হল খ্রিস্টমাসের ছুটি। দল থেকে যে দুজন আগেই বাদ হয়েছিল তারা পুনরায় দলভুক্ত হতে আর রাজি হল না। বাকি চারজনের জন্য নতুন ব্যবস্থাপনা। একদিন বাড়িয়ে নিলাম। টাকা অ্যাডজাস্ট হয়ে গেল। এবারে আর ট্রেনের টিকিট নিয়ে কোনও দুর্ঘটনা ঘটল না, যথাযথ পেয়ে গেলাম।

যাওয়ার আগে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়ালো। দুই দলত্যাগীর ভেতরে একজন দেশত্যাগী হল, অন্য আরেকজন আবার দলভুক্ত হল। নির্ধারিত দিনে কাঁথি স্টেশনে গাড়ি এসে আমাদের বাঁকিপুট পৌঁছে দিল। হোটেলে উষ্ণ অভ্যর্থনা, পৌঁছনোর সাথে সাথেই চা সঙ্গে কিছু স্ন্যাক্স চলে এল, স্নান করতে গরম জল লাগবে কিনা সব জেনে নিল। এছাড়া আমরাও জেনে নিলাম খাওয়া দাওয়ার কি ব্যবস্থা আরও নানা হ্যানত্যান। মোটামুটি বেলা সাড়ে দশটা-এগারোটা। এবারে মূল বিষয়, যা দেখতে আসা। সেই সমুদ্রের দিকে নজর ফেরাতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। আদিগন্ত শুধু কাদামাখা বালি। সেই বালির ওপরেই কয়েকটা বড় বড় নৌকো পার্ক করা। আর মাঝে মাঝে এক-একটা ট্র্যাক্টর ওখানে যাচ্ছে এবং ফিরে আসছে। চেষ্টা করলাম নৌকোগুলির কাছাকাছি পৌঁছতে কিন্তু ওই বালি ডিঙিয়ে সে অসাধ্য সাধন আর হয়ে উঠল না। বাধ্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম সমুদ্রটা কোথায়।
- ওই তো
- কই তো
- ওওইই তো
বহু কসরতের পর চোখে পড়ল একটা হালকা রূপালি রেখা। মনে হচ্ছে যেন ওখানে জল রয়েছে।
- আচ্ছা এদিকে জল আসবে না?
- এই সাড়ে বারোটার দিক করে এসে পড়বে

 

(আবার সামনের শনিবার)

একটি চমৎকার ভ্রমণ কাহিনী – বিরতির আগে
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments