১৮৯০ সাল। প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় – অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিস অফিসার। প্রকাশ করতে শুরু করেন ‘দারোগার দপ্তর’ নামক একটি সাময়িকী। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে খুব সম্ভবত প্রথম গোয়েন্দা কাহিনির যাত্রা আরম্ভ হয়। সেইসময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই কাহিনিগুলি লিখতে গোয়েন্দা স্বয়ং হাতে তুলে নিতেন কলম, জানাতেন রহস্যভেদে তাঁর অভিজ্ঞতা। এর বেশ কিছু সময় পরে পাঁচকড়ি দে-র দেবেন্দ্রবিজয়-অরিন্দম-কে নিয়ে সৃষ্টি হয় প্রথম গোয়েন্দা-সহকারী জুটি। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছে সময় এবং তার সাথে সাথে বাংলা গোয়েন্দা গল্পের জগতে এসেছে যেমন এসেছে একক গোয়েন্দার কীর্তি সেই রকমই আবির্ভূত হয়েছে বহু অবিস্মরণীয়, জনপ্রিয় জুড়ি।

আমরা যারা সাধারণ পাঠক, যারা একটু আধটু পড়তে ভালবাসি, তারা ভাল লাগলে সহজভাবে বলি ‘ভাই, ভাল লাগল’ মন্দ লাগলেও একইরকমভাবে স্বীকার করে নিই। আর যে লেখাসমৃদ্ধ বই পড়তে পড়তে, এমনকি আসলে দ্বিতীয় বার পড়ার সময়েও, দিগ্বিদিক ভুলে যেতে বাধ্য হই, প্রতিটি শব্দ তার উত্তরসূরীর প্রতি গড়ে তোলে দুর্নিবার আকর্ষণ, ট্রেনে, ট্রামে বা বাসে আকস্মিকভাবে জানালার বাইরে চোখ চলে গেলে প্রথমেই ‘ওভারক্যারেড হয়ে যাইনি তো’ এই ভীতি সৃষ্টি করে তবু কিছুতেই ইচ্ছে করে না যে শেষ পরিচ্ছেদটা আগে পড়ে নিই, ঝট করে জেনে নিই, কি ঘটবে, তাকে আনপুটডাউনেবল ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় কি?

এইরকমই একটি বই হাতে এল সম্প্রতি। ডাঃ অশোক দেবের লেখা পাঁচটি গোয়েন্দা উপন্যাসের একটি সংকলন ‘হাতের পাঁচ’। গোয়েন্দা-সহকারী জুড়ি, একইসঙ্গে দুই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত বন্ধু রাহুল সরকার – রঞ্জন মিত্র-এর কীর্তিকলাপ। নামেই মালুম মোট পাঁচটি কাহিনি আছে এতে, গোয়েন্দা হিসেবে র‍য়েছেন পূর্ণসময়ের রাহুল এবং তার সরকারী চাকুরীজীবী সহকারী রঞ্জনের জবানবন্দীতে লেখাগুলি গ্রন্থিত।

 

 

পাঁচটি গোয়েন্দা কাহিনি। খুব স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে অপরাধ, অপরাধ বলতে একটি খুন, দুটি মুক্তিপণ আদায়, একটি আত্মহনন এবং একটি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র। অপরাধের মোটিফ তিনটি ক্ষেত্রে অর্থ, একটি ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রোশ। এই পর্যন্ত যে বৈচিত্র্য নজরে পড়ে তা যে খুব মৌলিক এমনটি বলা না গেলেও লেখক মূল মুন্সিয়ানা কাহিনির বর্ণনায়। যেমন যে গল্প দুটিতে খুন এবং একটি আকস্মিক অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটে (যথাক্রমে চৌধুরী বাড়ির উপকথা এবং স্ক্রিনসেভার) দুটিতেই অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্যে অন্য কেউ আরও একটি বা একাধিক অপরাধ ঘটান অথবা ঘটাতে সাহায্য করেন। লেখকের কলমের জোরে প্রত্যেকটি মানুষ শেষ অবধি মানবিক দোষগুণ নিয়েই থেকে যান, কাউকে ভগবান কিংবা শয়তান বানিয়ে তোলার প্রয়োজন পড়ে না।

গোয়েন্দা গল্পের লেখক যদি একই সঙ্গে ভ্রমণকাহিনি লিখতেও দক্ষ হন, তাহলে কি হতে পারে তার উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায় ‘মরু অন্তর্ধান রহস্য’, ‘বেতলার অভিযান’ এবং ‘অ্যান ইভনিং ইন কলকাতা’ এই তিনটি গল্পে। কলকাতা শহরে শুরু হলেও এই তিনটি কাহিনির জাল ছড়িয়ে পড়ে সুদূর দুবাই, প্রতিবেশী ঝাড়খন্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে। এবং লেখকের বিস্তারিত বর্ণনার গুণে এই অঞ্চলের একটি পরিষ্কার ছবি আমাদের সামনে ফুটে উঠতে থাকে, পাঠকেরও মনে হতে পারে তিনি যেন গোয়েন্দার পাশে বসেই পুরো রহস্য উন্মোচন হতে দেখছেন।

বইটির সব ক’টি কাহিনি অত্যন্ত উপভোগ্য হলেও বিশেষভাবে উল্লেখের দাবিদার ‘অ্যান ইভনিং ইন কলকাতা’ এবং ‘স্ক্রিনসেভার’ গল্পদু’টি।

প্রথমটি একটি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের উন্মোচন। রাহুলের সহকারী রঞ্জন হঠাৎ করে একটি নোটবই পায় এবং যা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এক ভয়ংকর নাশকতা রুখে দেওয়া সম্ভব হয়। এই গল্পটিতে রূপকের আড়ালে উঠে এসেছে একসময় পশ্চিমবঙ্গের এক বিশেষ অঞ্চলের ত্রাস এবং বর্তমানে প্রায় অস্ত্বিত্ববিহীন এক বিশেষ রাজনৈতিক দলের কর্মকান্ডের কিছু বিবরণ। কিন্তু এখানেও লেখক এক সদর্থক পর্যবেক্ষকের ভুমিকা পালন করেছেন, বুঝিয়ে দিয়েছেন ঘটনা যাই হোক না কেন, শান্তির সপক্ষেই শেষ কথা বলা উচিত।

অন্যটি খুব সম্ভবত এই গ্রন্থের সবচেয়ে শক্তিশালী কাহিনি। কর্পোরেট জগতের প্রফেশন্যাল রিভ্যালরিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘স্ক্রিনসেভার’। অন্তর্ঘাত, সেই অন্তর্ঘাত জানতে পেরে সহকর্মীকে ব্ল্যাকমেইল, ইন্টার্নাল পলিটিক্স, ঘটনাচক্রে ঘটে যাওয়া একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু, সব মিলে গড়ে ওঠা এক ঠাসবুনোট রহস্য এবং সেই রহস্যভেদ। অত্যন্ত সাবলীলভাবে বর্ণিত এই কাহিনির পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে এক মর্মান্তিক মৃত্যু, যার ফলে একটি অসুস্থ শিশু তার মাকে হারায়, সেই মায়ের অপরাধ মেনে নিতে না পারলেও পাঠকের মন দোলাচলে ভুগতে থাকে ভালমন্দের দ্বন্দ্ব নিয়ে।

সব মিলিয়ে শুধু সুখপাঠ্যই নয়, শ্রীযুক্ত সমর মুখোপাধ্যায়ের প্রচ্ছদ এবং অলংকরনের সুবাদে সুদৃশ্য এক গ্রন্থ ‘হাতের পাঁচ’। আরও একটি কথা। বাংলা প্রকাশনার জগতে একক লেখকের বইতে সম্পাদক হিসেবে কোনও দ্বিতীয় ব্যক্তির নাম থাকবে বিষয়টি মেনে নেওয়া যতই কঠিন হোক না কেন এটি জরুরি। এখানে প্রকাশক হিসেবে ‘বঙ্গাড্ডা’ আমাদের ধন্যবাদার্হ হয়েছেন শ্রীযুক্ত মানব বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের হাতে গ্রন্থটি সম্পাদনার দায়িত্ব তুলে দিয়ে। তাঁর সম্পাদনায় গ্রন্থটি ত্রুটিহীন, একটিও মুদ্রণপ্রমাদ খুঁজে পাওয়া যায় না, বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে যা বিরল ঘটনা বললেও হয়ত কম বলা হয়। যদিও মনে হয় ‘স্ক্রিনসেভার’ কাহিনিটি আরও সুসম্পাদিত হওয়ার দাবি রাখে, অতিরিক্ত পরিমাণে ‘-’ চিহ্নটির ব্যবহার পীড়া জাগায়, এমনকি সময় সময় মনঃসংযোগের যথেষ্ট ব্যঘাত ঘটায়।

অসংখ্য শুভকামনা রইল নবীন গোয়েন্দা রাহুল এবং তার সহকারী রঞ্জনের প্রতি

 

 

হাতের পাঁচ

ডাঃ অশোক দেব

প্রথম প্রকাশ – ২৯শে জানুয়ারি, ২০১৪

প্রকাশক – বঙ্গাড্ডা 

এখন যা পড়ছি (২) : হাতের পাঁচ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments