দরকার পড়ল সে বছর স্কুলে গরমের ছুটি শেষ হতে। ছুটির মধ্যে বাসা বদল হয়েছে। এতদিন স্কুলে যেতাম হেঁটে, এবার উঠতে শুরু করলাম ছয় চাকায় আরও অনেক বন্ধুর সঙ্গে। গত শতাব্দীর আশির দশকের প্রথমভাগে সরকার যে শুধু দরিদ্র ছিল তা নয়, অমানবিকও ছিল। কম ভাড়ার বেসরকারি বাস চোখে পড়তে পড়তে স্কুল অর্ধেক গড়িয়ে যেত। অতএব, সকাল বেলা বাবা হাতে গুঁজে দেন চল্লিশ পয়সা, সরকারি বাসের ভাড়া আর বেলা সাড়ে দশটা-এগারটা নাগাদ বাড়ি ফিরি মায়ের সাথে বেসরকারি বাসের ছাত্র কুপনে। কুপন ছিল পনের পয়সার, আসল ভাড়ার চেয়ে দশ পয়সা কম। সারা মাসের কুপন একসাথে কিনতে হত বাস সিন্ডিকেটের অফিস থেকে। আগেই বলেছি সরকারি বাসের ভাড়াটা বেশি ছিল ফলে অন্তত বাসের ভাড়াটা না দেওয়া পর্যন্ত পকেট বেশ ভারী থাকত। দেওয়া হয়ে গেলে অবশ্যই কপর্দকহীন। বাকি স্কুল থেকে পাওয়া টিফিনের খরচা বাবদ প্রতিমাসে তিন টাকা, পরীক্ষার মাসে একটু বেশি, সেটা মা বা বাবা কেউ একজন স্কুলে জমা করে দিতেন। এখনকার মত বিনামূল্যে কোনও পরিষেবাই সেকালে পাওয়া যেত না।

কথায় কথায় অন্য দিকে চলে যাচ্ছি। ফিরে আসি মূল বিষয়ে। সেই সময় অর্থাৎ সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার কোনও আর্থিক সম্বল ছিল না বাসভাড়ার ওই দৈনিক চল্লিশ পয়সা ছাড়া। তাও বা কতক্ষণ? ওই যতক্ষণ না টিকিট কাটা হয় ততক্ষণ। বড্ড অপমানজনক ছিল সেই সব দিন। কুলের আচার, আইসক্রিম, ম্যাজিক ছবি এই জাতীয় আরও নানা দেবভোগ্যপণ্য সবই অধরা। কাঁহাতক আর অন্যের কাছে হাত পাতা যায়। আর রোজ হাত পাতলে সবাই হাত উল্টায়, সে এমনকি নিজের মা-বাবা হলেও। এই সত্যটা আমি ওই বয়সেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। আর আমার মায়ের ছিল অমোঘ যুক্তি – ‘এসবের কোনও দরকার নেই’। তর্কে পেরে না উঠলে এই সব কুযুক্তির অবতারনা সবাই করে থাকে। দরকার-অদরকার এগুলি যে ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন হতে বাধ্য, সেটা আর কে কাকে বোঝাবে? যাই হোক আমি নিঃসম্বল, আমাকে মেনে নিতেই হত। ‘ক্যা করে বাবু, গরিব আদমি হ্যায়’

এর মধ্যেই একটা রুপোলী রেখা দেখা গেল। ওই সরকারি বাসেই দেখা গেল। সরকারি ডিউটি একদম সময় মেনে। অতএব, আমাদের চোখে পড়ল বাসে রোজ একই ভদ্রলোক আমাদের টিকিট কাটেন। ধীরে ধীরে তিনি কাকু-তে পরিণত হলেন। তারপরেই মাঝে মাঝে তিনি আমাদের এক বিচিত্র আবদারের সম্মুখীন হতে শুরু করতেন – ‘কাকু আজ টিকিট কাটব না’। কন্ডাকটর কাকুও বোধ হয় ছোটবেলায় আমাদের মতই পরনির্ভরশীল ছিলেন, দুঃখটা বুঝতেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমাদের সবাইকেই তিনি টিকিট না কাটার সুযোগ দিতেন। কখনও যদি ওনার জায়গায় অন্য কাউকে দেখতাম তাহলে আমাদের বেশ কষ্ট হত। কতটা ওনার কথা ভেবে আর কতটা নিজের কথা ভেবে সেটা আর আজ মনে নেই। তবে এই ঘটনা প্রায় ঘটত না বললেই চলে। আমি প্রায় আড়াই বছর যাতায়াত করেছি কিন্তু অধিকাংশ সময় ওনাকেই পেয়েছি।

প্রথম যেদিন আমার টিকিট না-কাটার আবেদন মঞ্জুর হল সেদিন আমি পড়লাম অন্য এক ফাঁপরে। শুধু খেয়ে চল্লিশ পয়সা শেষ করার ক্ষমতা আমার ছিল না। কত খাবো? কাঠি দেওয়া বরফ আইসক্রিম পাঁচ পয়সা, কুলের আচার খুব বেশি হলে দশ পয়সার খাওয়া চলে। কারন পেট খারাপ হলেই তো আবার যত আপত্তিই থাক না কেন জিভে যুধিষ্ঠির ভর করতে বাধ্য। পুরো পয়সার ভগ্নাংশ আমার কাছে অবশিষ্ট এটা বলা আমার পক্ষে কঠিন ছিল আবার এমন কোনও জিনিস কেনা চলে না যার অস্তিত্ব মায়ের চোখে পড়ে। কারন এই দুটি ঘটনার যে কোন একটি ঘটিয়ে ফেলার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে সারাদিন ধরে একবার মায়ের কাছে আবার সন্ধ্যেবেলায় বাবার কাছে তাঁদের একটিমাত্র পুত্রের অসময়ে লায়েক হয়ে ওঠার চর্বিতচর্বন শোনার আগ্রহ আমার একেবারেই ছিল না তা বলা বাহুল্য মাত্র। অতএব আমি দ্বিতীয় দিন আর বাসের ভাড়া পেলাম না। আগের দিনেরটা দিয়েই চালাতে হল। মানুষের বয়স বাড়ে, বুদ্ধিও একইসঙ্গে। ফলে একটা এইরকম রফায় আসা গেল, যারা টিকিটের পয়সা বাঁচাতে পারবে তারা অন্যদের খাওয়াবে। এতে একটা স্বাধীনতাবোধও জেগে ওঠে আর নিজের শখও পূরণ হয়। এই ব্যবস্থাটা বেশ কিছুদিন চলার পর আমি যখন চতুর্থ শ্রেণীতে সেই সময় আমার মধ্যে একদিন আকস্মিক ভাবে খানিকক্ষণের জন্য বিপ্লবী চেতনা জেগে উঠল। আমি খেয়ে এবং খাইয়ে খরচ করলাম পনের পয়সা, বাকি পঁচিশ পয়সা কাজে লাগালাম একটা ছোট প্লাস্টিকের বন্দুক কিনে। বন্দুক ছোট্ট, ব্যাগের এক কোণে পড়ে থাকবে কারও চোখে পড়বে না। আর বাড়িতে ওটার কোনও দরকারও নেই, শুধু স্কুলে টিফিনের সময়তেই দরকার পড়বে। খালি বাড়িতে ব্যাগটাকে একটু চোখে চোখে রাখতে হবে। কিন্তু সে দিনের জন্য অন্তত আমার ব্যাগটাকে চোখে চোখে রাখার দরকার পড়ল না। আমার এক বন্ধু একদিনের জন্য বন্দুকটা চেয়ে তার বাড়িতে নিয়ে গেল, আমিও নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফিরে এলাম।

পরদিন সকালে স্কুলে গিয়ে বসেছি, এমন সময় আমার কাছে এলেন সেই বন্ধুটির বাবা। সটান প্রশ্ন –‘তোমার কাছ থেকে কি কাল ও একটা বন্দুক নিয়ে গিয়েছিল?’ গলা শুকিয়ে এল আমার। কাকু আমার মাকে চেনেন শুধু না, ছুটির পর মায়ের সাথে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা আঠেরো আনা। কারন উনিই আসেন ছেলেকে বাড়ি নিয়ে যেতে। যথাসম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রেখে স্বীকার করতেই উনি জিজ্ঞেস করলেন – ‘ওটার দাম কত ছিল?’। ঢোঁক গিলে দাম জানালাম। ভদ্রলোক পকেট থেকে পঁচিশ পয়সা বের করে আমায় বললেন –‘এটা রাখো। ওটা হারিয়ে গেছে। তুমি আরেকটা কিনে নিও।’ আমার মনে হল আমি আর বেঞ্চে বসে নেই, যেন সিলিং-এ ঝুলছি। উফফ্, বন্দুকটা নেই! কোনও দিন মা আর আমার ব্যাগে খুঁজে পাবে না!! পয়সা নেওয়ার আমার কোনও ইচ্ছেই ছিল না, জিনিসটা যে নেই, ওটা যে আমার ওপর আর কোনও চাপ সৃষ্টি করতে পারবে না, এটাই আমার তখন সবচেয়ে বড় শান্তি। কিন্তু আমার সেই আন্তরিক অনিচ্ছে ভদ্রলোকের বিনয় বলে ধরে নিলেন এবং আমার হাতে ওই পঁচিশ পয়সা গুঁজে দিলেন। আমি আর বিপ্লবী দলে নাম লেখালাম না, টিফিনের সময় একাই খেলাম একটু বেশি দামের কুঁচো বরফে রঙিন জল মেশানো আইসক্রিম।

একটি বিপ্লব প্রচেষ্টার অসময়ে দেহত্যাগ (পুরনো লেখা নতুন করে)
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments