ভূমিকা –

বেশ কয়েকবছর আগেকার কথা। প্রথমবার বিদেশে গিয়েছি অফিসের কাজে, Canada-র একটা ফরাসীপ্রধান শহর Montréal-এ। অনিন্দ্যদা আর আমি, দুজনেরই প্রথম বিদেশযাত্রা। ছবির মতো সুন্দর শহর, যেন উত্তর আমেরিকা মহাদেশের মাঝে এক টুকরো ইওরোপ কেউ তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছে। আমরা অভিভূত হয়ে নতুন শহরের সাথে মানিয়ে নিচ্ছি, তবে একটাই সমস্যা, ভাষা ! লোকজন এক বিদ্‌ঘুটে ভাষায় (পড়ুন French) কথা বলে, মাথামুন্ডু কিছুই বুঝি না, বোঝাতেও পারিনা। তবে আমরা ভালই আছি, সারাদিন নানা রকম গল্পগুজব করি, রাতে ফিরে অনিন্দ্যদা রান্নাবান্না করে, তারপর আমরা একসাথে কোনও সিনেমা দেখে শুয়ে পড়ি। Weekend গুলো ঘুরে-বেড়িয়ে কেটে যায়। এমন সময় এলো সেই নিদারুণ খবর। আমার কাজ বেড়ে গেছে, তাই প্ল্যানমাফিক অনিন্দ্যদা ফিরে গেলেও আমাকে থেকে যেতে হবে ! পুজোতে কোনও উপায় নেই বাড়ি ফেরার। সেইমতো অনিন্দ্যদা একদিন ফিরে গেল আর শুরু হল আমার একা একা পথ চলা। সেই নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলোতে আমার প্রিয় বিনোদন ছিল দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বন্ধুদের e-mail এর মাধ্যমে আমার অভিজ্ঞতা জানানো আর দিন গোনা।

সেই mailbox থেকেই এই email টা প্রায় হুবহু তুলে দিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম formatting টা পাল্টাবো, কিন্তু শেষমেশ একই রেখে দিলাম। দেখা যাক আপনাদের ভালো লাগে কিনা।

ষষ্টী –

সকালে ঘুম থেকে উঠলাম প্রচন্ড ঢাকের আওয়াজে… অ্যাপার্ট্‌মেন্টের পাশেই একটা পুজোমন্ডপ হয়েছে … যাত্‌তা শুরু করেছে  Montréal এর প্রবাসী বাঙ্গালীরা। নোংরা করে একটা প্যান্ডেল বানিয়েছে… আর বেশ জোরে জোরে ঢাক বাজাচ্ছে… ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য এর চেয়ে ভালো উপায় আর কি হতে পারে !! আমি সকালে উঠেই মিতা চ্যাটার্জির পুজো-র অ্যালবাম চালিয়ে দিলাম, এবার তো আর পুজোর নতুন অ্যালবাম সঙ্গে নেই, তাই পুরনো গুলোই শুনি … কি আর করা যাবে… তারপর অফিস। এই জায়গাটাতে বাঙালি একটু বেশী… অফিসের কাছেও একটা ছোট্ট পুজো হচ্ছে। এরা এখানকার Govt. এর কাছে আবেদন জানিয়েছে যেন পুজোর চারদিনের জন্যে ঢাক এর আওয়াজটা ছেড়ে দেওয়া হয়… আর Govt. সেটা শুনেও নিয়েছে !! সবাই যে এদেশে বাইরের লোক, আর বাঙালি community টা বেশ বড় হওয়ায় মানতে একরকম বাধ্য হয়েছে। সারাদিন বেশ ভালই কাটল… বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় প্রসাদও খেলাম… একেবারে অমৃত ! ফিরে যেতে যেতে শুনলাম মিতা চ্যাটার্জি-গৌতম ঘোষ এর “চলে যেতে যেতে…” এরকমই কেটে গেল ষষ্টী ! 

সপ্তমী –

আই ঊইশ ইট উড হ্যাভ বিন ট্রু !! নাহ্‌ , স্বপ্ন থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগলো… বেরিয়ে এলাম শেষ পর্যন্ত। ঢাকটা আমার মনে বাজছিলো … আর গানটা iPod-এ। সেই সেম ওল্ড অফিস ! সেই সেম ওল্ড রাস্তা… ঝরে পড়া লাল ম্যাপ্‌ল এর পাতা শুধু মা-এর লাল পাড় এর কথাই মনে করাতে পারে, খুশীর আন্দোলন তুলতে পারে না… এত সুন্দর হয়েও তার মধ্যে কিসের যেন অভাব… এত রোমান্টিক হয়েও কোথাও যেন নীরস… সারাদিন কোনও কাজ করতে পারিনি, সবাইকে বললাম ভালো লাগছে না আজ, কিছু বিদেশী বন্ধুর কাছে বর্ণনা করলাম আমরা কেমন পুজো কাটাই… আর পুজো actually কি জিনিস… লোকজন “লোড নিয়ে” আমাকে নিয়ে পড়ল… খুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করল Montréal এর একটা পুজো… নাহ্‌ ,সব বিফল…সব বিফল… পুজো-র গান নয়, মনে এখন শুধুই বাজছে Gharonda সিনেমা-র একটা গান “Ek akela ish Shehar mein..”

-    “ফ্রাস্টু” কাটাতে রাতে বাড়ি ফিরে মদ নিয়ে বসলাম… হিন্দিতে একটা কথা আছে না, Ghum ke dawai Rum … 

অষ্টমী –

আজ Friday, মস্তির দিন ! কাল থেকে কাজ নেই… দুটো week টানা কাজ করেছি… কাল তাই ঘুরতে যাবো, মনটা আজ বেশ ভালো, ভয়ে “মিতা চ্যাটার্জি” আর ছুঁলাম না, আমার Lucky Ali জিন্দাবাদ… কাল কোনও কাজ হয় নি, আজ কিন্তু much of a progress…  সারাদিন অসাধারণ weather, এখানে এই সময় usual temperature 6-7 থাকে, সেখানে আজ 25, বেশ গরম… প্রচন্ড হাওয়া দিচ্ছে, আর চারিদিকে লাল-হলুদ-সবুজ ম্যাপ্‌ল এর পাতা উড়ে বেড়াচ্ছে… দুর্দান্ত weather, কাজ শেষ করে খুশি মনে অফিস থেকে বেরোলাম (কিছু issue আছে, কিন্তু issue তো never ending… কি আর করা যাবে…)। যাহ্‌ , বেরিয়ে দেখি বাইরে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি, ভেবেছিলাম আজকের weather এ বিকেলে বেড়াতে বেরোব (মানে ঠাকুর দেখতে আর কি, মৃন্ময়ী তো জুটল না, তাই চিন্ময়ী বা তন্ময়ী smiley)… কিন্তু KLPD হয়ে গেল।  স্বাভাবিক temperature এতো fluctuate করলে তো বৃষ্টি নামবেই… নিরাশ  লাগছে… কি যে করি… অফিসে আবার ঢুকে পড়লাম… আবার কাজ নিয়ে বসলাম… কি আশ্চর্য !! যতগুলো issue সারা সপ্তাহ ধরে solve করতে পারিনি, কি করে জানি নেমে গেল… দেশে ফেরার আশা মনে ঝিলিক দিচ্ছে…

-দশটা বাজতেও যখন বৃষ্টি থামলো না, তখন অগত্যা CAB…

নবমী –

ভোর পাঁচটায় উঠেছি… Mission মন্ত্‌ থ্রাঁ ব্লাঁ … ফরাসী উচ্চারণ, আসলে বানান টা হল Mont-Tremblant … 50 KM from Montréal, অসাধারণ কিছু পাহাড়, আর তাদের মাঝে একটা বিশাল লেক… পাহাড় থেকে ঝর্ণা নেমে লেক-এ পড়েছে, সেই লেক –এর ধারে একটা European style village … পুরো ছবি!! এখানকার যত রহিস জনতা সবাই একটা করে বাংলো বানিয়ে রেখেছে … চারিদিকে লাল-সবুজ-হলুদের খেলা … প্রকৃতি যেন নিজের অবসর সময়ে নিজে হাতে ঢেলে সাজিয়েছে(refer to my Orkut Album)। আমরা পাহাড় এর উপরে একটা জঙ্গলে বেড়ালাম খানিকক্ষণ, তারপর লেক-এ বোটিং তারপর বাড়ি… ওখানে নাকি Bear এর খুব ভয়, আমাদের চোখে পড়েনি অবশ্য, তবে বাড়ি ফিরে Beer পেটে পড়েছে smiley ।     

দশমী –

আজ আবার মনটা আনচান করা শুরু করেছে সকাল থেকে… একরকম হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছি internet-এ। বাহ্‌ , তাহলে Montréal-এ একটা পুজো হয় !! এর মধ্যে আমার ইতালীয়ান ম্যানেজার ফোন করল। সেদিন আমার খুব মন খারাপ দেখে আজ বিকেলে ওর পরিবারের সাথে সময় কাটানোর জন্য বলেছিল, একসাথে Dinner এ বেরোনোরও কথা ছিল। ওকে কেসটা খুলে বললাম। ও বলল Dinner অন্যদিন হবে, আজ আমার পুজোতে যাওয়া উচিত, রাস্তাও বলে দিল… দুটো Metro পালটে একটা বাস ধরতে হবে, কিন্তু বাস-টা weekend-এ নাও পাওয়া যেতে পারে! ওকে মনে মনে বাহবা দিয়ে উঠে পড়লাম। যেহেতু আমি অফিস এর হাঁটা দূরত্বে থাকি, Public Transport এর সাথে খুব একটা পরিচিত নই, তবু আমাকে যেভাবে হোক পৌঁছতেই হবে… মনে মনে প্ল্যান করছি আর অন্যমনস্ক ভাবে সেই পুজো-র Website টা Browse করছি… হঠাৎ একটা link  চোখে পড়ল, click করতেই কতগুলো বাঙালি নাম আর ফোন নাম্বার…একটার পর একটা ডায়াল করে চললাম…কেউ বাড়িতে নেই, সবাই বিজয়া করতে ব্যস্ত, শুধু ভয়েস মেসেজে চলে যাচ্ছে, আমার আর তর সইছে না… হঠাৎ একজন ফোন তুলল।

-    Hello… এটা কি সুগতবাবুর বাড়ি?

-    Just a second…

-    Hello

-    সুগতবাবু বলছেন?

-    না, আমি শান্তনু… (Website-এ নাম ভুল দেওয়া ছিল, আমার দোষ নেই smiley ) 

-    আমি দেবদত্ত … কয়েকদিন এর জন্য Montréal-এ এসেছি… শুনলাম আপনারা নাকি পুজো করছেন?

-    আরে আপনি কোথায় ছিলেন এতদিন? আমাদের কাল রাতে কত আনন্দ হল… এখন তো সব wrap up হয়ে গেছে বোধহয়।

-    না মানে আমি শুধু একবার ঠাকুরের মুখটা দেখতে চাই… কিভাবে যাই বলুন তো?

-    আজ public transport পাবেন না, দাঁড়ান আমি বাড়িতেই আছি বাচ্চাদের সাথে… আমি আপনাকে pick-up করে নিচ্ছি, বাঙ্গালীর টাইম তো, হয়তো বিসর্জনের পুজোটা পেয়েও যেতে পারেন… নাহলেও ঠাকুর তো দেখতে পাবেনই…

-    না না আপনি কেন কষ্ট করবেন, আমি চলে যাবো, শুধু address টা verify করার জন্য ফোন করেছি…

-    আরে ছাড়ুন তো মশাই, আপনি হলেন আমাদের guest মানুষ, এটুকু তো করাই যায়।

আর আমি বেশী কথা বাড়াচ্ছি না, অনেক বড় গল্প… শুধু outline দিয়ে দিচ্ছি…

গাড়ি করে লং ড্রাইভ… পুজো… অনেক বাঙ্গালী দাদা আর বৌদি… সবাই যে কত আন্তরিক তা ভাবাই যায় না… সত্যিই বাঙ্গালী-র টাইম smiley , অঞ্জলি (এ শর্মা দেশে থাকতে কোনোদিন অঞ্জলি দেয়নি smiley ), হুলিয়ে খাওয়া-দাওয়া, অনেক রকমের বাড়িতে তৈরী মিষ্টি, নারকেল নাড়ু !! যিনি বানিয়েছেন, তিনি আবার বললেন নারকেল ভেঙ্গে তৈরী করা হয়েছে, Packaged Coconut Powder দিয়ে নয়… স্বাদেই প্রমাণ মিলল !! ঢাকের আওয়াজ, এবার সত্যিকারের… অসামান্য একটা দুপুর, দারুণ কিছু মানুষ, আবার গাড়ি চড়ে ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন… একটা শান্তির ঘুম …

তবে একটাই শেষ কথা…

“আসছে বছর আবার …” -যেন না হয় !!

এক প্রবাসীর পুজোর ডায়রী
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments