[আমাদের এক প্রাক্তন সদস্যের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করে এই লেখা লিখতে বসেছি। তফাতটা কেবল এই যে আমি পড়ছি হার্ড কপি, আর তিনি পড়তেন কেবলই কিন্ডলে। নতুন বছরের রেজোলিউশন - যখন যে বই পড়ে ভাল লাগবে, তার সম্পর্কে লিখে ফেলব দু এক প্যারা, বন্ধুদের সঙ্গে বই পড়ার আনন্দ ভাগ করে নিতে। আমার প্রস্তাব এটা একটা বারোয়ারী সিরিজের রূপ দেওয়া হোক। যে কেউ লিখতে পারেন এই সিরিজের অংশ হিসেবে। যেহেতু একেকটি পর্ব অন্য পর্বগুলির থেকে বিচ্ছিন্ন, তাই কোনো নিয়ম কানুনের দরকার নেই। নিজের অ্যাকাউন্ট থেকেই লেখা যাবে। কেবল আগে কটা পর্ব লেখা হয়েছে দেখে নিয়ে সেই সংখ্যাটা বসিয়ে দিলেই হবে। বাংলা কি ইংরেজি কি অন্য ভাষার বই, নতুন প্রকাশিত অথবা পুরোনো, সব রকম চলবে। একটাই অনুরোধ, লেখাটা যেন স্রেফ গল্পের প্লটটাকেই ছোটো করে বলে দেবার জন্য লেখা না হয়, বরং সেটা এড়িয়ে চলে বইটার সম্পর্কে নিজের অনুভূতি বা নিজস্ব বিশ্লেষণ দেওয়াই কাম্য।]

 

 

আজকে যে বইটা সম্পর্কে বলব সেটা শঙ্করীপ্রসাদ বসুর "বাছাই ক্রিকেট"। প্রকাশনা – মণ্ডল বুক হাউস। সদ্যপ্রয়াত লেখক এবং গবেষক শঙ্করীপ্রসাদের ক্রিকেট নিয়ে লেখা বই প্রথম পড়ি ছেলেবেলায়, স্কুলের লাইব্রেরি থেকে তুলে। আমাদের লাইব্রেরির এক অন্ধকার কোণে রাখা থাকত এই জাতীয় বইগুলি। সেদিকটা এমনিতে কখনো যেতাম না। একবার গিয়ে কালচে মলাটের বাঁধানো বইগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে পেয়ে গেছিলাম "ইডেনে শীতের দুপুর"। ক্রিকেট দেখেই বোধহয় উৎসাহিত হয়ে নিয়ে এসেছিলাম। পড়ে এতই ভাল লাগে, তারপর থেকে বেশ কিছুদিন লাইব্রেরিতে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হয়ে ওঠে ওই অন্ধকার কোণটা। সেখান থেকে একে একে আবিষ্কার হয় "রমনীয় ক্রিকেট", "বল পড়ে ব্যাট নড়ে", "ক্রিকেট সুন্দর ক্রিকেট"। শীতের রোদ গায়ে লাগিয়ে ইডেনে বসে টেস্ট ক্রিকেট দেখার সেই গল্পগুলো বড়ই রোম্যান্টিক। সেই যে টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসা তৈরি হয়ে গেল, তা আজও রয়ে গেছে। তাই এখনও অপেক্ষাকৃত পপুলার ফরম্যাট গুলো ছেড়ে টেস্ট ক্রিকেট দেখতে বসি অ্যালার্ম দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে। 

শঙ্করীবাবুর আরও অনেক বই আছে, বিশেষ করে বিবেকানন্দ বিষয়ক বইগুলি উল্লেখযোগ্য। সেসবের কথা তখন কিছুই জানতাম না। আমার কাছে উনি ছিলেন কেবল পুরোনো দিনের ক্রিকেট সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দেওয়া একজন অসাধারণ গল্প বলিয়ে। সেখানেই জেনেছি রোমাঞ্চকর অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টাই টেস্টের কথা, বা লাল বল লারউডের জীবনের ট্র্যাজিক কাহিনী।

মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে যখন বারো ক্লাসের ছাত্র, তখন একবার হঠাৎ মোলাকাত হয়ে যায় ওনার সঙ্গে। একেবারেই হঠাৎ বললে অবশ্য ভুল হবে, কাজের সূত্রে আমার মায়ের পরিচয় হয় ওঁদের পরিবারের সঙ্গে। মায়ের মুখে আমি ওনার লেখার ভক্ত শুনে তিনি বলেন ছেলেকে নিয়ে আসতে। মায়ের সঙ্গেই ওনাদের শিবপুরের বাড়িতে গিয়েছিলাম সেবার। দিব্যি মাই ডিয়ার লোক, বেশ কিছুক্ষণ গল্প করলেন, আমি কি পড়ি, খেলাধূলা কি করি, এইসব জানতে চাইলেন। তারপর এনে দিলেন তাঁর লেখা ক্রিকেট সংক্রান্ত লেখার এই সংকলনটি – বাছাই ক্রিকেট। নিজের হাতে লিখেও দিয়েছিলেন প্রথম পাতায়।

 

এই বইটি সম্পর্কে আলাদা করে বলার কিছু নেই, আগের যে বইগুলির নাম করলাম সেগুলোর থেকেই বিভিন্ন লেখা নিয়ে এখানে সংকলিত করা হয়েছে। যেকোনো ক্রিকেট-প্রেমীর অবশ্যপাঠ্য। বহুদিন পর তাক থেকে নামিয়ে আবার পড়তে শুরু করেছিলাম, ভাল লাগলেও কেন জানি মনে হল সেই কালচে মলাটের বাঁধানো বই গুলোর আমেজটা হারিয়ে গেছে। আমার মনে হয় শঙ্করীপ্রসাদের এই ধরনের লেখার সম্পর্কে প্রাথমিক ভাবে পড়ার জন্য এটা খুব ভাল সংকলন। বিশেষ করে "লাল বল লারউড" অংশটা তো অসাধারণ। তবু তারপর মূল বইগুলো পড়ে নিলে তবেই সেই রোম্যান্টিক শীতের দুপুরের মজাটা পুরোমাত্রায় পাওয়া যাবে।
 
ভাবতেই ইচ্ছে করছে লাইব্রেরির সেই অন্ধকার কোণাটায় আবার হানা দিতে…

 

এখন যা পড়ছি (১) : বাছাই ক্রিকেট
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments