বেকার ছেলেপুলেদের বোধহয় দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে থাকে বাড়ির অড জবস গুলি করা।সেই হিসেবে রেশন নিয়ে আসা আর শুয়োপোকার মত লাইনে দাড়িয়ে থেকে ইলেকট্রিক বিল দিয়ে আসা।

গত বুধবারটা ছিল সেই ইলেকট্রিক বিল জমা দেবার দিন। মোটরচালিত দ্বি-চক্রযানটা আহত হয়ে রয়েছে বলে পদব্রজে যাওয়ার হুকুম পেলাম। বাড়ি থেকে ইলেকট্রিক অফিস নেহাত কম দূরে নয়। যাই হোক মাতৃআজ্ঞা শিরোধার্য করে বেরিয়ে পড়লুম দুপুরে। খানিকটা শর্টকার্ট মারা গেল।

শিলিগুড়িটা দিনে দিনে বড় ঘিঞ্জি শহর হয়ে উঠছে। ফ্ল্যাটগুলো তাদের বিতকিচ্ছিরি চ্যাপটা বদন নিয়ে মুখ কেলিয়ে দাড়িয়ে। তবে শহরটার মাঝে মাঝে হঠাৎ কোন কোন গলি পড়ে যার ভেতর দিয়ে চলতে থাকলে পরপর গলির নেটওয়ার্কে চলতে থাকলে মনে হবে কোন গঞ্জে এসে পড়েছি। এখনো এমন টুকরো টুকরো গ্রাম এই শহরে বেঁচে আছে। সেরকমই এক গলির ভেতর দিয়ে শর্টকার্ট মারা গেল।

কেউ নিস্তব্ধ দুপুরে একলা হেঁটে দেখেছেন? মাথার ওপরে সূর্য মধ্যগগনে শীতকাল বলে তাপ নেই তেমন। কিন্তু আলো পর্যাপ্ত তার সাথে এই নিস্তব্ধতা সব। বাড়ির খোকাখুকুরা ইস্কুলে দস্যিপনা করে বেড়াচ্ছে তাই বাড়িগুলি শান্ত। গৃহিনীরা সকালের কাজকর্ম সেরে নিয়েছেন। বেড়ার গায়ে, উঠোনের তারে মেলে দেওয়া কাপড়গুলো ঝুলছে আর দোলা খাচ্ছে শীতের হাওয়ায়।

এই ধরণের দুপুরে অতি চেনাপরিচিত রাস্তাগুলোও কেমন অন্যচেহারা নিয়ে হাজির হয়। এগিয়ে চলেছি আর মনে মনে অবাক হয়ে দেখছি। গলির মুখে কেরোসিন টিনের বেড়া দেওয়া ছাপড়া বাড়িটা উঠোনের কোনের কুল গাছটা বহুবার দেখা তবু দুপুরের রোদে কেমন যেন লাগছে তাকে। টিনের ফুটোফাটা দিয়ে আসা টুকরো রোদগুলো রাস্তার ছায়া ঘেরা অংশে পড়েছে। কুলগাছের পাতায় রোদের ছোঁয়া। মেলে দেওয়া কাপড়গুলোর দিক থেকে এক দমকা হাওয়া এলো। নাকে ভেসে এলো সস্তার কাপড়কাচা সাবানের গন্ধ, কই খারাপ লাগলো না তো? এগিয়ে চলি। পর পর পাকা একতলা বাড়িগুলো পেরিয়ে তাদের জানালার পাল্লা বন্ধ ওপরের সানসেটে ঝলমলে রোদ। দুএকটা আগাছা প্রাণভরে নিচ্ছে সেই আলো। সামনাসামনি আলো পড়ে বিস্কুটরঙা বাড়িগুলো কেমন সেজেগুজে দাড়িয়ে। যেন সস্তার মেকাপ লাগিয়ে ফান্ডা মারতে বেরিয়েছে।

উঠোনখোলা মানে বেড়া না দেওয়া বাড়িগুলোর চকচকে নিকোনো উঠোনের এককোনে কুয়োতলা। বালতিটা পড়ে আছে দড়িটা ঝুলিয়ে। কোন তন্বী কিশোরীকে কুয়োতলায় না দেখে হতাশ হলাম। পরমুহুর্তেই চোখে পড়ল উঠোনে পড়ে আছে প্লাস্টিকের কিছু রান্নাবান্না খেলার সরঞ্জাম। তার কর্ত্রী অনুপস্থিত। একটা বোকামত কাক এসে সেগুলোকে ঠুকরেই উড়ে গেল। ছোটকর্ত্রীর হাতের রান্না পছন্দ হোলো না বোধহয়। যতই সর্বভুক হোক বালি,মাটি আর পাতার রান্না বোধহয় ওর-ও হজম হয় না।

মোড় ঘুরলাম, এগোতেই অশান্তি এই নিস্তব্ধতাকে ভেঙে নিদরুণ কর্কশ স্বরে চিৎকার করছে একটা সিমেন্ট মিক্সার। ঊঃ বেরসিকটা আর সময় পেলে না! রাস্তার দুধারে পাকা নর্দমা তৈরি হচ্ছে, মশলা মাখছে কিছু লোক, সেগুলোকে এনে মিক্সারের ঐ বিশাল পেটে পুরছে। বেচারা মিক্সার যদিও হজম করতে পারে না। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খানিক্ষণ চিবিয়েই উগরে দেবে উচ্ছিষ্টটা। এগিয়ে চললাম এই কানফাটানো সঙ্গীত থেকে যত তাড়াতাড়ি পালানো যায়।

এবার একটু নাক উঁচু করে শুকে দেখি- কোন বাড়ির গৃহকর্ত্রী রান্না চাপিয়েছে মাছভাজার। কি সুন্দর গন্ধ আসছে আহা- ঘ্রাণেন অর্ধভোজন। কথাটা মনে হতেই কেমন যেন খিদে খিদে পেয়ে গেল। সামনে মনে পড়ে একটা মিষ্টির দোকান ছিল, দ্রুত এগিয়ে যাই। পাশের জংলাগাছের বেড়া দেওয়া এককোণে কলাশূন্য কলাগাছগুলো ফেলে। পরের মোড় ঘুরতেই হায় আশাভঙ্গ, মিষ্টির দোকান বন্ধ। কেন দুপুরে কেন বন্ধ? ভারি অন্যায়। মনের দুঃখ মনে চেপে এগিয়ে চলি ধীর গতিতে। খিদে চাপতে একখানা সিগারেট ধরাই। ধোঁয়ায় মুখটা তেতো হয়ে আসে। কিঞ্চিৎ নাসিকা কুঞ্চিত করে টেনে চলি। আর একটু এগুলেই শহুরে বাজার পড়বে। এই সুন্দর রৌদ্রজ্জ্বল শান্তিটাকে খান খান করে দিতে ওখানে হাজির আছে অটোস্ট্যান্ড, রিক্সাওয়ালারা, বাজারের দোকানিদের চিৎকার- কিন্তু এই শান্ত দুপুরটা যেমন সত্যি তেমনি সেটাও সত্যি। তাই সেটাকে তো আর এড়িয়ে যাওয়া যায় না? কে জানে দুপুরের আলোয় বাজারটা আবার কি রূপ নিয়ে বসে আছে? সেটাকেও চেখে দেখতে ইচ্ছে হয়- নিস্তব্ধতাকে পেছনে ফেলে দিতে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই সেইদিকে।

এক দ্বৈপ্রাহরিক সঞ্চালন
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments